শাহরিয়ার কবির

নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতা ও গণমাধ্যম

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চরমতম মূল্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক যে জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার চরিত্র কী হবে তা '৭২-এর সংবিধানেই বর্ণিত হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার যেসব সহযোগী মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা সংক্ষিপ্ততম সময়ে জাতিকে একটি অনন্যসাধারণ সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে এই সংবিধানে 'গণতন্ত্র', 'জাতীয়তাবাদ', 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ও 'সমাজতন্ত্র' গ্রহণের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতার রক্ষাকবচ হিসেবে ধর্মের নামে রাজনীতি বা ধর্মভিত্তিক যে কোনো প্রতিষ্ঠান গঠন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর এই সংবিধান গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে এর মূলনীতি ব্যাখ্যা করে বঙ্গবন্ধু এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দিয়েছিলেন। ধর্মের নামে হত্যা, নির্যাতন, বঞ্চনা ও পীড়নের অবসানের পাশাপাশি ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোগীরা ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে পৃথক রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

আমাদের চরম দুর্ভাগ্য- ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং তার প্রধান সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা', 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' ও 'সমাজতন্ত্র' মুছে ফেলে ধর্মের নামে রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। তখন থেকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির মৌলবাদীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের যে অভিযাত্রা আরম্ভ হয়েছে, তা এখনও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আত্মস্বীকৃত প্রতিপক্ষ এখনও প্রবল প্রতাপে রাজনীতি ও ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণ করছে। প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও মৌলবাদী সন্ত্রাসের আগুনে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে অসহায় মানুষ। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে জিয়াউল হকের পাকিস্তান অথবা মোল্লা উমরের আফগানিস্তানের মতো জঙ্গি সন্ত্রাসী মনোলিথিক মুসলিম রাষ্ট্র বানানো। জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সাম্প্রদায়িক সহযোগীরা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয়/এথনিক সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মানুষদের ওপর যে কোনো অজুহাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের জন্য দারুণ উপলক্ষ হচ্ছে নির্বাচন।

অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি- বিশেষভাবে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নির্দিষ্টভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে নৃশংস হামলা চালিয়েছিল, তা ছিল কল্পনাতীত। তাদের নির্বাচনী প্রচারণায়ও আক্রমণের লক্ষ্য ছিল হিন্দু ধর্ম ও আচার। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় পাকিস্তানপ্রেমীরা বলেছিল- যুক্তফ্রন্টের নৌকা মার্কায় ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১-এ বলা হয়েছে- 'আওয়ামী লীগ জয়ী হলে মসজিদে আজান নয়, উলুধ্বনি শোনা যাবে।' স্লোগান দেওয়া হয়েছে- 'এ নির্বাচন ধুতি আর টুপির লড়াই', 'জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি খুইলা ধুতি পিন্দ', 'ধানের শীষে বিসমিল্লাহ' ইত্যাদি। এসব কদর্য সাম্প্রদায়িক প্রচারণা হিন্দুদের ওপর হামলার ক্ষেত্র তৈরি করে।

১৯৯৬ সালে বহু নির্বাচনী কেন্দ্রে বিএনপি-জামায়াতের হুমকি ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন এই ভরসায়- যে দল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যে দল বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মের নামে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনা-সন্ত্রাসের অবসান ঘটবে। বিএনপি ও জামায়াত এই পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের যে নজিরবিহীন সন্ত্রাস, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে হয়েছে- মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে এরকম বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে পারে- তা কেউ ভাবতেও পারেনি।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় তিন মাস আগে বিএনপি-জামায়াতের পছন্দের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানেই বিএনপি-জামায়াত জোট সারাদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও তা ব সৃষ্টি করে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করেছে। শুধু বেসামরিক প্রশাসন নয়; বিএনপি-জামায়াত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত তাদের সমর্থকদেরও ব্যবহার করেছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। নির্বাচনের আড়াই মাস আগে থেকেই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় জামায়াত-বিএনপির কর্মীরা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন আরম্ভ করে এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যে, সেবার বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ৭০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

