এমাজউদ্দীন আহমদ

স্বপ্নের বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

বাংলাদেশ আমার স্বপ্নের দেশ। এই দেশের মাটি আর মানুষকে ভালোবাসি এবং খুব গভীরভাবে। এদেশের মাটি সুরক্ষিত হোক আর এর অধিবাসীরা উন্নত জীবনের অধিকারী হোক- এই স্বপ্ন নিয়েই তো বেঁচে রয়েছি। প্রায় চার হাজার বছর পরে সর্বপ্রথম এদেশের শাসন কাজ পরিচালিত হচ্ছে এই মাটির সন্তানদের দ্বারা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। এর পূর্বেও দেশ ছিল। দেশের মাটি ছিল। ছিলেন দেশের অধিবাসীরা। কিন্তু কোনো সময় এর নীতি নির্ধারিত হয়নি এ মাটির সন্তানদের দ্বারা। ১৯৭১ সালের পর থেকে নতুন অধ্যায়টির সূচনা হয়েছে। এই অধ্যায় অক্ষয় হোক। অমর হোক। চিরন্তন হোক। এই স্বপ্ন নিয়ে তো রয়েছি। এ জন্য যা প্রয়োজন সে সম্পর্কে ভাবি এবং লেখাজোখা করি। আমার আলোচনা-পর্যালোচনার মৌল বিষয় এটাই। অনভিজ্ঞতার জন্য হয়তো রাজনীতি ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমরা বারে বারে হোঁচট খাচ্ছি। যত দ্রুত পথচলা উচিত সে গতি হয়তো নেই। হয়তো নেই সেই সক্ষমতা। তাতে দোষের কিছু নেই। যা নেই তা অর্জন করতে হবে। দেশের মাটিকে আরও উর্বর করতে হবে। দেশের জনগণকে সৃজনশীল করার স্বপ্ন দেখি, যা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, যুক্তিবাদী, মুক্তমনের অধিকারী, হৃদয়বান নাগরিকের বাংলাদেশ। আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাস-সমৃদ্ধ, সৃষ্টিশীলতায় উদ্দীপ্ত, নিজেদের ভাগ্য গড়ার দৃঢ়প্রত্যয়ে আস্থাশীল নাগরিকের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে থাকবে না দারিদ্র্য।

থাকবে না ব্যাধি-অপুষ্টি। সমাজ হবে দুর্নীতির কলুষমুক্ত। সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে আকাশের মতো হবে উদার। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পশূন্য সকল মত-পথ ও বিশ্বাসের অবাধ চারণক্ষেত্র। মিলনের তীর্থক্ষেত্র শহীদ মিনারের মতো। এই দেশের মাটি ও মানুষকে উন্নত করার দর্শনই আমার দর্শন। মাটিকে সুরক্ষিত রাখার স্বপ্ন আমার স্বপ্ন। এর অধিবাসীদের সৃজনশীল করার প্রত্যয় আমার প্রত্যয়। সবার মাথা উন্নত রাখার আকাঙ্ক্ষাই আমার সাধনা। জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। উজ্জ্বল বলছি বিভিন্ন কারণে। এক, বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র। বিশ্বের সমগ্র জনসমষ্টির প্রতি ৪৬ জনের একজন বাংলাদেশি। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বাংলাদেশ এর ১৩৩তম সদস্য। বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের পরে যে ৬০টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হয়েছে, তার সবগুলোর মোট জনসংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। বর্তমানে এই জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। এই ১৬ কোটি মানুষ যদি উন্নত মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে, এবং শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে এক উলেল্গখযোগ্য শক্তিতে। দুই, বাংলাদেশ শুধু জনসংখ্যার নিরিখেই নয়, এখন পর্যন্ত যে সব সম্পদ আবিস্কৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা হবে তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার ঘটলে যে দারিদ্র্য এখন বাংলাদেশের নিত্যসহচর তা পালাবার পথ পাবে না। তিন, মানবিক উপাদান হিসেবে বাংলাদেশের জনসমষ্টি উন্নতমানের। মানবসম্পদরূপে গড়ে তুলতে পারলে যে কোনো পর্যায়ে যে কোনো প্রতিযোগিতায় তারা উতরে যাবে সাফল্যের সঙ্গে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সাফল্যের দিকে দৃষ্টি দিলেই সব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চার, প্রতিবেশী ভারত এবং পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ আলোচনা-পর্যালোচনা, বিচার-বিশ্নেষণ বা ক্ষুরধার যুক্তির জৌলুসে জন্মলাভ করেনি। বাংলাদেশ প্রাণ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে। বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন সংকটকালে। সংকটকালেই তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন অতীতে। ভবিষ্যতেও তারা এমনই পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বিধাবোধ করবেন, ফলে এমন দেশটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল না হয়ে পারে না। এই বিশ্বাস নিয়েই তো আজও বেঁচে আছি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। এক, বাংলাদেশের জনগণের দেশপ্রেম জাগ্রত রাখতে হবে। কোনো জনপদে দেশপ্রেম আপনা-আপনি জাগ্রত হয় না। সংকটকালে তার প্রকাশ ঘটলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না আপনা-আপনি। এ জন্য প্রয়োজন নিরন্তর চর্চার, সার্বক্ষণিক যত্নের, প্রতি মুহূর্তের পরিচর্যার। জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধির উত্তম পন্থা হলো দেশের শাসন-প্রশাসনে তাদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত করা। গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়েই সাধারণ মানুষ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন এবং একাত্মতার উষ্ণ অনুভূতিই দেশপ্রেম। গণতন্ত্র হলো এর সঠিক পথ। দুই, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্য দেশপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বটে, তবে তাই যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় নাগরিকত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ। দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, নৈপুণ্যের মতো গুণাবলি এ লক্ষ্যে এক একটা মণিমুক্তা। নাগরিকদের তা আয়ত্তে আনতে হবে। সুশিক্ষার সিংহদরজা দিয়েই জাতীয় জীবনে তা প্রবেশ করে সগৌরবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে সচকিত করে তোলে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। রাষ্ট্রের প্রতি নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কে। সুশিক্ষিত জনসমষ্টি হলো যে কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রধানতম রক্ষাকবচ। তিন, জাতীয় সংহতি হলো জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্য নাম। যে জাতি যত সুসংহত এবং সুবিন্যস্ত সেই জাতি তত বেশি স্বাধীন। তত বেশি সার্বভৌম। জাতীয় পর্যায়ে ভিন্ন মত থাকবে। থাকবে ভিন্ন পথের দিশা। ভিন্ন মত ও পথের জন্যই রাজনীতি এত অর্থপূর্ণ। কিন্তু রাজনীতিকে সার্থক করতে হলে ভিন্ন মত ও পথকে ছাপিয়ে সমাজব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে ঐকমত্য। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ভাষার প্রশ্নে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এমন ঐকমত্যই ছিল এ জাতির প্রধান মূলধন।

