সমকাল-সীড-এইচএসবিসি গোলটেবিল বৈঠক

করুণা নয়, কাজ পাওয়া প্রতিবন্ধীদের অধিকার

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০১৮      

সমকাল প্রতিবেদক

'আমরা কি মানুষ না? আমাদের কেন কাজ দেওয়া হবে না? যখনই যেখানে কাজ চাইতে চাই, প্রতিবন্ধী বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের অবশ্যই কাজ দিতে হবে। আমরা সরকারি চাকরি চাই।'

এ দাবি প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ সানজিদ হোসেনের। দীর্ঘদিন তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন একটি কাজের আশায়। অথচ প্রতিবন্ধী বলে কেউই তাকে চাকরি দেয়নি। রাস্তায় চলতে গিয়ে প্রতিনিয়তই অপমান-অপদস্থ হচ্ছেন। শিকার হয়েছেন মারধরেরও। গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁও সমকাল কার্যালয়ে 'নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি :কাজের সুযোগ ও উপযোগী পরিবেশ' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন তিনি। ওই অনুষ্ঠানে তখন অন্তত ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রতিনিধি হয়েই এ বক্তব্য তুলে ধরেন সানজিদ। একই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, কাজ পাওয়া প্রতিবন্ধীদের অধিকার। তারা কারও করুণা চায় না। তাদের অবশ্যই কাজ দিতে হবে।

সোসাইটি ফর এডুকেশন অ্যান্ড ইনক্লুশন অব দ্য ডিজঅ্যাবল্ড (সীড), সমকাল ও এইচএসবিসির যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া। সীডের নির্বাহী পরিচালক দিলারা সাত্তার মিতুর সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য দেন নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের চেয়ারপারসন প্রফেসর ডা. মো. গোলাম রাব্বানী, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী চৌধুরী, সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ইউআইইউর ডিজঅ্যাবিলিটি টেকনোলজি স্পেশালিস্ট ড. খন্দকার এ. মামুন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজরানা ইয়াসমিন হীরা, ব্লাস্টের রিসার্চ স্পেশালিস্ট

অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সিদ্দিকী, আন্ডারপ্রিভিলেজড চিলড্রেনস এডুকেশনাল প্রোগ্রামস (ইউসেপ) ডিপার্টমেন্ট অব প্রোগ্রামসের স্পেশালিস্ট (স্কিল) সুরাইয়া আক্তার, সীডের স্কুল ইনচার্জ ও সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট সোহেলী পারভীন, কৃষ্টি কালচারাল সেন্টারের সোহাগ শেখ প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাজের জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য পৃথক ক্যাটাগরি করতে হবে। তারা কে কোন কাজ করতে পারবে, তার একটি নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করতে হবে। যাতে কাজের সন্ধানে গিয়ে নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভাইভা বোর্ড থেকে তাদের ফিরে আসতে না হয়। তিনি বলেন, অভিযোগ করা খুব সহজ, কিন্তু অভিযোগকে দূরীভূত করা খুব কঠিন। 'প্রতিবন্ধী' শব্দটা খুব অপ্রিয়, আভিধানিকভাবে 'প্রতিবন্ধী' শব্দটা পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। আমরা এখন তাদের বলি 'বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী'। এখন সময় পাল্টাচ্ছে। এই জনগোষ্ঠী এরই মধ্যে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ করেছে। যার বড় উদাহরণ বিশেষ অলিম্পিক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু সরকার নয়, এ ব্যাপারে দেশের সর্বস্তরের মানুষকেই কাজ করতে হবে। নিজে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকে সচেতন করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম রব্বানী বলেন, ১০টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব উন্নত দেশগুলোর মতো করেই কাজের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কাজের জায়গায় গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানা বাধার সম্মুখীন হন। ব্রিটিশ সময়ে করা কিছু আইনে অনেক অসংগতি রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বার্থে এসব আইন সংশোধন করতে হবে। নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট এখনও নবজাতক। সবার সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত যদি আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দিকে প্রসারিত করতে না পারি, তাহলে প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সকলকেই এ অবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে হবে। সমকাল সব সময় প্রতিবন্ধীবান্ধব এবং ভবিষ্যতেও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করে যাবে বলে তিনি জানান।

