ইভিএম বিতর্ক

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে এর বিরোধিতা অবশ্যই করব না। কিন্তু এর আগে আমাদের সক্ষমতা কিংবা প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। এই জরুরি বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রেখেই এগোনো উচিত বলেও মনে করি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক করার জন্য সংশ্নিষ্ট, বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে জরুরি। কারণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বাকবিতণ্ডা ততই বাড়ছে। এর ফলে রাজনৈতিক নানারকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে প্রীতিকর নয়। অতীতে যখন নির্বাচন কমিশনের সংলাপ অনুষ্ঠান হয়েছিল তখন আমরা অর্থাৎ বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রেখেছিলাম। কিন্তু সেসব বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত আশানুরূপ কিছু দেখা যায়নি।

আমাদের স্মরণে আছে যে, খণ্ডিতভাবে ইভিএমের (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) প্রচলন করেছিল এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এখন হঠাৎ করে জাতীয় নির্বাচন যেখানে মাত্র আর কয়েক মাস বাকি, সেখানে সামগ্রিকভাবে ইভিএমের প্রচলনে এত তাড়াহুড়া কেন, এটি প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ সময়ে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএমের বিষয়টি সামনে এনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করা হলো। এ নিয়ে শুধু রাজনৈতিক মহলেই মতবিরোধ রয়েছে তা তো নয়, কমিশনের ভেতরেও রয়েছে বিরোধিতা। কিন্তু সবরকম আপত্তি-সমালোচনা উপেক্ষা করেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। শুধু তাই নয়, জাতীয় নির্বাচনে ব্যালটের পাশাপাশি ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ৩০ আগস্ট রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সকাল ১১টার দিকে ইসির বৈঠক শুরু হয় এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতি দিয়ে বৈঠকটি শেষ হয় প্রায় সন্ধ্যার দিকে।

লক্ষণীয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পক্ষে সাতটি বিষয় তুলে ধরে আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি ইভিএম ব্যবহারে দ্বিমত করে লিখিত বক্তব্য দেন। তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনে তা ব্যবহার না করার বিভিন্ন কারণও তুলে ধরেন। মাহবুব তালুকদার এও জানিয়েছেন, তিনি ইভিএমের বিরুদ্ধে নন, তবে আগামী নির্বাচনে এর ব্যবহার হোক তিনি চান না। রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল বলে আমরাও মনে করি। আরও একটা প্রশ্ন হচ্ছে, বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি ও কারিগরি সামর্থ্য কি আমাদের আপাতত রয়েছে? ইসির তরফে কিন্তু এতদিন বলা হয়েছে, সব দল না চাইলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। বিধি বা নিয়মমাফিক ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ইসি কেন এ ব্যাপারে এত তাড়াহুড়া করে- তা প্রশ্নের বিষয়।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর জুলাইয়ে ঘোষিত ইসির কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইসির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সংলাপে আসা বিভিন্ন সুপারিশের আলোকে এই আইন সংস্কারের কথা ছিল। এ জন্য গঠিত কমিটি আরপিওর ৩৫টি ধারায় সংশোধনী আনার প্রস্তাবও করেছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে নির্বাচন কমিশন এ প্রস্তাব আরও পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠায়। তারপর থমকে যায় এই উদ্যোগ। গত জুলাই মাসের ১৫ তারিখে ইসি সচিব সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আরপিও সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন হচ্ছে না। কিন্তু ইসির ওই অবস্থানের এক মাসের মাথায় কেন আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলো তাও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহম্মদ ২৮ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেছেন, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের এও স্মরণে আছে যে, এর আগে ইসির সিদ্ধান্ত ছিল যে কোনো একটি পৌরসভার সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হবে। এরপর সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে ইভিএমের ব্যবহার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বর্তমান কমিশনের অধীনে এখন পর্যন্ত কোনো পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে কি পুরোপুরি ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে? এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই স্ববিরোধিতা ফুটে উঠেছে।

হঠাৎ করে ইভিএম ক্রয় করতে এত টাকারই-বা সংস্থানের পথটি কী? ইসির এক পরিকল্পনায় ইতিপূর্বে জানা গিয়েছিল ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প তারা হাতে নেয়। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, ওই প্রকল্প প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা কি যাচাই করা হয়েছিল? গত বছর ইসির সঙ্গে সংলাপে আলোচিত বিষয় ছিল ইভিএম। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ওই সংলাপে অংশ নিয়েছিল। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছিলেন। বিএনপিসহ ১২টি রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। আওয়ামী লীগসহ ৭টি দল ইভিএমের পক্ষে, ৩টি দল পরীক্ষামূলক ও আংশিকভাবে এবং একটি দল শর্তসাপেক্ষে  ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিল। এসব ব্যাপারে আমাদেরও মতামত কিংবা সুপারিশ ছিল। কিন্তু ইসি সবকিছু উপেক্ষা করে হঠাৎ এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে ইভিএমের পক্ষে যেতেই আপাতত মনস্থির করল।

যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় জনবলসহ আরও বেশ কিছু জরুরি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ইভিএমের বিষয়টি সামনে আনা, বিপুলসংখ্যক ইভিএম ক্রয় করা- এসবই অনাবশ্যক এমন কথাও সঙ্গতই উঠেছিল। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দ্বিমত রয়েছে সেহেতু এর ব্যবহারের তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেওয়া মানে অনাবশ্যক বিতর্ককেই আরও পুষ্ট করা। ইভিএম ব্যবহারের জন্য যে প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন তাই তো ইসির নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে হঠাৎ করে এত তাড়াহুড়ার কোনো মানে বুঝিনি। আবারও বলি, এ ক্ষেত্রে অর্থের বিষয়টি তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত একনেকেও কোনো কথা হয়নি। প্রকল্প অনুমোদনের আগে ঋণপত্র খোলা বেআইনি। আগে প্রকল্প অনুমোদন হতে হবে। এরপর একনেকে পাস হয়ে ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। এরপর হবে কার্যাদেশ। এই হলো নিয়ম। তাছাড়া যেখানে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও বেশি নেই, সে ক্ষেত্রে এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইভিএম মেশিন পরিচালনার জন্য দক্ষ লোকবলই বা কোথায় পাওয়া যাবে? এসব নিশ্চিত না করে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমি মনে করি না।

আমরা সুপারিশ করেছিলাম, আগে স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে জনগণের মধ্যে ইভিএম মেশিন ব্যবহারের বিষয়ে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু তা করার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎ করে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে গেলে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে। তাড়াহুড়া করে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনেও সংকট বাড়াতে পারে। প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যাপারে দেশ-বিদেশের নানা মহলের যেখানে আহ্বান রয়েছে, সেখানে ইসি ও সরকার এসব ব্যাপারে কতটা ক্রিয়াশীল এবং আন্তরিক এ নিয়েও সঙ্গতই প্রশ্ন উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা যেসব বিতর্কের সৃষ্টি ইতিমধ্যে করেছে সেসবের নিরসনেও ইসির তরফে সন্তোষজনক কার্যক্রম দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়নি।

গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমেই কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতার মূল উৎস। এমতাবস্থায় নির্বাচন যেমন স্বচ্ছ হওয়া অত্যন্ত জরুরি, তেমনি জনগণের আস্থায় যেন কোনো কারণে চিড় না ধরে এ ব্যাপারেও সজাগ-সতর্ক থাকাটা জরুরি। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দরকার নিরপেক্ষতার আবহ, সবার অধিকারের জন্য সমতল ভূমি নিশ্চিত করা। কিন্তু এসব ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। বিতর্কমুক্ত পরিবেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার আয়োজন করুক ইসি- এটাই হলো আমাদের প্রত্যাশা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি তাদের দায় ভুলে না গেলেই মঙ্গল।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

পরবর্তী খবর পড়ুন : দিনটি কেমন যাবে

শপিংমলগুলোতে সিনেপ্লেক্স বাধ্যতামূলক করা হোক: আসাদুজ্জামান নূর

শপিংমলগুলোতে সিনেপ্লেক্স বাধ্যতামূলক করা হোক: আসাদুজ্জামান নূর

যেখানেই শপিংমল হবে সেখানেই সিনেমা হল থাকতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক ...

টেকনাফে ২ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার

টেকনাফে ২ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ২ লাখ পিস ইয়াবা ...

নওয়াজ শরিফকে মুক্তির আদেশ

নওয়াজ শরিফকে মুক্তির আদেশ

দুর্নীতির মামলায় কারাগারে থাকা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে মুক্তির ...

তপ্ত দুবাইয়ে আরও উত্তপ্ত ম্যাচ

তপ্ত দুবাইয়ে আরও উত্তপ্ত ম্যাচ

বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালক জামিল জানালেন, বাইরে এখন ৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা। পরিচয় ...

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সারাদেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি যাতে কোনো গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক ...

আফজাল শরীফের চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আফজাল শরীফের চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘ ৪ বছর ধরে মেরুদণ্ড, কোমর ও হাড়ের ব্যথায় ভুগছেন ...

শহিদুলের জামিনের শুনানি হতে পারে আগামী সপ্তাহে

শহিদুলের জামিনের শুনানি হতে পারে আগামী সপ্তাহে

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ...

সালমান শাহকে স্মরণ করে যা বললেন ঋতুপর্ণা

সালমান শাহকে স্মরণ করে যা বললেন ঋতুপর্ণা

'নায়ক সালমান শাহ বাংলা ছবির অমর নায়ক। তাকে নিয়ে অনেক ...