যতীন সরকার

ভয়শূন্য হোক রাষ্ট্র

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস' স্লোগানকে সামনে নিয়ে দৈনিক সমকালের পথ চলার শুরু হয়েছিল ১৪ বছর আগে। নবযাত্রার প্রাক্কালে সমকালের এবারের প্রতিপাদ্য 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য'। বাংলাদেশের সংবাদ জগতে সমকালের ভয় আর আপসহীন পথ চলার জন্য তাদের সাধুবাদ জানাতেই হয়। মার্কসবাদীরা যে রাষ্ট্রকে বলেন 'দমনের যন্ত্র', সেই দমন তো নাগরিকদের ভয়তস্ত্র রেখেই করা হয়ে থাকে। শুধু রাষ্ট্রের কথাই বা বলি কেন? ভয় তো সূচিত হয় পরিবার থেকেই। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা কনিষ্ঠদের ভয়ের বাঁধনেই বেঁধে রাখতে চান। পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের অধিবাসীরূপে যেসব ভূতের ভয়ে আমাদের সবার সন্ত্রস্ত থাকতে হতো, সেই পাকিস্তানকে বিদায় দিয়ে বাংলাদেশে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও সেই সব ভূত ও ভূতের ভয় থেকে মুক্তি পাইনি। বাংলাদেশের ঘাড়েই তো পাকিস্তান ভূত হয়ে চেপে বসেছে। সেই ভূত প্রতিনিয়ত ধর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। সেই ভয়ে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও সদা কম্পমান। এ গোষ্ঠীর সবাই ভূতকে সন্তুষ্ট রাখার উপায়ের খোঁজ করে। এরাই অগণিত শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা রাষ্ট্রীয় সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে লোপাট করে দিয়ে 'রাষ্ট্রধর্মের' কথা প্রবর্তন করেছে, এবং ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন পাকিস্তানি ভূতদের শহরে সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। সবাই জানি, যে সময়ে আমরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম, সে সময়ে পৃথিবীটি ছিল সমাজতন্ত্রীয় ও সাম্রাজ্যবাদী- এরকম পরস্পরবিরোধী দুই শিবিরে বিভক্ত। তখনকার ভারতের মতো শক্তিশালী জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আমাদের সংগ্রামের সাথি হতে পেরেছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতন্ত্রী শিবিরের সহায়তা পেয়েই। বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি কিন্তু সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সমাজতন্ত্রী শিবিরের অনুপস্থিতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই আজ নিজেকে যেন বিশ্বেশ্বর ভেবে বসেছে। অন্যদিকে ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদবিরোধী সংগ্রাম না করে কিছুতেই আমাদের দেশটিকে তার মূল লক্ষ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। সেই সংগ্রাম তো একাত্তরের সংগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি দুরূহ। সেই দুরূহটাকেই অতিক্রম করার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, তার কিছুই আমরা এখনও করে উঠতে পারিনি। প্রস্তুতি গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে আছি- এমন কথাও বলতে পারছি না। অথচ আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো আজ অনেক বেশি সংহত। বিশেষ করে একাত্তরে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সহযোগী জামায়াতে ইসলামী তো সর্বোতভাবেই তার প্রতাপে প্রবল উপস্থিতি ঘোষণা করছে। জামায়াত তো 'মডারেট মুসলিম শক্তি'- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকেই এমন সার্টিফিকেটপ্রাপ্তি তাদের মনোবলকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াতের মতোই আরও অনেক অনেক গোষ্ঠী নামে-বেনামে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বিগত অর্ধদশক ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা সমাসীন, তারা তো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী শক্তিরই উত্তরাধিকার বহনকারী। কিন্তু তারা কি সুসংহত? তাদের অভ্যন্তরেও কি অনেক মতলববাজের সমাবেশ ঘটে যায়নি? সেই মতলববাজরাই কি সেই দলের ভেতর অনেক বেশি প্রবল হয়ে উঠছে না?

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দলটির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারবাহী যারা, তারাও যে আজ পূর্বেকার সেই নির্দি্বধ প্রত্যয়কে ধারণ করতে পারছেন না- সে কথা তো বেদনাদায়ক হলেও সত্য। সাম্রাজ্যবাদের কাছে তারা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বসেছেন- এমন কথা অবশ্য বলা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের অনেক উপদেশ কিন্তু অমান্য করার সাহসও তারা দেখিয়েছেন। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। অকুণ্ঠ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মৌলবাদবিরোধী না হলে কিছুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা আর মৌলবাদ-বিরোধিতা একই সূত্রে গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি হয় না। এখানেও কিন্তু নানা ধরনের দোদুল্যমানতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। একটি বিশেষ ধর্মতন্ত্রকে রাষ্ট্রধর্মরূপে বহাল রাখব, আবার সাম্রাজ্যবাদকে না চটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ থেকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব- এ রকমটি কী করে সম্ভব হতে পারে; আমার মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষের পক্ষে তা বোঝা খুবই কঠিন।

