শোভমানা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মাকিদ হায়দার

এরা সব অন্তঃপুরিকা, রাঙা অবগুণ্ঠন মুখের পরে তার ওপরে ফুলকাটা পাড়, সোনার সুতোয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি শাড়ির বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন তার 'শেষ সপ্তক' কবিতাগ্রন্থের বিশ সংখ্যক কবিতায়। কিন্তু কোথাও উল্লেখ করা হয়নি 'শাড়ি' শব্দটি। ভারতবর্ষে কবে কখন শাড়ির প্রচলন হয়েছে, সে সম্পর্কে যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় আমার বোধে, সেটি স্পষ্ট নয়। কেননা, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের, বাংলাদেশের ইতিহাস, গ্রন্থের চার খণ্ডের পাঠান্তে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য। তিনি জানিয়েছেন, বাঙালি জাতির উৎপত্তি কোন সময়ে বাংলাদেশে মানুষের বসতি আরম্ভ হয়েছিল, সেটি জানার উপায় নেই। উপরন্তু আরও জানিয়েছেন, 'বাংলার আদিম অধিবাসীগণ আর্যজাতির বংশোদ্ভূত নয়, বাংলার ডোম, চণ্ডাল, হাড়ি, পুলিন্দ, শবর এবং কোল, এরাই অন্ত্যজ জাতি হলেও বাংলার আদিম অধিবাসীগণের বংশধর। পরে গুপ্ত শাসনের অবসান ঘটলে, পালদের রাজ্য শাসন পরে সেনদের শাসন আমলেও, সেই প্রাচীনকালে নারীদের কি পরিধেয় ছিল, সেটির কোনো উল্লেখ করেননি ড. আর সি মজুমদার।

বাঙালি রমণীদের সুন্দর করে শাড়ি পরার রাতি প্রচলন করেছিলেন আই সি এস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানেদা নন্দিনী। তিনি একবার বোম্বে শহরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন, ওই অঞ্চলের রমণীরা উল্টো করে শাড়ি ব্যবহার করেন, যা বঙ্গীয় সমাজে সমাদৃত নয়। জ্ঞানদা বোম্বে থেকে ফিরে ঠাকুর পরিবারে প্রচলন করেছিলেন কুঁচা দিয়ে শাড়ি পরার প্রচলন। সেই থেকে বঙ্গের যুবতী এবং রমণীগণ কুঁচা দেওয়া শাড়ির ব্যবহার এবং শাড়ির পাড়, আঁচল, ব্লাউজে সামঞ্জস্য শুরু করেছিলেন দেবেন ঠাকুরের বড় পুত্র আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জায়া জ্ঞানদা নন্দিনী। আরও কিছু বোম্বে গিয়ে দৃষ্টিগোচর হয়েছিল ঘটিহাতা থেকে লম্বা ব্লাউজের হাতার প্রথমে শুরু হয়েছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেই।

দেশভাগের অনেক আগেই পূর্ববঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল, ঢাকার চিত্তরঞ্জন কটন মিলসহ আরও কয়েকটি শাড়ি তৈরির মিল। আমার কিশোরকালে দেখেছি, আমাদের পাবনা শহরের জিলাপাড়া মহল্লায় উভয় সম্প্রদায়ের রমণীরা ব্যবহার করতেন মোহিনী সিল্ক্কের শাড়ি। সেই শাড়ির আঁচলে ছিল নীল ডুরের চিকন একটি রেখা। তবে মূল শাড়িতে ছিল ওই একই নীল রঙের চিকন-মোটা পাড়। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিধবা রমণীরা ব্যবহার করতেন নীল চিকন পাড়েন মোহিনী ধুতি- ওই ধুতি পরিহিতাদের দেখলে সকলেই বুঝতে পারতেন, ভদ্রমহিলা বিধবা।

