আমার সুন্দর নজরুল ও আমার কথা

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০১৮      

লুৎফর রহমান

কাজী নজরুল ইসলাম চৈতন্যের একটি হ্রস্বতম তথ্য-ভাণ্ড আমাদের বিবেচনায় 'আমার সুন্দর' নামক গদ্য রচনাটি। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়া পর্যন্ত কবি-জীবনের বিবর্তনের ধারাটি তাতে বিশেষভাবে মূর্ত। তাতে সৃজনশীল জীবনের বিচিত্র বাঁক সম্বন্ধে কবির আত্ম-আবিস্কার গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্পী সত্তায় দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং মানবমুক্তির তীব্র এষণার উৎসারণ কী ভঙ্গি ও গভীর উপলব্ধির তাড়নায়, তা সম্যক অনুভব করা যায়। আমাদের বিবেচনায়, যুগস্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম অস্তিত্বের প্রকৃত গড়ন সময়ের কামারশালায় বিশ্ব পরিস্থিতির তৎকালীন তাপ-চাপ, অমানবিকতার নিঃসংশয় নির্লজ্জ প্রকাশের পটভূমিতে।

শিল্প বিপপ্লবোত্তর ইউরোপের রাষ্টগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার তুঙ্গ বিকাশকালে আন্তঃসম্পর্কের অবনতি ঘটে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। ক্ষমতার জয়ঢাকের বাজনায় উন্মত্ত ও উদ্ধত এই জাতি-রাষ্ট্রগুলো অচিরেই বিশ্বসভ্যতার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। দখল ও শাসন করার প্রয়াস থেকে উপনিবেশ বিস্তারে মরিয়া ওই সব দেশ বিশ্বময় আধিপত্য বিস্তারে ছিল তৎপর। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, পর্তুগিজ বণিক ও ফরাসি বণিকদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিহাসখ্যাত। তন্মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক প্রহসন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই ভূমি ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত নীতির আমূল পরিবর্তন নিশ্চিত করে। অতঃপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সক্রিয় হয়। ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম-দর্শন, যাপনের বিবিধ আচার-রীতি-নীতির ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ করে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি যে শাসিত জাতির সংস্কৃতি অপেক্ষা উন্নত- নানাভাবে তাই প্রতিপন্ন করে। শিক্ষা ব্যবস্থা ইউরোপীয় হওয়ার কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক চৈতন্য সমকালীন ইউরোপীয় আদলে গড়ে ওঠে; ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী তার দৃষ্টান্ত। নজরুল ইসলামসহ বাংলা সাহিত্যের আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যশিল্পীর জন্ম ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে।

১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষ গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ৪২ বছর এবং ইংরেজ কর্তৃক উপনিবেশ স্থাপনের ১৪২ বছর পর পরিবর্তিত আর্থনীতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থায় এক অস্থির বিশ্ব ব্যবস্থায় ১৮৯৯ সালে কবির জন্ম তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বর্ধমান জেলায়। কবির জন্মের ছয় বছরের মাথায় ১৯০৫ সালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী তাদের বিভক্তি-করণ নীতি বাস্তবায়ন করতে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর সমন্বয়ে গঠিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি দ্বিধাবিভক্ত করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাঙালির অনমনীয় মনোভাব, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাঙালির সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাংলার বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত নীল বিদ্রোহে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ, সক্রিয় ভূমিকা ও সফলতা ইত্যাদি কারণে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে আলাদা প্রদেশ করার ইংরেজ সকারের সিদ্ধান্তই বঙ্গভঙ্গ। ইংরেজ ঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রশ্নে আবহমান বাংলার সামাজিক জীবন আন্দোলিত ও আলোড়িত হয়। এই সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবর্গ ও মধ্যবিত্তের যে আন্দোলন, সংগ্রাম সেটাই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নামে ইতিহাসখ্যাত। এর পরের বছরেই ভারতবর্ষের দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ (১৯০৬)। এর পরপরই বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতি গঠিত হয়। কাজী নজরুলের ১১ বছর বয়সে ১৯১০ সালে স্বদেশী আন্দোলন সমগ্র ভারতবর্ষের মতো বাংলার জনজীবনকেও আলোড়িত করে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য কূট রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। তার প্রধান অস্ত্র হিসেবে তারা ভারতীয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কৌশলে বিভেদ সৃষ্টি করে। ভারতীয় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দু ও মুসলমান এই দ্বি-জাতিতত্ত্ব নামক ইংরেজসৃষ্ট ফাঁদের শিকারে পরিণত হয়। তার প্রভাব পড়ে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে। অতঃপর ১৯১১ সালে সরকারের এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বঙ্গভঙ্গ রদ হয়, কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়।

