রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়বে!

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে উত্তাপ-উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। চলছে নানা রকম হিসাব-নিকাশ। এই প্রেক্ষাপটে আমরা একটু দৃষ্টি দেই পেছনে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমাদের দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলন করতে হয়েছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে আমরা ধারণা করেছিলাম, আমাদের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সে আশা গুড়ে বালিতে পরিণত হয়। তৎকালীন সরকারের সময় মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপি ও তৎপরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করা হয়েছিল কঠোর আন্দোলন এবং ভোটারবিহীন ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো একটি নির্বাচনের মাধ্যমে। ১৯৯০ বা ১৯৯৬ কোনোটিই আন্দোলন ছাড়া সম্ভব হয়নি। এরপর ২০০১, একমাত্র এই সময়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল, কোনো আন্দোলন করতে হয়নি কিংবা করার প্রয়োজন পড়েনি। আবারও ধাক্কা বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে একজন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা নিয়ে। কয়েকটি ধাপ বাদ দিয়ে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া বিতর্কের সৃষ্টি করে। এ সময়েও কঠোর আন্দোলন করতে হয়েছিল, দমন-পীড়ন ও নির্যাতন ছিল, এসব ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার বা সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন যাই বলি না কেন, গত চার দশকে আন্দোলন ব্যতিরেকে সম্ভব হয়নি। কোনো সরকারই দাবির যৌক্তিকতা সহজে মেনে নেয়নি। কঠোর আন্দোলন সহজ কথায় বাধ্য হয়ে দাবি মেনে নিয়েছে।

এমন আন্দোলনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যতটা সফল, তার চেয়ে অনেক কম সফল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। হতে পারে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেওয়া এ দলটি অত্যন্ত শক্ত, মজবুত এবং তার আদর্শ লালনের কারণে। সবচেয়ে বড় বিষয়, তাদের মধ্যে দোদুল্যমানতা এবং অস্পষ্টতার লেশমাত্র নেই। তারা যা বলে তা বাস্তবায়ন করে ছাড়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ অনেক বিষয়ে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ইশতেহার অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চেষ্টা করে যাচ্ছে দ্রুত উন্নয়নের রাস্তায় বাংলাদেশকে ওঠাতে। তাদেরও অনেক সমস্যা রয়েছে; নেতাকর্মী বিশেষ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড সরকারের সব অর্জনকে ম্লান করে দেয়। উন্নয়নের সিঁড়িতে বাংলাদেশ উঠলেও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; কিন্তু তাদের ভালো দিক হলো, অস্পষ্টতা কিংবা মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে না থাকা। তুলনায় বিএনপি বরাবরই বিপরীত অবস্থানে থেকে আসছে। তাদের আরও বড় সমস্যা প্রয়োজনে, স্বার্থে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজেদের অবস্থানে বারবার পরিবর্তন। কার্যত এমন পরিবর্তন কোনো সুফল বয়ে আনে না। দেশি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও রাষ্ট্রের কাছে বিশ্বাস জোগানো তাদের পক্ষে এখন কঠিন হচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত ও অস্পষ্টতা তাদেরকে ঘরোয়া সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পেশ, বিদেশিদের ডেকে নালিশ করা এবং আস্থা অর্জনের জন্য ভারতের কাছে অঙ্গীকার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। অতি সম্প্রতি তারা নয়াপল্টনে একটি সমাবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা তিনটি শর্তের ভিত্তিতে নির্বাচনে যেতে চায়। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করে নির্বাচন করতে হবে। আবার বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরা চারটি শর্তে বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে মন্ত্রণালয় ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছে- যার সঙ্গে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রস্তাবের মিল আছে। বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মতদ্বৈধতা আমাদের আরও বিভ্রান্ত করে। তারা আগে খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বলে ঘোষণা দেয়। পরবর্তীকালে গাজীপুর ও বর্তমানে বাকি তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা বলে আসছিল। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দেয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তি নিদেনপক্ষে বড় বিষয়; কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় তাদের মতে, সহায়ক সরকার যা তারা বারবার বলে আসছে। এখানেও তারা স্পষ্ট নয়। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে নিরপেক্ষ সরকার দরকার, সে দাবি জোরালো কোথায়। যে সহায়ক সরকারের কথা তারা বহুদিন থেকে বলে আসছে, আজ পর্যন্ত তার কোনো রূপরেখা দিতে পারেনি। নাকি তারা সহায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসছে! সরকার হয়তো মেনে নেবে না, তবে তারা জনগণকে তাদের কথা জানাতে পারত। তারা বারবার কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে আসছে; কিন্তু কোথায় সেই আন্দোলন। অন্যদিকে তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতির কথাও তারা বলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা আসলে কী চাচ্ছে কিংবা তাদের কী করা উচিত, তা তাদের নিজেদের কাছেও স্পষ্ট নয়। এমনও আমরা দেখেছি রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে আবার তা স্থগিত করতে। এর অন্যতম কারণ, তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধরে নিলাম, সরকারের মামলা, হামলা ও দমন-পীড়নে অতিষ্ঠ নেতাকর্মীরা; কিন্তু জনগণের কল্যাণের কথা বললে গণঅভ্যুত্থান হওয়া অসম্ভব নয়। উল্টোভাবে বললে বাংলাদেশে বর্তমানে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই, যার জন্য জনগণ মাঠে নামবে। ইতিহাস বলে, আন্দোলন ছাড়া কোনো কিছুই অর্জন করা যায় না; যদি তাই হয়, তাহলে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে ২০১৪ সালে। এরপর তাদের অব্যাহত ভুল সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদেরকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। নিজেদের যখন আন্দোলন করার সক্ষমতা নেই, তখন তরুণ সমাজের একান্ত নিজস্ব স্বার্থের আন্দোলনকে বাতাস দিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনকে বেগবান করতে চেয়েছিল। সরকার পতন ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন আর তরুণ সমাজের কোটা সংস্কারের আন্দোলন যে এক নয়, তা তারা অনুধাবন করতে পেরেছে।

