আমেরিকার ঘাড়ে ভুয়া সংবাদের ভূত

আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৭      

সঞ্জয় দে

গত বছর মে মাসে আমেরিকার হিউস্টন শহরের ইসলামিক সেন্টার নিয়ে স্থানীয় একটি শ্বেতাঙ্গ ডানপন্থি গ্রুপ ও মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেখা গেল, শ্বেতাঙ্গ গ্রুপটি ফেসবুকে একটি সমর্থক পেজ খুলে প্রচারণা চালায়। অন্যদিকে মুসলিমদের পক্ষে তাদের প্রতিহত করতে আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রতিরোধের ডাক দেওয়া হয়। নির্ধারিত দিনে দু'পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়ালেও বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই সে পর্বের সমাপ্তি ঘটে। তবে বছরখানেক বাদে আবার সেই ঘটনাটি নিয়ে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন এক কেচ্ছা। যে দুটি পেজ খুলে এই দু'গ্রুপকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল; শোনা যাচ্ছে, এই দুটি পেজই খোলা হয়েছিল সুদূর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহর থেকে একই ব্যক্তি দ্বারা। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে পেজ খুলে এখানে উস্কানিমূলক পোস্ট করা হয়, যাতে বিভেদের আগুন জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের পালে যাতে নতুন করে হাওয়া লাগে। সম্প্র্রতি ফেসবুক এক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানতে পেরেছে ; শুধু এ দুটি পেজই নয়; গত বছর নির্বাচনের আগ দিয়ে রাশিয়া থেকে এমন কয়েকশ' ভুয়া পেজের মাধ্যমে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ করে এমন সব প্রচারণা চালানো হয়েছে, যেটিতে হয়তো বেগবান হয়েছে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযান। যেমন- কৃষষ্ণাঙ্গদের সপক্ষে কিছু পেজ খুলে বোঝানো হয়েছে, ওবামার সময়ে তারা কতটা বাজেভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। আবার খনিসমৃদ্ধ কিছু এলাকাকে টার্গেট করে সেখানকার জন্য পেজ খুলে বোঝানো হয়েছে- ট্রাম্প জয়ী হলে খনি শ্রমিকরা লাভবান হবে। এসব কেলেঙ্কারি নিয়েই এ সপ্তাহে এক শুনানিতে বসেছিলেন আইন প্রণেতারা। সেখানে তারা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে প্রশ্ন রাখেন- এভাবে যদি আবারও জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করার সুযোগ আসে, তবে কি তারা আবারও একই কর্মের পুনরাবৃত্তি করবেন? এ প্রশ্নের জবাব সুকৌশলে এড়িয়ে যান নির্বাহীরা। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের এমন নির্লজ্জ বেনিয়াসুলভ আচরণ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বরং আলোচনা করা যাক, কী করে রাশিয়া আমেরিকার প্রভাবশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নানা ফাঁকফোকর ও সুযোগের অপব্যবহার করে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাপটের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে ফেসবুক, গুগল ও টুইটার। ফেসবুকে বিনা পয়সায় কোনো গ্রুপ খুলে নিজেদের কথা জানান দেওয়া তো যাই-ই; সেই সঙ্গে কিছু পয়সা ঢাললে ফেসবুক ওই পেজটিকে স্পন্সরড পেজ হিসেবে আরও বহু মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল রাশিয়ার গ্রুপগুলো। যদিও প্রস্তুতি থাকলে ফেসবুক অর্থ সমাগমের প্রকৃত উৎসটি শনাক্ত করতে পারত। কারণ, রুশ গ্রুপগুলো অর্থ প্রেরণ করেছে একটি রুশ অর্থ প্রদানকারী পোর্টাল 'কিউই' ব্যবহার করে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না, অর্থের উৎস শনাক্তকরণের পেছনে ফেসবুকের তেমন কোনো দৃঢ় অভিপ্রায় আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের পেছনে অর্থদাতা কে, সেটি বিজ্ঞাপনের সঙ্গেই প্রচারের জন্য একটি নীতিমালা আইন প্রণেতারা তৈরি করতে চাইলে এই ফেসবুকই লবিস্ট নিয়োগ করে তাতে বাধা দেয়, যাতে অর্থ সমাগমের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়। এ তো গেল অর্থের বিনিময়ে ভুয়া রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা কিংবা বিজ্ঞাপন প্রচার। বিনা পয়সাতেও ফেসবুক, টুইটার কিংবা গুগল ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ প্রচার করা যায়, যে কর্মে রুশ গ্রুপগুলো বেশ পটু। কৌশলটি হলো, নিজেদের কর্মী বাহিনী ব্যবহার করে শত শত ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ খুলে আমেরিকার সমাজে বিভেদ তৈরি করতে পারে এমন কোনো স্বল্প পরিচিত কিংবা রুশ আশীর্বাদপুষ্ট সংবাদমাধ্যমের ভুয়া সংবাদ ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা জটিল। ভুয়া সংবাদের ব্যাপারটিই ধরা যাক। ফেসবুক স্বীকার করেছে, গত বছর রুশ গ্রুপগুলো যে ভুয়া সংবাদ ফেসবুকে প্রচার করে, সেটি প্রায় ১২ কোটি আমেরিকানের দৃষ্টিগোচর হয়। গুগল কিছুদিন আগে জানায়, তারা প্রায় এক হাজারটি সন্দেহজনক রুশ ভিডিও ইউটিউব শনাক্ত করেছে, যেটি হয়তো ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছে কয়েক কোটি আমেরিকান। একই ঘটনা ঘটে জার্মানিতে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের আগমুহূর্তে। প্রায় ৫৯ শতাংশ জার্মান জানায়, তারা ফেসবুকের মাধ্যমে ভুয়া রাজনৈতিক সংবাদ পড়েছে। এখন কথা হলো, ছড়িয়ে পড়া সংবাদ যে ভুয়া- সেটি ফেসবুক নির্ণয় করবে কীভাবে? প্রাথমিকভাবে তারা চেষ্টা করছে কিছু অনুসন্ধানী সাংবাদিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। এরা ফেসবুকের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। এদের কাজ হবে সন্দেহজনক কোনো সংবাদের মূল সূত্র খুঁজে বের করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভুয়া সংবাদগুলো একে অপরকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে। তার পর খুঁড়ে খুঁড়ে সেই মূল ও আদি সূত্রের কাছে পৌঁছে দেখা যায়, সেটি হয়তো কোনো সন্দেহজনক অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম কর্তৃক পরিবেশিত। আশঙ্কার কথা হলো, এমন একটি উদ্যোগ পরিচালনার জন্য যে সংখ্যক লোকবল প্রয়োজন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অদ্যাবধি নিয়োগ করেছে তার ভঘ্নাংশ। অন্যদিকে ইন্টারনেট জগতে তাদের সিস্টেম ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা আসলে কী করছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির ব্যাপারেও রয়েছে ব্যাপক অনীহা। তাদের বক্তব্য হলো, এতে ব্যাহত হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তির জয়যাত্রা।