রুপালী চৌধুরী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মানবিক হতে হবে। অন্তরটাকে বৃহৎ করতে হবে। তার মতে, আমরা কেউই স্বাভাবিক নই। শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চেয়ে একটু চালাক। তিনি বলেন, বিভিন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারের দিকনির্দেশনা জরুরি। যেন সব ভবনেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা মাথায় রেখে শৌচাগার নির্মাণ করা হয়। এই মানুষগুলোর সুরক্ষায় তিনি সচেতনতা ও ভালোবাসা তৈরির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন।

দিলারা সাত্তার মিতু বলেন, সরকার আইন করেছে। কিন্তু সরকারকে এই আইনের দেখভাল করা জরুরি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু চাকরি দিলেই হবে না। তাদের চাকরি করার পরিবেশও তৈরি করে দিতে হবে। সবার আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে শুরু করি, তবেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব হবে। বর্তমান সময়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে যা কিছু হচ্ছে, সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যই হচ্ছে। সরকার সহযোগিতা করছে বলেই বেসরকারি সংস্থাগুলো এ ক্ষেত্রে নানা কাজ করে যাচ্ছে।

রেজাউল মাকছুদ জাহেদী বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে সরকারের টার্গেট আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে অন্তত তিন হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাকরি নিশ্চিত করা। তাই তাদের দক্ষ, যোগ্য ও সক্ষম করে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০১৫ সালে ৩২ জন প্রতিবন্ধী, ২০১৬ সালে সাতজন, ২০১৭ সালে ১১৫ জন ও ২০১৮ সালে ১৭৬ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়া হয়।

ড. খন্দকার এ. মামুন বলেন, দুই বছর ধরে একটি 'অ্যাপ্লিকেশন' নিয়ে কাজ করছি- অটিজম অ্যান্ড এনডিসি। অটিজমের ২৫ শতাংশ শিশু কথা বলতে পারে না। অনেকের কথা বলতে দেরি হয়। অনেক 'অটিজম' শিশু তাদের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না বলে উগ্র আচরণ করে। এদের টেকনোলজি সাপোর্ট দেওয়া হলে দ্রুতই অবস্থার পরিবর্তন হয়। টেকনোলজিক্যাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করে প্রতিবন্ধী তরুণদেরও বিভিন্ন জায়গায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সীডের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এ কে এম বদরুল হক। তিনি বলেন, সব প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তি বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল (এনডিডি) প্রতিবন্ধী, অর্থাৎ অটিস্টিক, সেরেব্রাল পালসি, ডাউনস সিনড্রোম ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান পরিবর্তন, অধিকার, নিরাপত্তা, সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং সমাজের দায়বদ্ধতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ২০০৩ সালে সীড যাত্রা শুরু করে। ২০০৪ সাল থেকে এইচএসবিসি সীডের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সীড এইচএসবিসির সহায়তায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারা বিদ্যালয় উপযোগী করে তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের কিশোর-যুবকদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়িত করছে।

সুরাইয়া আক্তার বলেন, করুণা নয়, প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে কাজ করতে হবে। কাজের সুবিধা শুধু রাজধানীতে নয়, মফস্বলেও প্রসারিত করতে হবে।

সোহেলী পারভীন বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে 'পারবে'- এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সীডের তত্ত্বাবধানে সাতজন প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। যোগ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে। তারা তাদের কাজ ঠিকমতো করেছে বলে জানান তিনি।

প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সোহাগ শেখ বলেন, দেখিয়ে দিলে ওরা যে নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে, তার অনেক প্রমাণই আমাদের কাছে রয়েছে।

গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়ার দাবি জানিয়ে নাজরানা ইয়াসমিন হীরা বলেন, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়া জরুরি।

পরবর্তী খবর পড়ুন : ছাতকে পিঠা উৎসব

ঐক্যের চাপে বিএনপি

ঐক্যের চাপে বিএনপি

সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে 'বৃহত্তর জাতীয় ...

কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

ধানমণ্ডিতে সুপরিসর একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ী আহাদুল ইসলাম। ...

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির বৃহস্পতিবারের সম্ভাব্য জনসভায় ২০ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে কৌশলগত ...

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্লাইটের এক কেবিন ক্রুর মাদক সেবন ও ...

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে অপতৎপরতা ...

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব ধারা-উপধারা বহাল ...

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

মিয়ানমার থেকে নানা কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে সারা ...

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

হুট করেই ইমরুল কায়েস এশিয়া কাপের দলে ডাক পান। এরপর ...