'সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা: প্রাতিষ্ঠানিক নীতি-কাঠামোর দাবি'

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সুরক্ষায় প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ- ৬ সেপ্টেম্বর গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত বিশিষ্টজন এ বিষয়টিতেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্টজন তাদের বক্তব্যে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে পেশাগত ও বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজিত দলিতদের চরম দারিদ্র্য এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তারা বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হলেও এখন পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক ও মানবাধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। হেকস/ইপার বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেড ও সমকাল যৌথভাবে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সমকাল কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করে


মুস্তাফিজ শফি
সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধানে সমকাল সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার যে দাবি, সেটা অত্যন্ত ন্যায্য। একদিনে হয়তো সব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, তবে এ ক্ষেত্রে আলোচনা চালিয়ে যেতেই হবে এবং যার যার অবস্থান থেকে কাজও করে যেতে হবে। আজকের আলোচনায় সরকারের নীতিনির্ধারক, মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, আদিবাসী নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যেমন অংশ নেবেন, তেমনি একেবারে মাঠ পর্যায়ের আদিবাসী প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। সবাই মিলেই আমরা সমস্যা সমাধানে একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি করব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাব। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া এই দেশ তার মৌলিক চেতনা থেকে বিচ্যুত হবে না, পথ হারাবে না।

ফিলিপ গাইন
বাংলাদেশে অন্য যেসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে তাদের মধ্যে হরিজন বা সুইপার, ঋষি, কায়পুত্র (যারা মাঠে শূকর চড়ান) এরা অন্যতম। তারা অনেকে নিজেদের দলিত হিসেবেও বিবেচনা করেন। তারা সমাজে অত্যন্ত অবহেলিত এবং তারাই সব থেকে বেশি সুবিধাবঞ্চিত। তাদের সংখ্যা নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি আছে বাংলাদেশে। কারও কারও মতে এদেশে তাদের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ। আবার কারও কারও হিসাবে তাদের সংখ্যা ১৫ লাখের মতো বা তারও কম। দলিতদের সংজ্ঞা, পরিচয় ও সংখ্যা নিয়ে অচিরেই সব বিতর্কের অবসান ঘটবে এমনটা আশা করা যায় না। তবে তার থেকেও বড় বিষয় হলো আমরা আজ যাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলছি এবং যাদের বলা হচ্ছে দলিত তাদের একটি বড় অংশই প্রান্তিক, হতদরিদ্র এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বৈশ্বিক ও বৃহত্তর সংস্কৃতির চাপে বিপন্ন। একদিকে যেমন সমতলের স্বল্পপ্পপরিচিত ও অদৃশ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে দৃশ্যমান করা জরুরি, তেমনি জরুরি তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া।

সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার একটি বড় অংশই এক সময় ছিল অরণ্যচারী। সান্তাল, গারো, ওঁরাও, পাহাড়ি এদের অরণ্যনির্ভরতার কথা আমরা জানি। কিন্তু বনভূমিতে তাদের সনাতনি অধিকার স্বীকৃত নয়। অথচ বনায়নের সুযোগে ও শিল্পায়নের কারণে বনভূমির একটি বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে শিল্পপতি ও প্রভাবশালীদের হাতে। কীভাবে বন বিনাশ ঘটে চলেছে, কারা এজন্য দায়ী এবং সত্যিকারের বন প্রতিষ্ঠার কোনো উপায় আদৌ আছে কি-না তা নিয়ে সব থেকে বেশি তৎপর হতে হবে রাষ্ট্রকে। এদিকে, ভূমিহীনতা এবং ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাসহ সহিংসতা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি সাধারণ সমস্যা, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি দীর্ঘদিনের। এজন্য অনেকেই সরকারের কাছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য একটি ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছে। ভূমি কমিশনের গুরুত্ব নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু সরকার আন্তরিক না হলে ভূমি কমিশন কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় আছে।

