নতুন শক্তির উন্মেষ

রাজনীতি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মামুনুর রশীদ

রাজনীতি মানুষের জীবনে সবদিক অধিকার করে থাকে- এ কথা সত্য। কিন্তু তা যখন প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন তা সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। আমাদের জনজীবনে রাজনীতি সব সময় উচ্চকিত এবং সরকার সব সময় খুবই দৃশ্যমান। সম্প্রতি দুটি ঈদে শহর থেকে শুরু করে গ্রামবাংলায় হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র রাজনীতি। রাজনীতি ছাড়া কোনো সংলাপ কোথাও শোনা যায় না। গরুর হাটে গরু কেনা থেকে শুরু করে তা জবাই এবং বণ্টন হওয়া পর্যন্ত রাজনীতি। আমাদের দেশে রাজনীতির অপর নাম দেওয়া যেতে পারে নির্বাচন। এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিলবোর্ডের আকার এবং সংখ্যা ভোগ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি আবেদন সৃষ্টি করেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের গাড়ি, সমর্থকদের মোটরসাইকেল ও ছোট ছোট সভা গ্রামবাংলাকে দখল করে রেখেছে।

মানুষের চিন্তা-ভাবনার কোনো অবকাশ বা ভিন্ন চিন্তার কোনো সুযোগই নেই। সামনে ডিসেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা হবে। পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাও এগিয়ে আসবে। এই সময়ে নির্বাচনও হওয়ার কথা। দলে দলে ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচন উৎসবে জড়িয়ে পড়বে। নির্বাচন যদি হতো শুধু রাজনীতিবিদ, তাদের সমর্থক এবং নীরবে-নির্বিঘ্নে শুধু ভোট দেওয়ার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাহলে সমস্যার কিছু থাকত না। কিন্তু যেভাবে এই নির্বাচনে শিশু-কিশোর, যুবা, বৃদ্ধ জড়িয়ে পড়বে, তাতে জনজীবন রাজনীতির মধ্যে হারিয়ে যাবে। পাড়ায় পাড়ায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে অফিসগুলো হবে, সেগুলো একেকটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে। হৈ-হুল্লোড়, মিছিল-মিটিং, বিনামূল্যে চা-সিগারেট-পান এবং নাশতার আয়োজনে মুখর হয়ে উঠবে। একটা পর্যায়ে গিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকবে, সেই উত্তেজনার জোয়ারে ভাসতে থাকবে এলাকার মানুষ। নানা ধরনের প্রতিশ্রুতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এলাকাবাসী। যেহেতু মনোনয়ন এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তাই সবার দৃষ্টি কেন্দ্রের দিকে। কেন্দ্র থেকে যার ওপর করুণা বর্ষিত হবে, জল্পনা-কল্পনা শেষে তাকে নিয়েই চলবে সমর্থকদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড। অন্যদের কেউ কেউ ঘরে ফিরে যাবে আবার কেউ কেউ ভিন্নমাত্রায় কাজ শুরু করবে। এটি গেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি সাধারণচিত্র। এই সময়েও জ্ঞানের অন্যান্য মাত্রা কমতে থাকে। সংস্কৃতি চিন্তা, বিজ্ঞান চিন্তা; মানবকল্যাণমূলক চিন্তা ক্রমেই দূরাগত হয়ে ওঠে।

নির্বাচন সামনে রেখে নতুন নতুন সমীকরণও দেখা যাচ্ছে। নতুন কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। রাজনীতিতে একদা তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল প্রবল। কিন্তু আদর্শভিত্তিক রাজনীতির অবসান হওয়ার পর তাত্ত্বিক আলোচনা কমতে কমতে একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কোনো পরিকল্পনার কথাই কেউ বলছে না। অথচ সম্প্রতি শিশু-কিশোরদের যে বিদ্রোহ হয়ে গেল, তাতে কিন্তু অনেক ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। স্কুলের শিশু-কিশোররা পথে নামছে। গাড়ির কাগজপত্র দেখছে, যানবাহন চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল জনগণ; কিন্তু তা একসময় রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে ভিন্ন পথে চলে গেল। থামল না রাজপথে প্রাণ হরণ।

১৮৭১ সালে ফরাসি দেশে একটা প্যারিকমিউন হয়েছিল। গণতন্ত্রের একটা আদর্শ উদাহরণ। নাগরিকরা তখন দখল করেছিল দেশ। রাজপথে দাঁড়িয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। প্রবল নারী শিক্ষার বিষয়টি উচ্চারিত হচ্ছে। কোথাও কোনো চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই হচ্ছে না। জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্র অবশ্য টিকে ছিল মাত্র ৭১ দিন। কিন্তু সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল, অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই প্যারিকমিউনের পথ ধরেই এসেছিল রুশ বিপ্লব।

আমাদের দেশেও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অরাজনৈতিক শিশু-কিশোরদের আন্দোলনটি কিন্তু ভয়ঙ্কর রকম রাজনৈতিক। মানুষের মনের কথাকে তারা বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। মানুষের জন্য যা কিছু কল্যাণকর তাই তো রাজনীতি। গণতন্ত্রে তাই তো উচ্চারিত হওয়ার কথা। কিন্তু মুখে কল্যাণ চিন্তার আড়ালে যদি অর্থ আর পেশিশক্তির প্রদর্শন দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে কী দাঁড়াল? দেশটায় অনেক টাকা এখন। অনেক টাকা আবার বিদেশেও চলে গেছে। প্রচুর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে। কিন্তু মানুষ আদর্শগত মূল্যবোধ হারাচ্ছে। ছুটছে সেই টাকার পেছনেই। মানবিক চিন্তা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা- সবই আজ পশ্চাৎপদ। কিন্তু যতই শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য থাকুক না কেন, আমাদের শিশু-কিশোররা চেতনার দিক দিয়ে যথেষ্ট অগ্রসর- তার প্রমাণ পাওয়া গেল। রাজনীতিকরা যতই অবহেলা করুক না কেন, একটা সচেতন প্রাগ্রসর প্রজন্ম কিন্তু এগিয়ে আসছে। তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানও আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। শুধু টাকা আর পেশিশক্তি দিয়ে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া যাবে না।

মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে একটা কিছু করতেই হবে। বেশ কিছুদিন দেখা গেল রাজপথে শৃঙ্খলা আনার জন্য গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মোবাইল কোর্ট করে একটা তোড়জোড় লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু কিছুতেই চালকদের সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিনই মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। পথের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না। অনেক জায়গায় চার লেনের রাস্তা হয়েছে, যেখানে গাড়ি-ঘোড়া নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। কিন্তু যেহেতু সংস্কৃতি তৈরি হয়নি তাই অর্ধেক রাস্তা চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলদারদের হাতে। আগেই বলেছি, এখন অনেক টাকা। আর এই টাকা অল্প পুঁজিতে বেশি মুনাফা করার টাকা, আবার বিনা পুঁজিতেও অর্থোপার্জন। পক্ষান্তরে লুটেরা পুঁজির টাকা। অল্প মুনাফা করে বহুদিন ধরে ব্যবসা করার পর একটা বড় পুঁজি গড়ে উঠতে পারে। তাতে পুঁজিবাদেরও এক ধরনের সংস্কৃতি নির্মাণ হয়। যদিও সেই সংস্কৃতির সঙ্গে একটা অন্ধকারের সমাজ তৈরি হয়। হলিউড বা বলিউডের ছবিতে এসব মাফিয়া ও ডনকে দেখা যায়। অবৈধ অস্ত্র, মাদক, হত্যা, নিষ্ঠুরতা- এসবও থাকে তার সঙ্গে।

আমাদের দেশে যেহেতু একটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে; তাই মাঝে মাঝে এসব প্রবণতা মাথাচাড়া দিলেও তা দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ক্ষমতা দখলের জন্য যে মাঠ দখলের রাজনীতি শুরু হয়, তাতে পেশিশক্তি একটা বড় ভূমিকা পালন করে। পুঁজিবাদ যেহেতু এখানে উৎপাদনের সঙ্গে সবটা সম্পৃক্ত নয়; তাই সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের সংমিশ্রণে একটা বিকৃত অর্থনীতির জন্ম হয়েছে। তার প্রমাণ আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা। নানা ধরনের বিধিবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কোনো এক চোরাগলি দিয়ে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। আবার ব্যাংকগুলো পুঁজিবাদী দেশের মতো একেবারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। এই বিকৃত পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিডিয়া। ধনী ব্যক্তিরা ব্যবসা-বাণিজ্যের একটু উন্নতি করলেই তাদের একটি টিভি চ্যানেল চাই। তাদের বিত্তের পাহারাদার হিসেবে যেহেতু টিভি চ্যানেলগুলো কাজ করে, তাই এই চ্যানেলগুলোতে সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষার কোনো অঙ্গীকার দেখা যায় না।

একদা বাংলাদেশ টেলিভিশন বা তারও আগে পাকিস্তান টেলিভিশন মধ্যবিত্তের মূল্যবোধকে সংরক্ষণ ও বিকশিত হওয়ার জন্য কাজ করত। বর্তমানে ৩১টি টিভি চ্যানেল কোনো রকম মূল্যবোধের বাণী দর্শকের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব বোধ করে না। ফলে একদিকে বিকৃত পুঁজি, অন্যদিকে মিডিয়া অনুপ্রাণিত উদ্দেশ্যবিহীন জীবনযাত্রার বহুবিধ মাত্রা যোগ হচ্ছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে একটা গভীর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। সেই যোগাযোগটি মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। আবার আশির দশকে এসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এসে সেই যোগাযোগটি তৈরি হয়। সেই ধারা এখন একটি ক্ষীণ ধারায় পরিণত। কারণ প্রকৃত রাজনীতিবিদরা এখন পেছনের সারিতে; অচেনা-অজানা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা পুঁজিপতিরা রাজনীতির মাঠ দখল করছে। দৃশ্যত কিছু রাজনীতিবিদকে দেখা গেলেও তারা সংখ্যালঘু। ইতিহাসের একটা বড় অংশ জুড়ে বাম রাজনীতিবিদরা মূল্যবোধ ও সামাজিক অঙ্গীকার প্রকাশে আজীবন সংগ্রাম করে আসছেন। বহুধা বিভক্ত এই রাজনৈতিক শক্তি ক্রমেই দুর্বল ও ক্ষীণকণ্ঠ হয়েছে। হয়তো কিশোর-তরুণ এবং যুবশক্তির মধ্য থেকেই একটা নতুন শক্তির উন্মেষ হবে। ইতিহাসের এ এক বড় শিক্ষা।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

পরবর্তী খবর পড়ুন : বিমসটেক কি সফল হবে?

ধানমণ্ডির সেই উন্মুক্ত স্থানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন

ধানমণ্ডির সেই উন্মুক্ত স্থানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন

গণপূর্ত বিভাগের নকশায় প্রথমে জায়গাটি ছিল দৃষ্টিনন্দন উন্মুক্ত স্থান। এই ...

সাকা পরিবার কোণঠাসা

সাকা পরিবার কোণঠাসা

গভীর সংকট অতিক্রম করছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া চট্টগ্রামের ...

মুস্তাফিজকে ছেড়ে দিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স

মুস্তাফিজকে ছেড়ে দিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স

ইন্ডিয়ার প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাদের দল থেকে ...

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে দৃঢ় সমর্থন সুইস প্রেসিডেন্টের

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে দৃঢ় সমর্থন সুইস প্রেসিডেন্টের

সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আঁলা বেরসে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে জোরালো সমর্থন ...

অনশন ভেঙেই পুনরায় পরীক্ষা চাইলেন আখতার

অনশন ভেঙেই পুনরায় পরীক্ষা চাইলেন আখতার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত 'ঘ' ইউনিটে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ...

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় ও স্টিয়ারিং কমিটি গঠন

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় ও স্টিয়ারিং কমিটি গঠন

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় ও স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ...

ভারতে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত অন্তত ৫০

ভারতে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত অন্তত ৫০

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে।অমৃতসরের যোধা ...

নিরাপত্তার স্বার্থেই ঐক্যফ্রন্টকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি: কাদের

নিরাপত্তার স্বার্থেই ঐক্যফ্রন্টকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি: কাদের

ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই সিলেটে নবগঠিত জোটের প্রথম সমাবেশের অনুমতি ...