হাসান আজিজুল হক

আপন অন্ধকারে

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

এখন আমি কি করে উপরে উঠব- সিঁড়ির ঠিক প্রথম ধাপে দাঁডিয়ে উপরের দিকে চেয়ে তার সঙ্গিনীর মনে ভাবনা এলো, এখন কি করে আমি উপরে উঠি, এই সিঁড়িগুলোর ধাপ বেয়ে উপরে উঠে ওকে, আমার সঙ্গীকে কি করে বলি, আমি শুয়ে পড়তে চাই। আমি আর দাঁড়াতে পারি না, তোমার দিকে চাইতে পারি না, নিজের দিকে না, পৃথিবীর নিকে না, কোনো দিকে না- আমি এখন অন্ধকার চাই, একাকী হতে চাই এবং ঘুমিয়ে পড়তে চাই এবং ঘুমিয়ে পড়তে চাই এবং ঘুমিয়ে পড়তে চাই।

লোহার সিঁড়িটা বোতলের ছিপি খোলার ঘোরানো আঁকশির মতো পাক দিয়ে উপরে উঠে গেছে। গোড়ালি ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল দিয়ে মেয়েটির পায়ের পেছনের দিকটা লোহার স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠি- ইস্‌ কি ঠাণ্ডা- আর মেয়েটি ভাবে, কেমন করে উপরে উঠব! অসম্ভব, আমি উপরে উঠতে পারব না, আমাকে নিচে থাকতে হবে- নিচে মানে গর্তে, খাদে, অন্ধকারে- আমি কি উপরে উঠতে পারি!

জং ধরেছে লোহার সিঁড়িটায়। মাঝে মাঝে গেছে বেঁকো হয়ে, ফুটো হয়ে। কিন্তু এক পা এক পা করে ঘুরে ঘুরে আরোহী পৌঁছুবে একটা আশ্চর্য সংকীর্ণ বারান্দায়। ধারণা হবে ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের মতো বারান্দাটা শূন্যে ঝুলছে। দেড় হাত চওড়া বারান্দা শিকের ওপর ভর করে কীভাবে টিকে আছে জানতে বাসনা যদি প্রবল হয়- দেখা যাবে সরু সরু তিনটে লোহার খুঁটি ওটাকে ধরে আছে। খুঁটি তিনটেকে কিছুতেই গ্রাহ্য হবে না এবং আশঙ্কা প্রবল ও বিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসবে, যখন সেইটুকু বারান্দা গভীর কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠবে আরোহী পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে। এঃ, কাঠ! ভিজে স্যাঁতসেঁতে কাঠের তক্তা ফাঁক ফাঁক করে সাজানো, বৃষ্টির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, যেন ধারালো নখর হয়েছে তাদের। তখন বাড়িটার দিকে একবার চাইতে হয়। বারান্দাটার মতো গোটা বাড়িটাই ঝুলছে, গোটা বাড়িটারই আগাগোড়া কাঠের মেঝে, দেয়াল সব- একান্তই কাঠের ছাদ হয় না, তাই টিন দিয়ে ছাওয়া। তখন দেখা যাবে- এঃ কাঠ- সব কাঠ, ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, পুরনো তক্তা ফাঁক ফাঁক করে সাজানো- বৃষ্টির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, যেন নখর বেরিয়েছে ওদের, যেন বহুকাল বাড়িটা দাড়ি কাটে না, নখ কাটে না, সে যেন বহুকাল থেকে হুমড়ি খেয়ে আছে পৃথিবীটার ওপর- ক্ষুধার্ত চোখে চেয়ে আছে। বারান্দাটার মাঝামাঝি দরজা দিয়ে যে ঘরটা, তার পাশের ঘরটা এবং ওপাশের অনুরূপ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে উঠানহীন নর্দমার ওপর বাঁশ পুঁতে পুঁতে উঁচু করা কাঠের রান্নাঘরটার প্রত্যেকটিতে ঠিক একই রকম ভিজে অন্ধকার।