অপরিমেয় ধন, মান, প্রাণ উৎসর্গ করে আমরা পাকিস্তান নামক একটি অপরাষ্ট্রের হাত থেকে আমাদের দেশটিকে উদ্ধার করেছিলাম। পাকিস্তানের সব অপনীতিকে পরিত্যাগ করে চারটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর আমাদের রাষ্ট্রটিকে দাঁড় করিয়েছিলাম। দ্বিজাতিতত্ত্ব নামক যে অপতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রী, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবর্জিত রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল, সে সবকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের রাষ্ট্রের সব নাগরিকই হবে সমান মর্যাদার অধিকারী। শোষক ও শোষিতের বৈষম্যমুক্ত এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলব, যে ব্যবস্থায় দেশের সব মানুষের জন্যই খাদ্য-বস্ত্র-আবাস-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা লাভের নিশ্চয়তা থাকবে। এসব প্রত্যাশাকে বাস্তব করার পথ ও পদ্ধতিই আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে বিধিবদ্ধ করেছিলাম। সে পথ ধরেই কিছু দূর আমরা এগিয়েও গিয়েছিলাম। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করলাম যে, পথটি বড়ই কঠিন। দেখলাম, পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরই একটি গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। সেই গোষ্ঠীটি সক্রিয় সহায়তা করছে আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী দৈশিক ও বৈশ্বিক সব অপশক্তির। বলতে গেলে, ওরা সবাই মিলে বাংলাদেশের পাকিস্তানায়ন ঘটানোরই পাঁয়তারা করছে। যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে আমাদের স্বাধীনতাকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারাই সেই স্বাধীন দেশটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালেই সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় সেই সংগ্রামটিকে ভিন্ন লক্ষ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতলব এঁটেছিল যারা; তখনই তারা সফল হতে না পারলেও, স্বাধীনতা-পরবর্তী চার বছরকাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিল। বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে তারা সপরিবারে হত্যা করল। কারাগারে আবদ্ধ করল বিপুলসংখ্যক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে। কারাগারেই নির্মমভাবে হত্যা করল জাতীয় চার নেতাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ওরা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানটির খোলনলচে পাল্টে দিল। ধর্মনিরপেক্ষতার উৎখাত ঘটিয়ে ও একটি বিশেষ ধর্মতন্ত্রকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে বাংলাদেশের খোলসের ভেতর পাকিস্তানের ছাঁচ ঢুকিয়ে দিল।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বেনামিতে প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করল। সমাজতন্ত্রের হাস্যকর সংজ্ঞা দিয়ে শোষণভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাকেই পাকাপোক্ত করে তুলল এবং গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রের সেবাদাস বানিয়ে ফেলল। অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে নাম-পরিচয়টি বহাল থাকলেও সংগ্রামের মাধ্যমে লব্ধ এর অন্তঃস্বরটি আর অবশিষ্ট রইল না। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আগুন যাদের অন্তর-গভীরে সবর্দা জ্বলজ্বল করছে, যাদের কেউই বাংলাদেশের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াকে মেনে নিতে পারে না, তাদের সংখ্যা মোটেই কম নয়। কিন্তু তারা করবে কী? তাদের সামনে পর্বতসম বাধা। সেসব বাধা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সেগুলোর স্বরূপ, প্রকৃতি এবং কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে সেগুলোর উদ্ভব ও বিস্তৃতি ঘটেছে- সবই বুঝে নিতে হবে। বামপন্থিদের তো আমরা সুনিষ্ঠ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মৌলবাদবিরোধী বলেই জানতাম। কিন্তু এখানেও তো আজ সংশয়ের কীট বাসা বেঁধেছে। বিপুলসংখ্যক বামপন্থিই তো আজ উন্মার্গগামী। সেই উন্মার্গগামীদের কাছে কিছুই তো প্রত্যাশা করা যায় না। সিপিবি ও বাসদ প্রকৃত বামপন্থি বিকল্পের মধ্যেই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা অবলোকন করছে। অথচ সেই বিকল্প উদ্ভবের আশু সম্ভাবনা যে নেই, তা আমাদের সবারই জানা।

তাহলে উপায়? উপায়হীনতার মধ্যে বসবাস করাই কি আমাদের অনিবার্য নিয়তি? নিশ্চয়ই নয়।

আশাবাদী আমাদের হতেই হবে। তবে আমি সর্বদাই বলে থাকি এবং আজও বলছি, নিষ্ফ্ক্রিয় আশাবাদ আমাদের কখনও গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না। সদা সক্রিয়তাই আশাবাদকে সার্থক করে তোলার হিরণ্ময় পথ। তবে পুনরাবৃত্তি হলেও আবার বলি, সে পথ খুবই কঠিন। দৃঢ়চিত্ত হয়েই সেই কঠিন পথে চলতে হবে আমাদের। এখানে ভয়ের কোনো স্থান নেই। খুব সহজে যে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না- এমন কথা মেনে নিয়েই পথে নামতে হবে। পথের কাঁটা সরাতে সরাতেই পথ চলতে হবে।

দৈনিক সমকাল পত্রিকা ১৪ বছরে পদার্পণ করেছে। পত্রিকাটি এ পর্যন্ত যথার্থ দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে এসেছে। মুক্তিবুদ্ধি চর্চার প্রসার ঘটানোতেও তাদের অবদান কম নয়। এখন এই মুহূর্তে এ বিষয়ে এই পত্রিকাটিকে আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠতে হবে। শুধু এই পত্রিকাটি নয়, সব গণমাধ্যমকে একত্র হয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চায় নিয়োজিত হতে হবে।

লেখক

প্রাবন্ধিক

শিক্ষাবিদ
একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

রাজনীতির নানামুখী হিসাব-নিকাশের কারণে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক আসনে ...

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। নারী-পুরুষ-শিশু সব ...

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক এমএনএইচ বুলু ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর রোড ...

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

একাদশ সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ...

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে ...

কলেজ শিক্ষকের ধর্ষণে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা!

কলেজ শিক্ষকের ধর্ষণে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা!

মাত্র ১০ বছরের মেয়েটি স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, ...

কর্নেল (অব.) জাফর ইমামের মনোনয়ন ফরম ছিনতাই!

কর্নেল (অব.) জাফর ইমামের মনোনয়ন ফরম ছিনতাই!

ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চাওয়া কর্নেল (অব.) জাফর ...

চোখ হারানো প্রত্যেকে পেলেন ৫ লাখ টাকা

চোখ হারানো প্রত্যেকে পেলেন ৫ লাখ টাকা

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে ...