ড. বদিউল আলম মজুমদার

আইনসিদ্ধতা, বৈধতা ও নৈতিকতা

সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

রাজধানীতে ঘাতক বাসের চাপায় দুই সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে সৃষ্ট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। শুধু শান্তিপূর্ণই নয়, এর মাধ্যমে তরুণরা সড়কে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নিয়েছিল। আন্দোলনটি সরকারবিরোধীও ছিল না এবং সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেও এটি পরিচালিত হয়নি। তবুও এটির সমাপ্তি হয় সহিংসতা তথা পুলিশের অভিযানে এবং পুলিশের পাশাপাশি একদল অস্ত্রধারীর আক্রমণের মাধ্যমে।

কিন্তু কেন সহিংসভাবে কচি-কাঁচাদের এ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটির সমাপ্তি ঘটে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে গত কয়েক বছরের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। বিশ্নেষণ করতে হয় সরকারের বর্তমান অবস্থান, বিশেষত এর সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগের আইনসিদ্ধতা (legality), বৈধতা (legitimacy) এবং নৈতিকতা (morality)।

একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হওয়া গণতান্ত্রিক শাসনের পূর্বশর্ত। কারণ জনগণের সম্মতিই গণতান্ত্রিক সরকারের মূল ভিত্তি। তবে শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়, এমনকি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও নয়। কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া একটি সরকার গঠিত হলে তা গণতন্ত্রের প্রথম ও মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করে না। বস্তুত গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। তবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও একটি সরকার গণতান্ত্রিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই যে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েও অনেক সরকার পরবর্তী সময় স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছে। এমনকি হিটলারও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় না এলেও একটি সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ হতে পারে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান মহাজোট সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনটি ছিল একতরফা- নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের মধ্যে বিএনপিসহ ২৮টি দলই এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। তাই নির্বাচনটি ছিল মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। তবে এটি ছিল সাংবিধানিকভাবে বৈধ। অর্থাৎ এটি ছিল সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠিত একটি আইনসম্মত সরকার।

তবে আইনসিদ্ধ হলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর গঠিত সরকারটি লেজিটিমেসি বা বৈধতা ছিল গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এর কারণ শুধু একতরফা নির্বাচনই নয়, যার ফলে জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না, এতে ভোটার উপস্থিতিও ছিল নগণ্য। তাই দশম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারটির পেছনে জনসম্মতির ঘাটতি ছিল। আর জনসম্মতির ঘাটতিসম্পন্ন একতরফা নির্বাচনের কারণে পরবর্তী সময় অনেক জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়, যদিও নির্বাচন হওয়া উচিত সমস্যা সমাধানের, বিশেষত কাদের ওপর ভবিষ্যতের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পড়বে সে সমস্যা সমাধানের সর্বজন স্বীকৃত পন্থা।

নির্বাচনের পরে জনসম্মতির ঘাটতি দূরীকরণের জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল কিছু জনপ্রিয় ইস্যুকে কাজে লাগানো। এমন একটি সম্ভাব্য জনপ্রিয় ইস্যু ছিল উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। উন্নয়ন সবাই চায় এবং উন্নয়ন সবারই প্রয়োজন। তাই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে জনসমর্থন পাওয়ার উদ্যোগ ছিল নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এ উদ্যোগের ক্ষেত্রে যা ইতিবাচক ছিল না, তা হলো উন্নয়নের বিপরীতে গণতন্ত্রকে দাঁড় করানো। উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র- ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি বিতর্ক সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালানো হয়। অর্থাৎ উন্নয়ন চাইলে অন্তত কিছু গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিসর্জন দিতে হবে। নির্বাচনের পর সরকারকে 'নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে কিছু বুদ্ধিজীবী এ বিতর্কে বাতাস দেন। তারা স্লোগান তোলে : 'শেখ হাসিনার গণতন্ত্র, উন্নয়নের মূলমন্ত্র'। আর বাস্তবেই গত কয়েক বছরে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমাগতভাবে সঙ্কুচিত, মানবাধিকার লঙ্ঘিত এবং সরকার অসহিষ্ণু ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে, যা অনেক নাগরিকের মনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

এ ছাড়াও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার অবকাঠামো তথা দৃশ্যমান উন্নয়নের দিকে জোর দিয়ে আসছে। অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সাধারণত বড় অঙ্কের অর্থকড়ি জড়িত থাকে, যা দিয়ে নিজের দলের বা নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের ফায়দা দেওয়া যায়। আর এ ফায়দা প্রদানের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির জন্ম হয়। এ ফায়দার চেইনে অনেক দুর্বৃত্ত যুক্ত ও সৃষ্টি হয়, যা দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিস্তৃতি ঘটায়। এ প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বগুড়ার তুফান সরকার ও সাভারের রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার মতো অসংখ্য দুর্বৃত্তের সৃষ্টি হয়েছে, যারা ক্ষমতাসীনদের 'শক্তি' জুগিয়েছে এবং যাদের বাড়াবাড়িতে অনেক সাধারণ মানুষ এখন অতিষ্ঠ। উপরন্তু ফায়দা প্রদান ও দুর্নীতির কারণে অনেক প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়েছে এবং কাজের মান নিম্নগামী হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ফায়দা দেওয়ার রাজনীতির কারণে গত কয়েক বছরে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের এক মহোৎসব পরিলক্ষিত হয় আর্থিক খাতে। বস্তুত ব্যাংক লুট আমাদের পুরো আর্থিক খাতকেই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পুঁজিবাজারে লুটপাটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে দুর্বৃত্তদের পকেট ভারী করা হয়েছে। এই লুটপাটের ধারা এখন সমাজের বহু ক্ষেত্রেই বিস্তৃতি লাভ করেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে অবশ্যই প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে, যা বাড়া কাঙ্ক্ষিতও এবং মানুষ এর সুফল পায়। তবে প্রবৃদ্ধি কী মূল্যে এবং কী শর্তে অর্জিত হচ্ছে তাও বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। যেমন, উচ্চ হারের প্রবৃদ্ধি যদি আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত শর্তে গৃহীত ঋণের বেড়াজালে আটকে ফেলে, তাহলে তার মাশুল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে হবে। এ ছাড়াও উন্নয়নের সুফল আমাদের দেশে সবার কাছে সমভাবে পৌঁছেনি।

সরকারের তেলে মাথায় তেল দেওয়ার নীতির ফলে সুযোগেরও সমতা সৃষ্টি হয়নি। ফলে জাতীয় আয়ে দরিদ্রদের অংশ ক্রমাগতভাবে কমেছে এবং উচ্চবিত্তদের বেড়েছে। সমাজে ক্রমান্বয়ে বৈষম্য প্রকট হয়েছে, যা অনেকের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সমাজে ভয়াবহ অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

দৃশ্যমান উন্নয়নের প্রতি জোর দেওয়ার আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো যে, এর ফলে মানুষের অবস্থা এবং অবস্থানের পরিবর্তনের দিক উপেক্ষিত থেকে গেছে। অর্থাৎ সতিকারের উন্নয়ন হলো মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়ঃনিস্কাশন, পুষ্টি, ইত্যাদির উন্নয়ন, যে প্রক্রিয়ায় অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা করে মাত্র। অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের প্রাপ্য সেবাগুলোর মানে, যেগুলো তাদের জীবনমানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, তেমন উন্নতি ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে- যেমন, গ্রামীণ শিক্ষার মানে ব্যাপক ধস নেমেছে। যদিও সুস্বাস্থ্য ও মানসম্মত শিক্ষাই পিছিয়ে পড়া মানুষের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম সোপান।

লেজিটিমেসির সংকটের মুখোমুখি হয়ে বর্তমান সরকার আরও কয়েকটি কাজ করেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পরে যত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে তার প্রায় সবই সরকার 'কেপচার' বা দখল কারার চেষ্টা করেছে। এর জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, যেগুলো ছিল বহুলাংশে 'নিয়ন্ত্রিত' এবং যা 'খুলনা মডেল' বলে পরিচিত। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে অনেক সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যে বঞ্চনা তাদেরকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে তরুণ এবং প্রথমবারের ভোটাররা, যাদের একটি বড় অংশই বিগত দশম জাতীয় নির্বাচনে তাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যদিও বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে 'দিনবদলের সনদ' শীর্ষক একটি যুগান্তকারী নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছিল, কিন্তু সরকার গঠনের পর সে ইশতেহার বহুলাংশে উপেক্ষিতই থেকে যায়। তবে দিনবদলের সনদ বাস্তবায়িত হলে আমরা আজ একটি ভিন্ন, বিশেষত শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশে বসবাস করতাম বলে আমাদের বিশ্বাস। দিনবদলের সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অবসান। কিন্তু গত এক দশকে সমাজের সর্বস্তরে দলীয়করণের ভয়াবহ বিস্তৃতি ঘটেছে। 'প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী'দের একটি বড় অংশই নানা কারণে বহুলাংশে ক্ষমতাসীন দলের চরম অনুগত হয়ে পড়েছে। এর ফলে সব সেবা- নিম্ন আদালতের রায় থেকে শুরু করে নিরাপত্তা সেবা পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই এখন ক্ষমতাসীনদের করায়ত্ত হয়ে গেছে। সমাজে আইনের শাসনের অভাব এবং বিচারহীনতার এক ধরনের ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও যার ভুক্তভোগী। এ ধরনের নগ্ন দলীয়করণের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ভয়াবহ না হয়ে পারে না।

২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে তাতে সুস্পষ্টভাবে তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেগুলো হলো গণতন্ত্রায়ন, সুশাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ। দুর্ভাগ্যবশত এসব ক্ষেত্রেও সরকারের কোনো সফলতা নেই। বরং এসবের ক্ষেত্রে সরকার যেন উল্টো দিকেই হেঁটেছে।

এ ছাড়াও লেজিটিমেসির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকার কিছু 'পপুলিস্ট' বা জনতুষ্টিকর বিষয়ের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছে। এর একটি হলো মাদকবিরোধী অভিযান। মাদকের সরবরাহ লাইন আগে থেকে বন্ধের কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে হঠাৎ করে অভিযান পরিচালনা শুরু করা হয়। এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৯০ জন ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে, যদিও সত্যিকারের গডফাদাররা অধরাই রয়ে গেছে (প্রথম আলো, ৩০ জুলাই ২০১৮)। এসব বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে মানুষকে বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা মানবাধিকারের নগ্নতম লঙ্ঘন। উপরন্তু ভুল তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হকের ক্রসফায়ারে মৃত্যু এ অভিযানকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সাম্প্রতিককালে সরকার আরও কিছু ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও গড়িয়েছে। এর একটি হলো কোটা আন্দোলনের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং এ আন্দোলনের নেতাদের ছাত্রলীগ কর্তৃক নিগৃহ এবং পরবর্তী সময় তাদের গ্রেফতার। আরেকটি ভুল হলো প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার এবং তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ও জামিন না দেওয়া। সবচেয়ে বড় ভুল করেছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা তরুণদের আন্দোলনের ইতিবাচকভাবে সমাপ্তি টানতে অপারগতা এবং পরিণতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বল প্রয়োগ ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছাত্রলীগকে সাধারণ ছাত্রদের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ২০১৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয় তা আইনসিদ্ধ হলেও, একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গুরুতর লেজিটিমেসির সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ লেজিটিমেসির সমস্যা সমাধানে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও তা দূরীভূত হয়নি। বরং কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রমের ফলে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে সরকার ক্রমাগতভাবে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। আমরা দেখেছি, সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। অনেকটা ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করার ফলে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনদের আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তারা জনগণের হৃদয়-মন জয় করার ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগই নেয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কা না থাকার ফলে ক্ষমতাসীনরা বরং আরও বেসামাল, বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিককালে কোটা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন অবসানে সরকারের সহিংস পদক্ষেপ এবং দমন-পীড়নের ফলে সরকার তরুণদের বিরাট অংশের বিরাগভাজন হয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিরপেক্ষ নাগরিকদের সমর্থনও বহুলাংশে হারিয়েছে বলে অনেকের ধারণা। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয়ের পেছনে নিরপেক্ষ ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এদের সমর্থনে অবনতি সরকারের 'মরাল অথরিটি' বা নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে। জনসমর্থনে ভাটা পড়া এবং নৈতিক অবস্থানে দুর্বলতা ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে এবং বল প্রয়োগকেই তাদের শক্তির উৎসে পরিণত করেছে, যার নগ্ন প্রয়োগ হয়েছে কোটা এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ সরকারের সমর্থনের পরিধি সঙ্কুচিত হয়েছে এবং শাসন করার ক্ষমতা, এমনকি ভবিষ্যৎও ক্রমবর্ধমান হারে বল প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর বল প্রয়োগই একমাত্র ভরসার একটি হাতিয়ার হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা দায়ের ও পুরনো মামলা সচল এবং তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা।

আর বল প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীলতার কারণেই সরকার আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে রাজপথ দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার নতুনভাবে শুরু করেছে। প্রথম আলোর (৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন দিনে (১-৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে পাঁচটি মামলা হয়েছে, যাতে ১১২ জনের নাম উল্লেখসহ আরও অনেক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় এরই মধ্যে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও অভিযোগ উঠেছে যে, গত তিন দিনে (১-৩ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০৭ জন এবং ঈদের পর থেকে ৭০৯ জন বিএনপির নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো যে, কোনো সহিংসতার ঘটনা ছাড়াই পুলিশ মামলা করছে- এ পর্যন্ত সারাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৬৭টি মামলা দায়ের করার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে (প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে আমরা দেখেছি যে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, তাদের গ্রেফতার ও ভয়ভীতি সঞ্চারই 'খুলনা মডেল' তথা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের প্রথম পদক্ষেপ।

রাজপথ দখলের ঘোষণা ও দমন-পীড়ন কোনোভাবেই ক্ষমতাসীনদের শক্তি ও সমর্থনের পরিচায়ক নয়, বরং তাদের ভয় ও দুর্বলতারই প্রতিফলন। আর সরকার যখন ভয় পায় তখন তারা আরও সন্দেহপ্রবণ হয় এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে। তখন তারা বেশি ভুল করে, যা তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাসকে ত্বরান্বিত করতে পারে। প্রসঙ্গত, যারা কোনোরূপ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে মিছি মিছি ষড়যন্ত্রের ধুয়া তোলে, তারা মূলত এর মাধ্যমে তাদের নিজেদের এবং জনগণের ওপর আস্থার ঘাটতিই প্রদর্শন করে থাকে। তবে রাজপথ দখল করে শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা নির্ভর করবে বল প্রয়োগকারীদের এবং তাদের উপরস্থদের মনোবল কত দিন অটুট রাখা যায় তার ওপর।

পরিশেষে, আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, 'আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে'। এসব ক্ষেত্রেই জাতি হিসেবে আমরা যেন উল্টো পথে যাচ্ছি। শুধু তাই নয়, আমাদের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই আজ চরম দুরবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়েছে। আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স' পদ্ধতি ভেঙে পড়েছে এবং সর্ব ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এ অবস্থা গত ৪৭ বছরের পুঞ্জীভূত অপশাসনেরই ফসল। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকালীন গত দশ বছরে তা যেন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে চার-পঞ্চমাংশ সংসদীয় আসনে বিজয়, একতরফাভাবে এবং কোনোরূপ রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সংসদ এবং সংসদের বাইরে কোনো কার্যকর বিরোধী দল না থাকা যেন তাদের জন্য 'কার্স' বা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে অনেকের মনে আজ প্রশ্ন : ক্ষমতাসীনরা কি আবারও সেই পুরনো আত্মঘাতী পথে হাঁটবে? যদি হাঁটে, তার ভয়াবহ মাশুল কিন্তু শুধু তাদেরকেই নয়, বরং পুরো জাতিকেই দিতে হবে। আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা যে, ক্ষমতাসীনরা তাদের আজকের সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ পরিণতি উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হবে।



লেখক



সম্পাদক, সুজন-

সুশাসনের জন্য নাগরিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : ধরিত্রীকে বাঁচাতে হলে

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপহার দিয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান। ...

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে ...

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

ড্রেসিংরুম থেকেই জরুরি তলব ঢাকায়-ওপেনিংয়ে কিছুই হচ্ছে না। সৌম্য সরকারকে ...

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ...

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পি ও নবাগতা অধরা খান জুটির ...

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ...

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

এশিয়া কাপে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে আফগানিস্তান। ভালো রান সংগ্রহ ...

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

আগামী মাসে সৌদি আরবে চার জাতির একটি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ...