আমাদের ব্যর্থতা

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৮      

শরীফ আজিজ, পিএসসি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গভবন থেকে আমরা তিনজন ছুটে গিয়েছিলাম ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের দিকে- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হক, ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ ও লেফটেন্যান্ট রাব্বানী। প্রথমজন বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব আর অপর দু'জন বঙ্গবন্ধুর এডিসি। আমাদের লক্ষ্যস্থল বঙ্গবন্ধুর বাড়ি হলেও সেখানে আমরা পৌঁছাতে পারিনি। গণভবন থেকে আসা বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও পারেননি। অভ্যুত্থানকারীরা কর্নেল জামিলকে হত্যা করে। তবে বঙ্গভবন থেকে আসা আমাদের তিনজনকে অভ্যুত্থানকারীরা প্রাণে মেরে না ফেললেও গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে এবং আটকে রাখে। আমাদের সেই তিন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে আমি এখনও বেঁচে আছি।

এমন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটবে, তা আমরা কল্পনায়ও আনতে পারিনি। কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি- সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে। যখন এটা ভাবি, খুবই অনুশোচনায় পড়ি, বিচলিত হই; আত্মগ্লানিতে ভুগি এবং লজ্জা লাগে। বঙ্গবন্ধুকে বলা হয়েছিল, ৩২ নম্বর রোডের বাসায় থাকবেন না, গণভবনে থাকুন। তিনি বললেন, এ বাসাতেই থাকবেন। এর পর আর কেউ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা বলেননি। মনে আছে, তাঁর মৃত্যুর তিন-চার দিন আগে হত্যাকারীদের একজন কর্নেল ফারুক কোনো এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানিয়েছিল। এসব লোকই কিনা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল! আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না? ডিজিএফআই, এনএসআই- কেউই জানল না! এটি কীভাবে সম্ভব হলো? এটা ছিল আমাদের চরম ব্যর্থতার জলজ্যান্ত ও বিষাদময় ইতিহাস।

তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কার? অবশ্যই আমাদের ছিল। বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারিনি- এ ব্যর্থতা গোটা জাতির। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় পিজিআর ছাড়াও বেসামরিক নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ছিলেন। সন্দেহ নেই- বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কর্নেল ফারুক-রশিদ চক্র যে এই পরিকল্পনা করেছে, তার কিছুই আমরা টের পাইনি কেন? বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুকে হয়তো সতর্ক করে থাকতে পারে। কিন্তু আমার অনুযোগ, দেশের ভেতরে এত গোয়েন্দা সংস্থা, এত বাহিনী- কেউই বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র কেন টের পেল না? ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট-পিজিআর প্রতিষ্ঠিত হলেও, ওই রেজিমেন্ট বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল না। সে দায়িত্বে ছিল কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আসা একটি সেনা গোলন্দাজ ইউনিট। মোট কথা, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সবাইকেই দায়ী করা যায়। তবে এটি ছিল সংশ্নিষ্টদের অবহেলা, যা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়।

১৫ আগস্ট আমাদের তিন এডিসির দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সকালে বঙ্গবন্ধুর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সকাল ৬টার দিকে ফখরুল ইসলাম নামে এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা গণভবন থেকে আমাকে টেলিফোন করে জানায়- 'ধানমণ্ডি ও মিরপুর রোডের দিক থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আপনারা কিছু শোনেননি?' এর পরই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাব। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হককে জানালাম। তিনি বললেন, তিনিও যাবেন। গাড়িতে ওঠার আগে তিনি একটি পিস্তল দিয়ে সঙ্গে রাখতে বললেন। আমি অপর এডিসি লে. রাব্বানীকেও ঘটনা বললাম। তিনিও যাওয়ার কথা বললেন। আমরা তিনজনই বঙ্গভবন থেকে একটি গাড়ি নিয়ে নিউমার্কেট পার হয়ে ধানমণ্ডি ২ নম্বর সড়কে পৌঁছলে তখন কালো ইউনিফর্ম পরিহিত কোরের (ট্যাঙ্ক বাহিনী) লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি? জানালাম, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যাব। ওরা বলল, তাকে তো হত্যা করা হয়েছে। আমরা বললাম, কী বলছ? তোমরা কি পাগল? আমরা তাদের বাধা পেরিয়ে সামনে এগোলাম। এর পর কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে ফের আরেক দল আমাদের আটকাল। নানা কৌশলে দ্বিতীয় বাধাও পার হলাম।