ধ্রুপদী ভারতীয় অনড় সমাজ জীবনে সংঘটিত উপরি-কথিত রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রত্যেকটিই জাতির সমগ্র চৈতন্যে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এতটি আকস্মিক সিদ্ধান্ত বাঙালিকে অভাবনীয় এক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। তদুপরি কাছাকাছি সময়ে অর্জিত দুটি নতুন অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি দ্বারা সমগ্র বিশ্ব হতচকিত ও বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক. কাজী নজরুল ইসলামের ১৫ বছর বয়সে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। দুই. কবির প্রথম যৌবনে ১৯১৭ সালে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মপ্রতিষ্ঠা।

সর্বজনবিদিত যে, নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে দুই বছর বিশ্বযুদ্ধের আগুনে পুড়েছেন। অন্যান্য বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিকের চেয়ে তিনি ক্ষমতার আগ্রাসী রূপ অধিক প্রত্যক্ষ করেছেন। সামাজিক শোষণ-পীড়ন ব্যতীত ব্যক্তিগত জীবনে মামলার আসামি, সম্পাদিত পত্রিকা ও পুস্তক নিষিদ্ধ হওয়া, জেল-জুলুম সহ্য করার মধ্য দিয়ে অর্জিত সে অভিজ্ঞতা। যে দারিদ্র্য তাকে মহান করেছিল, খ্রিষ্টের সম্মান এনে দিয়েছিল তার ভয়াবহতার স্রষ্টা যে ক্ষমতাবানরাই- তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বাল্যকালেই। ওই বয়সেই তিনি উৎপাদক (১৯১২ সালে)। শ্রমের মধ্যে সম্মান আছে কিন্তু আরাম নেই। তাই দারিদ্র্য তাকে আত্মমুখী করেছিল এবং আত্মোপলব্ধি 'যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস', তাদের চিনতে সাহায্য করেছিল। অপর সংস্কৃতির জীবনধারা ও যাপনের বিধিবিধান তিনি রপ্ত করেছিলেন সৈনিক জীবনে (১৯১৭-১৯১৯) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা। বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী (১৯১৯) গল্পে তার প্রমাণ বিদ্যমান।

সৈনিক জীবনেই সম্ভত বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনে নিষ্ঠাবান পাঠকের বেশে বিচরণ সম্পন্ন করেন। 'বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য' শীর্ষক রচনায় পর্যায়ক্রমে শেলি, মিল্টন, নোগুচি, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ, গোর্কি, যোহান বোয়ার, বার্নার্ড শ, জেসিঁতো বেনাভাঁতে, লিওনিদ আঁদ্রিভ, ক্লুট হামসুন, ওয়াদিশল রেমঁদ, আনাতোল ফ্রাঁস, হুইটম্যান, পুশকিন, দস্তয়ভস্কি, টলস্টয়, কার্ল মার্ক্স, ইবসেন, ফ্রয়েড, ব্যালজ্যাক, জোলা, গ্রাৎসিয়া গেলেদ্দা, দ্যু-অননৎসিও, কিপলিং প্রমুখ কালজয়ী কবি-ঔপন্যাসিক, সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিকের রচনার অন্তর্পাঠ ও অন্তর্মাধুর্য সমাজতাত্ত্বিকের বিশ্নেষণী দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট- নজরুল ইসলামের শিল্প সাধনা কোনো খামখেয়ালি মানুষের খামখেয়াল নয়। তা যে আত্মজিজ্ঞাসাজাত, বিশ্ববীক্ষণের ফল- উপরি-উক্ত বক্তব্যের সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

