বিএনপির চার দশক

ফিরে দেখা

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

রিয়াজউদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির চার দশক পূর্ণ হচ্ছে আজ ১ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৮ সালে এ দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে। এর তিন বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিয়োগান্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়। রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। ক্ষমতায় আসীন হন খোন্দকার মোশতাক আহমদ, যিনি সামরিক ফরমান বলে দেশের একক রাজনৈতিক দল বাকশাল বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু তিনি মাত্র ৮১ দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেন। সে বছরেরই নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তার পরিবেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভাব সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের। দেশের শাসনভার তখন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের হাতে ন্যস্ত, কিন্তু দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তা পূরণ করায় জিয়াউর রহমানই যে সবচেয়ে উপযুক্ত সে বিষয়ে জনমনে সামান্যই সংশয় ছিল।

১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরের বছর প্রত্যক্ষ ভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল অংশগ্রহণ করে, যার মধ্য দিয়ে দেশটি ফের বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসে। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হন- গঠিত হয় বিএনপি। সে সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত রাজনৈতিক দল বলতে ছিল কেবল আওয়ামী লীগ। কিন্তু একটি বিকল্প রাজনৈতিক দল গড়ে উঠুক, যার দর্শন হবে আওয়ামী লীগের তুলনায় ভিন্ন, এমন প্রত্যাশা বিভিন্ন মহলে ছিল। এমন একটি দল গঠিত হলে রাজনৈতিক শূন্যতা যেমন পূরণ হবে, তেমনি স্বাধীনতার পর থেকে দেশে একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের যে প্রাধান্য ছিল তাতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সন্দেহ নেই, বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিল এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালে। দল গঠনের প্রক্রিয়ায় এবং পরের কয়েকটি বছর ক্ষমতার সুবিধা তিনি কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, বিএনপি শুরু থেকেই জনগণের সাড়া পেয়েছে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তারই সাক্ষ্য দেয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, কমিউনিস্ট পার্টি, মুসলিম লীগ, সাম্যবাদী দলসহ অনেক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপির বাইরেও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা নির্বাচিত হন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য যা অপরিহার্য।

কিন্তু ১৯৮১ সালের মে মাসে ফের রাজনৈতিক অঙ্গনে কালো ছায়া। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে সেনাবাহিনী প্রধান এইচ এম এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে অপসারণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে আসীন হন। বিএনপির জন্য সৃষ্টি হয় সংকট। দলটি টিকে থাকবে কি-না, এ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। দলের নেতৃত্বভার কার ওপর অর্পিত হবে, সে প্রশ্নে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিচারপতি আবদুস সাত্তার নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। তবে তারও কিছু সমর্থক ছিল। আরেকটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে কেন্দ্র করে। এমন প্রেক্ষাপটেই জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আসেন। বলা যায়, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই তাকে এই বড় দলটির নেতৃত্ব গ্রহণে সম্মত করান। রাজনৈতিক দল পরিচালনায় তার অভিজ্ঞতা ছিল না। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞাবলে তিনি দ্রুতই সবকিছু সামলে নিতে শুরু করেন। আশির দশকের প্রায় গোটা সময়কালে এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। তার নির্দেশনায় দলীয়ভাবে নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকেন। জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা দেখাতে পারেন। এটা বিশেষভাবে আমরা দেখি ১৯৮৬ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে গেলেও তিনি সামরিক শাসকের অধীনে নির্বাচনে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এ আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপিকে ভাঙার অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তিনি দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। দলের কর্মী-সমর্থকদের অকুণ্ঠ সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তার দলের সাংগঠনিক ভিত তেমন জোরদার ছিল না। কিন্তু জনসমর্থন ছিল ব্যাপক। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি জয়ী হবে, এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে অনেকেরই ছিল না। কিন্তু জনগণ তাকে বিপুলভাবে জয়ী করেছে। তবে এ সময়ে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকে। আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামী ও এইচ এম এরশাদের দল জাতীয় পার্টিকে সঙ্গী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় হয়। বিএনপি নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। অনেকের ধারণা, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বিএনপির নেতৃত্ব একগুঁয়েমি প্রদর্শন করে, যার পরিণতি দলের জন্য ভালো হয়নি। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পরাজয়ের জন্য এ ধরনের অদূরদর্শিতা দায়ী বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া হাল ছাড়েননি। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ফের ক্ষমতায় ফিরে আসে। এ নির্বাচনের সাফল্যের পেছনেও দলের সাংগঠনিক শক্তি নয়, বরং মুখ্য ভূমিকা হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি দলটির জনভিত্তিকে। তবে বেগম খালেদা জিয়ার এবারের শাসনামলে সুশাসনের অভাব দেখা দিতে থাকে। দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগও বেশি বেশি উঠতে থাকে। এটা ঘটেছে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু পরিণতিতে রাজনৈতিক সংকট জোরালো হতে থাকে। আওয়ামী লীগ রাজপথে সক্রিয় হয়। তাদের নেতৃত্বে ১৪ দল ও মহাজোট গঠিত হয়। লগি-বৈঠকের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট, যা ক্ষমতা থেকে ছিটকে দেয় বিএনপিকে। বিএনপির জন্য তৈরি হয় নতুন সংকটের। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ দলের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে যান। এ সময়ে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা পরাজিত হয়। নতুন পরিস্থিতি যে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, সেটা তারা সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারছিল না। এ সময়ে তারা আরেকটি গুরুতর ভুল করে- ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট। সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যে তারা রাজপথে একের পর এক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিতে থাকে। কিন্তু জনগণের তরফে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলে না। দলের নেতাকর্মীরাও তেমন সক্রিয়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়।

২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমতা সংহত করতে পারে। এ সময়ে তারা বিএনপির ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে, অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা-হামলা এমনকি তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব এ ধরনের জটিল ও কঠিন পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার উপযুক্ত কৌশল উদ্ভাবন করতে পারছে না, এমন ধারণা বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে।

মাস চারেকের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মাসখানেকের মধ্যেই গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। অথচ দলের চেয়ারপারসন জেলে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট। বিএনপি সংসদের বাইরে। নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে গঠিত হবে, সে বিষয়ে দলটির যেসব প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে উত্থাপন করা হয়েছে, তা গ্রহণে সরকারের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তাহলে বিএনপি কী করবে? বারবার ক্ষমতায় যাওয়া দলটির বিপুল জনসমর্থন রয়েছে। অথচ প্রায় এক যুগ তারা ক্ষমতার বাইরে। এ পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দলটি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, বেগম খালেদা জিয়া যদি জেল থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের কাছে যেতে পারেন তাহলে যত প্রতিকূল পরিস্থিতিই হোক, বিএনপি নিজের অবস্থান সংহত করতে পারবে। এ অবস্থায় কোনো ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত হওয়া নয়, বরং নেতৃত্বকে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সাবধানতার সঙ্গে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের কোনো প্রশ্নই আসে না। গণতান্ত্রিক ধারাতেই তাদের রাজনীতি করতে হবে। আওয়ামী লীগ তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেই বিএনপির জন্য বড় বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, সামনে আরও দেবে। সেটা মোকাবেলা করেই তাদের পথ চলতে হবে, টিকে থাকতে হবে। সন্দেহ নেই, চার দশক আগে প্রতিষ্ঠিত দলটি এখন সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। কিন্তু ভরসার জায়গাও যে আছে- বিপুল জনসমর্থন নিয়েই বিএনপি আজ পা রাখছে ৪১ বছরে।

সাবেক সম্পাদক, নিউজ টুডে
সৌম্য থাকছেন একাদশে

সৌম্য থাকছেন একাদশে

সৌম্য সরকার কি খেলছেন? ওপেনিংয়ে কে কে খেলবেন? আফগানিস্তান ম্যাচের ...

ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ৪৯

ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ৪৯

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে ৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে ...

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান ...

মুন্সীগঞ্জে ‌‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

মুন্সীগঞ্জে ‌‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

মুন্সীগঞ্জে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আব্দুল মালেক (৪৫) নামে এক ব্যক্তি ...

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারত 'বধ' করেই ফেলেছিল আফগানিস্তান। কিন্তু ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত টাই ...

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এবার ...

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে রাজধানীতে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ওইদিন ...

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে রাশিয়ার জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং দ্বিপক্ষীয় ...