এমন রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে বিএনপির মতো একটি বড় দল যাদের সঙ্গে আরও ১৯টি দল রয়েছে, তাদের আরও নতুন ৫টি দলের সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার চিন্তা চলছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এমন একটি বড় দলকে যাদের কারও কারও নিবন্ধন নেই, তাদের সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে। ৫টি দলের প্রধানদের ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ইমেজ থাকতে পারে; কিন্তু তাদের জনসমর্থন রাজনীতির মাঠে ও জনগণের কাছে কতটা, তা অনেকের জানা। রাজনীতি বড় নিষ্ঠুর এবং নির্মম এ কারণে যে, ৫টি দলের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকের আদর্শ বিএনপি ও এর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে দারুণ সাংঘর্ষিক। অন্ততপক্ষে বাম রাজনৈতিক দলের বিষয়ে এমন মন্তব্য করা সঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে হলে আটঘাট বেঁধে নামতে হবে আর কি। বিএনপি ও তাদের বর্তমান ১৯ দল এবং তাদের সঙ্গে আরও ৫ দল মিলে মোট ২৫ দল বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে কিনা, তার জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। বড়জোর তিন কিংবা চার মাস। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তোড়জোড় এবং দাতা দেশ ও সংস্থার মাথাব্যথা ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে, তার বিন্দুমাত্র লেশ আমরা লক্ষ্য করছি না। এখন পর্যন্ত তাদের বক্তব্য খুব সাদামাটা এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমিত। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি এ সাক্ষ্য বহন করছে যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্রমেই পুনর্বার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

শুরুতে বলছিলাম বাংলাদেশে আন্দোলন ছাড়া কোনো কিছু অতীতে অর্জন করা যায়নি। যে তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকারের কথা বিএনপি বারবার বলে আসছে, এমন সরকারকে বিতর্কিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাই মুখ্য ছিল। সামনে তাদের দুটি পথ খোলা আছে। কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সহায়ক কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে বাধ্য করা; যদিও তাদের পক্ষে তা অসম্ভব। অন্যথায় তাদেরকে যে কোনো ধরনেই হোক নির্বাচনে আসা ছাড়া কোনো পথ নেই। যদিও রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই; তবুও আর কত সময় নিয়ে তারা নিজেদের স্পষ্ট করবে এবং দোদুল্যমানতা থেকে বেরিয়ে আসবে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই সময় পর্যন্ত।

neazahmed_2002@yahoo.com

অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পরবর্তী খবর পড়ুন : এটাই সবার কাম্য

তবুও জয় পেলো না জার্মানি

তবুও জয় পেলো না জার্মানি

জার্মানি ইউরোপিয়ান নেশনস লিগের গ্রুপ 'এ' থেকে 'বি' তে নেমে ...

‘এরশাদকন্যা’র বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

‘এরশাদকন্যা’র বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পালিত কন্যা ও জাতীয় ...

ভালো নেই আমজাদ হোসেন

ভালো নেই আমজাদ হোসেন

অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেনের। ...

৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাতীয় পার্টি: এরশাদ

৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাতীয় পার্টি: এরশাদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনশ' আসনেই জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী ...

শাস্তি কমছে না স্মিথ-ওয়ার্নারদের

শাস্তি কমছে না স্মিথ-ওয়ার্নারদের

শাস্তি কমতে পারে স্মিথ-ওয়ার্নার ও বানক্রফটের। সোমবারের খবর ছিল এমনই। ...

বাবার বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন সারা, সাজিয়ে দিয়েছিলেন মা

বাবার বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন সারা, সাজিয়ে দিয়েছিলেন মা

অমৃতার সঙ্গে সাইফ আলী খানের বিয়েবিচ্ছেদ হয়েছে বহু বছর আগে। ...

৬ মাসে ১৫০ কোটি ভুয়া অ্যাকাউট ডিলিট করেছে ফেসবুক

৬ মাসে ১৫০ কোটি ভুয়া অ্যাকাউট ডিলিট করেছে ফেসবুক

গত ছয় মাসে ১৫০ কোটিরও বেশি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ডিলিট করেছে ...

মহারাষ্ট্রে সেনা ডিপোর গোলা বিস্ফোরণে নিহত ৬

মহারাষ্ট্রে সেনা ডিপোর গোলা বিস্ফোরণে নিহত ৬

ভারতের মহারাষ্ট্রে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি ডিপোর কাছে ধ্বংসের জন্য নেওয়া ...