এছাড়া, প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিশ-এর অধিক আন্তর্জাতিক সনদ এবং জাতীয় আইন আছে। এদের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কী দায়িত্ব তার নির্দেশনাও আছে এসব সনদ ও আইনে। এসব সনদ ও আইন এবং সেসবের বাস্তবায়নের জন্য নীতি-কাঠামো এবং কোন ধরনের পদ্ধতি কার্য-প্রক্রিয়া আছে বা থাকতে হবে সে ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি সংশ্নিষ্ট অনেকেরই সুস্পষ্ট ধারণা নেই। শ্রম আইন ২০০৬ এবং ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইন (ইস্ট বেঙ্গল স্টেট একুইজিসন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০)। এ আইন দুটির অপব্যবহার ও লঙ্ঘন হচ্ছে বলে আমরা খবর প্রকাশিত হতে দেখি। পূর্ববঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে আদিবাসীর জমি বিক্রির ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ আছে তা নানা কৌশলে অমান্য করায় তাদের অনেক জমি চলে যাচ্ছে বাঙালির হাতে। অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার 'এবরিজিনাল' হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় তারা এ আইনের সুযোগ নিতে পারছে না। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকার যেসব আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে সেসবের সঠিক প্রয়োগেও যত্নবান হওয়া দরকার।

এই গোষ্ঠীগুলো যেসব কারণে পিছিয়ে থাকছে এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে না তার মধ্যে অন্যতম রাজনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে 'বাঙালী' হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদ-এ আছে, 'রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।' কাজেই আমরা এটুকু বলতেই পারি যারা বাঙালি নয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রাপ্তিতে তাদের বেলায় ঘাটতি আছে। যারা বাঙালি নয় এবং যারা সরকারি দৃষ্টিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীও নয়, যেমন চা জনগোষ্ঠী ও হরিজন তাদের মর্যাদা এবং সামাজিক সুরক্ষা আরও দুর্বল। চা শ্রমিক, তাদের পরিজন এবং হরিজন যারা শহর পরিস্কার রাখেন, তাদের জীবন যে মর্যাদাহীন ও অরক্ষিত তা তাদের মজুরি বঞ্চনা, নিকৃষ্ট মানের আবাসন, ভূমিহীনতা, অদৃশ্যমানতা এবং পরিচয়হীনতাই বলে দেয়। মর্যাদাহীন এই জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে সামাজিক সুবিচার ও সুরক্ষা পাক এটা আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও দাবি।

সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অধীন 'স্পেশাল এফেয়ার্স ডিভিশন' কাজ করে। তবে তাদের পর্যবেক্ষণ হলো- 'স্পেশাল এফেয়ার্স ডিভিশন' বাজেট প্রণয়ন এবং আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করে না। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের দাবি স্পেশাল এফেয়ার্স ডিভিশন নয়, তাদের ভালোমন্দ দেখার জন্য এবং সহায়তার জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনসহ যেসব প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করে, তারা যদি অধিকার ও অধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনা নিয়ে ভালো কেস ডকুমেন্টেশন, অনুসন্ধান ও গবেষণা আরও জোরদার না করে তবে মানবাধিকার পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র, পুলিশ এবং প্রভাবশালী মহলকে ঠিক পথ অবলম্বন করতে হবে। তাই ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের দাবি তাদের অধিকার রক্ষায় একটি বিশেষায়িত মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হোক।

পার্লামেন্ট এবং সাংসদরা আইন প্রণয়ন করেন, আইনের বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন এবং প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করেন। রাষ্ট্রের কাছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা বাঙালি নয়, তাদের যেসব দাবি তারমধ্যে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি অন্যতম। রাষ্ট্র কীভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেবে? এক্ষেত্রে ভারতের সংবিধান (ট্রাইবাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল) অনুসরণ করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকা প্রণয়নের জন্য সংস্কৃতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে জাতীয় কমিটি কাজ করছে, তার সদস্যরা সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি তালিকা যদি প্রণয়ন করতে পারেন এবং তা সংবিধানে তফসিল আকারে আসে তবে এ পর্যন্ত স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পাশাপাশি ভূঁইয়া, ভূইমালী, ভূমিজ, রাজবংশী, কাদর, কোল, কোডা এবং আরও অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মহিমায় স্বীকৃতি পাবে।


আনিসুল হক
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। কাউকে ছোট করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তি দেশ স্বাধীন করেনি। আগামীতে ক্ষমতায় ফিরে এলে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। দলিত ও সমতল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমস্যার সঙ্গে কোনো দ্বিমত নেই। বর্তমান সরকার ফের ক্ষমতায় এলে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই 'বৈষম্যবিলোপ আইন' পাস করা হবে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। তাদের নিরাপত্তা ও ভূমি অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করছে। দেশে বৈষম্যবিলোপ দূর করতে বিশেষভাবে আইন প্রণয়নের চেষ্টা করা হবে। তবে সমাজের সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হওয়ার কারণে একজন ব্যক্তিকে হোটেলে খাবার দেওয়া হয় না, এটা শুধু ব্যক্তি নয়, মানবজাতির জন্য অপমানজনক। তাদের অধিকার যেন খর্ব না হয়, সে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দাবিগুলো বাস্তবায়নের দিক এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের দুঃখ-দুর্দশা যেন আর না বাড়ে সেই চেষ্টা করা হবে। 'দলিত ও সমতলের আদিবাসীদেও বর্তমান বাসস্থান থেকে নিশ্চিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবেনা। এই বিষয়ে আগামী একমাসের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে একটি ডিরেক্টিভস দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।'


সুলতানা কামাল
সমতল ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমার পায়ের তলার মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে দাঁড়াব কোথায়? যা প্রতিনিয়ত এই গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে ঘটছে। রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা ঘুরে দেখেছি, এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শ্মশান পর্যন্তও দখলে চলে গেছে। একটু একটু করে ইট সরিয়ে দখল করে নিচ্ছে স্থানীয়রা। তারা মারা যাওয়ার পরে যেখানে থাকবে, সেই জায়গাটাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সমতলের মানুষদের উন্নয়নে বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছে, তবে তা খুবই নগণ্য। তাও দুর্নীতির কারণে ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর অধিকারে বিষয়টি ভীষণভাবে অবহেলিত রয়ে গেছে। তাদের সমস্যার সমাধান করতে না পারলে আমাদের প্রচণ্ড সমস্যায় পড়তে হবে। এমনকী তাদের নিরাপত্তার জন্য যে আইন আছে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আইনমন্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি, আপনার মন্ত্রণালয়ে বৈষম্যবিলোপ আইনের খসড়া হয়ে আছে, কিন্তু আইনটা কেন পাস হয় না? বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে মানুষের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সে কারণে বিশ্বে এটা প্রামাণ্য দলিল হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী মাদার অব হিউম্যানিটি, সে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার পায় না! মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারকে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।

ফজলে হোসেন বাদশা
সমকাল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। এই প্রতিষ্ঠানটি একটি সঠিক জায়গায় হাত দিয়েছে। সমতলের দুর্দশার কথা উপলব্ধি করতে পেরেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হবে না। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে কয়েকটি উন্নয়নমূলক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। 'পার্বত্য চট্টগ্রাম' নিশ্চয়ই একটা ইস্যু। তবে সমতলে আদিবাসীদের দুর্দশা ও কাহিনী বলার কথা কমে গেছে। পুলিশ তো আদিবাসীদের বাড়িতে আগুন দিল। এমনকি প্রশাসন ও রাষ্ট্র তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করছে না। তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ প্রান্তিক মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সভা-সেমিনারে অন্তত চার-পাঁচবার অর্থমন্ত্রীকে বলেছি। বাজেটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কিছু উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা করার জন্য অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত 'ডায়েরি'তেও টুকে দিয়েছিলাম। তাদের জন্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা নয়, অন্তত একশ কোটি টাকার কথাও উল্লেখ করেছিলাম। কিন্তু বাজেট উপস্থাপনের সময় দেখলাম এই জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। আমি অর্থমন্ত্রীকে দোষ দেব না। হয়তো বয়সের কারণে ভুলেও যেতে পারেন। আদিবাসীদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের যে মন্ত্রণালয় রয়েছে ওই মন্ত্রণালয়ের 'স্পেশাল ডিভিশন'-এর মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের বিষয়গুলো দেখা হয়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছে, সমতলের আদিবাসীদের আমরা 'প্রটেক্ট' করতে চাই। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। কারণ এই মানুষগুলো সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করে। আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলি, সমতলের আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের ভূমি যে কেউ নিয়ে যেতে পারে। এসব ঘটনায় পুলিশ বা প্রশাসন কোনো নিরাপত্তা কিংবা দখলবাজদের বাধা দেয় না। কারণ 'ভূমি অধিকার আইন' বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না। একজন আদিবাসীকে হিন্দু বানিয়ে তার জমিটা 'দান' দেখিয়ে দখল করে নেওয়া হচ্ছে। রেজিস্ট্রি অফিসেও এগুলো কেউ দেখছে না। তাদের ভূমি যে কেউ নিয়ে যাচ্ছে। আর ভূমি দখলে সব দখলদারই এক। তাই সমতলের মানুষদের ভূমি রক্ষায় অবিলম্বে একটি 'ভূমি কমিশন আইন' করা জরুরি। এ ছাড়াও, আদিবাসীদের নানা ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। তাদের ভাষাগত সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুলে পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ করতে হবে। তাদের ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কাজ করতে হবে। দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশেষ আইন হওয়া উচিত।

ড. জাফর আহমেদ খান
সংবিধান অনুযায়ী এ দেশে সবার জন্য আইন সমান। আদিবাসীদের জন্য কিছু একটা করা দরকার। এখন ভাবার সময় এসেছে। রাঙামাটিতে ১২-১৩টা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনগত কাঠামো থাকা দরকার। কাউকে বাদ দিয়ে চলা যাবে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভিশনকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা মুক্ত বাংলাদেশ চাই। যার যে অধিকার আছে, সেটা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ব্যাপারে যতটুকু করা যায় ততটুকু করা যাবে।

সৈয়দ বোরহান কবীর
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যে লড়াই করেছিল, তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল 'সাম্য'। বৈষম্যহীন সমাজ। বঞ্চনামুক্ত একটা দেশ। আমরা যদি সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে যাই, তাহলে দলিত এবং আদিবাসীদের বাদ দিয়ে কখনই সম্ভব না। একটা সাম্যভিত্তিক সমাজ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং বঞ্চনামুক্ত সমাজ গড়তে পারব না। কাজেই আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলব, তখন আমাদের অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের ধারায় সবাইকে সমবেত করতে হবে। সেই লক্ষ্য থেকেই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা। আমরা মনে করি, একটা ত্রিমাত্রিক আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা পথ পাব। এটা একটা সূচনা মাত্র। যে সূচনার পথ ধরে বাংলাদেশে যারা বিপুল জনগোষ্ঠী আদিবাসী শ্রেণি আছে। বিশেষ করে বিপুল জনগোষ্ঠী, সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠী, যারা পদে পদে বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের জন্যই একটা নবযাত্রা শুরু করব এই ছোট ঘর থেকে।

অনীক আসাদ
'হেকস/ইপার সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। সংস্থাটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধকবলিত শরণার্থীদের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এ দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সংস্থাটি বিগত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করে চলেছে।' অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন বঞ্চনা ও অধিকারের আলোকে দেখতে পাই, এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটা সুগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার। যেখানে অধিকারগুলোকে 'অ্যাড্রেস' করতে পারব। আদিবাসী ও দলিতদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা একত্রে কাজ করতে চাই। এছাড়া, এই সরকার যেহেতু আদিবাসীবান্ধব সরকার। আজকের এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- জাতীয়ভাবে যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। তাই সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেব।

শিশির শীল
দলিত ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় একটি ভূমি কমিশন করা জরুরি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শক্ত উদ্যোগ নিয়ে একটি ভূমি কমিশন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, এই জনগোষ্ঠীর বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য-উপাত্ত নেই, যা উদ্বেগজনক। তাদের উন্নয়নের জন্য বার্ষিক কর্মসূচিতে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয় না। বর্তমান বাজেটে চা বাগানের আদিবাসীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অনেক লজ্জার বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরা দেশ পরিচালনা করছে, তাদেরই এ উদ্যোগ নিতে হবে।

মনি লাল দাস
দীর্ঘদিন ধরে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসীরা ভূমি কমিশন গঠনের দাবিতে আবেদন জানিয়ে আসছে। গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এর মূল কারণ ভূমি দখল। আদিবাসীদের নির্যাতনের প্রধান কারণ হচ্ছে 'জমি'। এই জমিকে কেন্দ্র করেই একদিকে আদিবাসীরা খুন হচ্ছে, অন্যদিকে তারা ভূমি হারাচ্ছে। আবার ধর্ষিত হচ্ছে আদিবাসী মেয়েরা। কেউ কেউ দেশান্তরী হচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে ৫/৬ জন আদিবাসী খুন হচ্ছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষার জন্য অন্তত ভূমি কমিশন গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এমনিতেই আদিবাসীরা সংখ্যালঘু। এছাড়া, 'মাইনোরিটি'র ওপর 'মেজরিটি'র অত্যাচার তো থাকেই। আইন-আদালতের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, এ দেশে দুষ্টের পালন হয়, দমন হয় না। ভূমির দলিল জাল হওয়া সত্ত্বেও আইনজীবীরা জেনেশুনে অন্যায়কারীর পক্ষে সাফাই গাচ্ছে। এতে ভূমি হারায় আদিবাসীরা। এ ছাড়া, বর্ণবৈষম্য তো আছেই। তাই অনতিবিলম্বে 'ভূমি কমিশন' গঠনের দাবি জানাচ্ছি। আমরা আদিবাসীরা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায়, তখন আমাদের মা-বোনদের পুকুরে নাক ডুবিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে সাতক্ষীরায় অনেক আদিবাসীই পালিয়ে দেশ ছেড়েছে। আমরা আর কত নির্যাতনের শিকার হব? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও যদি আমরা অধিকার ফিরে না পাই তাহলে যাব কোথায়?