জাতি হিসেবে বাংলাদেশের রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। রয়েছে এর সুস্পষ্ট গন্তব্য। জাতির এই লক্ষ্য এবং গন্তব্যকে ধারণ করেই রাষ্ট্রকে তার নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং হাজারো প্রতিবন্ধকতা জয় করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। সাম্য (Equality), মানবিক মর্যাদা (Human dignity) এবং সামাজিক ন্যায়নীতি (Social justice) রাজনৈতিকভাবে ঘোষিত হয়েছে এসব লক্ষ্য। তা ছাড়াও রয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অর্জনের লক্ষ্য, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের উন্নত জীবনের আশীর্বাদ আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সব নাগরিকের মাথা উঁচু করে, রাজনীতির বৃহত্তর ক্ষেত্রে নীতি গ্রহণের সব স্তরে এবং নীতি বাস্তবায়নের সব পর্যায়ে অংশগ্রহণের অধিকার-সমৃদ্ধ পরিপূর্ণ জীবন গঠনের লক্ষ্য। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাই এমন নীতি, যা জাতীয় স্বার্থ এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের উপযোগী। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। চাই দেশের চার পাশে এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বহুসংখ্যক নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র। চাই নাগরিকদের মধ্যে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতীয় মানস। সবার ওপরে চাই নিরপেক্ষ, আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ শাসক-প্রশাসক, যারা কোনো জনপদের প্রতি বিরাগ বা অনুরাগে নয় অথবা ক্ষণিক লাভের প্রত্যাশায় নয়, বরং জনস্বার্থ বা জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর হতে পারেন। বাংলাদেশের নীতি হতে হবে এমন, যা শুধু বর্তমানের প্রেক্ষাপটে নয়, বরং আগামী তিন-চার দশকের স্বপ্ন পূরণেও সক্ষম।

এ জন্য কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে জনকল্যাণমূলক করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সুসংহত যৌথ জাতীয় কর্মে রূপান্তরিত করা এবং জাতীয় কর্তব্যের প্রকৃষ্ট মাধ্যমরূপে তার প্রকৃতিতে সার্বিক পরিবর্তন সাধন করে রাজনীতিকে সৃজনশীল করা। এ সম্পর্কে অনেকেই চিন্তাভাবনা করেছেন। JDB Millier রাজনীতি সম্পর্কে অনেক লিখেছেন, কিন্তু সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছতে পারেননি (Millier, 1965, Pelican Books)। তার কথায়, 'এক মহান ক্রীড়ার মতো রাজনীতিতে রয়েছে নেতৃত্ব, প্রশংসা লাভ এবং আত্মনিবেদনের সুযোগ' (Politics, like a game, gives Scope for leadership, for applause and dedication)। কিন্তু রাজনীতি তার যথার্থ রূপ পেতে হলে হতে হবে 'জনকল্যাণের লক্ষ্যে এমন এক সুসংহত যৌথ কর্ম, যা নৈতিকবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কোনো মহৎ কর্ম সম্পাদন করার এক প্রকৃষ্ট পন্থা' [[Politics is a means of getting things done, often with a strong sense of moral urgency-Ibid, 23]