ঘর দুটি পার হলে ওদিকেও একটি বারান্দা। কাঠের, সংকীর্ণ এবং আর্তনাদময় এবং সেখানে দাঁড়িয়ে দিন হলে শূন্যতা এবং শূন্যতা পেরিয়ে বড় বড় গাছ ও রাত্রি হলে গাছগুলোতে বাদুড়ের মতো ঝোলা অবস্থায় অন্ধকারকে প্রত্যক্ষ করা যায় এবং এই সমগ্র ছবিটা একনজরে মেয়েটির অনুভবে এলো- পুরো ছবি নয়, এ ছবির অতি অল্প অংশই দেখা, প্রায় সবটাই মন এঁকে নিল। কিন্তু মেয়েটি অনুভব করে ছবিটা আশ্চর্য রকমের বাস্তব এবং এ ছবির এতটুকু হেরফের হওয়ার উপায় নেই। তখন সে এবং তার দুর্বল পা এবং লোহার রেলিংয়ে রাখা তার শীর্ণ ডানহাত একসঙ্গে ভাবতে শুরু করে, কী করে, কী করে এখন উপরে ওঠা যায়। কিন্তু এতগুলো ভাবনা আসলে যে মুহূর্তের মাত্র- কারণ অতি অল্প সময়ের মধ্যেই একটি মাত্র আলো কিংবা ভয় মনের মধ্যে লক্ষবার অনুরণন তুলতে পারে- তা মেয়েটি বুঝল যখন ওর সঙ্গী ছেলেটি এক হাতে একটা স্যুটকেস নিয়ে রিকশাওয়ালাকে পয়সা দিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলল, হ্যাঁ, এখানেই, এসো। বলে উদ্ভট আকারের জুতো জোড়া কসরত করতে করতে ঘুরতে লাগল এবং উঠতে লাগল এবং লোহার সিঁড়ি থেকে ঠং ঠং করে শব্দ হলো। তখন, আমাকে যেমন করেই হোক উঠতে হবে, পড়ে থাকলে তো চলবে না- ভেবে এবং সংকল্প করে মেয়েটি স্যান্ডেল টানতে টানতে উঠতে শুরু করল। কিন্তু আরোহণের সঙ্গেই তো পতন মিশে থাকে এবং আরোহণটা কিছু সবক্ষেত্রেই ভালো নয়, সুখকর নয়, তাই হঠাৎ বিশ্রী একটা শব্দ করে তাকে মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রেলিংয়ে দু'হাতে ভর দিয়ে অতি করুণভাবে সে কয়েকবারই ওই অপছন্দনীয় শব্দটা করতে থাকে।

এঃ হে, বমি হচ্ছে নাকি? তাই তো! দাঁড়াও, আসছি আমি। ছেলেটি যেখানে ছিল সেই ধাপেই স্যুটকেসটা নামিয়ে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে নেমে এলো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, বমি হচ্ছে? আমার হাত ধরো, ধরে আস্তে আস্তে উঠে এসো।

পারি না, পারছি না। ঠিক আছে, একটু বিশ্রাম নাও। আমি ধরছি তোমাকে। কাছে এসে এক হাতে মেয়েটির কাঁধের কাছে ধরে থাকে ছেলেটি। সঙ্গে সঙ্গে বমির আরেকটা তীব্রতা এসে মেয়েটিকে কুঁকড়ে দেয়। অতি কষ্টে নিজেকে সামলায় সে, কিন্তু নিচের দিকে চেয়ে তার মাথা ঘুরে ওঠে। আমি কিছুতেই উঠতে পারব না।

মেয়েটি বসে পড়তে চেষ্টা করে।

আরে, আরে পড়ে যাবে যে, কী সাংঘাতিক- আতঙ্কিত ছেলেটি এক হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে এবং এক পা এক পা করে উঠে স্যুটকেসটার কাছে এসে সেটা আর এক হাতে নিয়ে কোনো রকমে বারান্দায় উঠে আসে। বারান্দাটা ক্যাঁচকোঁচ করে একরাশ শব্দ করে ওঠে এবং যেন থামতেই চায় না। সন্ধ্যা তখন দ্রুত এগিয়ে আসছে, জনবিরল এই এলাকায় তবু দূরের বাড়ির ঈর্ষাতুর কোনো বধূ ভাবল, আহা, ওরা কি সুন্দর, কত সুখী, কেমন কোমরে হাত জড়িয়ে ছেলেটি নিয়ে তুলল মেয়েটিকে। আহা।

বারান্দায় কিন্তু সত্যিই বসে পড়ে মেয়েটি। বসে বসে প্রাণপণে সামলাতে চেষ্টা করে নিজেকে।