তৎকালের পূর্ববঙ্গের সিরাজগঞ্জ মহকুমার শাহজাদপুরের [তন্তুবায় সম্প্রদায়ের] তাঁতিরা শুরু করেছিলেন শাড়ির উৎপাদন। তবে 'মাক্‌' 'ছিলা' 'টানা দেওয়া' সুতিতে রঙ ব্যবহার এবং শাড়ির বহর কত হাত হবে, প্রাথমিক অবস্থায় তাঁতিরা ঠিক করতে পারেননি; কখন ১২ হাত, ১১-১০, এমনকি ৯ হাত পর্যন্ত তৈরি করেছিলেন। আঁচল ছিল না ওইসব শাড়িতে। দেশ ভাগ হওয়ার অনেক আগেই কিছু হিন্দু ও মুসলমান তাঁতি সম্প্রদায়ের মানুষ শাহজাদপুর ছেড়ে পাবনা শহরের পূর্বের দিকের দোগাছি নামের একটি অজপাড়াগাঁয়ে, নিয়ে এসেছিলেন জমির লোভ দেখিয়ে অনেক লাখেরাজ জমি বিনামূল্যে ওই সকল তাঁতি সম্প্রদায়কে দিয়েছিলেন, দোগাছীর জমিদার শ্রী কৃষ্ণসাহা। কথিত আছে, জমিদার জায়ার বাড়ি ছিল শাহজাদপুরেই। তিনি একবার পূজার সময় গিয়েছিলেন পিতৃগৃহে। সেখানে গিয়ে পূজা-পার্বণ উপলক্ষে কতগুলো শাড়ি পেয়েছিলেন, কিন্তু একটি শাড়িও নাকি জমিদার জায়ার পছন্দ হয়নি। রাগে, অভিমানে দোগাছী ফিরে এসে স্বামীর কাছে জানিয়ে ছিলেন তার অপছন্দের কথা। এবং এও নাকি বলেছিলেন, তন্তুবায় সম্প্রদায়ের হিন্দু-মুসলমানদের কিছু লাখেরাজ সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে আমাদের শাহজাদপুর থেকে তাঁতিদের এনে দোগাছীর 'কুলুনিয়া' গ্রামে বসতি গড়ে দিতে হবে, দিয়েছিলেন জামিদার বাবু।

দোগাছীর জমিদার বাবুর মহানুভবতার কথা জানতে পেরেছিলেন সুজানগরের তাঁতীবন্দের জমিদার। যেহেতু তাঁতীবন্দ ব্যবসা-বাণিজ্যে দোগাছীর চেয়ে অগ্রসর হলেও তাঁতশিল্পে এগিয়ে গিয়েছিলেন দোগাছীর তন্তুবায় সম্প্রদায়। জমিদার গৃহিণীর নির্দেশে এবং বিভিন্ন রঙের তাঁতের শাড়ির ডিজাইন এবং কোন শাড়ি কত কাউন্টের হবে, কোনোটা হবে ৮০ কাউন্টের, সুতার সঙ্গে ৬০ কাউন্টের সুতা, ৬০ এবং সঙ্গে ৪০ কাউন্টের, এবং ৪০ ও ৩২ কাউন্টের সুতার মিশ্রণে যে সকল শাড়ি তৈরি হতো, সেগুলোর মূল্য ছিল স্বল্পমূল্য। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অনেক পরিবার সেকালে ওই সব শাড়ি ব্যবহার করত, উচ্চবিত্তরা ওই ৮০-৬০ কিংবা ৮০-৮০ কাউন্টের সুতার তৈরি চোখ জুড়ানো শাড়িগুলো ব্যবহার করতেন প্রায় বারো মাস। বিশেষত পূজা-পার্বণে এবং ঈদের সময় উচ্চবিত্তরা কলকাতার বিখ্যাত সব শাড়ির দোকান থেকে কিনতেন শখের শাড়িগুলো। পাবনা থেকে কলকাতায় যেতে হতো সকাল ৬টায়, বিশ্বাস মোটর কোম্পানির খাঁচাওয়ালা বাসে এবং রাত ১০টা-১১টার ভেতরেই কলকাতার শিয়ালদহ ইস্টিশন থেকে আসাম বেঙ্গল মেলে উত্তরবঙ্গের মানুষরা কেউ নামতেন ঈশ্বরদীতে, কেউ বা অন্যত্র। সে সময় কলকাতার ধর্মতলা স্ট্রিটের 'ওয়াসেল মোল্লার' দোকানটি নাকি ছিল পূর্ববঙ্গবাসীর কেনাকাটার একমাত্র স্থল।

পাবনা শহরের বড় কাপড়ের দোকানটি ছিল ললিত মোহন বসাকের। পরেরটি ছিল সেই দোগাছীর কাজী নাজিরউদ্দিনের 'পাবনা স্টোর'। সেটির অবস্থান ছিল নন্দ বসাকের হার্ডওয়্যারের দোকানের পশ্চিম প্রান্তে, আর ললিত মোহন বসাকের দোকান ছিল পূর্ব দিকে। পূজা-পার্বণে, ঈদে-মহররমে ওই দুটি দোকানে প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা যেত। অন্যান্য দোকানে খরিদার যেতে চাইতেন না, কেননা ললিত বসাকেরর দোকানটিতে অনেক আলমিরা ছিল, যার ভেতরে মোহিনী মিলের এবং চিত্তরঞ্জন কটন মিলের শাড়ি ছাড়াও থাকত ঢাকার রূপগঞ্জের রায়পুরা, দোহার, রূপসার তাঁতিদের শাড়িগুলো। জামদানি শাড়ি তখনকার দিনে মুড়াপাড়া ও নোয়াপাড়ায় তৈরি হতো। সেই সব শাড়ি হিন্দু-মুসলমানদের অনুষ্ঠান ছাড়াও ছেলে কিংবা মেয়েদের বিয়ের সময় ছেলেপক্ষকে দিতে হতো, লাল টুকটুকে জামদানি/কাতান শাড়ি বিয়ে-হলুদের, ফিরানির দুই বাড়ির বয়সীদের শাড়ি। দুই পক্ষের সামর্থ্য অনুসারে শুধু শাড়িই নয়, গামছা-লুঙ্গিও দিতে দেখেছি আমাদের পিতা শেখ মোহাম্মদ উদ্দিনকে, বোনদের বিয়েতে শাড়ির পরিমাণ থাকত বেশি। এবং যে কোনো ছেলেমেয়ের বিয়েতে শাড়ি দেওয়ার প্রচলন বোধকরি অনেক কাল আগেই শুরু হয়েছিল বঙ্গীয় সমাজে। শান্তিপুরী শাড়ির সমাদর ছিল উভয় বঙ্গে।

পিতা একদিন রোজার ঈদের আগে আমাকে আমাদের দোহার পাড়ার বাড়ি থেকে রিকশায় নিয়ে গেলেন পাবনার বড় বাজারের ললিত মোহন বসাকের 'বসাক বস্ত্রালয়ে'। ভিড় কিছুটা থিতু হয়ে এলে ললিত মোহন জানতে চাইলেন, সঙ্গের ছেলেটি কে? পিতা জানালেন, আমার ছেলে, পাবনা জিলা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র [সেটি ছিল ১৯৬৬ সাল]। ললিত কাকাকে পিতা বললেন ১০ থেকে ১২টি বিভিন্ন দামের শাড়ি দিতে। তবে ১৫ থেকে ১৮ টাকার ভেতরে যেন দাম হয়। সেসব শাড়ি আমাকে দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন দোহারপাড়ায় এবং বললেন, আমি বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত তোর দুই মাকে বলিস শাড়ি যেন কাউকে না দেয়। দুই দিন পরেই রোজার ঈদ। ঈদের আগের দিন দুই মাকে পিতা নিজ হাতে শাড়ি না দিয়ে জানালেন, তোমাদের দু'জনার পছন্দমতো শাড়ি বেছে নাও। আমার মা রহিমা খাতুন, তিনি তার রুচি এবং বয়স বিবেচনা করে যে শাড়িটি নিয়েছিলেন, সেটির দাম ছিল মাত্র ১৭ টাকা। ছোটমা আছিয়া খাতুন, তিনি নিয়েছিলেন মাত্র ১৫ টাকা দামের তাঁতের সুন্দর শাড়ি। আমার তিন কাকিমা ও বোনদেরও ওই একইভাবে শাড়ি বেছে নিতে বললেন। বড় বোন রেজিয়া এবং দ্বিতীয় বোন রোকেয়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বেশ অনেক বছর আগেই। তাই ওই দু'জনের পর নিয়েছিলেন দুই ফুফু এবং মেজকাকার মেয়েরা। ১৫ থেকে ১৮ টাকা দামের একটি শাড়ি পেয়েছিল দ্বিতীয় বোন রোকেয়া, অন্যরা কমবেশি দামের- তবে তাদের পছন্দ অনুসারে নিয়েছিল তারা।

শৈশব, কৈশোরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাজার কথা মনে হলো; মনে করিয়ে দিলেন দৈনিক সমকালের সাহিত্য সম্পাদক 'কালের খেয়া'র- কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক মাহবুব আজীজ। বাংলাদেশের বিয়েতে প্রথম দিনেই মেয়েকে দিতে হয় লাল টুকটুকে বেনারসি/কাতান শাড়িসহ হলুদের শাড়ি। ফিরানির শাড়ি উভয় পক্ষের বয়সীদের বয়স অনুসারে দিতে হতো, সেই ১৪ থেকে ১৮ টাকা দামের, সাত-আট টাকার মিলের শাড়ি বাড়ির কাজের মেয়েদের। সেগুলোর কাঁচা রঙে ছাপা, মাস যেতে না যেতেই বোঝা যেত ওগুলো ছিল মোহিনী মিলের ধুতি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের মহিলাদের ভেতরে ভারতীয় শাড়ির প্রীতি প্রকটভাবেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ভারতীয় শাড়ির চেয়ে অনেক বেশি ভালো সুতায় তৈরি হতো দোগাছীর শাহজাদপুরের এবং টাঙ্গাইলের পাখরাইলে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার পানি ছাড়া অন্য কোথাও জামদানি শাড়ি হয় না, আমাকে জানিয়েছিলেন রূপগঞ্জের বিখ্যাত জামদানি প্রস্তুতকারক আলহাজ কফিল উদ্দিন। আমার বিসিকের চাকরির সময়ে বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়েছিলাম সিএসপি মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিনকে। তিনি বিসিক নকশা কেন্দ্রের প্রধান শিল্পী ইমদাদ হোসেনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর বিভিন্ন মেলায় বৈশাখী মেলা, বসন্ত মেলা, এমনকি যশোরের সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন মেলার উদ্ভাবক ছিলেন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত। প্রায় চার বছর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন বিসিকের চেয়ারম্যান ছিলেন, তত দিন উত্তরবঙ্গের রংপুর শহরে প্রতিবছরই শীতের মেলা করিয়েছিলেন এবং ঢাকার শেরাটন হোটেলে সাপ্তাহিক একটি মেলায় রূপগঞ্জের হাজি কফিল উদ্দিনসহ আরও অনেক নামকরা জামদানি প্রস্তুতকারকের জামদানি বুনন কীভাবে হয়, মাকু দিয়ে সুতার ঘর বদলসহ যাবতীয় শাড়িতে কিসের মোটিভ দিলে সুন্দর দেখতে হবে, সেটি ব্যবস্থা করেছিলেন, বাংলা ক্রাফটের মালেকা খান, পারভীন আহমদ [বিশিষ্ট নাট্যকার সাঈদ আহমদের স্ত্রী] এবং রুবী গজনবী এদের সঙ্গে আলাপ শেষে জামদানি, ঢাকাইয়া শাড়ির, এমনকি মিরপুরের বিহারিদের বেনারসি শাড়ি বিদেশে রফতানি করা হয়েছিল রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সহযোগিতায়। সেই আশির দশকেই মিরপুরের বেনারসিপল্লীর নাম পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস 'দেবদাস' ছায়াছবির জন্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার শাড়ি অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই ও মাধুরী দীক্ষিতের জন্য ঢাকা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন 'দেবদাস' ছায়াছবির প্রয়োজকের কর্মীরা, তবে সেটা এই শতকে। আশির দশকের পর থেকে ভারতীয় শাড়ির চাহিদা বাংলাদেশে লোপ পেতে শুরু করে। নিম্নমানের সুতার জন্য, মাসখানেক ব্যবহারের পরই ওই ভারতীয় শাড়িগুলো বিবর্ণ এবং ফেঁসে যেত। সেদিক থেকে বাজার পেয়ে গেল টাঙ্গাইলের পাথরাইল, নলসন্ধ্যা এলাকার বটা বসাক-মনি বসাকদের উন্নতমানের শাড়ি। দীর্ঘকাল ধরে প্রস্তুত করে আসছেন। কবি মাহমুদ কামাল আরও জানালেন, পাথরাইল ও নলসন্ধ্যায় নামকরা কারিগরদের পশ্চিমবঙ্গের তাঁতিরা দুর্গাপূজার মাস তিনেক আগেই টাঙ্গাইল থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে নিয়ে যান বারাসাত, চব্বিশ পরগনায়।

গত শতকের দেশভাগের অনেক আগেই ঢাকা শহরের বিখ্যাত শাড়ির দোকান ছিল পাটুয়াটুলীতে 'ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়'। দেশভাগের পর ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয় চলে যায় কলকাতার গড়িয়াহাটে। কলকাতায় যখনই আমরা স্বজনরা যাই দশ-পনেরো জন, তখনই সময় করে গড়িয়াহাটের আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ে গেলে, বস্ত্রালয়ের মালিক বিশিষ্ট গল্পকার অনুজ দাউদ হায়দারের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু সুনন্দ সাহা এবং ওই ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের সেলসম্যানদের বাড়ি সাভারের গ্রামে এবং কেরানীগঞ্জ-বিক্রমপুরের লোক হওয়ার সুবাদে সুনন্দ সাহার নির্দেশ আছে দাম কম রাখতে আমাদের কাছ থেকে। আমার আপন বোনের ছেলের বিয়েতে ওই দোকান থেকে কয়েকটি বিয়ের শাড়ি আমার ভাইবোন মিলেই কিনেছিলেন। কাতান, বেনারসি, বিয়ের শাড়ি মিলিয়ে মাত্র ভারতীয় মূল্য নিয়েছিল ৫২ হাজার রুপি। অথচ ঢাকার মৌচাকে ওই পাঁচটি শাড়ির দাম হেঁকেছিল এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশের শাড়ি ক্রেতাদের জন্য সুনন্দদা থাকলে, আবার নাও থাকলেও অন্তত-চা, বিস্কুট মিলবেই কলকাতার গড়িয়াহাটের আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ে। আমাদের দেশে শিশুরা শাড়ি পরতে পছন্দ করে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে, কাজী নাজির উদ্দিনের ছেলেরা চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে বানিয়েছিলেন পাবনা স্টোর, খুলনা নিউমার্কেটে ছিল পাবনা স্টোর এবং ঢাকা স্টেডিয়ামের নিচতলায় ছিল পাবনা স্টোর এবং পাবনা এম্পোরিয়াম। পাবনা স্টোরের ঢাকা স্টেডিয়ামের ২৪ নম্বর দোকানের মালিক ছিলেন আলহাজ কাজী আশরাফ হোসেন। তিনি স্বল্প শিক্ষিত হলেও পাবনা শহরের পূর্ব-উত্তরের শিবপুর নামক গ্রামে একটি হাইস্কুল, মাদ্রাসা দিয়েছিলেন গত শতকের ষাটের দিকে। স্কুলটির নাম কাজী আশরাফ হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়, দশম শ্রেণি পর্যন্ত। কাজী সাহেবের একমাত্র শ্যালক আবুল কালাম আজাদ, তিনি ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ভগ্নিপতির সহায়তায় ভর্তি হয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে। মাধ্যমিক পাস করার পর তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন পাবনা স্টোরের। সে সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যখন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসতেন, তার পরিবার এবং গওহর আইয়ুবসহ সিন্ধু প্রদেশ থেকে বেলুচিস্তান থেকে শিল্পপতিরা ঢাকায় এলেই শাড়ি কিনতেন স্টেডিয়ামের পাবনা স্টোর থেকে। এমনকি পাকিস্তানের কালাবাসের নবাব পরিবার এবং ঢাকার সল্ফ্ভ্রান্ত ধনী পরিবারের একমাত্র শাড়ি কেনার জায়গা ছিল ওই কাজী আশরাফ হোসেনের পাবনা স্টোর থেকে। তৎকালীন জিন্নাহ এভিনিউতে 'আবরণী' নামে আরও একটি শাড়ির সল্ফ্ভ্রান্ত দোকান থাকলেও দেশি-বিদেশি-কূটনীতিবিদ-নেপালের নিহত রাজা-রানী, পশ্চিম পাকিস্তানের সিনেমার অভিনেত্রীরা ঢাকায় এলেই পাবনা স্টোর থেকে সকলেই শাড়ি কিনতেন সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৬০ টাকার ভেতরে। কাজী আশরাফ হোসেন ও আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে আমার পাবনাবাসী হিসেবে পরিচয় থাকার সুবাদে কাজী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার দোকানের সর্বোচ্চ বিক্রি একদিনে কত টাকা হয়েছিল। তিনি হেসে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানি রুপিতে মাত্র ২৭-২৮ হাজার টাকা। সেটি মধ্য ষাটের একদিনের বিক্রির হিসাব তিনি এবং কালাম দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের ঋতুভিত্তিক শাড়ি, যেমন বসন্তের শাড়ি হলুদ রঙের হতেই হবে। বৈশাখের শাড়ি, একুশে ফেব্রুয়ারির শাড়িগুলোতে বর্ণমালা থাকায় তরুণীদের দেখতে মন্দ লাগে না এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ছায়ানটের রমনায় বটমূলের অনুষ্ঠানে নানা রঙের শাড়ি দেখতে পেতাম, যখন পড়াশোনা করতাম। কবিগুরুর জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে ঠাকুরের গানের বাণীসংবলিত শাড়ি সবকিছুই বাঙালি সংস্কৃতির ধারক-বাহক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিগত অনেক বছর তাঁতের শাড়িতেই দেখলাম। অন্যদিকে বর্তমানের জাতীয়তাবাদী দলের সভানেত্রীকে দেখছি শিফন শাড়িতে।

আমাদের টাঙ্গাইলের বটা বসাক, মনি বসাকের চাহিদা দেশের বাইরেও রয়েছে। বাজিতপুরের হাটে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় টাঙ্গাইলের বসাকদের শাড়ি। যেহেতু মোহিনী মিল, চিত্তরঞ্জন কটন মিল নেই। এমনকি পাবনায় তাঁতের শাড়ি সেই আগের মতো বাজারে বিকোয় না, তার পরিবর্তে পাবনার লুঙ্গি ও গামছার চাহিদা আছে সমগ্র বাংলাদেশে। শোনা যায়, সুচিত্রা সেনের বাড়ি যেহেতু পাবনা শহরে, একদা তিনি কলকাতায় যাওয়ার পরও তার নিকটাত্মীয় যারা তখনও পাবনার হেম সাগর লেনের বাড়িতে ছিলেন ১৯৫৪ সালের আগ পর্যন্ত, তারা সুচিত্রা সেনের জন্য পাবনার দোগাছীর শাড়ি নিয়ে যেতেন কলকাতায়। ডুরে শাড়ি, পাছা পেড়ে শাড়ি সবই তৈরি হতো পাবনায়। অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, রোমানদের পরিধেয় লাল রঙের চাদর থেকে শাড়ির প্রচলন, যুদ্ধক্ষেত্রে রোমানরা শক্ত বর্মের ওপর ওই লাল চাদরে শরীর ঢেকে যুদ্ধে যেতেন।

রবীন্দ্রনাথের 'হঠাৎ দেখা' কবিতায় প্রকটভাবে শাড়ির বর্ণনা আছে। কবিতার নায়িকার শাড়িটি ছিল লাল রঙের এবং দালিম ফুলের মতো রাঙা। আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, আঁচল তুলেছে মাথায়... এবং 'বাঁশি' কবিতায় ঢাকার ধলেশ্বরী নদীতীরে পিসিদের গ্রাম- বেশ কয়েক চরণ পরেই কবি জানিয়েছেন, যে মেয়েটির সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল, সেই মেয়েটির পরনে ঢাকাই শাড়ি ছিল। 'বাঁশি' কবিতাটির শেষে এসে পাঠকমাত্রই দেখতে পান ঢাকাই শাড়ির উল্লেখ। কাজী নজরুলও লিখেছেন, নীলাম্বরী শাড়ি পরে কে যায়! প্রথম জীবনে, আমার ভালো লাগার দিনে মুমুকে যেদিন দেখলাম পহেলা বৈশাখের রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, সেদিন আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। মুমুর পরিধানে ছিল ধূসর ছাইরঙের টাঙ্গাইলের একটি শাড়ি। সেদিন শুধু আমার দৃষ্টিই আকর্ষণ করেনি মুমু, করেছিল আরও অনেকের। সেই মুমু ভুলে গিয়েছে আমাকে, মানে-অভিমানে। যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন যে ভদ্রলোকের সঙ্গে, তিনি কবিদের নাম শুনলেই নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে যেতেন। হয়তো মুমু কোনোদিন তার স্বামীকে বলেছিলেন কবিদের কথা। কিংবা বলেন নাই আমার নাম। মুমু যেদিন লাল শাড়ি পরে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে, সেদিন আমি বুঝতে পারিনি শাড়ি পরলে মুমু এবং মুমুকে ভালো লেগেছিল কেন। আশা করি, যুক্তরাজ্যে ওরা দু'জনাই ভালো আছেন, ধূসর শাড়ি এবং লাল শাড়ি দীর্ঘজীবন হোক। তবে শাড়ির দোকান যে শুধু বসাকদেরই ছিল বা কাজীদেরই ছিল, সেই ভাবনা বাইরে রেখে বলা যেতে পারে, দেশীয় শিল্পের উন্নতির জন্য স্বদেশি দ্রব্যের দোকান ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সেই স্বদেশি দ্রব্যের দোকান প্রথম খুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্গের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছাও ছিল। দোকানদার রবি বাবু। দোকানটির নাম দিয়েছিলেন 'স্বদেশী ভাণ্ডার'। সময়কাল ছিল ১৮৯৭। আগেই বলেছি ঋতুভিত্তিক শাড়ির কথা। এখন শরৎকাল, সামনেই দুর্গাপূজা। সেই পূজামণ্ডপে গেলে দেখা যাবে নীল সাদায় শরৎ শাড়ি। শাড়ি দিয়ে অনেক সময় দাম্পত্য কলহের শেষ পরিণতি আমরা দেখতে পাই। শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। স্ত্রী, পুত্রকন্যার মায়া ত্যাগ করেই। যেহেতু স্বামী বা শাশুড়ি-ননদের অত্যাচারেই ওই পথ বেছে নেন অনেকেই। এই প্রবণতাটা বৃহত্তর যশোরেই বেশি। শাড়ি যে শোভমানা, বলার অপেক্ষা রাখে না মুমু বা মুমুর মতো সুশ্রী হলে কিংবা না হলেও, শাড়িই বাঙালি রমণীদের জন্য আশীর্বাদ।

পরবর্তী খবর পড়ুন : শাড়ির গল্প

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীক ছেড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা ...

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ...

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

বিএনপি ভোটে না এলে ১০০ আসন ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ- ...

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নতুন নয়। বিশেষত উপমহাদেশে এই ...

সুফি গান আমার কাছে ঈশ্বরবন্দনার মতো

সুফি গান আমার কাছে ঈশ্বরবন্দনার মতো

'সঙ্গীতের আলাদা কোনো ভাষা নেই। কোনো মানচিত্রের মধ্যেও একে বন্দি ...

কুলাউড়ার সাবেক তিন এমপির ডিগবাজি

কুলাউড়ার সাবেক তিন এমপির ডিগবাজি

নির্বাচন দুয়ারে। মনোনয়ন নিশ্চিতে চলছে দল ও জোট বদলের মৌসুম। ...

হৃদয় ছুঁয়েছে 'হাসিনা :অ্যা ডটার'স টেল'

হৃদয় ছুঁয়েছে 'হাসিনা :অ্যা ডটার'স টেল'

কেউ রাজনীতি পছন্দ করুক, আর না করুক- 'হাসিনা :অ্যা ডটার'স ...

ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া গ্রেফতার করবে না পুলিশ: মনিরুল

ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া গ্রেফতার করবে না পুলিশ: মনিরুল

ফৌজদারি অপরাধে জড়িত না হলে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কাউকে পুলিশ ...