সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

সাজানো বাগান চাই

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য। চমৎকার এক বাণী। কিন্তু আমরা কয়জনে পারি ভয়শূন্য চিত্ত কাজ করে যেতে? তার জন্য সাহস লাগে। সেই সাহসের পথেই হাঁটছি। পরিবেশ আন্দোলন করছি। আমার কাজ-ই যেহেতু পরিবেশ নিয়ে, তাই আমি আমার লেখার মূলে এই পরিবেশকেই রাখব।

প্রকৃতিকে জয় করার মাধ্যমেই সভ্যতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। আবার এভাবে প্রকৃতিকে জয় করার মধ্যেই ঘটছে প্রকৃতির রূপান্তর। রূপান্তরের ধারায় আবার প্রকৃতির উন্নতি যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে অবনতিও। প্রকৃতির এরূপ অবনতিতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। কারণ মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই মানুষই প্রকৃতিকে জয় করতে গিয়ে ইকোসিস্টেম বা প্রকৃতির রাজ্যের ভারসাম্যকে ব্যাহত করে এবং অনবরতই তা করে। অবশ্য মানুষ তা করে জীবনেরই প্রয়োজনে। তবে জীবনের সেই দাবি মেটাতে গিয়ে মানুষ এখন প্রকৃতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যে, প্রকৃতি যেন তার মানুষ বহন করার ক্ষমতা দ্রুততালে হারিয়ে ফেলছে। কাজেই আজকের মানুষকে তার নিজের বেঁচে থাকার স্বার্থে, পৃথিবীতে টিকে থাকার স্বার্থে প্রকৃতির আরও অবনতি রোধ করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং সেইসঙ্গে এরই মধ্যে যেটুকু অবনতি হয়ে গেছে তা পুনরুদ্ধার করতে হবে, ইকোসিস্টেমের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে ব্যর্থতার পরিণতি মানবজাতির জন্য মারাত্মক। তাতে জীবনযাত্রার বিদ্যমান মানের আরও অবনতি তো ঘটবেই, এমনকি বিশ্বমায়ের কোলে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করা পর্যন্ত মহাহুমকির সম্মুখীন হতে পারে। পরিবেশ-বিবেচনা-বর্জিত উন্নয়নের এটা হচ্ছে নিয়তি এবং এখন পর্যন্ত এ প্রবণতাই প্রবল।

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রবাহ টিকিয়ে রাখার ব্যর্থতা বিশ্বের বহু দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ করেও তুলেছে। পরিবেশ এবং উন্নয়নজনিত হুমকি একটি থেকে অন্যটি আবার স্বতন্ত্রও নয় বরং অবিচ্ছেদ্যভাবে একাত্ম। একটি অবনতিশীল প্রাকৃতিক ভিতের ওপর উন্নয়ন টিকে থাকতে পারে না। পরিবেশের অবনতির খেসারত যদি উন্নয়নের মূল্যমানকে পেছন ফেলে দেয় তখন উন্নয়নের সঙ্গেও কোনো লাভ বা সুবিধা যুক্ত থাকে না। কেননা, উন্নয়নের মূল্যমান এবং মানবিক সুবিধা কার্যকারণ ও প্রভাব প্রতিক্রিয়া আরও জটিলতায় আবদ্ধ। এজন্য এর সমাধানও বিচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস বা খণ্ডিত নীতিমালার গণ্ডিতে সাধন করা সম্ভব নয়।

পরিবেশ সম্পর্কে উদ্বেগ সভ্যতার সূচনা থেকেই লক্ষ্য করা যায়। সুপ্রাচীনকাল থেকে মহামনীষী ছাড়াও প্রকৃতিপ্রেমিক শিল্পী, সাহিত্যিক ও শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব প্রকৃতির জয়গান করেছেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এবং প্রকৃতিপ্রেমের অন্তহীন আলেখ্য তুলে ধরেছেন। তবে প্রকৃতিকে পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম করে দেখার চেতনা সাম্প্রতিককালের ব্যাপার। এটা সূচিত হয়েছে যখন বিশ্বে মাত্রাতিরিক্ত হারে জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে পরিবেশের অবনতি অবধারিত করে তুলেছে এবং যখন মানুষ প্রকৃতির সম্পদ ভাণ্ডারের প্রকাশ্য ও গোপন দুর্গে হানা দিয়ে বসেছে। আবার ধারণোপযোগী ও অর্থবহ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে পরিবেশকে বিচার-বিবেচনায় আনা শুরু হয় বলতে গেলে ষাটের দশক থেকে যখন প্রযুক্তিগত বিপুল উদ্ভাবন পরিবেশের যথেষ্ট অনিষ্ট সাধনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সংকটের বহুবিধ নেতিবাচক গ্রন্থি আকস্মিকভাবে উন্মোচিত করে দেয়।

পরিবেশ ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত জাতিসংঘ সম্মেলন এবং জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে। পাশাপাশি বলে রাখা ভালো ২১ সংখ্যক এজেন্ডায় এর সরাসরি প্রতিফলন রয়েছে। মানুষের ধারাবাহিক পরিবেশ বিপর্যয় ও দূষণের আগ্রাসনে এ ধরণীর সার্বিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখোমুখি ও বিপর্যয়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে। এ জাতীয় বিপর্যয়ের ফলে নারী উৎপাদনশীল জগৎ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভয়াবহ অবক্ষয়, মরুকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার দায়ভার, নারীর খাদ্য, জ্বালানি ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহে নারী মজুরিবিহীন কাজে অধিক সময় ধরে জড়িত, যা নারীদের আয়মূলক কাজ থেকে ছিটকে পড়তে সহায়তা করে। আমাদের দেশের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে সব মানুষ বিশেষ করে নারীরা বিশেষভাবে অরক্ষিত ও বঞ্চনার শিকার। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নারী কৃষিকাজের সঙ্গে বিশেষ করে সবজি বাগান ও ফল-ফুল উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বাসা-বাড়িতে ও কৃষিজমির কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ ঝুঁকি নারীর স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খারাপ প্রভাবের কথা বলছি, কারণ আমরা সবাই জানি ভিন্ন ভিন্ন বেশকিছু রাসায়নিক দ্রব্যের বিষক্রিয়ার প্রতি নারীর নাজুকতা খানিকটা বেশি। আগেই বলেছি, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের দ্বারা নারী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের মান ও টিকে থাকার সামর্থ্যের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীল ও চলমান করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে, যা জেন্ডার সমতা ও ন্যায্য বিচারকে ত্বরান্বিত করে। তবে উদ্বেগের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সিদ্বান্ত গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন পেশাদার ব্যবস্থাপক হিসেবে যথা পানি বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ, আইনজীবী ও বন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নারীদের খুব সামান্যই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

আমাদের দেশ তো ততটা উন্নত দেশ নয়। এ দেশের সম্পদের ভিত্তি নিম্ন, ভূমি-জন অনুপাত নিম্ন, সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনার হার সর্বাধিক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জনগণের জীবিকা সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কর্মসংস্থানের জন্য, রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের জন্য একমাত্র উৎস হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। ৫০ শতাংশেরও বেশি লোকের জীবিকার প্রধান উৎস হচ্ছে কৃষি। কিন্তু কৃষি সেক্টর সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের হুমকির সম্মুখীন। কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত পরিকল্পনা অপরিহার্য। সাম্প্রতিককালে আমরা সমুদ্রের গভীরতা হ্রাস পাওয়া কিংবা সমুদ্র স্তর উঁচু হওয়ার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের বিশাল ভূখণ্ড সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। অতীতে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর ব্যাপক হারে বন্যা হতো। এখন প্রতি ৩ থেকে ৪ বছর পর বাংলাদেশ ভয়ানক বন্যার শিকার হচ্ছে। সিডর, আইলা প্রভৃতি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সমুদ্র উপকূলবর্তী জনবসতি দুমকীর সম্মুখীন। জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সংস্থান করার জন্য প্রকৃতির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। কিন্তু প্রকৃতির ক্ষমতা বা সামর্থ্যেরও একটা সীমা আছে। আমরা এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনো টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যেহেতু বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। আমার প্রত্যাশা আর সবকিছুর মতো আমাদের পরিবেশও হবে সুন্দর। সুস্থ-প্রফুল্ল থাকতে একটা সবুজে ঘেরা পরিবেশের বিকল্প নেই।

লেখক



প্রধান নির্বাহী

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সংস্থা

প্রতি কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্ভব হবে না

প্রতি কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্ভব হবে না

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। বিগত নির্বাচনে ...

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত হয়নি, পিছিয়েছে

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত হয়নি, পিছিয়েছে

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত হয়নি। তাবলিগের দুই পক্ষের ...

বাবাকে হত্যার পর থানায় আত্মসমর্পণ ছেলের

বাবাকে হত্যার পর থানায় আত্মসমর্পণ ছেলের

চাঁদপুরে বাবা মুছা গাজীকে হত্যার পর থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন মাদকাসক্ত ...

বিএনপির গ্রেফতার ৪৭২ নেতাকর্মীর তালিকা ইসিতে

বিএনপির গ্রেফতার ৪৭২ নেতাকর্মীর তালিকা ইসিতে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশব্যাপী গ্রেফতার ...

অন্যের জুতায় ইয়াবা ঢুকিয়ে নিজেই ফাঁসলেন ব্যবসায়ী

অন্যের জুতায় ইয়াবা ঢুকিয়ে নিজেই ফাঁসলেন ব্যবসায়ী

শহিদুল নামে এক ব্যবসায়ীর জুতার ভেতর ইয়াবা দিয়ে মাদক মামলায় ...

কমিউনিস্ট পার্টি রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করবে: সেলিম

কমিউনিস্ট পার্টি রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করবে: সেলিম

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, জনপ্রতিনিধির ...

মুখ ও কান ঢেকে রাখতে পারবে না পরীক্ষার্থীরা

মুখ ও কান ঢেকে রাখতে পারবে না পরীক্ষার্থীরা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা ...

কলেজছাত্রকে গলা কেটে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দিল দুর্বৃত্তরা

কলেজছাত্রকে গলা কেটে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দিল দুর্বৃত্তরা

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে নাইম হোসেন (২০) নামে এক কলেজছাত্রকে গলা কেটে ...