অনিশ্চয়তার ছায়া

রাজনীতি

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০১৮      

এম হাফিজ উদ্দিন খান

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে যাবে না বিএনপি - এই কথাটি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দলের অবস্থান আবারও পরিস্কার করেছেন দলের নেতারা (সমকাল, ৮ আগস্ট, ২০১৮)। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনকালীন 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' তৈরি, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার আর সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। অন্যদিকে সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্নেষণে দেখা যাচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দুটি বড় দল (বলা যায় দুটি বড় জোটের অবস্থান) বিপরীতে অবস্থান করছে। এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসছে। কিন্তু এখনও কাটেনি অনিশ্চয়তার ছায়া। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এখনও রয়েছে বড় রকমের অনিশ্চয়তা।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে কিংবা হয়ে থাকে, এর তিক্ত অভিজ্ঞতার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটানা দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থেকেছে- এমন দৃষ্টান্ত খুব কম। এই পরিস্থিতি শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য যেমন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার, তেমনি দেশের অগ্রগতির জন্যও বড় রকমের প্রতিবন্ধক। গণতন্ত্রের জন্যও অশনিসংকেত। আমাদের দেশে দৃশ্যত গণতন্ত্রের জন্য যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কিংবা সরকারের দায়িত্বশীলদের কথা বলতে শোনা যায়, প্রকৃতপক্ষে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটে এবং এমনটি ইতিমধ্যে বহুবার লক্ষ্য করাও গেছে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হবে (এ রকম চিত্র নতুন নয়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলেও দেখা গেছে) আর যারা সরকারে থাকবে তাদের জন্য অন্যরকম ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে- এমনটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টান্তমূলক করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি শুধু বিরোধী মহলেরই নয়, এ দাবি আরও নানা মহল থেকেই রয়েছে। ওই নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয়, এ তাগিদও রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা মহলের। কিন্তু নানারকম অনিশ্চয়তার মেঘ ক্রমাগত যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে তাতে প্রশ্ন বাড়ছে; বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টান্তমূলক করার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের দুটি বড় দলকে ছাড় দিতে হবে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে এক টেবিলে বসে সমাধান সূত্র বের করা উভয় দলের নেতৃবৃন্দের উচিত। সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা। সাংবিধানিক কারণে আওয়ামী লীগের অবস্থান আগে থেকেই পরিস্কার। বড় দুটি দলই তাদের নিজস্ব ইস্যুতে অনড়। আর সংকট এখানেই। আবারও বলতে হচ্ছে যে, এই পরিস্থিতিতে দেশ-জাতির স্বার্থেই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে দু'দলকে সরে আসতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দু'দলের নেতাদের আলোচনার টেবিলে বসার ক্ষেত্র তৈরিতে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। আলোচনার টেবিলে তর্ক-বিতর্ক হোক এবং এর মধ্য দিয়েই বের হয়ে আসুক সমাধান। শান্তিপ্রিয়রা এমনটাই প্রত্যাশা করেন। সবার অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করার দায় কারোরই কম নয়। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি মহলের দায় বেশি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সবকিছু হতে হবে প্রশ্নমুক্ত, নির্মোহ অর্থাৎ আইন ও ন্যায়ানুগ। গণতন্ত্রে আলোচনার দরজা রুদ্ধ হয় না কিংবা থাকে না। আলোচনা করেই গণতন্ত্রে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায় কিংবা হয়।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে অনেক নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই খুব অপ্রীতিকর। নিকট অতীতে কয়েকটি সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে, তাও প্রীতিকর নয়। সবকিছু আমলে রেখে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে না গিয়ে সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরও আমরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারিনি বলেই বারবার এমন সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। এর স্থায়ী সমাধান করতে হলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরই নয়, সংশ্নিষ্ট সবারই চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রতি যার যার অবস্থান থেকে আরও শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। সবাই যদি আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন, তাহলে সংকটের সমাধান কোনো দুরূহ বিষয় নয়। সবদিক বিবেচনায় সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। অন্য কোনো পন্থায় শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যাবে না এবং পৌঁছা যাবে না ঐকমত্যে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। এই মতবিরোধ নিরসনের প্রয়োজনেই দরকার অর্থবহ সংলাপ।

দেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নিজেদের স্বার্থের বিষয়গুলো গৌণ করে দেখে দেশ-জাতির স্বার্থ মুখ্য করে দেখা প্রয়োজন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যার যার অবস্থানে অনড় থাকলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরুদ্বিগ্ন থাকার অবকাশ নেই। এমন অবস্থা সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করবে, যা শান্তিপ্রিয় কারোরই কাম্য নয়। তাই খোলা মন নিয়ে সংলাপে বসার বিকল্প নেই। এক কথায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ জরুরি। এই সংস্কৃতির বিকাশেই আমাদের অনেক সমস্যা-সংকট নিরসনের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। 'বিচার মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার'- এই মনোভাব নিয়ে তো একটি দেশের রাজনীতি চলতে পারে না। জনকল্যাণের অপর নামই যদি হয় রাজনীতি, তাহলে এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই রাজনীতির পথ নির্ধারণ করা উচিত।

৭ আগস্ট ২০১৮ তারিখ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ভবনে এক কর্মশালার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, 'জাতীয় নির্বাচনে কোথাও কোনো অনিয়ম হবে না- এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।' প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এমন মন্তব্য জনমনে হতাশা বাড়িয়েছে। তবে তিনি এও বলেছেন, অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কয়েকদিন আগে অনুষ্ঠিত কয়েকটি সিটি নির্বাচনে যে মাত্রায় অনিয়ম হয়েছে, সেই মাত্রায় দৃষ্টান্তযোগ্য ব্যবস্থা কি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে? জবাব প্রীতিকর নয়। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটাই তো সত্য যে, নির্বাচন কমিশনই মুখ্য প্রতিষ্ঠান। তাদের অবস্থান যদি নির্মোহ ও কঠোর হয়, তাহলে অনিয়মমুক্ত নির্বাচন করা সম্ভব এবং এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছেও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের দেশে জনগণের আস্থা এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আস্থার সংকট ছিল এবং এখনও আছে। কারণ অতীতে কখনও কখনও যেভাবে নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কথা আছে। যেহেতু তাদের ওপর জনগণের আস্থা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেহেতু তারা গত সিটি নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়েই কাজটি করার একটি সুযোগ তারা পেয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, জাতীয় নির্বাচন হলো পুরো ক্ষমতার পালাবদল। এই পালাবদল সামগ্রিক। স্থানীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনমতের প্রতিফলনের একটি ধারা লক্ষ্য করা যায়।

আমাদের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে কিংবা নতুন করে উঠছে, এসব কিছুরই নিরসন ঘটিয়ে সুস্থ ধারায় নিয়ে আসতে হবে জাতির বৃহৎ স্বার্থে। দেশের মানুষের আশা পূরণের দায়িত্ব সরকারের, একই সঙ্গে রাজনীতিকদের। গণতন্ত্রের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে এবং এ জন্য এর পথ করতে হবে মসৃণ। আমাদের দেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের গণতন্ত্রের পথে নেতিবাচক অনেক কিছুই এখনও বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। শুধু রাজনীতি ও নির্বাচনের প্রয়োজনেই নয়, সার্বিক স্বার্থেই এ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত পরিত্রাণ না মিলবে, ততক্ষণ আমাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

পরবর্তী খবর পড়ুন : দিনটি কেমন যাবে

যশোরের বিএনপি নেতা আবু ঢাকায় 'অপহৃত'

যশোরের বিএনপি নেতা আবু ঢাকায় 'অপহৃত'

যশোর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ ...

‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ প্রচারে সমস্যা নেই: ইসি

‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ প্রচারে সমস্যা নেই: ইসি

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে নির্মিত ‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ বিজ্ঞাপন হিসেবে টেলিভিশনে ...

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই: সুজন

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই: সুজন

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে ...

দেশে হঠাৎ বন্ধ স্কাইপি

দেশে হঠাৎ বন্ধ স্কাইপি

দেশে হঠাৎ করে সোমবার বিকেল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্কাইপি ...

জেনে-শুনে মন্তব্য করা উচিত: দুদক চেয়ারম্যান

জেনে-শুনে মন্তব্য করা উচিত: দুদক চেয়ারম্যান

'তদন্ত করলে দুদকেও দুর্নীতি বেরুবে'- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের ওই ...

আগাম প্রচার সামগ্রী সরানো না হলে জরিমানা: ইসি

আগাম প্রচার সামগ্রী সরানো না হলে জরিমানা: ইসি

জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আগাম প্রচার সামগ্রী যারা সরাননি, তাদের জরিমানা ...

পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি

পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি

'বৈষম্য নয় পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক' প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ...

উচ্চশিক্ষায় নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করবে ইউজিসি

উচ্চশিক্ষায় নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করবে ইউজিসি

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ স্নাতক ...