বিশ্বসমাজের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামও সোভিয়েত ইউনিয়নের নব প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক আর্থনীতিক ব্যবস্থার মধ্যে মানব জাতির কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন। 'বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য' শীর্ষক রচনায় কবি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন-

'দূর সিন্ধুতীরে বসে বসে ঋষি কার্ল মার্কস যে মারণমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন তা এতদিনে তক্ষকের বেশে এসে প্রাসাদে-লুক্কায়িত শত্রুকে দংশন করলে। জার গেল- জারের রাজ্য গেল- ধনতান্ত্রিকের প্রাসাদ হাতুড়ি-শাবলের ঘায়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। [...] [...] ভোরের পাণ্ডুর জ্যোৎস্নালোকের মতো এর করুণ মাধুরী বিশ্বকে পরিব্যাপ্ত করে ফেলেছে।' [ন. র. ৭ম খণ্ড ২০০৮, ২৫]

সমকালের অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক ও রাজনীতি সচেতন বাঙালির মতো নজরুলকেও বাধ্য হয়ে শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, সর্বহারা শ্রেণি, শ্রমিক, শ্রম-শোষণ, বাজার, মুনাফা, পুঁজি, উদ্বৃত্ত ইত্যাদি পরিভাষার মর্মার্থ আত্মস্থ করতে হয় সময়ের একান্ত প্রয়োজনে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও এর আলোকে বিশ্ব সমাজকে পর্যবেক্ষণ, বিশ্নেষণ করার পদ্ধতিটিও রপ্ত করতে হয়। লক্ষণীয়, তার স্বকালই নজরুলের চৈতন্য গড়ে দিচ্ছে বিপরীতধর্মী বিচিত্র ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। ক্রমে তিনি 'ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম'-এর প্রবক্তায় পরিণত হচ্ছেন।

১৯২১ সালে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে যুগপৎ কাজী নজরুলের শিল্পী সত্তা ও রাজনৈতিক সত্তার উদ্ভাসন ঘটে। খেলাফত আন্দোলন (১৯২০) ও অসহযোগ আন্দোলনের (১৯২১-২২) প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এই সময় ভারতীয় জনগণ স্বাধীনতার দাবিকে সর্বতোভাবে সমুন্নত রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ, কংগ্রেস তখন বিবদমান। সম্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধি ফেনিয়ে উঠছে রাজনীতির উত্তাল নদীতরঙ্গে। এই সময় নজরুলের আত্ম-সংকট সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় 'আমার লীগ কংগ্রেস' নামক রচনায়। [..] ..] [...] 'আমি কোনো প্রলোভন নিয়ে এই কলহের কুরুক্ষেত্রে যোগদান করিনি। 'লীগ' কেন, 'কংগ্রেস'কেও আমি কোনোদিন স্বীকার করিনি। আমার ধূমকেতু পত্রিকা তার প্রমাণ।'(প্রাগুক্ত-৬২) উদ্ৃব্দত অংশে ভারতবর্ষীয় রাজনীতির সমকালের দ্বান্দ্বিক অবস্থাটি যেমন স্পষ্ট, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের কুরুক্ষেত্রে কবি নজরুলের বিপদাপন্ন অবস্থাটিও তেমনি স্পষ্ট। প্রাসঙ্গিক আরও কিছু মন্তব্যদৃষ্টে আমাদের মনে হয়েছে, কাজী নজরুল ইসলাম রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন ও বিচক্ষণ ছিলেন। বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের কূট রাজনীতিতে নেতৃবৃন্দের কার কী ভূমিকা, তা নজরুলের বিভিন্ন লেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। এবং বুঝতে কষ্ট হয় না যে, তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্বকালের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তিনি ঠকেছেন প্রতারণা করার উদ্দেশ্য ছিল না বলেই। 'পোলিটিকাল তুবড়িবাজি' নামক রচনায় তিনি 'স্বরাজ' প্রতিষ্ঠা বিষয়ে ভারতবর্ষীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যকার সংকটকে চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক তত্ত্বদার্শনিকের আন্তরিক যুক্তি নিষ্ঠায় (দ্র. প্রাগুক্ত-৪৯)। এবং আমাদের বিবেচনায় কাজী নজরুল ইসলামের রাজনীতি চর্চাও কোনো খেয়ালমাত্র ছিল না। এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন স্বকালের স্বার্থান্ধ রাজনীতিকদের কূট রাজনীতির স্বীকার।

ভারতবর্ষে ইংরেজবিরোধী আন্দোলন ক্রমে প্রাসঙ্গিক নানা ঘটনার কার্যকারণসূত্রে জোরদার হয়েছে। ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের আত্যন্তিক প্রচেষ্টা এক সময় অতিউৎসাহীর পর্যায়ে উপনীত হয়। ১৯২৯ সালের ইউরোপ-আমেরিকার মহামন্দা ১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। কবি নজরুল ইসলাম মুসোলিনি, হিটলারের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা অনুধাবন করেছিলেন। তার গদ্য রচনায় সে বিষয়েও রয়েছে স্পষ্ট বক্তব্য [..] [...] [...] [..] 'হঠাৎ চমকে উঠে শুনি- আবার যুদ্ধ- বাজনা বাজছে- এ যুদ্ধ-বাদ্য বহু শতাব্দীর পশ্চাতের। দেখি তালে তালে পা ফেলে আসছে- সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট সেনা। তাদের অগ্রে ইতালির দ্যু-অননৎসিও, কিপলিং প্রভৃতি। পতাকা ধরে মুসোলিনি এবং তার কৃষ্ণ-সেনা। (প্রাগুক্ত-২৬)

এতক্ষণের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কবি কাজী নজরুল সম্বন্ধে যে বিষয়টি পরিস্কার করা সম্ভব হয়নি তা হচ্ছে- নজরুল কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, নাট্যকার, অভিনেতা, সঙ্গীতজ্ঞ এবং সচেতন রাজনীতিক। এবং সময়ের পালা বদল তার এসব সত্তার উদ্ভাসন চূড়ান্ত করেছে। এ সম্পর্কে কবির নিজের ভাষ্য-

"আমার সুন্দর প্রথম এলেন ছোটগল্প হয়ে, তারপর এলেন কবিতা হয়ে। তারপর এলেন গান, সুর, ছন্দ ও ভাব হয়ে। উপন্যাস, নাটক, লেখা (গদ্য) হয়েও মাঝে মাঝে এসেছিলেন। 'ধূমকেতু' 'লাঙল' 'গণবাণী'তে, তারপর এই 'নবযুগে' তাঁর শক্তি-সুন্দর প্রকাশ এসেছিল; আর তা এল রুদ্র-তেজে, বিপ্লবের, বিদ্রোহের বাণী হয়ে। বলতে ভুলে গেছি, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈনিকের সাজে দেশে ফিরে এলাম, তখন হক সাহেবের দৈনিক পত্র নবযুগে কি লেখাই লিখলাম, আজ তা মনে নেই; কিন্তু পনেরো দিনের মধ্যেই কাগজের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।" (প্রাগুপ্ত-৩৭-৩৮)।

যতটা অবলীলায় কবি বক্তব্যটি উচ্চারণ করেছেন, প্রকৃত বাস্তবতা ছিল ততটাই কঠিন ও কঠোর। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে সোচ্চার, আধিপত্যবাদ রুখতে মরিয়া কবি নজরুল ছিলেন ব্রিটিশদের চক্ষুশূল। তাই তারা নানাভাবে তার কণ্ঠ রোধ করতে চেয়েছে। 'আমার সুন্দর' রচনায় কবির আত্মোপলব্ধি আত্মস্মৃতির ধারায় যেন অভিব্যক্তি পেয়েছে। কবি বলেন-

