বিশ্ববাজারে বাড়তি হিস্যা পেতে

চামড়া শিল্প

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

আবু আফজাল মোহা. সালেহ 

রফতানি পণ্য তালিকা প্রণয়ন করতে গেলে পাট ও চায়ের পর অনিবার্যভাবে যে পণ্যটির নাম চলে আসত, তা হলো চামড়া। তবে আমাদের চামড়া খাত বাজার ধরতে পারছে না। পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের ট্যানারিকে বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) মানসনদ দিচ্ছে না। বিশ্বের ৬৬টি বড় ব্র্যান্ড এর সদস্য। এলডব্লিউজি মানসনদহীন ট্যানারি থেকে তারা চামড়া কেনে না। পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় সনদের ক্ষেত্রে। বিশ্বের ৪৪০টি কারখানা এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৪২টি গোল্ড সনদ। ভারত ১০৫টি, চীন ৭৫টি, ব্রাজিল ৬৩টি, ইতালি ২৬টি, ভিয়েতনাম ১৪টি, পাকিস্তান ৩টি ও বাংলাদেশ একটি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয় ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের সার্বিক রফতানি আয় কমেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বৃদ্ধির প্রবণতার পর গত বছরই এ খাতে রফতানি আয় কমেছে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের রফতানি আয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বর্তমানে রফতানি বাণিজ্যে যেসব পণ্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, সেগুলো পুরোপুরি স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর নয়। অথচ রফতানি বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আমাদের অবশ্যই স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক অধিক মূল্য সংযোজনকারী পণ্য রফতানিতে মনোযোগী হতে হবে। চামড়া খাতের বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) নিরীক্ষিত কারখানার সংখ্যা বাংলাদেশে মাত্র একটি। ২০১৫ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজির নিরীক্ষায় সেরা মান অর্থাৎ গোল্ড কারখানার মর্যাদা পায়। এখন পর্যন্ত এপেক্স ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো কারখানা এলডব্লিউজির সনদ পায়নি। তবে বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশ্নেষকরা। বিশ্ববাজারে চামড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে তৈরি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের চামড়াজাত পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। 'ফরাসিদের ফ্রেঞ্চ কাফে'র পর মানের দিক থেকে বাংলাদেশের চামড়াই বিশ্বের সেরা বলে মনে করেন চামড়া বিশেষজ্ঞরা। এ রকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না।

রফতানি বাণিজ্য এখনও স্বল্পসংখ্যক দেশ ও সীমিত পরিমাণ পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, জুট গুডস- এই পাঁচটি পণ্য থেকে আসে মোট রফতানি আয়ের ৬৫.৯০ শতাংশ। অন্যদিকে দেড় শতাধিক দেশে পণ্য রফতানি করা হলেও আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসে ৮৪.৯৭ শতাংশ রফতানি আয়- এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। অন্য দেশগুলোতেও রফতানি বাড়াতে হবে। তার মানে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে। মানোন্নয়নের পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগী হতে হবে। সাম্প্রতিককালে রফতানি বাণিজ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অপ্রচলিত পণ্যের (জুতা, চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদি) অবদান বৃদ্ধি, আমদানি বৃদ্ধির অনুপাতে রফতানির পরিমাণ অধিক হারে বাড়া, প্রাথমিক পণ্যের অবদান বৃদ্ধি ইত্যাদি। আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তা হলো জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে অবশ্যই রফতানি বাড়াতে হবে। বর্তমান বিশ্বে রফতানিকে উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয়। তবে আমাদের মতো দেশের রফতানি বাড়াতে হলে অবশ্যই স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য রফতানির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চামড়া খাত হতে পারে এক দারুণ সম্ভাবনা। চামড়া শিল্প সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর এবং অন্য যে কোনো খাতের চেয়ে এ খাতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ চামড়ার জুতা রফতানি করছে। বাংলাদেশে আগে জুতা তৈরি হলেও তা দ্বারা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা হতো। এখন জুতা রফতানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জুতা শিল্পের বিকাশের চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ, আমাদের দেশে শ্রম সস্তা ও উৎপাদন খরচ অন্য দেশের তুলনায় কম। উন্নত দেশগুলোয় জুতা তৈরির মোট খরচের ৪০-৪৫ শতাংশ ব্যয় হয় শ্রমিকের মজুরি বাবদ। আমাদের দেশে তা মাত্র পাঁচ শতাংশের মতো। জাপানে একজন জুতা শ্রমিকের প্রতি ঘণ্টায় মজুরি ২৩.৬৫ ডলার। বাংলাদেশে এ হার মাত্র ০.২৩ ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজোড়া চামড়ার জুতা তৈরি করতে খরচ হয় ৩২ ডলার, যা বাংলাদেশে ১৪ ডলার। একটু উদ্যোগী আর ব্যবসায়ীরা আন্তরিক হলেই এ সুযোগ কাজে লাগানো যাবে। অবশ্য এ সুযোগ অন্য শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রায় একই। উৎপাদন খরচ ও আউটপুটের হারের ব্যবধান অনেক বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জুতা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এখন বিশ্ববাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে গার্মেন্টের মতো আমাদের দেশে এখন এ খাতের ব্যবসা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। বিপুল সম্ভাবনাও আছে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার। চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে বলে সে দেশের পত্রপত্রিকা মারফত জানা যাচ্ছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া বিশ্বের জুতার বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। মান বাড়িয়ে বাজার ধরতে দেশে শিল্পবান্ধব অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সরকার আন্তরিক। ব্যক্তি-উদ্যোগ সম্পৃক্ত করতে হবে বা বাড়াতে হবে। শুধু ট্যানারি নয়, এই শিল্পকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট আরও অনেক অপরিকল্পিত কারখানা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। সেসব কারখানায় ট্যানারির কঠিন বর্জ্য, যেমন টুকরো চামড়া, গরুর হাড়, চর্বি, দাঁত পুড়িয়ে পোলট্রি ফিডসহ আরও নানা জিনিস তৈরি করা হয়। এটা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এর পরিবেশগত খারাপ দিক আছে। এসব কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থায় ক্ষেত্রমতে আলাদা অঞ্চল তৈরি করা যেতে পারে।

আমাদের প্রধান সুবিধা হচ্ছে, চামড়া আমরা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই পাই। তার ওপর এখানে শ্রমিকের মজুরিও কম। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা তুলনামূলক কম দামে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য দিতে পারি। দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রফতানির জন্য উৎপাদন করে আসছে। কাঁচা চামড়া ও সেমিপাকা চামড়া বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রফতানি সামগ্রী। শতকরা ৯৫ ভাগ কাঁচা চামড়া এবং চমড়াজাত দ্রব্যাদি, প্রধানত আধাপাকা ও পাকা চামড়া, চামড়ার তৈরি পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, হাতমোজা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট প্রভৃতি রফতানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে প্রতিবছর। অধিকাংশ চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী রফতানি করা হয় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্ভাবনার বিচারে পাদুকা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

চামড়া খাতকে শক্তিশালী করতে ট্যানারি কারখানার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, চামড়া শিল্পে ব্যবহূত উপকরণের উৎপাদন বৃদ্ধি, সঠিক পদ্ধতিতে পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ এবং পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ এসব বিষয়ে ব্যাপক প্রচার এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কোরবানি ঈদের সময় আমরা সিংহভাগ চামড়া পেয়ে থাকি। আর এসব চামড়ার মানও ভালো। তবে পরিবহন ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আরও সচেতন হতে হবে। আর এ সময়েই সিন্ডিকেট ও কারসাজি করে বিপুল সম্ভাবনার এ খাতকে অস্থির করতে চায় কেউ কেউ। এ সময়ে সরকার আরও কঠোর ভূমিকা পালন করলে ভালো হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিবেক জাগ্রত হতে হবে আগে। পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা না হলে এ খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিবছর সরবরাহ বাড়লেও কমছে চামড়া রফতানি এবং রফতানির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে প্রতিবছর দেশের বাজারে চামড়ার দাম কমছে। চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশ মূলত এমন বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে, যেখানে ব্র্যান্ডমূল্য নেই। ফলে এ দেশের রফতানিকারকরা পণ্যের দাম কম পান।

উপপরিচালক, বিআরডিবি, লালমনিরহাট
abuafzalsaleh@gmail.com

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপহার দিয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান। ...

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে ...

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

ড্রেসিংরুম থেকেই জরুরি তলব ঢাকায়-ওপেনিংয়ে কিছুই হচ্ছে না। সৌম্য সরকারকে ...

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ...

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পি ও নবাগতা অধরা খান জুটির ...

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ...

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

এশিয়া কাপে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে আফগানিস্তান। ভালো রান সংগ্রহ ...

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

আগামী মাসে সৌদি আরবে চার জাতির একটি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ...