সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজুন

রাজনীতি

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

এমাজউদ্দীন আহমদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ডিসেম্বরে নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ। ২৮ আগস্ট রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। ওইদিন তিনি আরপিও সংশোধনীরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ তাদের মিত্ররা এ ব্যাপারে বারবারই অবস্থান স্পষ্ট করে আসছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন মহলের অনেকেরই বক্তব্য অনেকটা এ রকম যে, বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা নির্বাচনে অংশ না নিলেও নির্বাচন আটকে থাকবে না। এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কাম্য নয়। দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে বারবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে যাতে ক্ষমতাসীনরা কার্যকর উদ্যোগ নেন এই আহ্বানও জানানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্ষমতাসীনরা এই দাবি কিংবা আহ্বান উপেক্ষ করে চলেছেন। তাদের কারো কারোর বক্তব্য একদিকে অনিশ্চয়তার ছায়া দীর্ঘ করছে, অন্যদিকে নানা রকম বিতর্কের পথ সৃষ্টি হচ্ছে। গণতন্ত্রে যে সহনশীলতা ও পরমতসহিষুষ্ণতাকে অন্যতম শর্ত বলা হয়, তা এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করার মধ্য দিয়ে। ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে আরপিও সংশোধনীর প্রস্তাব যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, তাতে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে বলেই মনে করি। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দ্বিমত তো আছেই, কমিশনের ভেতরেও এ নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে আপত্তি জানিয়েছেন (নোট অব ডিসেন্ট) নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। পত্রপত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখেছি, গত ৮ এপ্রিল সিইসি বলেছিলেন, 'জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি ইসির এখনও নেই।' এরপর গত ৭ জুন পটুয়াখালীর বাউফলে স্মার্টকার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সিইসি আরও বলেছিলেন, 'সব রাজনৈতিক দল এবং ভোটাররা ইভিএমের পক্ষে মত দিলে জাতীয় নির্বাচনও ইভিএম পদ্ধতিতে হবে।' কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্যে হয়েছে কিংবা ভোটাররা মত দিয়েছেন কিনা, এর কোনোটিই হয়নি। গত ১৫ জুলাই ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেছিলেন, 'আরপিও সংশোধনের একটা উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়েছিল, তবে সেটা এখন আর হচ্ছে না।' প্রশ্ন হচ্ছে- ইসির দায়িত্বশীলদের এসব বক্তব্য হঠাৎ করে পাল্টে গেল কেন এবং তারা স্ববিরোধী অবস্থানই-বা কেন নিলেন?

আমাদের রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থার সংকটের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। দায়িত্বশীলরা যদি এ রকম স্ববিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তাহলে তো আস্থার সংকট সঙ্গত কারণেই আরও প্রকট হতে বাধ্য এবং হচ্ছেও তাই। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আস্থা, পারস্পরিক সম্মান ও নীতির ভিত যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবেই এবং এই মতবিরোধের নিরসন ঘটতে পারে সংলাপের মাধ্যমে। আলোচনার দরজা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রুদ্ধ হতে পারে না, রুদ্ধ থাকতে পারে না। আলোচনার দরজা খোলা রাখার দায়দায়িত্ব সর্বাগ্রে সরকারের। ইভিএমে ভোট হতে পারে। প্রযুক্তির বিকাশের সুযোগ আমরা নেব না কেন? কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে সবার মতামতের ভিত্তিতে। এ ব্যাপারে ঐকমত্য ছাড়া কোনো রকম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। দেশের রাজনীতিতে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি উপেক্ষা করলে চলবে না বরং এসব ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে। আজকের দিনের বাস্তবতায় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সব সংকট দূর করার উদ্যোগ নিলে আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারব।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টান্তমূলক করার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে এক টেবিলে বসে সমাধান সূত্র বের করা উভয় দলের নেতৃবৃন্দের উচিত। সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দু'দলের নেতাদের আলোচনার টেবিলে বসার ক্ষেত্র তৈরিতে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। আলোচনার টেবিলে তর্ক-বিতর্ক হোক এবং এর মধ্য দিয়েই বের হয়ে আসুক সমাধান। শান্তিপ্রিয়রা এমনটাই প্রত্যাশা করেন। সবার অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করার দায় কারোরই কম নয়। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি মহলের দায় বেশি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সবকিছু হতে হবে প্রশ্নমুক্ত, নির্মোহ অর্থাৎ আইন ও ন্যায়ানুগ। নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলো নির্বাচন কমিশন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশন জনআস্থা অর্জনে সক্ষম হতে পারেনি। ইতিমধ্যে তারা অনেক সুযোগ পেয়েছে আস্থা অর্জনের। কিন্তু তা না করে উল্টো আরও বিতর্কের সৃষ্টি করছে।

আমাদের এও মনে রাখা অবশ্যই দরকার, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে অনেক নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রীতিকর। সবকিছু আমলে রেখে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে না গিয়ে সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরও আমরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারিনি বলেই বারবার এমন সংকটের বৃষ্টি হচ্ছে। এর স্থায়ী সমাধান করতে হলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরই নয়, সংশ্লিষ্ট সবারই চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রতি যার যার অবস্থান থেকে আরও শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। সবাই যদি আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন, তাহলে সংকটের সমাধান কোনো দুরূহ বিষয় নয়। সব দিক বিবেচনায় সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। অন্য কোনো পন্থায় শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যাবে না এবং পৌঁছা যাবে না ঐকমত্যে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। এই মতবিরোধ নিরসনের প্রয়োজনেই দরকার অর্থবহ সংলাপ।

যদি বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করা না যায়, তাহলে সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করবে- এমন শঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করেছেন, যা শান্তিপ্রিয় কারোরই কাম্য নয়। তাই খোলা মন নিয়ে সংলাপে বসতেই হবে। নির্বাচন কমিশনকে যদি আরও স্বাধীন এবং ক্ষমতা দিয়ে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সে রকম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়া যায়, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে যাবে। নির্বাচনের সময় যে সরকার থাকবে, তারা নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ সহযোগিতা করবে। এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান সংকট কেটে যাওয়ার পথ সুগম হবে বলেই মনে করি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ জরুরি। এই সংস্কৃতির বিকাশেই আমাদের অনেক সমস্যা-সংকট নিরসনের পথ উন্মুক্ত হবে।

সব দলের অংশগ্রহণে অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য যা যা করা দরকার, সরকার তাই করবে। আমরা এত কিছুর পরও এমন প্রত্যাশাই রাখতে চাই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ হলে দায়িত্বশীলরাই প্রশংসিত হবেন এবং আমাদের গণতন্ত্রের পথটি মসৃণ হবে। আগে সমাজকে গণতান্ত্রিক করার উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজ যদি গণতান্ত্রিক না হয়, তাহলে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা থেকেই যাবে। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়, যদিও তা অপরিহার্য। এর কয়েকটি কারণও রয়েছে। যেমন নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক দেশের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ভোটদাতা এবং প্রায় ৬০ কি ৭০ হাজার ভোটকেন্দ্র তদারক করার ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের নেই। কমিশনকে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে। সহায়তা গ্রহণ করতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার যে গুণপনা, অর্থাৎ যে নিরপেক্ষতা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বীকৃত অনেকেই বলে থাকেন, গত কয়েক বছরে এর বৃহৎ অংশ হারিয়ে গেছে। তাছাড়া বাংলাদেশে নির্বাচন ও রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত কালো টাকা ও সন্ত্রাস দ্বারা- এই অভিযোগও নতুন নয়। গণতন্ত্রের পথ সব সময় বন্ধুর। তাই এ পথে চলতে গেলে মাঝেমধ্যেই নেতৃত্ব সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। তবে এ সংকট নিরসনের পন্থা আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এরই মাধ্যমে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সম্মান দেখানো যায়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে সেই পথটা হোক মসৃণ ও প্রতিবন্ধকতামুক্ত।

সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে যেতে চায় বিএনএ

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে যেতে চায় বিএনএ

বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ...

কালাইয়ে বেড়েছে কিডনি বিক্রি

কালাইয়ে বেড়েছে কিডনি বিক্রি

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অভাবী মানুষের কিডনি বেচাকেনা আবারও বেড়েছে। অভাবের ...

চট্টগ্রামে মহড়া, অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

চট্টগ্রামে মহড়া, অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গত বুধবার দু'পক্ষের ...

জেএমবিকে অর্থ জোগাচ্ছে জঙ্গি শায়খের পরিবার

জেএমবিকে অর্থ জোগাচ্ছে জঙ্গি শায়খের পরিবার

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশকে (জেএমবি) চাঙ্গা ...

রাত ১১টার পর ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া উচিত: রওশন

রাত ১১টার পর ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া উচিত: রওশন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক রাত ১১টার পর বন্ধ করে দেয়া ...

আফগানদের কাছে বড় হার বাংলাদেশের

আফগানদের কাছে বড় হার বাংলাদেশের

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা বাংলাদেশ প্রস্তুতি হিসেবে নিচ্ছে। এমন একটা কথা ...

বিশ্বে প্রতি ৫ সেকেন্ডে ১ শিশুর মৃত্যু: জাতিসংঘ

বিশ্বে প্রতি ৫ সেকেন্ডে ১ শিশুর মৃত্যু: জাতিসংঘ

ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগ ও বিশ্ব ...

বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ৬ বছরের শিশুর মৃত্যু

বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ৬ বছরের শিশুর মৃত্যু

লিজা আক্তার। বয়স মাত্র ৬ বছর। চোখের সামনে বাবা ট্রেনে ...