তখন রাস্তায় কোনো সাধারণ লোকজন ছিল না। কারফিউ চলছিল। বিদ্রোহী সেনাদের তৃতীয় দল আমাদের বাধা দিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে। সাংহাই চীনা রেস্তোরাঁর কাছে ওরা আমাদেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনেহিঁচড়ে লেকের পাড়ে নিয়ে আটকে ফেলল। তারা ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। অকথ্য ভাষায় আমাদেরকে গালাগাল করল। তারা আমাদের সবার চোখ ও পিছমোড়া করে হাত বাঁধল। সেনারা বলল, 'তিন গাদ্দারকে ধরেছি।' একবার কর্নেল ফারুকও ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। সে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হককে চিনল। বলল, 'এদেরকে ধরে রাখো।'

এভাবে আমাদের চোখ বেঁধে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা রাখা হলো। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বোন-জামাই মেজর শহীদুল্লাহ আমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে গণভবনে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের চোখ খুলে দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখা হলো। দিনটি ছিল শুক্রবার। নামাজের সময় হলে কর্তব্যরত প্রহরীদের বুঝিয়ে বন্দি অবস্থা থেকে বেরিয়ে গণভবনের মসজিদে নামাজ পড়লাম। সন্ধ্যায় গণভবনের কম্পট্রোলার, যিনি আমাদের পূর্বপরিচিত একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলে প্রহরারত সৈনিকদের ফাঁকি দিয়ে আমরা বঙ্গভবনে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, কর্নেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী হাতে সামরিক সচিবের ব্যাজ পরে আছেন। তিন বাহিনী থেকে তিনজন নতুন এডিসি নিয়োগ পেয়েছে। শুনলাম আমাদের অন্যত্র পোস্টিং করা হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যায় শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে ফের আমাদের ডাক পড়ল। কেননা, সেখানে যারা ছিলেন, তাদের ওই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা ছিল না।

এর পর বঙ্গভবনেই এক ধরনের বৈরী পরিবেশে আড়াই মাস কেটে গেল। বঙ্গবন্ধুর প্রাক্তন এডিসি হিসেবে বঙ্গভবনে কর্মরত অন্যরা আমাদের এড়িয়ে চলত। কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ বঙ্গভবনের তৃতীয় তলায় ভিআইপি রুমে থাকত। তাদের মধ্যে এক ধরনের অহঙ্কার এসে গেল- 'তারাই দেশ চালাচ্ছে।' কিছুদিন যেতে না যেতেই পুরো সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে চলে গেল। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কোনোভাবেই তাদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে পারছিলেন না।

যেহেতু সার্বিকভাবে সেনাবাহিনী এই সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল না, সেহেতু পুরো সেনাবাহিনী ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। বরং সেনাবাহিনী আড়াই মাস সময়ের মধ্যে অভ্যুত্থানকারীদের স্থানচ্যুত করে দিয়েছিল। সুতরাং সেনাবাহিনীকে ওই সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা যাবে না। কিন্তু সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ড ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটার পর, ঘটনাস্থলে যাওয়া সবারই আকাঙ্ক্ষিত ছিল। ঘটনার পর স্থানীয় সেনা অধিনায়ক ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সেনাবাহিনী পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যে কোনো বিবেচনায়ই এটা ছিল চরম ব্যর্থতা।