জনসমাজ যতদিন থাকবে এবং সমাজে যতদিন অভাব-অনটন থাকবে এবং তা নিরসনের জন্য যতদিন বহুমুখী ব্যবস্থা থাকবে রাজনীতিও ওই সমাজকে ঘিরে টিকে থাকবে। রাজনীতিকে তাই শান্তিপূর্ণ, যুক্তিবাদী এবং প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য এবং রাজনীতি থেকে সন্ত্রাস ও সংঘাত দূর করার জন্য অতীব প্রয়োজন সমাজে মৌল সমস্যা সম্পর্কে সমাজব্যাপী এক ঐকমত্যের ঘন আস্তরণ তৈরি করা। কিন্তু সমাজব্যাপী সেই ঐকমত্য শুধু তখনই তৈরি হবে, যখন রাজনীতি সংকীর্ণ স্বার্থের আবর্ত থেকে, জনজীবনের বৃহত্তর অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়বে এবং গোষ্ঠী স্বার্থ বা শ্রেণিস্বার্থের দেয়াল ভেঙে ছিটিয়ে ছড়িয়ে পড়বে জনস্বার্থের উদার প্রান্তরে এবং বিস্তৃত হবে কল্যাণমুখী বিস্তৃত মোহনায়। ক্ষমতার রাজনীতিকে তাই অনেকেই রাজনীতি বলতে চান না। ক্ষমতার রাজনীতিতে নৈতিকতার কোনো প্রলেপ নেই। না থাকায় মানব সমাজের কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তার কারণও রয়েছে। এক, যে সমাজে ক্ষমতার রাজনীতি প্রচলিত সেক্ষেত্রে গণতন্ত্র অচল, কেননা গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি যে নির্বাচন ব্যবস্থা তা কখনও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হয় না। এই ব্যবস্থায় ভোটদাতা নির্ভয়ে ভোটদানে সক্ষম হয় না এবং ভোটপ্রার্থীও ভয়শূন্যচিত্তে ভোটদাতাদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করতে পারে না। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে যে পার্থক্য তা মুছে ফেলা হয় এবং সরকার ও ক্ষমতাসীন দল একাকার হয়ে পড়ে। দুই, যে সমাজে ক্ষমতার রাজনীতি প্রচলিত সেই সমাজে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমন কী নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে নির্বাচন কমিশন তাদের সদস্যদের অধিকাংশই নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ অথবা দলের নেতৃবৃন্দের দ্বারা ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের প্রতি আনুগত্যের জন্য। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ধারণা হলো, ক্ষমতার রাজনীতিকে জনকল্যাণের রাজনীতিতে রূপান্তরিত করতে হবে সচেতন উদ্যোগের মাধ্যমে। আবদ্ধ জলাশয়ে কখনও আপনা-আপনি স্রোতের সৃষ্টি হয় না। জীবনীশক্তির অসংখ্য ঝর্ণাধারায় সিক্ত ও সমৃদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তা কখনও স্রোতস্বিনীতে পরিণত হবে না। এজন্য চাই সার্থক নেতৃত্ব। চাই পরীক্ষিত এবং কালোত্তীর্ণ উদ্যোগ এবং চাই জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ নেতার জাদুকরি স্পর্শ। ক্ষমতার রাজনীতির রোমশ ও নির্মম পন্থা কোনোদিন সুস্থ রাজনীতির আকার ধারণ করে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যে পরিবর্তন এসেছে বেশ কয়েক বছর ধরে তা অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। এর কারণও অবশ্য রয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের মতো অত সহজে জন্মলাভ করেনি। এ দেশের জনগণ সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে, সমাজ জীবনের শত ধারায় রক্ত ঝরিয়ে, এক নদী রক্ত সাঁতরে তুলে এনেছে স্বাধীনতার রক্তকমল। লাভ করেছে সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাদের স্বপ্নের কুসুমকলিগুলো পদদলিত করে যেভাবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বৈরতান্ত্রিক বাংলাদেশরূপে পরিচিত হচ্ছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির প্রতি এ এক অনপনেয় অপমান। এ পথ বাংলাদেশের নয়। এ পথ যত শিগগির সম্ভব পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়। সামনের জাতীয় নির্বাচনে এই সুযোগ আসছে। গ্রহণ করুন। নতুন আলোয় চারদিক ঝলমল করে উঠুক। এ জন্য বেশি কিছু করতে হবে না। মাত্র কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।

এক, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ (House of the Nation) ভেঙে দেওয়া। বিশ্বের সর্বত্র তাই করা হয়। এর ফলে অংশগ্রহণকারী সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে Level playing field will be ensured)

দুই, গত ৮-৯ বছরে বিরোধী দলগুলোর বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা করা হয়েছে। অধিকাংশ মামলা শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভীতি প্রদর্শনের লক্ষ্যে। কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলাও করা হয়েছে। শঙ্কাহীনভাবে ভোটদাতা অথবা ভোটপ্রার্থী যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় তা হলে এসব মামলার মধ্যে যদি ফৌজদারি বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে সেগুলো সম্পর্কে আমার কোনো বক্তব্য নেই, কিন্তু (Those on flimsy grounds) সেগুলো প্রত্যাহার করা সমীচীন অথবা নির্বাচন পর্যন্ত তা স্থগিত রাখা যায়, যেন যাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা রয়েছে তারাও ভোট দিতে পারে অথবা ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতে পারে।

তিন, গত ৮-৯ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সরকার এবং দলের মধ্যে যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তা হারিয়ে গেছে। এ সময় দেশের শাসন-প্রশাসনকে অনুগত দলীয় ক্যাডারের মাধ্যমে এমনভাবে পলিটিসাইজেশন করা হয়েছে যে, তাদের অনেকেই দেশের জনগণের আস্থা হারিয়েছেন, অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার আসে আর যায়, কিন্তু শাসন-প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করে শাসন পরিচালনা করেন। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন, কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে নির্ভর করতে হবে। highly politicized প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহযোগিতার ওপর। যে ক'টি মহানগরীতে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো সম্প্রতি ওইসব নির্বাচনে যা যা ঘটেছে তা শুধু দেশের সংবাদ মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, বিদেশিদের চোখেও তা সুস্পষ্ট হয়েছে। তাই আসছে নির্বাচনের সময় (নির্বাচনের দিন দশেক পূর্ব থেকে নির্বাচন সমাপ্তির দিন তিনেক পর পর্যন্ত।) নিরাপত্তা বাহিনী থেকে কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মীর ওপর যদি Polling Center দেখাশোনা এবং ভোটদাতাদের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে ভোটদাতাদের এবং ভোটপ্রার্থীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়।

চার, জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরে নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ছোটখাটো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার কথা, যার মাধ্যমে সরকারের দৈনন্দিন কার্য সমাধা হতে পারে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিরোধী দলগুলো থেকে, বিশেষ করে বিএনপি থেকে কয়েকজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হলে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি মন্ত্রণালয় থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ অনেক উন্নত অবস্থায় থাকতে পারে। জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটদাতা, ভোট প্রার্থনাকারী এবং সাধারণ মানুষের চিত্ত যেন ভয়শূন্য হয় তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভোটাধিকার স্বাধীন দেশে অন্যতম মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন নির্বাচন কমিশনের, তেমনি সরকারের।

লেখক



প্রাবন্ধিক

শিক্ষাবিদ

প্রাক্তন উপাচার্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে টাকা!

কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে টাকা!

মাছের বাজার, শাক-সবজির বাজার, বইয়ের বাজার ও পোশাকের বাজারের সাথে ...

মিরসরাইয়ে পটকা মাছ খেয়ে ২ জনের মৃত্যু

মিরসরাইয়ে পটকা মাছ খেয়ে ২ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বিষাক্ত পটকা মাছ খেয়ে দাদি ও নাতনির মৃত্যু ...

তোশাখানা জাদুঘর উদ্বোধন

তোশাখানা জাদুঘর উদ্বোধন

রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের পাওয়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উপহারসামগ্রী সংরক্ষণে তোশাখানার জন্য নিজস্ব ...

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে ...

শেকড়ের গান গেয়ে মাতালেন আব্দুল হাই দেওয়ান

শেকড়ের গান গেয়ে মাতালেন আব্দুল হাই দেওয়ান

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্টিত ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট-২০১৮' র প্রথম দিনে ...

নয়াপল্টনের আকাশে ড্রোন

নয়াপল্টনের আকাশে ড্রোন

রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর দিন ...

নয়াপল্টনে সহিংসতার ৩ মামলা ডিবিতে, রিমান্ডে ৩৮

নয়াপল্টনে সহিংসতার ৩ মামলা ডিবিতে, রিমান্ডে ৩৮

নয়াপল্টনে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলা বৃহস্পতিবার তদন্তের জন্য ...

বর-বধূ সাজে রণবীর-দীপিকা

বর-বধূ সাজে রণবীর-দীপিকা

বলিউডের আলোচিত জুটি রণবীর-দীপিকার বিয়ের ছবি দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন ভক্তরা। অবশেষে ...