মানবিক সমাজ চাই

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০১৭      

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

বৈচিত্র্য ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষের জীবন গড়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রূপান্তরের বিষয়টি পরিবর্তনশীল হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের রূপান্তর ঘটলেও পরিবর্তনশীলতার বিষয়টি সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে না। কারণ মানুষের জীবনের কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে, যার প্রয়োগের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটলেও মূল উপাদানের পরিবর্তন ঘটানো উচিত নয়। যেমন- একজন নারী কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। এরপর জায়া হিসেবে তার পদযাত্রা শুরু হয়। পরে তার জননী হিসেবে রূপান্তর ঘটে। এখানে পরিবর্তনশীলতার বিষয়টি অপরিহার্য। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একজন নারীর ভূমিকাও পরিবর্তিত হয়। এখানে ভূমিকাকে দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। জননী হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে তা হলো, সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। সুশিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত। আবার মানবিক মূল্যবোধ, সততা, নৈতিকতা, উদারতা ও সার্বজনীনতার বিষয়গুলো কোনোভাবে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর ব্যত্যয় ঘটছে। যেমন বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানাগুলোতে মা যখন তার সন্তানকে জঙ্গিবাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন এ ধরনের মনস্তাত্তি্বক পরিবর্তন কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের জঙ্গিবাদীদের প্রয়োজনে আত্মঘাতী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ পরিবর্তন প্রত্যক্ষভাবে সমাজের মূল ভিত্তিকে আঘাত করছে। ফলে শক্ত শিকড়ের ওপর যেখানে নারী সমাজের দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, তা থেকে এক ধরনের বিচ্যুত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টিকে যদি সতীদাহ প্রথা বা সহমরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়; তবে এ ক্ষেত্রে সহজ-সরল একটি সমীকরণের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানে যে বিষয়টি পরোক্ষভাবে কাজ করেছিল তা হলো, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীকে বঞ্চিত করা। সাম্প্রতিককালে মমতাময়ী মায়ের নিষ্পাপ সন্তানকে জঙ্গিবাদে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা ও আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতাও আমরা দেখেছি। যদিও সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবী অগ্রসর হয়েছে, মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে স্বামীর রক্ষণশীল আচরণ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে অনেকে বাধ্য হয়েই নারী আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিককালের একটি ঘটনায় বিকৃত সামাজিক ও মনোজাগতিক রূপান্তরের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। সামাজিক সম্পর্কের বলয় ও রূপান্তর আত্মিক না হয়ে আর্থিক হওয়ায় এ ধরনের বিরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়া কাজ করছে। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ঘটনা সমাজতাত্তি্বক ও মনস্তাত্তি্বক ধারণা বর্তমান সময়েও শ্রেণি বিভাজনের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। পত্রিকার খবরে এসেছে ভেবে দেখার জন্য, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, ছেলের জন্মদিনে মেয়ে জোগাড় করে দেওয়ার ব্যবস্থা দিলদার আহমেদই করেছিলেন। এ ছাড়া সাফাতের বাবা তার সন্তানের পকেট খরচ হিসেবে প্রতিদিন দুই লাখ টাকা দিতেন। ফলে অর্থ হয়েছে অনর্থকের মূল আর ব্যক্তিত্ব বিকশিত না হয়ে বিকৃত হয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে অপসংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রে। অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতি ও সমাজের অংশ মনে করে বনানীর ঘটনায় অপরাধটা কোথায় তা সাফাতের মতো তরুণ প্রজন্ম যেমন বুঝতে পারছে না, তেমনি প্রবীণ হয়েও তার বাবা বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে না। সাফাতের মা প্রকৃত অর্থেই বিষয়টিকে উপলব্ধি করে তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, তার সন্তানের নষ্ট হওয়ার জন্য তার বাবা ও বাবার অর্থ দায়ী। সাফাতের সাবেক স্ত্রী বলেছেন, একজন বাবা চান তার সন্তান তার মতো বেড়ে উঠুক। দিলদারও ছেলেকে তার মতোই বানিয়েছেন। এ ধরনের রূপান্তর সমাজের জন্য কাম্য নয়। নিজের বাবা-মাকে হত্যার মাধ্যমে ঐশীর যে ঘটনা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতাকে সমর্থন করে না। অবৈধ উপার্জনের ফল যে সুখকর হয় না তা স্পষ্ট। পরিবারের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ঐশীর মনোজগতে কাজ করেছিল। ফলে পরিবারকেন্দ্রিক উদার ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বাইরের অবাস্তব জগতের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সমীকরণটি যে জায়গায় এসে মেলে সেটি হলো, এখানে প্রকৃত দোষী পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র নাকি বিশ্বায়ন। সাধারণভাবে এখানে সন্তানের চেয়ে বাবা-মাকে দোষী করাই সমীচীন হবে। কেননা রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতাকে তারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের নেপথ্যে যে একটি কদর্য চেহারা আছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দিকটিকে ইঙ্গিত করে। এ জন্য এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে গেলে প্রথমে পরিবার, তারপর সমাজ থেকে মাদককে সমূলে বিদায় জানাতে হবে। বেপরোয়া জীবনযাপনের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তা না হলে বনানীর মতো এ রকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। প্রকৃত আধুনিকতা ম্যাকল্যানগিলো আনটোনিয়োনির আধুনিকতার ধারণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেছেন, 'যারা জীবনকে আধুনিকতার বিশুদ্ধতার সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেনি, তাদের ক্ষেত্রে আধুনিকতাকে ধারণ করা খুব কঠিন। কিন্তু প্রকৃত আধুনিকতা বাস্তবিকই মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক ও উদারনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে।' আমরা সেই আধুনিক রূপান্তরের পরিবর্তনশীলতার প্রত্যাশা করি; যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করবে।
অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
asadzmn2014@yahoo.com

পরবর্তী খবর পড়ুন : প্রবাসে স্বদেশের জয়গান!

তাইজুল ফেরালেন রাজাকে

তাইজুল ফেরালেন রাজাকে

মিরপুর টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিন ব্যাট করছে জিম্বাবুয়ে। বৃহস্পতিবার ...

মেলানিয়ার সঙ্গে ঝামেলায় পদচ্যুত ট্রাম্পের উপদেষ্টা

মেলানিয়ার সঙ্গে ঝামেলায় পদচ্যুত ট্রাম্পের উপদেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে ঝামেলার পর ...

নয়াপল্টনে সংঘর্ষ: ৩ মামলায় গ্রেফতার ৫০

নয়াপল্টনে সংঘর্ষ: ৩ মামলায় গ্রেফতার ৫০

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় দলের স্থায়ী কমিটির ...

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে মহাসংকটে ...

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চলকে শহরের সুবিধায় আনতে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ...

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ঘাতক ব্যাধি ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ...

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

'লোকগানের কথায় রয়েছে জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ঐন্দ্রজালিক সুর অদ্ভুত এক ...

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দক্ষ রাজমিস্ত্রি হিসেবেই মিরপুর, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকার মানুষজন চিনতেন ...