২০০১ সালে নির্বাচনকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদ করার কারণে খালেদা-নিজামীর সরকার আমাকে ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনসহ বহু সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে। সাংবাদিক মানিক সাহা, সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালু ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদসহ ১৬ জন লেখক-সাংবাদিককে তখন হত্যা করা হয়েছিল মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার কারণে। আমার কারাগারে থাকার সময় বন্ধুরা ঠিক করেছিলেন, গণমাধ্যমে যেসব লেখার জন্য আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেগুলো তারা গ্রন্থাকারে ২০০২ সালের বইমেলায় প্রকাশ করবেন। উচ্চতর আদালতের নির্দেশে বইমেলার ১০ দিন আগে আমি জামিনে মুক্ত হই। ততদিনে বইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। আমার একটি নতুন লেখাসহ এই বইয়ে ২৬টি নিবন্ধ ও প্রতিবেদন ছিল, যা ২০০১ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত লিখেছি। বইয়ের প্রচ্ছদে ছিল সিরাজগঞ্জের বহুল আলোচিত নির্যাতিত পূর্ণিমার ছবি।

'বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা এবং আমার রাষ্ট্রদ্রোহিতা' শিরোনামের এই গ্রন্থে নির্বাচনকেন্দ্রিক বহু সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমি প্রত্যক্ষ করেছি কিংবা বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে উদ্ৃব্দত করেছি। ২০০১-এর ২৩ অক্টোবর দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি কৈলাশ সরকার ভোলা ও পটুয়াখালী থেকে ফিরে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। তার শিরোনাম- 'ভোলার নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের আহাজারি'। ভুক্তভোগীদের উদ্ৃব্দত করে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে- 'পত্রিকায় কিছু লেখার দরকার নেই। কাউকে বলতে চাই না, আমাদের জীবনে কী ঘটে গেছে। কোনো বিচার চাই না, ক্ষতিপূরণ চাই না। কেউ দিতেও পারবে না। আপনারা শুধু প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বলবেন, আমাদের কোনো উপায় নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমরা এদেশেই থাকতে চাই। শুধু তিনি যেন আমাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করেন, আমরা একটু শান্তি চাই।... আমরা রাজনীতি করি না, ভোট দিতে যাইনি। ভবিষ্যতেও কোনোদিন ভোট দেব না। আপনাদের মাধ্যমে তাকে কথা দিলাম। তিনি যেন শুধু আমাদের দিকে একটু করুণা করেন। আমরা এদেশেরই মানুষ। আর কতকাল নিজ দেশে পরবাসী থাকব? এত অত্যাচার, নির্যাতন আর সহ্য হয় না। এমন যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। না পারি কাউকে বলতে, না পারি কাউকে দেখাতে। শুধু ঈশ্বর জানেন, আমরা কেমন আছি। স্বামী, সন্তান, ছেলেমেয়ে কে কোথায় আছে জানি না। তারা আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে কি-না জানি না। আর কতকাল এভাবে থাকতে হবে?'...

'কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিচু গলায় নিচের দিকে তাকিয়ে শুধু এটুকু বলার পর আর কিছুই বলতে পারলেন না পরেশ চন্দ্র মিস্ত্রির স্ত্রী প্রভা রানী (৪০)। ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার লেজপাতা গ্রামের একজন প্রভা রানীর কান্নার সুরে সুর মিলিয়েছে ওই এলাকার শত শত মা।'

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নৃশংসতম সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। তখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক হিন্দু মায়ের আকুতি গোটা জাতিকে স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত করেছিল। বাগেরহাটের সেই মায়ের শিশুকন্যাকে গণধর্ষণ করতে গিয়েছিল বিএনপির সন্ত্রাসীরা। অসহায় মা নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি। ধর্ষকদের মিনতি জানিয়ে বলেছিলেন- 'বাবারা, তোমরা একজন একজন করে আস। আমার মেয়েটা খুব ছোট।' ধর্ষিতা কন্যার অসহায় মায়ের এই আকুতি যে কোনো দেশের যে কোনো মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ করবে। এমন হাজার হাজার সন্ত্রাস, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা ২০০১ সালে ঘটেছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

এসব ঘটনা তখন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও স্তম্ভিত করেছিল। খালেদা-নিজামীদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার প্রথম থেকে এসব ঘটনা অস্বীকার করেছে। বলেছে- বাংলাদেশে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে। আমার মতো 'দেশদ্রোহীরা' সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য গণমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের কল্পিত কাহিনী প্রচার করছে। নির্বাচনের আগে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এক জনসভায় বলেছিলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তিনি নির্মূল কমিটি ও আমাকে দেখে নেবেন। ক্ষমতায় গিয়ে তিনি তার কথা রেখেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের দু'মাস না পেরুতেই আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে'।

২০০১ সালের ২২ নভেম্বর আমার গ্রেফতার খালেদা-নিজামীদের সরকারের জন্য বুমেরাং হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যে অপরাধ তারা এতদিন ঢেকে রাখতে চেয়েছিল, সারা পৃথিবী তা জেনে গেল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আমাকে 'কারাবন্দি বিবেক' ঘোষণা করেছিল। অ্যামনেস্টির মহাসচিব ঢাকা এসে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে আমার মুক্তি দাবি করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

এই নির্বাচনের চার বছর পর আমরা ৩ খণ্ডে প্রকাশ করেছিলাম 'বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ১৫০০ দিনের শ্বেতপত্র'। প্রায় ৩ হাজার পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রে আমরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ২৭৮৬টি প্রতিবেদন এবং ২৩২টি আলোকচিত্র প্রকাশ করেছিলাম, যা প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়।

২০০৩ সালে নির্বাচনকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সম্পর্কে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তদন্তের জন্য বিচারপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশনের প্রতিবেদনে প্রায় ১০ হাজার ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শ্বেতপত্রে বর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান- বাংলাদেশে নির্বাচন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য উৎসব নয়; আতঙ্ক। আজও এই আতঙ্কের অবসান হয়নি।

২০১৪ সালে জামায়াতের প্ররোচনায় নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলে বিএনপি সেই নির্বাচনে যাবে না। বলা হয়েছে- জামায়াতকে বাদ দিয়ে নির্বাচন 'ইনক্লুসিভ' হবে না। ২০১৩ সালে প্রথমে উচ্চতর আদালত এবং পরে নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। কারণ জামায়াতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে আইন প্রণেতারা হবেন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ। জামায়াত জনগণের নয়; আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে। জামায়াত রাষ্ট্র এবং দলের ভেতরেও নারী-পুরুষ কিংবা মুসলিম-অমুসলিম নাগরিকের সমঅধিকার ও সমমর্যাদায় বিশ্বাস করে না। জামায়াত নারী নেতৃত্ব হারাম মনে করে। এসব কারণে জামায়াতকে রাজনীতি করার অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত ছিল। উচ্চতর আদালত অতদূর যেতে চায়নি- জামায়াতকে শুধু নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। ২০১৪ সালে জামায়াতকে এবং জামায়াতের প্রধান মুরুব্বি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে খুশি করতে গিয়ে বিএনপি শুধু নির্বাচন বর্জন করেনি; যারা তাদের বারণ অমান্য করে ভোট দিতে গিয়েছিল, সেসব মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে, জনপরিবহনে আগুন দিয়ে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত করেছে। ২০০১-এর মতো ব্যাপকভাবে না হলেও বহু জায়গায় সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও আদিবাসীরা জামায়াত-বিএনপির আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলেছিলেন- কোনো দেশে গণমাধ্যম যদি সজাগ থাকে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। একইভাবে বলা যায়- সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময়েও গণমাধ্যম যদি সজাগ থাকে, এর মাত্রা ও বিস্তার কম হবে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর উপর্যুপরি হামলা, হত্যা, নির্যাতন ও সম্পত্তি দখলের প্রধান কারণ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া। প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা এবং হামলাকারীদের হুমকির কারণে আক্রান্তরা মামলা করে না। ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণ করার জন্য দু'জন সাক্ষী প্রয়োজন, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন, যা ভুক্তভোগীদের পক্ষে প্রদান করা সম্ভব নয়। এসব কারণে আমরা আশু করণীয় হিসেবে 'সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন' প্রণয়নসহ 'জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন' এবং পৃথক 'সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়' গঠনের দাবি জানিয়েছি।

'৭২-এর সংবিধানের মতো ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে আমরা গত ২৭ বছর ধরে আন্দোলন করছি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা যেভাবে হিংস্র থাবা বিস্তার করছে- ধর্ম-বর্ণ-জাতিসত্তা-ভাষা-অঞ্চল নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক



সভাপতি

ঘাতক-দালাল

নির্মূল কমিটি

পরবর্তী খবর পড়ুন : শামসুর রাহমান

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে ...

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

ড্রেসিংরুম থেকেই জরুরি তলব ঢাকায়-ওপেনিংয়ে কিছুই হচ্ছে না। সৌম্য সরকারকে ...

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ...

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পি ও নবাগতা অধরা খান জুটির ...

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ...

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

এশিয়া কাপে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে আফগানিস্তান। ভালো রান সংগ্রহ ...

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

আগামী মাসে সৌদি আরবে চার জাতির একটি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ...

নির্বাচনের আগে সিনহা অপপ্রচারে উসকানি না দিলেও পারতেন: কাদের

নির্বাচনের আগে সিনহা অপপ্রচারে উসকানি না দিলেও পারতেন: কাদের

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নির্বাচনের আগে বই প্রকাশ ...