রুশিনা সরেন
আমি সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারী। সেখানে আমাদের ভোটার সংখ্যা ২০ হাজার। মোট ভোট রয়েছে ৮০ হাজার। 'মেজরিটি' এবং 'মাইনোরিটি' সবাই আমাকে নারী হিসেবে সম্মানিত করেছে। ফলে আমি উপজেলার নারী ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হতে পেরেছি। কিছু কিছু জায়গায় কঠোরপন্থি আছে। ফলে সেখানে আদিবাসীরা নির্যাতনের শিকার হয়। এদিকে কুচক্রী মহলও কিছু কিছু আদিবাসীকে ভুল পথে নেয়। পরে বেনামে আদিবাসীদের জমি দখল করে নেয়। চাকরিতে আদিবাসীদের কোটা রাখতে হবে। তবে আদিবাসী নারীরা ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাবার সম্পত্তিতে যেমন ভাগ পায় না। তেমনি স্বামীর সম্পত্তিতেও অধিকার নেই। ফলে আদিবাসীরা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নির্যাতিত। তাই নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে ও আদিবাসী নারীদের অধিকার রক্ষায় বাবা ও স্বামীর সম্পত্তিতে যেন ভাগ পায়, তা আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সঞ্জীব দ্রং
একটি রাষ্ট্র, দেশ বা গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী তা ওই দেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কেমন আছে তা দেখলে বোঝা যায়। আদিবাসীরা মানুষ। তাদের যে ভূমি অধিকার, সেটা মানবাধিকার। কিন্তু আমাদের দেশে আদিবাসীদের জন্য কোনো 'পলিসি' নেই। বিদ্যমান আইনে আদিবাসীদের অস্তিত্বও নেই। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে তারা দেশে থাকতে পারবে না। একটি পূর্ণাঙ্গ আইন করা হলে কাঠামোগতভাবে তারা ভালো থাকতে পারবে। অথচ ভারতের স্বাধীনতার ১২ বছরের মাথায় ওই দেশের আদিবাসীদের উন্নয়নে ও অধিকার রক্ষায় একটি আইন করা হয়েছে।

মো. মোজাহিদুল ইসলাম
মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দলিত ও আদিবাসীদের বসবাস যেখানে, সে জায়গাটা অনুন্নত। অর্থাৎ বিদ্যুৎ-এর খুঁটিটা ওখানে গিয়ে শেষ হয়েছে। এমনকী পাকা রাস্তাটাও শেষ হয়েছে ওই জায়গাতেই। ওই পাড়ার পুকুরগুলোও ভেঙে যাচ্ছে। এরকম একটা বৈষয়িক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, সব রকম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার এই মানুষগুলো। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বঞ্চনা মোকাবেলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতি কাঠামোর দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি, দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার যদি সদয় হয় বা দৃষ্টি দেয় তাহলে এই মানুষগুলো তাদের অধিকার ফিরে পাবে। এজন্য অবশ্যই নতুন আইন করতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পল্লব চাকমা
আদিবাসী ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন প্রকৃতিনির্ভর। কিন্তু আজ তাদের প্রকৃতি থেকে জোর করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে চলেছে। তাই আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে ও অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন করা জরুরি। আর আইন করার সময় তাদের মতামত গ্রহণ করাও প্রয়োজন। পাশাপাশি আদমশুমারিতে যেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও ন্যায়সঙ্গত।

ড. শহিদুজ্জামান
সমতলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশই চরম দারিদ্র্য এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার। উন্নয়নশীল দেশ হলেও এখন পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌল-মানবিক অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি তাদের ভূমি দখল করে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের কিংবা স্থানীয় ব্যক্তিরা। এমনকি আদিবাসীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য যে 'স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন' কাজ করে। সেই ডিভিশন স্বচ্ছভাবে কাজ করছে না। সম্প্রতি কয়েকজন হিন্দু বাঙালি প্রকল্প থেকে অর্থ পেয়েছে। কিন্তু দলিতরা পায়নি। তাই স্থানীয় মন্ত্রণালয়কে ভালো হতে হবে। সংবেদনশীল হতে হবে। তবেই দলিত জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। আরেকটা বিষয় সমতল ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নতুন নতুন আইন দরকার। পাশাপাশি সুন্দর সুন্দর যেসব আইন আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি।

নওরীন আক্তার শারমীন
সমতল এলাকার আদিবাসীরা নিজের জমির রেকর্ড রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রভাবশালীদের নজরে পড়ে ওই জমি জবরদস্তি দখল হচ্ছে এবং অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে জালিয়াতি করে অনেকে তাদের জমি দখল করেছে। এভাবে জমির মালিকানা থেকে দিন দিন আদিবাসীদের নাম মুছে যাচ্ছে। আদিবাসীদের জমি বিনা রেজিস্ট্রিতে এক শ্রেণির দখলদার মানুষ জবরদখল করে ভোগ করছে। এছাড়া আদিবাসীদের বসতভিটা বরাদ্দের কোনো পদ্ধতি নেই। ভূমি কমিশন গঠনের সময় যেন ছোট ছোট সমস্যা সমাধান করা হয়। আইনের মধ্যে যেন কোনো বড় ফাঁক না থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বন বিভাগের অনেক অব্যবহূত জায়গা রয়েছে। আদিবাসীদের বসতভিটা বাড়ানোর জন্য তাদের সেই জমি যেন বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়।

চানিয়া রানী বাঁশফোর
আমাদের ভিটা নাই। যেখানে থাকি, সে জায়গাটুকুও দখল করে নিয়েছে স্থানীয়রা। এমনকি পুকুর পরিস্কার করে মাছ চাষ করার পর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে গেলেই ক্ষমতাসীনরা ওই পুকুরটিও দখল করে নেয়। তাই আমাদের ভূমি রক্ষায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি। শিক্ষা, ভূমি অধিকার, স্বাস্থ্য- সকল ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীরা বঞ্চিত। এ সরকার সদয় না হলে, আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

বনানী বিশ্বাস
আদিবাসীদের হিন্দু সাজিয়ে জমি দখল করা হয়। এটি সম্পূর্ণ বাস্তব। তবে হিন্দুদের মধ্যে যারা বেশি সমস্যায় আছে, তাদের মধ্যে দলিতের সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে কয়েকটা গোষ্ঠীর তো কোনো ভূমিই নেই। তাহলে তারা থাকবে কোথায়? যে মানুষদের কোনো জমি নেই, তাদের অবশ্যই ঘর করে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। অবশ্যই এ সরকারের ভূমি কমিশন গঠন দরকার। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি নিশ্চিত করতে হবে। 'বৈষম্যবিলোপ আইন' ঝুলে আছে, তা পাস করাও জরুরি। আরেকটা বিষয় এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আমরাও কাজ করছি। কারণ, এসব দলিতকে পিছিয়ে রেখে এসডিজি অর্জন করা সক্ষম হবে না। তাই দলিতদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চাকরি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে কোটা রাখতে হবে। কোটা সংস্কার করা হোক আর না হোক আদিবাসীদের জন্য ৫% রাখতে হবে। আদিবাসীদের জন্য কোটা বাদ দিলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