এর পর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যু্যত্থান হলো। তবে আমরা চেয়েছিলাম, খালেদ মোশাররফ সফল হোন। খুনিরা পালিয়ে গেল। তার আগে একটি বৈঠকে এক সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছিলেন। বঙ্গভবনের বাইরে অরাজকতা চলছিল। নভেম্বর মাসের ৬-৭ তারিখে 'সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই' বলে পাল্টা অভ্যুত্থান হলো। ইতিমধ্যে জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো। কিন্তু জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যা সম্পর্কে আমরা পুরো অন্ধকারে ছিলাম। পরে যখন জেনেছি, তখন খুনিরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে। জেলহত্যার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।

এই মহাবিষাদের ঘটনা শেষ করার আগে বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে কিছু বিশেষ কথা বলতে চাই। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। এডিসি হিসেবে আমরা তার পরিবারের সদস্যের মতো ছিলাম। সকালে বঙ্গভবন থেকে ৩২ নম্বরে আসতাম, রাতে ফিরে যেতাম। প্রতিদিন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের খেতে বলতেন। তাঁর মাতৃসুলভ ডাকে বেশিরভাগ সময়ই না খেয়ে আসতে পারতাম না। খেতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু খেয়ে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো। তিনি সবার পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।

বঙ্গবন্ধু সরল মনের বড়মাপের মানুষ ছিলেন। তাঁর জন্য আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। কর্তব্যের তাগিদেই সেদিন আমরা তিন সামরিক কর্মকর্তা বঙ্গভবন থেকে তাঁর বাসার দিকে ছুটে গিয়েছিলাম। এই সাহসিকতার জন্য পরে কি এর কোনো মূল্যায়ন হয়েছে- এ প্রশ্ন অনেকে করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এতদিন পরও এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়নের জন্য কোনো তদবির বা দেনদরবার করিনি। আমাদের অ্যাকশন ছিল স্পন্টেনিউয়াস, যেটাকে ইংরেজিতে বলে ্তুঈধষষ ড়ভ উঁঃু্থ. এখানে সাহসিকতা ছাড়াও 'কর্তব্যের খাতির' কথাটিই মুখ্য ছিল। মোট কথা, বঙ্গবন্ধুকে আমরা বাঁচাতে পারিনি- এই গ্লানি ও মনোবেদনা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ৪৩তম শাহাদত দিবসে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

হ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.)

পরবর্তী খবর পড়ুন : বরগুনায় প্রতিরোধ

সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে আমাদের আটকে রাখা হয়েছে: খালেদা

সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে আমাদের আটকে রাখা হয়েছে: খালেদা

আদালতকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন খলেদা জিয়া বলেছেন, একদল নির্বাচন ...

ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন ৩২ জন

ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন ৩২ জন

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির হয়ে অংশগ্রহণের ...

পাবনায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় নিহত ২

পাবনায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় নিহত ২

পাবনার সাঁথিয়ায় দুই বাসের প্রতিযোগিতাকালে একটি অটোভ্যানকে চাপা দেয় একটি ...

বিএনপির চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি: নাসিম

বিএনপির চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি: নাসিম

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে ...

ঢাবিতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কম্পিউটার ল্যাব উদ্বোধন

ঢাবিতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কম্পিউটার ল্যাব উদ্বোধন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বোধন ...

হেলমেটধারী এজেন্টরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে: রিজভী

হেলমেটধারী এজেন্টরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে: রিজভী

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের গাড়িতে হেলমেটধারী এজেন্টরা আগুন লাগিয়েছে ...

রাস্তায় চানাচুর বিক্রেতা থেকে এমপি প্রার্থী!

রাস্তায় চানাচুর বিক্রেতা থেকে এমপি প্রার্থী!

স্যোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল তিনি। সেখান থেকে এখন হচ্ছেন খবরের শিরোনাম। ...

বিক্রেতাহীন ‘সততা স্টোর’

বিক্রেতাহীন ‘সততা স্টোর’

শিক্ষার্থীদের মাঝে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টির পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ...