বিমসটেক কি সফল হবে?

আঞ্চলিক সহযোগিতা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ফরিদুল আলম

গত ৩১ আগস্ট নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শেষ হলো চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান- এই সাত দেশের সমন্বয়ে গঠিত বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন। প্রথমে ১৯৯৭ সালের জুন মাসে থাইল্যান্ডে মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড- এই চার দেশের সমন্বয়ে BIST-EC গঠিত হয়। মিয়ানমার সেই সময় এ সংস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণ করে। পরবর্তী বছরে এর প্রথম শীর্ষ বৈঠকে মিয়ানমারকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া হলে সংস্থাটির নতুন নাম হয় BIMST-EC। ২০০৩ সালে নেপাল ও ভুটানকে পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করা হয় এবং নাম দাঁড়ায় বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিকাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন। দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থাটির ৭ সদস্য দেশের মধ্যে ৫টিই বর্তমান সার্কভুক্ত অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয় দেশ। এর বাইরে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড। বিমসটেক-এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। ব্যবসা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পর্যটন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পোশাক ও চামড়া শিল্পসহ আরও অনেক ক্ষেত্র বিমসটেক-এর মূল উদ্দেশ্যভুক্ত। এখানে উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছরের মধ্যেও এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যতটুকু না পারস্পরিক বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এর তুলনায় বিমসটেক প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে উপরোক্ত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক বিষয়ে সংযোগ সাধন। সদস্য দেশগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে উল্লিখিত উদ্দেশ্য সাধনকল্পে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে বাংলাদেশ, পরিবহন, যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে ভারত; প্রযুক্তি খাতে শ্রীলংকা, প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে মিয়ানমার, মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় থাইল্যান্ড ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর খাতওয়ারি বিষয় নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ পর্যন্ত ৪টি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার সর্বশেষটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নেপালে।

এবারের শীর্ষ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব সিদ্ধান্ত শীর্ষ নেতাদের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বিমসটেক ট্রান্সপোর্ট কানেকটিভিটি মাস্টার প্ল্যান। এ বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা রয়েছে এ পরিকল্পনার। এবারের সামিটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গ্রিড ইন্টার কানেকশনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা জানি, দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ খাতের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। ল্যান্ড লক দেশ হওয়ার কারণে ভারত এ খাতে এককভাবে যে সুবিধা এতদিন ধরে নিয়ে আসছিল, এবার আঞ্চলিক সহযোগিতা তথা বিমসটেক-এর বৃহত্তর স্বার্থে সেখানে অন্য দেশগুলোর স্বার্থে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে এ ধরনের সিদ্ধান্তে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকেও এই খাতের বিপুল সম্ভাবনার সুফল অর্জন করতে পারবে অপরাপর সদস্য দেশ। সার্কের আওতায় যে বিষয়টি নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে সুযোগ থাকলেও যে অভাবনীয় সম্ভাবনাগুলো অর্জন করা যায়নি, সেখানে বিমসটেক-এর আওতায় এ ধরনের অর্জন সার্কের ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোকে গুরুত্বহীন করে তুলবে। সম্মেলনের শেষ দিনে ৩১ আগস্ট কাঠমান্ডু ঘোষণায় বিমসটেকভুক্ত দেশের মানুষের উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ, পর্যটনের মতো খাতগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। পরে বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহৎ কাঠামোর আওতায় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ লেনদেনে একমত হন জোটভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানরা। এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়াও এবারের সম্মেলনে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দূরীকরণে সদস্য দেশগুলো একমত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পারস্পরিক স্বার্থে একত্রে কাজ করার যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো, এর ফলে সদস্য দেশগুলো এ বিষয়ে আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে পারবে।

এ অঞ্চলে ৩০০ গিগাওয়াটের অধিক জলবিদ্যুৎ এবং বঙ্গোপসাগরে রয়েছে অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার। এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ এবং এ উদ্যোগ যথার্থভাবে গ্রহণ করা গেলে নিশ্চিতভাবে বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে বিমসটেক। আর তাই বিমসটেক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বৈশ্বিক বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীরা এ সংগঠনের উন্নয়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে এর তাৎপর্যের দিকটি আরও বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা) এবং বিমসটেক আউটরিচ যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, সেটাও বিশেষভাবে তাৎপর্যের দাবিদার। ব্রিকস-এর দেশগুলো বর্তমানে বিমসটেক-এর অপার সম্ভ্ভাবনাগুলোর বিষয়ে এতটাই অবগত যে, তারা সম্মিলিতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নতুন একটি ধারা সৃষ্টিতে প্রয়াসী। ব্রিকস-এ ভারতের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ সালে প্রথমে এডিবি, পরে বিশ্বব্যাংকসহ অপরাপর অর্থনৈতিক সংস্থা বিমসটেক উন্নয়ন মডেলের বিভিন্ন অবকাঠামোগত বিষয়ে বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়। এডিবি স্টাডির মধ্যে রয়েছে- ক্রস বর্ডার সুবিধাদি, মাল্টি মডেল পরিবহন ও সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন, এভিয়েশন, সমূদ্র পরিবহন, মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন। ২০১৪ সালে বিমসটেক ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড লজিস্টিক স্টাডি নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ১৬৭টি প্রকল্পের মধ্যে ৬৬টি প্রকল্পে জোর দেওয়া হয়। বর্তমানে বিমসটেক-এর শতাধিক প্রকল্পে এডিবি ও বিশ্বব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে।

এবারের সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি নিজে এতে অংশগ্রহণে বিরত থেকে সে দেশের প্রেসিডেন্ট উ মিন্টকে পাঠিয়েছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ, ক্রমাগত নিন্দা ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় সু চি যাননি বলে মনে করা হচ্ছে। তার পরও সংস্থার বৃহত্তর স্বার্থে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের ফাঁকে কয়েকজন নেতার সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠক সেরেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেপাল ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে দুই নেতাই সম্মত হয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপালকে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ বছরের মধ্যেই যদি বিমসটেক কানেকটিভিটি কার্যকর হয়ে যায়, তবে নেপাল-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সহযোগিতা একটি নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রত্যাশিত বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী সংস্থাটির উন্নয়নে তাদের অভিন্ন মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, বিমসটেক-এর উন্নয়ন মডেলের আলোকে ব্রিকস-এর সঙ্গে এর সংযোগ এবং সাম্প্রতিক বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল (BBIN) উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীদ্বয়।

সুতরাং এ ক্ষেত্রে দুই দেশেরই উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা অভিন্ন। সেগুলো একই সুতোয় গাঁথতে দুই প্রধানমন্ত্রীই অভিন্ন পথে কাজ করে যাচ্ছেন। সার্কের অনিশ্চয়তার এই কালে বিমসটেক তাই অপার সম্ভাবনার হাতছানি।

mfulka@yahoo.com

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে বেইজিংয়ের ইউআইবিইতে উচ্চশিক্ষারত

পরবর্তী খবর পড়ুন : নিমন্ত্রণ

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

গল্পে পড়া উঠের পিঠে চড়া সেই বেদুইনরা নাকি এখন শুধুই ...

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

সিলেটের প্রাণ সুরমা নদীকে খুবলে খাচ্ছে বালুখেকোরা। অথচ এই নদী ...

বরিশালেও প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন

বরিশালেও প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন

হিজলা ও মুলাদী উপজেলার মধ্যবর্তী নয়াভাঙ্গুলী নদীর ৮-১০টি পয়েন্টে এবং ...

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহযোগিতার জন্য ফের আহ্বান জানাবেন ...

সালাহ ফিরেছেন, জিতেছে লিভারপুল

সালাহ ফিরেছেন, জিতেছে লিভারপুল

'ফর্মে নেই সালাহ।' কথাটা উঠে গিয়েছিল। কারণ মিসর তারকা মোহামেদ ...

২০ হাজার টাকা ঘুষের জন্য ওসির রাতভর নাটক

২০ হাজার টাকা ঘুষের জন্য ওসির রাতভর নাটক

একটি প্রতারণার মামলায় দুর্গাপুরের ঝালুকা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোজাহার ...

আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করতে হবে: প্রধান বিচারপতি

আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করতে হবে: প্রধান বিচারপতি

জনগণের হয়রানি বন্ধে আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করার আহ্বান ...

ষড়যন্ত্রের ঐক্য কোনো ফল দেবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

ষড়যন্ত্রের ঐক্য কোনো ফল দেবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ...