প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের সুযোগ

পরিবেশ-প্রতিবেশ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০১৮      

ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও নাজিম উদ্দিন

ইট-কাঠের নাগরিক সভ্যতার শহরগুলো থেকে দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ। কিন্তু মানুষ তার শিকড়কে সহজে ভুলতে পারে না। সবুজে ভরা গ্রামবাংলায় বেড়ে ওঠা নাগরিক সমাজের একটা অংশ সবুজকে ধরে রাখতে চায় নিজেদের আবাসস্থলে। শৌখিন মানুষরা তাদের ঘরবাড়িতে সবুজকে ধরে রাখার জন্য একান্ত নিজস্ব ভাবনা আর প্রচেষ্টায় আপন আপন বাড়ির ছাদে তৈরি করছে ছাদের বাগান। পাশাপাশি নাগরিক ব্যস্ততার যান্ত্রিক পীড়ন থেকে একটু প্রশান্তি পেতে কিংবা এক টুকরো সবুজ ছোঁয়ার আশায় বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় এখন অনেকেই করছেন শখের বাগান। নিজের একটু ইচ্ছা আর সামান্য শ্রম দিলেই কিন্তু আপনার বাড়ির ছাদ হয়ে উঠতে পারে একখণ্ড সবুজের আঙিনা। গ্রামের উর্বর মাটিতে যে ফুল, ফল কিংবা সবজি বাগান আমরা দেখে মুগ্ধ হই, আগ্রহ থাকলে তাকে তুলে আনা সম্ভব শহরের বহুতল ভবনের ছাদেও। নিজেদের হাতে ফলানো যেতে পারে বিষমুক্ত শাক-সবজি, ফলমূল। এভাবে মেটানো যেতে পারে আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা। সময়ের সঙ্গে এ বাগান এখন আর শৌখিনতায় আটকে নেই। নিরাপদ সবজি দিয়ে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ, পারিবারিক বিনোদন এবং অবসর কাটানোর এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে এ ছাদ বাগানগুলো। বাংলাদেশের শহুরে কৃষি ব্যবস্থার শৌখিন পদযাত্রা সময়ের বিবর্তনে এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী নগরায়ন বাড়ছে। ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন। ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

ঢাকা শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটের কাঠামো, যা মূলত শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ঢাকার পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি। অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ন, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে কমে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কেবল ছাদ বাগান স্থাপন করা হলে শহরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব এলাকায় ছাদ বাগান বা গাছের সংখ্যা বেশি সেসব এলাকার তাপমাত্রা অন্য এলাকার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম।

আমাদের শহরগুলোতে মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমে আসছে। ইট-কাঠের ভবনের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়ানো বহুতল ভবন। বিশেষ করে জানালায় কাচ ও বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা; কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গল্গাস। সূর্য থেকে তাপ ও আলো এ ধাতব ও কাচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়। এভাবে প্রতিফলনের দরুন সে নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহরজুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপ। ভবনে বা এর কাঠামোতে বাগান স্থাপন করা হলে বাগানের গাছের পৃষ্ঠদেশ এ তাপ শুষে নেয় এবং গাছের দেহ থেকে যে পানি জলীয় বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়, তা সে নির্দিষ্ট স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনে। অসংখ্য ছাদ বাগান বা শহুরের গাছপালা এ প্রক্রিয়ায় শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনে। ছাদ বাগানকে কেতাবি ভাষায় যেমন কোনো সংজ্ঞায় নির্ধারিত করা যায়নি, তেমনি এর কোনো সুনির্দিষ্ট মডেল এ দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। পাকা বাড়ির খালি ছাদে অথবা বারান্দাতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফুল, ফল, শাকসবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদ বাগান বলা হয়। বাড়ির মালিক তাদের আপন আপন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে আপন ভাবনায়, ভঙ্গিমায় সাজিয়ে তোলেন তাদের ছাদকে। এখানে টবে, বড় বড় ড্রাম কিংবা ট্রেতে রোপণ করা হয় নানা ফুল, ফল ও সবজি। কেউ কেউ আবার ছাদে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে তাতে গাছ রোপণ করেন। ছাদের আকার ও সহনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে নানা কাঠামোর ওপর স্থাপন করেন টব, মাচা। তবে এলোমেলো ও অপরিকল্পিত ছাদ বাগান কেবল সময়, অর্থ অপচয় করায় না। সেই সঙ্গে ভবনেরও নানা ক্ষতি করে। তাই কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে ছাদ বাগান গড়ে তোলা প্রয়োজন। ছাদে বাগান করার সময় প্রথমেই ছাদের আয়তন অনুসারে কাগজে-কলমে খসড়া ম্যাপ করে বিভিন্ন স্থাপনা ও ভবনের কলামগুলো চিহ্নিত করে নিতে হবে।