'এই গান লিখি ও সুর দেই যখন, অজস্র অর্থ, যশ-সম্মান, অভিনন্দন, ফুল, মালা- বাংলার ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা পেতে লাগলাম। তখন আমার বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ মাত্র। এই সম্মান পাওয়ার কারণ, সাহিত্যিক ও কবিদের মধ্যে আমি প্রথম জেলে যাই, জেলে গিয়ে চল্লিশ দিন অনশন-ব্রত পালন করি রাজবন্দিদের উপর অত্যাচারের জন্য।' ( প্রাগুক্ত-৩৯)

অতঃপর তিনি তার অস্তিত্বের ভিন্ন এক রূপ 'প্রকাশ-সুন্দর'কে আবিস্কার করেন জননী জন্মভূমি রূপে। তারপর সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করে অস্তিত্বের আর এক রূপ 'যৌবন-সুন্দর', 'প্রেম-সুন্দর'কে আবিস্কার করেন। এই জীবনবাদী কবি আপন পুত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে শোকের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তাকেও অস্তিত্বের অংশ করে নেন এবং তার মধ্যে আবিস্কার করেন 'শোক-সুন্দর'কে। জীবনের এই নিদারুণ কষ্টের অভিজ্ঞতা তার মধ্যে জাগ্রত করে বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহ ঘনীভূত হয়ে স্রষ্টার প্রতি জাগে প্রগাঢ় অভিমান। সেই ক্ষণে তিনি 'ধ্বংস-সুন্দর' বা 'প্রলয়-সুন্দর'কে আবিস্কার করতে গিয়ে নিজের মধ্যে খুঁজে পেলেন 'ধ্যান-সুন্দর'। কিন্তু তার শিল্পী সত্তা ধ্যান-সুন্দরের মধ্যে জন্মের সার্থকতা খুঁজে পায়নি। জাগতিক দায়িত্ব-কর্তব্য, মর্তপ্রীতি, মানবকল্যাণ, নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে তিনি প্রলয়-সুন্দরকেই শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন। এভাবে কবির আত্ম-আবিস্কার একটি চূড়ান্ত পরিণতি পেল।

আলোচ্য 'আমার সুন্দর' প্রবন্ধটি সে কারণেই হয়ে রইল নজরুল শিল্পী সত্তার পরিচয়জ্ঞাপক। আমাদের বিবেচনায় কবির কাল এবং সেকালের বিশ্ব-পরিস্থিতি এবং ভারতীয় মানসচৈতন্যই সর্বতোভাবে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহু বিচিত্র রচনা ও কর্মের স্রষ্টারূপে তাকে গড়ন দিয়েছে। া

পরবর্তী খবর পড়ুন : সংবাদ সংক্ষেপ

সাগরিকায় আজ সিরিজ জয়ের ম্যাচ

সাগরিকায় আজ সিরিজ জয়ের ম্যাচ

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সর্বশেষ ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দুই বছর ...

নির্বাচন বানচালের জন্যই ৭ দফা ও সংলাপের দাবি

নির্বাচন বানচালের জন্যই ৭ দফা ও সংলাপের দাবি

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ...

৪১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদক চার্জশিট দিচ্ছে

৪১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদক চার্জশিট দিচ্ছে

আগ্নেয়াস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগে ৪১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে ...

তফসিলের আগেই সংলাপে বসার আহ্বান জানাবে ঐক্যফ্রন্ট

তফসিলের আগেই সংলাপে বসার আহ্বান জানাবে ঐক্যফ্রন্ট

অবশেষে আজ বুধবার সিলেটে জনসভা করছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একাদশ জাতীয় ...

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই যত অভিযোগ

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই যত অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মহাসড়কের পাশ থেকে চার যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ...

অতিথি পাখিতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কা

অতিথি পাখিতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কা

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, ...

এক মঞ্চে রংপুরের ১৬২ রাজনৈতিক নেতা

এক মঞ্চে রংপুরের ১৬২ রাজনৈতিক নেতা

একই মঞ্চে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস নির্বাচনের শপথ নিয়েছেন রংপুর বিভাগের ...

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, ফার্মাসিউটিক্যালস সিলগালা

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, ফার্মাসিউটিক্যালস সিলগালা

সাভারের নবীনগর এলাকার মির্জানগরে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ ...