ইতিহাসে আরও একটি কালো দিন

২১ আগস্ট

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৮      

ড. মোহিত উল আলম

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক মর্মন্তুদ ঘটনার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। কোনো কোনোটি গভীরভাবে মনে দাগ কেটে আছে এবং ভয়ঙ্কর শিহরণও জাগায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম গ্রেনেড ও বোমা হামলা পরিচালিত হয়েছিল। হামলায় হতাহতের যে চিত্র দেখা গিয়েছিল, তা মানবসভ্যতার আরেক কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৫ আগস্টের পর ২১ আগস্ট হলো বিভীষিকাময় কলঙ্কজনক দিন। লক্ষ্য ছিল, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তখনই অভিযোগ উঠেছিল, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের বলবানদের চক্রান্তে ঘৃণ্য শক্তি ওই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল। এই নারকীয় কর্মকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পৈশাচিক রূপ। এ দেশের ইতিহাসে ২১ আগস্ট কালো দিন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পর ইতিমধ্যে ১৩ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আজ এর ১৪ বছর পূর্ণ হলো। এই ১৪ বছরে বহু রকম নেতিবাচক ঘটনা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে, যা সঙ্গত কারণেই বাড়িয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রাও। আমরা কখনও কখনও বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন তুলেছি- এসব কী হচ্ছে, কোনদিকে যাচ্ছে দেশ! এসব প্রশ্ন ওঠার পেছনে সঙ্গত কারণও ছিল, যে কারণগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সৃষ্ট রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা। আমাদের রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। ২১ আগস্ট এমনই একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার দিন। আমরা স্বাধীনতা-উত্তর প্রত্যাশা করেছিলাম সব রকম নেতিবাচকতা থেকে মুক্ত থাকতে পারব। সব অপশক্তির কবর রচনা হয়ে গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে আমাদের সব স্বপ্ন পূরণ করে। কিন্তু আমাদের এই আশা প্রথম হোঁচট খেল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে রচিত হলো কলঙ্কিত অধ্যায়। তারপর আরও কত কিছুই না ঘটল। ওইসব মর্মান্তিক ঘটনাবলিরই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হলো ২১ আগস্ট, ইতিহাসের আরও একটি কালো দিন।

দীর্ঘ প্রতিকূলতা ও নাটকীয়তার পর এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে গতকালের সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এটুকু জানতে পেরে স্বস্তিবোধ করছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর সেদিন পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিল। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলেও তা নেয়নি পুলিশ। এমনকি এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকেই অভিযুক্ত করে বক্তৃতা-বিবৃতিও দিয়েছিলেন বিএনপির নেতারা। পুলিশের দায়ের করা মামলা ভিন্ন খাতে নিতে নীতিনির্ধারকরা একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করেন- এই অভিযোগও তখন পুষ্ট রূপ নিয়েছিল। আমাদের মনে আছে, পার্থ সাহা নামে এক নিরীহ যুবককে আটক করে নির্মম, নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। জজ মিয়াকে নিয়ে নাটক হলো। এই জজ মিয়াও একজন সাধারণ মানুষ, যাকে চক্রান্তের শিকার হয়ে জীবনী শক্তি হারাতে হয়েছে। তারপর আরও কত কিছু। সবই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলার পুনঃতদন্ত শুরু হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক কিছুই মানুষ জানতে শুরু করে নতুনভাবে। এও জানা যায়, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে এ হামলার যে ছক কষা হয়েছিল, এর শিকড় ছিল অনেক গভীরে প্রোথিত। আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহারের বিষয়টি এই অধ্যায়েও নতুন রহস্যের সৃষ্টি করে। এমন ধরনের গ্রেনেড কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের হাতে কোনো রকম উচ্চ মহলের সহযোগিতা ছাড়া পৌঁছা সম্ভব ছিল না। বিএনপি সরকারের আমলে এ মামলাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে জঘন্য সব তৎপরতা চালানো হয়। মানুষের যে যুগ-যুগান্তরের দাবি, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এ ক্ষেত্রে নতুন প্রহসন লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিটের পর শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া।

আইনের শাসনে বিশ্বাসী যে কোনো নাগরিক এ জঘন্য হামলা ও হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচারের বরাবরই পক্ষে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কাম্য না হলেও অত্যন্ত কৌশলে তাই তো হয়েছিল। আইন ও ক্ষমতার অপ্রয়োগ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা এ দেশে কতটা জঘন্য লিখিত-অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছিল এটাও এরই একটা দৃষ্টান্ত। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না- এমনটি আইন পাস করে সিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সত্যের পরাজয় ঘটতে পারেই না। সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংগঠিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেদিন কোনো শোক প্রস্তাবও জাতীয় সংসদে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ শোক প্রস্তাব তুলতে দেওয়া হয়নি। কেন এমনটি হয়েছিল- এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অনেক উত্তরও। ওই গ্রেনেড হামলায় যে চারদলীয় জোটের ইন্ধন ছিল, এ ব্যাপারে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।

বর্বরোচিত ওই হত্যাযজ্ঞের কথা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। কোনো গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সভ্য দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে দিবালোকে জনসভায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাবা যায় না। বিস্ময়কর হয়ে ঠেকেছিল যে, গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর এলাকায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যরা হামলাকারীদের আটক করার ব্যাপারে কোনো চেষ্টাই চালাননি। শুধু তাই নয়, গ্রেনেড হামলার পর দ্রুত ঘটনার আলামত নষ্ট করার অপক্রিয়াও চালানো হয়েছিল। এসবই তখনকার পত্রপত্রিকাসহ অন্য গণমাধ্যম এর সাক্ষ্যবহ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য যারা এ জঘন্য অপরাধকে সমর্থন করেছিল, অপরাধে মদদ জুগিয়েছিল তারাও ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর ষড়যন্ত্র আর পৃষ্ঠপোষকতায় এর সঙ্গে জড়িত ছিল দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি)। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো বিভীষিকাময় হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করি যে, এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশে সৃষ্টি না হয়। আমাদের এই প্রত্যাশার পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন অপরাধের দৃষ্টান্তযোগ্য বিচার ও অপরাধীদের যথাযথ দণ্ড।

ওই হামলাটির তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রতীয়মান হয়, তৎকালীন ক্ষমতাসীন জোটের কিছু নেতা বাংলাদেশের মোড় ঘুরিয়ে পুনরায় পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পথ পরিস্কার করতে শেখ হাসিনাকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে পঙ্গু করে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতে চেয়েছিল। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যাচেষ্টা করা হলেও তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন প্রতিবার। অস্বীকার করার কোনোই উপায় কিংবা পথ নেই যে, শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতীক। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে ২১ বছর ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও শেখ হাসিনার উপস্থিতি ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বহ্নিশিখা আবার জ্বলতে শুরু করে তার গতিশীল নেতৃত্বে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। কিন্তু ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যেভাবে প্রকাশ্যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল, তা নজিরবিহীন। তবে আশার কথা এই, বাংলাদেশের শুভবোধসম্পন্ন মানুষরা এ ধরনের নিষ্ঠুরতা মেনে নেয়নি। তারা বরাবরই রুখে দাঁড়িয়েছে। আমরা খুব দ্রুত দেখতে চাই- ২১ আগস্ট হামলায় আহত ও নিহতদের স্বজনরা বিচার পেয়েছেন। ইতিমধ্যে যথেষ্ট বিলম্ব হয়েছে। এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন হোক- এটা আমাদের প্রত্যাশা। ঘাতকদের শাস্তি হোক। কেবল হামলা পরিচালনাকারীরাই নয়, এর নেপথ্যের শক্তিকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এত বড় অপরাধের যদি দৃষ্টান্তযোগ্য বিচার ও দণ্ড নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেশকে অপরাধমুক্ত করার সব রকম প্রচেষ্টা বিফলে যাবে। যদি হামলাকারী, চক্রান্তকারীদের কঠোর শাস্তি না হয়, তাহলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিনষ্ট করার অপক্রিয়ার চক্রান্ত চলতেই থাকবে। দূর হোক অন্ধকার। সব রকম নেতিবাচকতার নিরসন ঘটুক। অন্যায়-অবিচার পরাভূত হোক। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ূক আলো। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। রাজনীতি ফিরে আসুক সুস্থ ধারায়।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : খুশির ঈদ

নদী বিষয়ক বইমেলা উদ্বোধন

নদী বিষয়ক বইমেলা উদ্বোধন

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে তিন দিনব্যাপী নদী ...

'জাফর ইকবাল আমার গান ছাড়া অন্য কারো কণ্ঠে লিপ দিতে চাইতেন না'

'জাফর ইকবাল আমার গান ছাড়া অন্য কারো কণ্ঠে লিপ দিতে চাইতেন না'

লক্ষ কোটি তরুণের প্রিয় শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। সেই ১৯৮২ সালে ...

আমিরাতকে বড় ব্যবধানে হারাল মেয়েরা

আমিরাতকে বড় ব্যবধানে হারাল মেয়েরা

ছুটির দিনে গ্যালারিতে বসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের খেলা দেখছেন বেশ ...

মানুষ আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে: শাজাহান খান

মানুষ আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে: শাজাহান খান

নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, 'এবারের নির্বাচন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই ...

অটোরিকশায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে ৪ জনের মৃত্যু

অটোরিকশায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে ৪ জনের মৃত্যু

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় পল্লী বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে ...

সুলতান সুলেমানের পর এবার ‘জান্নাত’

সুলতান সুলেমানের পর এবার ‘জান্নাত’

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে বিদেশি সিরিয়াল গুলো বাংলা ডাবিং করে প্রচার ...

২ কর্মী হত্যায় ইউপিডিএফ দুষছে সংস্কারবাদী জেএসএসকে

২ কর্মী হত্যায় ইউপিডিএফ দুষছে সংস্কারবাদী জেএসএসকে

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় নিজেদের দুই কর্মীকে হত্যার তীব্র নিন্দা ও ...

গায়ের জ্বালা মেটাতে সিনহা মিথ্যা কথা লিখেছেন: আইনমন্ত্রী

গায়ের জ্বালা মেটাতে সিনহা মিথ্যা কথা লিখেছেন: আইনমন্ত্রী

আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ...