সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৪      

মঙ্গল কুমার চাকমা

বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দীর্ঘ ১৭ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। সরকার প্রচার করে আসছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকি ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। বস্তুত সরকারের ওই বক্তব্য বা প্রতিবেদন সর্বাংশে সত্য নয়। জনসংহতি সমিতির মূল্যায়নে চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। আর অবাস্তবায়িত রয়েছে ৩৪টি ধারা এবং আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে ১৩টি ধারা। তার অর্থ হচ্ছে, চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনও অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে 'ক' খণ্ডের ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ সম্পূূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার যে দাবি করছে, সেই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে সরকারের অসত্য বক্তব্যের চিত্র ফুটে উঠবে। চুক্তির 'ক' খণ্ডের ১ নং ধারায় পার্বত্যাঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়ন গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। এই বিধান এখনও কাগজ-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে কোনো আইনি বা কার্যগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারের কোনো অফিস আদেশ, দিক-নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। ফলে নানা কায়দায় পার্বত্যাঞ্চলে অব্যাহতভাবে বহিরাগতদের অভিবাসন ঘটছে এবং উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য/মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে বসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির 'খ' খণ্ডের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ৩৫টি ধারার মধ্যে ২৯টি ধারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার যে দাবি করছে, তাও সর্বাংশে সঠিক নয়। ১৯৯৮ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের মাধ্যমে উন্নয়ন সংক্রান্ত ১৯ নং ধারা ব্যতীত যদিও 'খ' খণ্ডের অন্য সব ধারা তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুর্ক্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু আইনে অন্তর্ভুর্ক্ত হওয়া মানেই তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা যায় না। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছরেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচিত পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের পরিবর্তে এখনও অনির্বাচিত ও মনোনীত ৫ সদস্যকে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে এসব পরিষদ অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই যেখানে আইনের প্রয়োগ নেই, সেখানে এ বিধানগুলো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা কখনোই সঠিক হতে পারে না।
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্য থেকে ১৫ সদস্যে উন্নীত করে গত ২৩ নভেম্বর ২০১৪ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ১৯৯২ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বিগত ২২ বছর ধরে কোনো সরকার এ পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি এবং এ লক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়নেরও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্র্তী পরিষদের আকার যতই বাড়ানো হোক না কেন, তাতে কখনোই শক্তিশালী, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক পরিষদ গড়ে উঠতে পারে না এবং সব জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতে পারে না।
অতিদ্রুততার সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইন সংশোধন করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন কাজ মহাজোট সরকারের ৬ বছরসহ আজ ১৩ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা ছাড়াই ২০০১ সালে ভূমি কমিশন আইন পাস করা হয়। ফলে ওই আইনে পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মক ২৩টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ওই বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের জন্য আঞ্চলিক পরিষদ পুনরায় সুপারিশমালা প্রেরণ করে। এক পর্যায়ে আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যৌথভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক গত ২০ জুন ২০১১ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৩ দফা সম্বলিত সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি কর্তৃকও ওই ১৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। কিন্তু আজ অবধি ওই ১৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাব অনুসারে ভূমি কমিশন আইনটি সংশোধন করা হয়নি।
দলীয় স্বার্থ জড়িত থাকায় সরকার পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অতিদ্রুততার সঙ্গে সংশোধন করে। পক্ষান্তরে পার্বত্য সমস্যার অন্যতম দিক ভূমি সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ভূমি কমিশন আইন সংশোধন কাজ সরকার বছরের পর বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। চুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন কাজ ১৭ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে পার্বত্য চুক্তিকে লঙ্ঘন করে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এভাবেই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে।
বস্তুত বর্তমানে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। দেশ-বিদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্য সরকার বুলিতে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে। আর চুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে চুক্তি পরিপন্থী বা জুম্ম স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। বস্তুত দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই এ চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্যই হচ্ছে প্রধান। তাই আর বিলম্ব না করে দেশের সামগ্রিক স্বার্থে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে সময়সূচিভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণপূর্বক সরকারকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।
তথ্য ও প্রচার সম্পাদক
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি

পরবর্তী খবর পড়ুন : শান্তির জন্য

হংকংয়ের বিপক্ষে কষ্টের জয় ভারতের

হংকংয়ের বিপক্ষে কষ্টের জয় ভারতের

হংকংয়ের ইনিংসের তখন ২৯ ওভার চলছে। কোন উইকেট না হারিয়ে ...

মুশফিক বিশ্রামে খেলবেন মুমিনুল

মুশফিক বিশ্রামে খেলবেন মুমিনুল

রুটি সেঁকতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত না আবার হাতটাই পুড়ে যায়- ...

শিক্ষার্থীরা আশাবাদী, সন্দেহ যাচ্ছে না ছাত্রনেতাদের

শিক্ষার্থীরা আশাবাদী, সন্দেহ যাচ্ছে না ছাত্রনেতাদের

সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশাবাদী। তবে কিছুটা সন্দেহ আর সংশয়ে আছে ক্যাম্পাসে ...

স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বাড়ছে গড় আয়ু

স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বাড়ছে গড় আয়ু

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ক্রমশই বাড়ছে। ১০ বছর আগে ২০০৮ ...

৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য

৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য

চলমান রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য। আওয়ামী ...

'থাহনের জাগা নাই, পড়ালেহা করব ক্যামনে'

'থাহনের জাগা নাই, পড়ালেহা করব ক্যামনে'

ভিটেমাটির সঙ্গে শিশু নাসরিন আক্তারের স্কুলটিও গেছে পদ্মার গর্ভে। তীরে ...

রোগশোক ভুলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ওরা

রোগশোক ভুলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ওরা

হাটহাজারীর কাটিরহাট থেকে ছয় কিলোমিটার ইটবিছানো রাস্তার পর প্রায় এক ...

হ্যাটট্রিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ শুরু মেসির

হ্যাটট্রিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ শুরু মেসির

চ্যাম্পিয়নস লিগে গত মৌসুমেও দারুণ খেলেছেন মেসি। কিন্তু রোমার কাছে ...