চাহিদা অনুসারে হাফ ড্রাম, সিমেন্ট বা মাটির টব, স্টিল বা পল্গাস্টিক ট্রে সংগ্রহ করতে হবে। অনেক সময় বসতবাড়ির ভাঙাচোরা বালতি, অব্যবহূত তেলের বোতলও ছোটখাটো গাছ রোপণের জন্য ব্যবহার করা হয়। ঠিকমতো উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এসব অব্যবহূত জিনিস বাগানে ব্যবহার করা গেলে এও হতে পারে এক নতুন নান্দনিকতা। ছাদের সুবিধামতো স্থানে স্থায়ী বেড (ছাদ ও বেডের মাঝে ফাঁকা রাখতে হবে) স্থাপন করা যেতে পারে। এসব বেডে মূলত সবজি, শাক চাষ করার পাশাপাশি চাইলে লাগানো যায় ফুলগাছ। স্থায়ী বেড বানাতে না চাইলে পুরনো চৌবাচ্চা বা জাহাজের লাইফ বোট রাখার বয়ার খোলও অনেক জায়গায় বেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের ঢাকা শহরে যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৯ হাজার ৪৪৭ জন মানুষ বাস করেন, সেখানে দুই-তিন বা পাঁচ হাজার বর্গফুটের বাড়ির ছাদগুলো তালাবদ্ধ করে ফেলে রাখা সত্যি বিলাসিতা। জার্মানিসহ গোটা ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ যেখানে জনসংখ্যার নেগেটিভ আয়তন অনেক বড়, সেখানে শুধু ছাদেই নয়, জানালার কোনা থেকে শুরু করে বাড়ির দেয়াল কোথাও বাকি নেই, যেখানে তারা গাছ লাগায় না। স্কুলের বাচ্চা থেকে শুরু করে বুড়োবুড়ি সবাই প্রকৃতিপ্রেমী। সেখানে ৮০-৯০ বছরের বয়স্ক পুরুষ-নারীও সারাদিন বাগানে কাজ করে গাছের পরিচর্যা করেন। ছাদ বাগান আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হওয়ার একটি সুযোগ করে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো মানুষের সভ্যতায় থিতু হওয়ার সময় মহাকালের হিসাবে অতি নগণ্য। পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা মানুষের কিছু অভিযোজিত ক্ষমতা এখনও আমাদের মাঝে বিরাজমান। যে কোনো রঙের তুলনায় আমাদের চোখে সবুজ রঙের পার্থক্যটা বেশি ধরার কারণও এই অভিযোজনের ফল বলে অনেকেই ধারণা করেন। তাই নানা প্রকার সবুজের সমারোহ দেখে আমরা প্রফুলল্গ হয়ে উঠি। অসংখ্য শেডের সবুজ রঙ আমাদের একঘেয়েমিতে আক্রান্ত করে না। যান্ত্রিক জীবনে ছাদ বাগানের ছোট সবুজ উদ্যান আমাদের সতেজ রাখতে সহায়তা করে। গড়ে তোলে নির্মল পরিবেশ। ছাদ না পেলে বারান্দাতেই গড়ে তুলুন আপন উদ্যান। সুতরাং জোরদারভাবে এখন থেকে শুরু হোক সবুজের আন্দোলন। সেটা নিজের শোবার ঘর আর প্রতিটি বাড়ির বন্ধ ছাদ থেকে। নিজের আর নিজের সন্তানের সুস্থভাবে শ্বাস নেওয়ার প্রতিজ্ঞায়। এর সঠিক বাস্তবায়নে সরকারের যথাযথ নীতিমালা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রয়েছে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে রয়েছে গণমাধ্যমগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক ও গবেষণা শিক্ষার্থী
kamrul_sub@hotmail.com

শ্রীনগরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত

শ্রীনগরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মো. তাজেল (৩৫) নামে এক ...

খাঁটি দুধ চেনার ঘরোয়া উপায়

খাঁটি দুধ চেনার ঘরোয়া উপায়

ভেজাল দুধের ভিড়ে খাঁটি দুধ চেনা যেন দুষ্কর। কোথাও দুধে ...

নেইমারের গোলে উরুগুয়েকে হারাল ব্রাজিল

নেইমারের গোলে উরুগুয়েকে হারাল ব্রাজিল

ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে পেনাল্টি। না হলে আসল ব্যবধান ব্রাজিলের ...

মেক্সিকোর বিপক্ষে সহজ জয় আর্জেন্টিনার

মেক্সিকোর বিপক্ষে সহজ জয় আর্জেন্টিনার

ম্যাচের তখন দুই মিনিট। বার কাঁপানো এক শট নেয় মেক্সিকো। ...

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীক ছেড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা ...

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ...

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

বিএনপি ভোটে না এলে ১০০ আসন ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ- ...

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নতুন নয়। বিশেষত উপমহাদেশে এই ...