মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ড. আকমল হোসেন

বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় গ্রহণ ও মানবেতর জীবনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের আচরণের কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত হয়নি। বরাবরের মতো মিয়ানমার সরকার এ জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালি বলে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এর সাম্প্রতিক নজির হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক প্রকাশনায় ১৯৭১, ১৯৯৬ ও ২০১৫ সালের তিনটি ছবি বিকৃত করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ এবং সমুদ্রপথে আগমন করার প্রমাণ হিসেবে যা দেখানো হয়েছে, তা সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে ফাঁস করে দিয়েছে। মিয়ানমার এ জনগোষ্ঠীর মানুষকে কখনোই তাদের নাগরিক বলে মনে করে না। রাখাইনের বৌদ্ধ জনগণের মধ্যেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে একই মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, তাদের নূ্যনতম মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের প্রতি মিয়ানমারের শাসকরা ভ্রূক্ষেপ করেনি। তারা এমন পরিস্থিতি বরং তৈরি করেছে, রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়েছে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে আশ্রয় নিতে। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে তাদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন ও অত্যাচার করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার নজির নেই।

১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামলেও কূটনৈতিক উদ্যোগের দ্বারা একটা সমাধানে পৌঁছানো গিয়েছিল। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের অধিকাংশকেই নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০১২-এর পর থেকে যারা এসেছে তাদের আর স্বদেশে ফেরা হয়নি। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট নতুন করে তাদের আগমন শুরু হয়েছে। নতুন পর্বে বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে তাতে এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ ফেরত যেতে পারেনি। বাংলাদেশ এ সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছে যেমন; আন্তর্জাতিক প্রচারণাও চালিয়েছে। এটা ঠিক, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও কূটনীতি বিষয়টিকে জাতিসংঘ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। যে কারণে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করতে দেখা যায়। জাতিসংঘ মহাসচিব এ সমস্যা সমাধানে প্রথম থেকে এক সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু হলে তিনি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, মানুষ পুড়িয়ে হত্যার জন্য মিয়ানমারকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়কে দেখেছে। তাদের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহ করার পর যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে গণহত্যা সংঘটিত করার জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ সামরিক বাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহানুভূতি সত্ত্বেও প্রধানত চীন ও রাশিয়ার কারণে মিয়ানমারের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। নিরাপত্তা পরিষদের অন্য স্থায়ী সদস্যদের তুলনায় এ দুটি রাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থে মিয়ানমারকে কোনো চাপ দিতে প্রস্তুত নয়।

কিন্তু বাংলাদেশের তরফ থেকে মিয়ানমারের আচরণকে কীভাবে দেখা হয়েছে, তা বিবেচনা করলে বোঝা যাবে, আন্তর্জাতিক মত থাকলেও মিয়ানমার কেন তার একগুঁয়েমি বজায় রেখে চলেছে। সমস্যার শুরু থেকেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের কিছু সামরিক উস্কানিমূলক কাজকে অবজ্ঞা করেছে। যেমন, একাধিকবার মিয়ানমারের সামরিক হেলিকপ্টারের বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন বা মিয়ানমারের সীমানার ওপার থেকে বাংলাদেশের ভেতর গুলিবর্ষণকে প্রতিবাদ করার ভাষায় আবদ্ধ রাখার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে দেশটির একগুঁয়েমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বললে কোনো অতিকথন হয় না। আগেও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে নাফ নদে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছিল। সামরিক হামলার জবাব শুধু কূটনৈতিক ভাষার মধ্যে আবদ্ধ রাখাকে তোষণ বলে মনে হতে পারে।

গত নভেম্বরে দু'দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল, যাকে 'অ্যারেঞ্জমেন্ট' নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। ২৩ নভেম্বরের এ সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন। প্রথমে বলা হলো, দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে এবং একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে তিন মাসের মধ্যে। কিন্তু ২৫ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য থেকে প্রত্যাবাসন যে শুরু হবে না, তা বোঝা গিয়েছিল। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে- এ যুক্তিতে এ সময়সীমা রাখা সম্ভব নয় বলে তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু 'অ্যারেঞ্জমেন্ট' পরে শব্দের ভেতরেই আটকে থেকেছে, বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। মিয়ানমার আসলে তখন তার ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা এড়াতেই এ সমঝোতা করেছিল- এটা বলা ভুল হবে না। তবে সমঝোতা অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন করার জন্য আট সহস্রাধিক রোহিঙ্গার নামের তালিকা তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার সে তালিকা থেকে অল্প কয়েকজনকে চিহ্নিত করে প্রত্যাবাসনের জন্য তার প্রস্তুতির কথা জানায়।

কাদের প্রত্যাবাসন করা হবে, সেটা যেমন মিয়ানমারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল; অন্যদিকে কোথায় প্রত্যাবাসিতরা থাকবে, তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়া সম্পর্কিত। কেননা, রোহিঙ্গারা যেসব বাড়িঘর ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল, সেসব পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার কর্মকর্তাদের নিয়ে রাখাইন সফরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বসবাসের গ্রামগুলো যেমন খুঁজে পাননি, তেমনি দেখে এসেছেন যে রোহিঙ্গাদের জন্য শিবির তোলা হয়েছে। এখন রোহিঙ্গারা যেনতেনভাবে রাখাইনে ফিরতে যে অনিচ্ছুক, তার পেছনের কারণ তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তারা তাদের বাসস্থান, ফসলের ক্ষেত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, মসজিদ ফিরে পেতে খুব সঙ্গত কারণে ইচ্ছুক হবে। কিন্তু সেসব তাদের ফেরত দিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে মিয়ানমার, তারা জানতে চায়। এর সঙ্গে জড়িত তাদের নাগরিকত্বসহ রোহিঙ্গা পরিচিতি নিশ্চিত করা। মিয়ানমার সরকার কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করে বাস্তব কোনো কর্মপন্থা গ্রহণ করেনি।

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে, তা বোঝা যায়। তাতেও দেশটির শাসকদের অবস্থান কোনোভাবেই পরিবর্তন হচ্ছে না। কেননা, এখন পর্যন্ত এ চাপ শুধু আলোচনা, প্রস্তাব গ্রহণ বা আহ্বানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়াই। মিয়ানমারকে তার অপরাধের জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে যেতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সামরিক চাপসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের চাপ না দিলে মিয়ানমারকে কাবু করা যাবে না। এর সঙ্গে তার নাগরিকদের ভ্রমণ, লেখাপড়া, সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে লক্ষ্য হিসেবে ঠিক না করলে কোনো কাজ হবে না। বিশ্বব্যাংক ও এ জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মিয়ানমারের শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার হুমকি না থাকায় তাদের একগুঁয়েমি বাড়তে থাকবে। চীন বা রাশিয়ার সম্মতি না থাকলে নিরাপত্তা পরিষদ কাজ করতে পারবে না- তা জেনেও তাদের পাশ কাটিয়ে মিয়ানমারকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবতে হবে। তবে মৌলিক প্রশ্ন- পাশ্চাত্যের দেশগুলো তাদের নিজ নিজ স্বার্থকে কীভাবে দেখবে এখানে? তাদের সরকার যেমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজস্ব স্বার্থ দেখে, তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও লাভ দিয়ে পরিচালিত হয়। এ বিষয়ে সঠিক চিন্তা না হলে মিয়ানমারকে কাবু করা যাবে না।

সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রবেশ ...

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ...

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজতে ...

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আন্দোলনেই দেশে স্বাধীন মানুষের পতাকা উড়বে বলে জানিয়েছেন ...

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ...

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২২৪ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ...

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেফতার করা ...