দক্ষ মানবসম্পদ

উন্নয়ন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

কাজী মসিউর রহমান

এ জনপদে সম্পদ যা আছে, সেটুকুও পুঞ্জীভূত হয়েছে মাত্র দুই শতাংশের সিন্দুকে। এর উত্তাপে পুড়ছে প্রাণ-প্রকৃতি। বিদ্যমান অন্যান্য সমস্যার প্রায় সিংহ ভাগই সম্পদ আর ক্ষমতার ওই পুঞ্জীভবনেরই ফলাফল। এ কারণে খ্যাতিমান শিক্ষা দার্শনিক ও আইনের আমেরিকান অধ্যাপক মার্থা নুসবাম মনে করেন, যাপনযোগ্য জীবনের সাধারণ অনুষঙ্গ জোগাড় এবং নাগরিক সত্তার বিকাশের জন্য মানবিক মূল্যবোধের চাষাবাদ জরুরি। অস্থির, অনাস্থা এবং নিবর্তনমূলক এই সময়ে মানবিকতার অনুশীলন ছাড়া মানুষ ও প্রকৃতির মুক্তি নেই। অথচ দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যায়, বিদ্যমান বাজার মৌলবাদের মানসপুত্র যে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সেটি মানবিকী বিদ্যাকে শিক্ষায়তনের পরিসর থেকে উচ্ছেদ করার কাঠামোগত আয়োজন প্রায় পূর্ণ করেছে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিকী বিদ্যার যে প্রান্তিকীকরণ ঘটেছে, সেটি যুগের মহাসড়কে ঘটে যাওয়া কোনো কাকতালীয় দুর্ঘটনা নয়। এই অবহেলা সুপরিকল্পিত একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশমাত্র।

বিজ্ঞান আর বাণিজ্য শিক্ষার যে ব্রাহ্মণ্য বা ক্ষত্রিয়বাদ, সেখানে মানবিকী বিদ্যা একেবারে শূদ্র হয়ে উঠেছে। মানবিক বিদ্যাকে শূদ্র হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে প্রধানত 'কম মেধাবীদের' জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ইতিহাস, দর্শন বা রাজনীতিবিদ্যার মতো বিষয়গুলোকে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকও মনে করেন, মেধাবীদের বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়া উচিত (মেধাবীর ধারণাটিও কাণ্ডজ্ঞাননির্ভর)! এ রকম মর্যাদাহানিকর প্রেরণার মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিসরে মানবিকী বিদ্যা অধ্যয়নের প্রতি নিরুৎসাহই তো তৈরি হওয়ার কথা। হয়েছেও তাই। শুধু তাই নয়, মানবিক বিদ্যার গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা ও বিনিয়োগে যথেষ্ট কৃপণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর চলমান শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে কোনো ধারা অনুসরণ করে মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা অবান্তর হবে না। বিজ্ঞান কী? সেটি তো মাধ্যমিক স্তরের শুরুতেই মুখস্থ করতে হয়। বোঝে বা না বোঝে আর প্রযুক্তি কী সেটা চিন্তা না করেই বিজ্ঞানকে প্রযুক্তির সমার্থক হিসেবে শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে শিখে যায়। বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা জানার সম্পর্কটাও চিন্তা করার উৎসাহ তারা পায় না খুব একটা। আর একটি ধারা 'ব্যবসায় শিক্ষা', এটির ব্যাপারে হয়তো ধারণা করা যায় এর নাম দেখে অথবা শিক্ষকদের আলোচনায়। কিন্তু বিপদ বাধিয়েছে 'মানবিক বিদ্যা'। মাঝেমধ্যে বেশ আয়োজন করে যাকে কলাবিদ্যা বা আর্টসও বলা হয়ে থাকে।

অভিজ্ঞতায় দেখা যায়- বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় না 'মানবিক বিদ্যার' সংজ্ঞা! মানবিকী অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পরও জানা যায় মানবিক বিদ্যা কী? উত্তরটি পেলে নিশ্চয় ধারণা করা সহজ হতো, শিক্ষার এই ধারাটি কেন এতটা নিবর্তনমূলক রাজনীতির শিকার। এটা সাধারণভাবে অনুমেয়, মানুষ সম্পর্কিত বিদ্যাই মানবিক বিদ্যা। তাহলে আবার প্রশ্ন জাগে, মানুষ কী? জার্মান দার্শনিক শোপেন হাওয়ার মনে করেন, মানুষ যা নয় সে আসলেই তাই, সে যা আসলে সে তা নয়। আবার আমাদের খ্যাতিমান দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম বলেন, 'মানুষ মরণশীল' কথাটির ভেতর এক রকম ভ্রান্তি আছে। মানুষ তো মরে না। মৃত্যুবরণ করে ব্যক্তি বা তার দেহ। এ সূত্রে বলা যায়, মানুষ হলো তার চিন্তার সৃষ্টি। আবার সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও জাঁক লাকা মনে করেন, অবচেতনই মানুষ। মানুষ প্রকৃতপক্ষে যা কিছু নিয়ে চিন্তা করে বা তার অবচেতনে যা কিছু সুপ্ত তার বড় একটা অংশজুড়েই থাকে বিমূর্ত সব বিষয়, যেমন- সত্যের স্বরূপ, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, ভাষা, ঈশ্বরের ধারণা, ন্যায়, সুন্দর-অসুন্দর, মর্যাদা, চেতনা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ইত্যাদি। তথ্য ও উপাত্তের নিরিখে মানবিক বিদ্যা এসব বিভিন্ন বিষয়ের সম্ভাব্য সব রকম ব্যাখ্যা নির্মাণের প্রয়াস চালায়। সে সামাজিক বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কও নির্মাণ করে। মানুষের বিমূর্ত চিন্তাগুলো একমাত্রিক হতে পারে না। তাই মানবিকী বিদ্যা সৃষ্টিগতভাবেই বাহুমাত্রিক বা ইন্টারডিসিপ্লিনারি। সে জ্ঞানকাণ্ডের এক ধরনের সামগ্রিকতা ধারণ করে।

আর এই সামগ্রিকতা আসে প্রশ্ন-উত্তরের নিরন্তর প্রবহমানতার মধ্য দিয়ে। জীবনকে আসলে নিবিড় নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা জারি রাখতে হয়। তাই তো সক্রেটিস বলেন- An unexamined life is not worth living.. নিজের ঐতিহ্যকে, নিজের মানিয়ে নেওয়া অবস্থানকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে জীবনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়। তর্ক করে জানার প্রচেষ্টা চালাতে হয়, আমি যা বিশ্বাস করি, তা কেন করি? এ রকম ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে ভিন্ন মতামতগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার গণতান্ত্রিক উদারতাও তৈরি হয়। অপরপক্ষে, বাজারচালিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষায়িত জ্ঞানের চর্চা করানো হয়। মানবিকী বিদ্যা সেই অন্ধগলি দিয়ে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। বিশেষায়িত জ্ঞান প্রায়শই খণ্ডিত সত্যকে উপস্থাপন করে। কার্যত, পাশ্চাত্য প্ররোচিত বিশেষায়িত জ্ঞান প্রায়শই খুব সীমাবদ্ধ, আড়ষ্টতানির্ভর এবং প্রতিক্রিয়াশীল। ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির মতো সৈয়দ নিজার আলম তার 'বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভব বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন' গ্রন্থে বলছেন- 'যে কোনো বিষয়কেন্দ্রিক জ্ঞান অন্যান্য বিষয়ে অজ্ঞতা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করে। এমনকি বিশেষজ্ঞরা নিজের বিষয়ের বাইরে জগৎ-জীবনের অপরাপর বিষয়ে অজ্ঞ থাকার কারণে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।'

শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সচেতনায়ন। যার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে এবং এ পথ ধরে বৃহত্তর মুক্তির জন্য কাজ করবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এ সচেতনায়ন কতটা হয়, সে প্রশ্ন করা অযৌক্তিক হবে কি?

বাজার সংস্কৃতির জঠর থেকে উঠে আসা মহাসড়কে চালকরা সবাইকে মানবসম্পদ বানানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছেন। কিন্তু 'সম্পদ' বানানোর সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে উন্নতি ও প্রগতি টেকসই হবে না। অর্থনীতি শাস্ত্রের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী শুধু 'সম্পদ' বানাতে গেলে সে সম্পদ কতটা মানবিক গুণাবলি ধারণ করতে পারবে, সে ব্যাপারে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে। কারণ অর্থনীতি শাস্ত্রের বিকাশ হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিয়ামক শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্তে। মানবকল্যাণের জন্য নয়।

বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নের রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ নির্ধারণ করেছে। সেখানে মানবিক সমাজ নির্মাণের বাস্তবসম্মত কর্মসূচি না থাকলে ওইটি আর যাই হোক, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হয়ে উঠতে সক্ষম হবে না। তাই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অংশী কার্যক্রম হিসেবে একটি মানবিক বাংলাদেশে বিনির্মাণের জন্য সবাইকে কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষার মাধ্যমিক স্তর থেকেই মানবিকী বিদ্যার স্বরূপ আলোচনা এবং বিদ্যমান আস্থা হারানো বিশ্ব ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে এর প্রাসঙ্গিকতা আলোচনার আনুষ্ঠানিক সুযোগ রাখতে হবে। মানবিকী বিদ্যাকে অপরাপর ধারার (বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শিক্ষার) মতো মর্যাদা দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দকে এ প্রচেষ্টায় আন্তরিকভাবে যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বহুত্ববাদী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উন্নয়ন-প্রগতির চিন্তা ভিত্তি হতে হবে মানবিকতার দর্শন।

শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

'মি টু আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়'

'মি টু আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়'

বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া যৌন নিপীড়ন বিরোধী #মি টু আন্দোলনের ঢেউ ...

বিএনপির বিরুদ্ধে ইসিতে অভিযোগ আওয়ামী লীগের

বিএনপির বিরুদ্ধে ইসিতে অভিযোগ আওয়ামী লীগের

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার ...

নির্বাচনে দায়িত্ব পেলে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান

নির্বাচনে দায়িত্ব পেলে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, 'আগামী মাসে একাদশ জাতীয় ...

ইসিতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ

ইসিতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ

দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণের সময় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ...

সেই সোহাগ 'আটক'

সেই সোহাগ 'আটক'

নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বুধবার পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের সময় ভাংচুর ...

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার ঢাকায়

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার ঢাকায়

বাংলাদেশে নতুন নিয়োগ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ঢাকায় ...

যুক্তরাজ্যে কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর মৃত্যু

যুক্তরাজ্যে কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর মৃত্যু

যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও কথা সাহিত্যিক দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু আর ...

মির্জা আব্বাস দম্পতির আগাম জামিন হাইকোর্টে

মির্জা আব্বাস দম্পতির আগাম জামিন হাইকোর্টে

রাজধানীর নয়াপল্টনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় করা তিন মামলায় বিএনপির ...