আমেরিকায় আজ বিজ্ঞাপনের পেছনে যে খরচ করা হয়, তার ৩৫ শতাংশই ব্যয় করা হয় অনলাইনে। আমেরিকান ভোক্তারা তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ দ্রব্যই ক্রয় করে এমাজনের মতো অনলাইন প্রতিষ্ঠান থেকে। অর্থাৎ গুগল, ফেসবুক, এমাজনের মতো দানবসম প্রতিষ্ঠান আমেরিকানদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ফুলে-ফেঁপে উঠেছে এদের ব্যবসা। সে তুলনায় তাদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই যেন শিথিল। বিপুল অঙ্কের চাঁদা প্রদান করায় আইন প্রণেতারাও তাদের কাছে অনেকটা অসহায়। এমন এক পরিস্থিতিতে তারা যদি শুধু মুনাফার দিকে তাকিয়ে বিদ্যমান ফাঁকফোকর ঠিক করার ব্যাপারে ক্রমাগত অনাগ্রহ দেখায়, তবে একদিন আমেরিকার গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা যে ভালোভাবেই বিঘ্নিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী

পরবর্তী খবর পড়ুন : ড. মনীন্দ্র কুমার রায়

ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেলেন জয়া

ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেলেন জয়া

ভারতের জিও ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি অভিনেত্রী জয়া আহসান। শনিবার ...

নির্বাচন বানচাল করে বিএনপি চায় 'ভূতের সরকার'

নির্বাচন বানচাল করে বিএনপি চায় 'ভূতের সরকার'

সহায়ক সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ...

দেশে রাজনীতি করার কোনো পরিবেশ নেই

দেশে রাজনীতি করার কোনো পরিবেশ নেই

সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড, বিরোধী পক্ষকে জেল-জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করার কৌশল ...

গুরু পাপে লঘু দণ্ড

গুরু পাপে লঘু দণ্ড

বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. খুরশিদ আলমের বিরুদ্ধে আলোচিত অর্থ আত্মসাতের ...

'আজও তার সাধনা থামেনি'

'আজও তার সাধনা থামেনি'

'যখন পাঞ্জাবি আর পাজামা চাপিয়ে শরীরে, সকালে কিংবা বিকেলে একলা ...

অল্প পুঁজি, বড় স্বপ্ন

অল্প পুঁজি, বড় স্বপ্ন

অল্প পুঁজি, বড় স্বপ্ন- এ নিয়ে প্রথমবারের মেলায় অংশ নিয়েছে ...

প্রায় নিশ্চিত আওয়ামী লীগ অনিশ্চয়তা বিএনপিতে

প্রায় নিশ্চিত আওয়ামী লীগ অনিশ্চয়তা বিএনপিতে

সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের ভোটারদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই প্রবাসী। তাই এখানকার ...

'বড় ভাই'র নেতৃত্বে কিলিং মিশনে যাচ্ছিল ওরা

'বড় ভাই'র নেতৃত্বে কিলিং মিশনে যাচ্ছিল ওরা

তিনটি মোটরসাইকেলে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়াম এলাকায় কিলিং মিশনে যাচ্ছিল ...