নির্মল চন্দ্র দাস
আমি হরিজন সম্প্রদায়ের। আমরা এমন একটা সম্প্রদায়ের, যাদের কেউ গণনা করে না। অথচ বাংলাদেশে ১৫ লাখ হরিজন রয়েছে। আমাদের বাদ রেখে কীভাবে এসডিজি পূরণ করা সম্ভব হবে? আমাদের তো এক ইঞ্চিও জমি নেই। অনেকে ভূমি রক্ষা কিংবা ভূমি পাওয়ার আশায় আন্দোলন করে। আমরা কিসের আশায় আন্দোলন করব। তারপরেও প্রধানমন্ত্রী, মানবতার জননী আমাদের কথা দিয়েছেন উচ্চ ভবন করে আমাদের বসবাসের জায়গা নিশ্চিত করবেন। এজন্য তিনি অর্থ বরাদ্দও দিয়েছিলেন। কিন্তু সিটি করপোরেশন তাদের পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য ভবন নির্মাণের জন্য ওই টাকা নিয়েছে। অথচ মাত্র ৫ হাজার পরিচ্ছন্নকর্মী সিটি করপোরেশনে চাকরি করে। এই সম্প্রদায়ের আরও ৩৫ হাজার মানুষ অন্য অফিসে বা ভিন্ন স্থানে কাজ করে চলে। তাদের কী হবে? আমরা মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অসুস্থ পরিবেশে কাজ করি। অথচ আমাদের কোনো হোটেলও খেতে দেয় না। বলে, আমাদের নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে। আমরা আর কত পরিবর্তন হব? এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৬শ' ছেলেমেয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া শেষ করে বের হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার। তাই 'বৈষম্য বিরোধ আইন' করে আমাদের সুষ্ঠুভাবে বাঁচার অধিকারটুকু দেন।

নুরুন্নবী শান্ত
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামে সকল শ্রেণিপেশার মানুষের পাশাপাশি হরিজনরা ঘরে বসে থাকেনি। তারাও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমে পড়েছিল। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দলিত ও সমতল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক অধিকার রক্ষায় ভূমি কমিশন গঠন, পাশাপাশি তাদের অধিকার ও নিরাপত্তায় নতুন একটি প্রাতিষ্ঠানিক নীতি কাঠামো ও 'বৈষম্য বিলোপ আইন' প্রণয়ন জরুরি।

প্রধান অতিথি
আনিসুল হক
মন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

সঞ্চালক
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সমকাল

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক
ফিলিপ গাইন
পরিচালক, সেড

আলোচকবৃন্দ
সুলতানা কামাল
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী
উপদেষ্টা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার

ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি
প্রধান উপদেষ্টা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ
আহ্বায়ক, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস

ড. জাফর আহমেদ খান
সিনিয়র সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ

সৈয়দ বোরহান কবীর
নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত ও চেয়ারম্যান, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেড

অনীক আসাদ
কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেকস/ইপার বাংলাদেশ

সঞ্জীব দ্রং
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয় আদিবাসী ফোরাম

শিশির শীল
সেক্রেটারি জেনারেল, সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপি জিস্‌)

ড. শহিদুজ্জামান
নির্বাহী পরিচালক, ইএসডিও

মনি লাল দাস
আইনজীবী, সভাপতি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও বাংলাদেশ দলিত পরিষদ, রংপুর

রুশিনা সরেন
ভাইস চেয়ারম্যান, ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ

মো. মোজাহিদুল ইসলাম
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, হেকস/ ইপার বাংলাদেশ

পল্লব চাকমা
নির্বাহী পরিচালক, কাপেং ফাউন্ডেশন

চানিয়া রানী বাঁশফোর
সেতাবগঞ্জ, পঞ্চগড় দিনাজপুর

বনানী বিশ্বাস
নির্বাহী পরিচালক, অভিযান

নির্মল চন্দ্র দাস
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ

নুরুন্নবী শান্ত
কো-অর্ডিনেটর, এনএনএমসি

নওরীন আক্তার শারমীন
প্রতিনিধি, আরকো

অনুলিখন
ওয়াকিল আহমেদ হিরন
সিনিয়র রিপোর্টার

সাজিদা ইসলাম পারুল
স্টাফ রিপোর্টার
নাটোরে নির্মাণাধীন ড্রেনে আবারও মিললো গ্রেনেড

নাটোরে নির্মাণাধীন ড্রেনে আবারও মিললো গ্রেনেড

নাটোর শহরে নির্মাণাধীন ড্রেন থেকে আরও একটি গ্রেনেড উদ্ধার করা ...

ঢাকায় সাপের দংশনে প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

ঢাকায় সাপের দংশনে প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

ঢাকার ধামরাইয়ের রামদাইল গ্রামে বিষাক্ত সাপের দংশনে দেলোয়ার হোসেন সোহাগ ...

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপহার দিয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান। ...

ভারতের কাছেও বড় হার বাংলাদেশের

ভারতের কাছেও বড় হার বাংলাদেশের

পরপর দুই ম্যাচে বড় হারের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ...

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে ...

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

ড্রেসিংরুম থেকেই জরুরি তলব ঢাকায়-ওপেনিংয়ে কিছুই হচ্ছে না। সৌম্য সরকারকে ...

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ...

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পি ও নবাগতা অধরা খান জুটির ...