উঠে তো এলাম, যেমন করেই হোক, বমিই হোক আর যা-ই হোক, উঠে তো এলাম, কিন্তু, এক্ষুনি আমার যে শুয়ে পড়া প্রয়োজন। ওকে বলা যায় কী করে সে কথা? কী করে বলি, চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না, তোমাকে না, পৃথিবীকে না, আমি শুয়ে পড়ব অন্ধকারে, একাকী হয়ে শুয়ে পড়ব এবং ঘুমোব। মেয়েটি ভাবল।

সে, ওর সঙ্গী তখন প্যান্টের পকেটে হাত চালিয়ে পুরনো মরচে ধরা একটা চাবি বের করে ওর দিকে চেয়ে স্লান হেসে কতকালের জং ধরা বিরাট তালাটা খুলল খচমচ করে, তারপর সেটাকে একদিকে কড়ায় আটকে ক্যাঁক করে বন্ধ করল আবার এবং তারপর ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলতেই ভিজে ভ্যাপসা একটা গন্ধ এবং পুরনো একখানা অন্ধকার বারান্দা বেরিয়ে এসে ওদের একসঙ্গে ঝাপটা দিল।

বিশ্রী গন্ধ তো- ছেলেটা বলল, মেয়েটা প্রাণপণে আবার বমি সামলাল।

এসো, ঘরে এসো- বলে সে স্যুটকেসটা নিয়ে ভেতরে ঢোকে এবং সঙ্গিনীর দিকে আর একবার চেয়ে মমতার সঙ্গে বলে, উঠতে কষ্ট হচ্ছে? হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কেন বলো তো? উঠো না, আমি আসছি, দাঁড়াও।

সে এসে ওকে ধরে তুলে ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে সরু লম্বাটে ঘরটার মধ্যে একটা শূন্য তক্তপোষ, তার একটা কোণে অন্ধকারে জাগিয়ে উবু হয়ে শুয়ে আছে। মেয়েটিকে সেই তক্তপোষের পিঠের ওপর বসিয়ে, নিজেও তার পাশে বসে একটা পা স্যুটকেসের ওপর উঠিয়ে দিয়ে বলল, জঘন্য গন্ধ আর বিশ্রী অন্ধকার।

বাইরের রাস্তায় আলো জ্বলে উঠল।

পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বালিয়ে ছেলেটা দেখল হোল্ডার আছে, কিন্তু কোনো বাল্ক্ব নেই। একটু চেষ্টা করতেই সুইচও চোখে পড়ল; কিন্তু দেশলাইয়ের কাঠিটা পুড়ে শেষ হওয়ার আগেই সে বুঝতে পারে মিস্ত্রি ডেকে মেরামত না করলে এবার বৈদ্যুতিক আলো পাওয়া যাবে না। এতক্ষণের মধ্যে এই প্রথম ওরা দু'জনেই একসঙ্গে স্বাভাবিক আলোচনা শুরু করে। এখন কী করা যায় বলো তো কুঁড়ি? (কুঁড়ি নামটা ভীষণ বেখাপ্পা শোনায়, চমকে উঠতে হয় নামটা শুনে- ও যদি কুঁড়ি হয়, তাহলে আবার ফুটবে কখন? দেখে তো মনে হয় ফোটার পালা শেষ করে ও এখন বাসি হতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু সেটাই যখন ওর নাম এবং ওর সঙ্গে লেপ্টে বসে থাকা ছেলেটাই যখন ডাকছে ওই নাম ধরে, কী আর করা যাবে?)।

এখন কী করা যায়?

কিসের কী করা যায়?

আলো নেই যে! আলোর ব্যবস্থা করা যায় কী করে?

বাল্ক্ব নেই বুঝি?

শুধু তা হলে তো ভাবনাই ছিল না- বাল্ক্ব একটা কিনে এনে লাগানো যেত। দেখলাম তো, তার-টার কিছুই ঠিক নেই। মিস্ত্রি ছাড়া হবে না।

বাড়িওয়ালার সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা হয়নি?

বাড়িওয়ালার কাছে একবার গেলে বুঝতে পারতে ওরা কী জিনিস। তিন মাসের বাড়িভাড়া নিয়েছে অ্যাডভান্স। তাতেও কি ডাঁট গেছে? ব্যাটা শহরের মাঝখানে দোতলা বাড়িতে- কোনো আদ্যিকালে এই ভুতুড়ে বাড়িটা তৈরি করে রেখেছে এখানে। ও ব্যাটা কোনো দিন আসে এখানে ভেবেছ? তবু কোনো কথা বলার উপায় নেই- সঙ্গে সঙ্গে শুনতে হবে, আপনার দরকারটা কী অমন খারাপ বাড়ি নিয়ে, আপনাকে তো সাধাসাধি করা হচ্ছে না! আলোর কথা জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, আছে, আছে, আলো আছে, তবে একটু ঠিকঠাক করে নিতে হবে আরকি। নতুন তার-টার লাগাতে হতে পারে কিন্তু। উঠে তো পড়ূন। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিনি অতটা তখন।

তাহলে আর কী করা যাবে?

কিন্তু অন্ধকারে থাকব কী করে এখন?

অন্ধকারই তো ভালো।

ঠিক আছে, মোড়ের মাথার মুদিখানা থেকে একটি মোমবাতি নিয়ে আসব।

কোনো দরকার নেই, অন্ধকারেই চলে যাবে আমাদের।

তা না হয় হলো, কিন্তু আজ শোবে কোথায়?

কেন, এখানে।

এই তক্তপোষে? কিন্তু কাল-পরশুর আগে বিছানা পাব কোথায়? অর্ডার দিতে হবে। তৈরি করিয়ে নিতে হবে সবকিছু। সব ব্যবস্থা না করে এলে এমন অসুবিধাই হয়।

তুমি কাছে থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই। সব ব্যবস্থা করতে গিয়ে শেষে তোমাকে হারাব?

তাই বলে একেবারে খালি হাতে?

আমি সুখ চাই না, আনন্দ চাই না, আলো চাই না; আমি শুধু তোমাকে চাই।

আমি তো রয়েছিই তোমার কাছে।

কই, কোথায়- কাছে এসো, আরো কাছে এসো।

এই তো।

কান পেতে থেকে আর বিশেষ কিছু শোনা যায় না কিছুক্ষণ। যা শোনা যায় তা ভাষা নয়। কাজেই বোঝা যায় না। তা অস্পষ্ট, দ্রুত এবং অস্ম্ফুট এবং উত্তপ্ত এবং ভীষণ তীব্র। কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। সবকিছুরই শেষে একটি মাত্র দিব্য। তার নাম ক্লান্তি। সে সকলের শেষে আসে। অত্যন্ত ধীরে ধীরে সে আসে- কিন্তু আসে নিশ্চিত গতিতে। সে সবকিছুরই শেষে আসে- একমাত্র বোধহয় মৃত্যু ছাড়া। মৃত্যুর আগে আসে সে এবং এজন্যই মরতে এতো ক্লান্তি।

সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিরক্ত, ক্রুদ্ধ এবং পীড়িত মেয়েটি ভাবল।

এবার ওদের ক্লান্তি-আক্রান্ত কথা শোনা যায়। মেয়েটি বলে, যেন খালি হাতে বলেছিল, একেবারে খালি হাতে। এসেছি নাকি? এইভাবে এখানে এনে তুললে নাকি আমাকে?

ভীত কণ্ঠে সে বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু কি সময় দিলে আমাকে? ভাগ্যিস বাড়িটা দেখে রেখেছিলাম আগে থেকে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি আচমকা এসে তুমি বলবে, আমি চলে এলাম- তা আমি ভাবিনি। কাল আমাকে যেমন করে হোক মেসে একটা খবর দিতে হবে।

কিন্তু তাই বলে একদম খালি হাতে আসবে তা কে ভেবেছিল?

সে ভাবনাটা তোমার নয়, সে ভাবনা আমার।

ভালো। কিন্তু আমি দেরি করতে চাই না। খুব তাড়াতাড়ি আমরা ধরা পড়ে যাব। সে তো তুমি বুঝতেই পারছ!

হ্যাঁ, ধরা আমাদের তাড়াতাড়িই পড়তে হবে।

কাজেই তার আগে এটা হয়ে যাওয়া দরকার।

কোনটা?

বুঝতে পারছ না নাকি কোনটা? আমাদের বিয়েটা।

ও।

তার মানে? ও রকম চুপ করে গেলে যে? শোন, আমি দু-তিন দিনের বেশি দেরি করব না। এই দু'দিনের মধ্যে তোমাকে জিনিসপত্র কিনে ফেলতে হবে- জিনিসপত্র মানে- বিছানাপত্র, হাঁড়িকুড়ি, টেবিল-চেয়ার- সবকিছু। কাল মিস্ত্রি ডাকার ব্যবস্থা করবে- একটা ঝিয়ের খোঁজ করবে। আমরা এভাবে চোরের মতো বাঁচতে চাই না। আমরা ভদ্রলোকের মতো বাঁচব।

কাদের মতো বললে?

ভদ্রলোকের মতো। তারা যেমন করে বাঁচে।

কিন্তু তুমি কিছুই জানো না যে!

আমি কিছুই জানতে চাই না, কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন নেই আমার। আমরা শুধু ভালো করে বাঁচতে চাই।

আমাকে আবার কিছু টাকা দেশে পাঠাতে হয়। চার-পাঁচটা ছোট ভাই-

এরপর বলবে একটা বুড়ো বাপ, বুড়ি মা। ওসব আমি শুনতে চাই না। চার-পাঁচটা ছোট ভাই কেন তোমার? আর এ কথা আমি আগে জানতে পারিনি কেন?

চেঁচিও না, চেঁচিও না বলছি। আমি তোমাকে বাঁচতে নিষেধ করছি। তোমার চিৎকার আমার অসহ্য লাগছে।

না, আমি চেঁচাব না, আমি চেঁচাব। কিন্তু আমি কী করে এলাম? আমার ছোট ভাইগুলোর মুখ তোমার মনে পড়ে? আমার মায়ের মুখ? আমি কী করে এসেছি? অন্তত গোটা আশি টাকা তো আমি দিতে পারতাম মাসে।

এতক্ষণে সম্পূর্ণ পতন হয় নায়িকার। ঘরে অন্ধকার। জমাট হয়ে ওঠে। রাস্তার আলো সেই অন্ধকারকে দ্বিখণ্ডিত করে পশ্চিমের কাঠের দেয়ালের একটা সাদা রেখা হয়ে থাকে। ভ্যাপসা গন্ধটা আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে গিয়ে সোঁদা গন্ধ হয়ে ওঠে। পা নাড়তেই গোটা বাড়ি চিৎকার করে ওঠে, পড়ে যাওয়ার ভয় দেখায়, ফাঁক ফহ্নাঁক বসানো তক্তার ভেতর দিয়ে শাঁই শাঁই করে বাতাস আসে। এই অবস্থায় কুঁড়ি নির্দয় হয়ে চৌকির পিঠের ওপর লুটিয়ে পড়ে। তখন শোনা যায় চুলের ওপর হাত বোলানোর আরামদায়ক শব্দ আর এই ফিস ফিস কথাগুলো-

কেঁদো না, কেঁদো না কুঁড়ি- কাঁদবার কী হয়েছে। আমি তোমাকে আঘাত দেওয়ার জন্য কিছু বলিনি।

তা আমি জানি। আমার সব মনে পড়ে গেল হঠাৎ। আমার পৃথিবীটা মনে পড়ে গেল। তাই। কিন্তু তুমি কেঁদো না, তুমি কাঁদতে পারবে না।

না, আমি কাঁদতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে চেয়েছি। আর হাসতে চেয়েছি, জানো?

জানি।

জানো না, তুমি জানো না।

আমি জানি কুঁড়ি।

তুমি তা বিশ্বাস করো?

করি।

ঠিক করে বলো। বিশ্বাস করো তুমি? যেমন করে ধার্মিকরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে?

আমি কোনো ধার্মিককে চিনিনে। ওদের বিশ্বাস কী রকম কী করে বলব কুঁড়ি?

তুমি নিজে ধার্মিক নও?

না, আমি বকধার্মিক, আমি ভণ্ড। আমি তা জানি।

আমি জানি, তুমি ধার্মিক- তুমি আমার চেয়েও ধার্মিক।

আমার চেয়েও খাঁটি তুমি। তাই তুমি আমার প্রিয়তম।

তুমি যেন ঠকে যেও না কুঁড়ি।

আমি জানি আমি ঠকব না।

তোমার শরীরটা ভালো লাগছে না, তাই না কুঁড়ি?

কেন?

তখন হঠাৎ বমি হলো কেন?

শরীরটা খুব ক্লান্ত ছিল।

কিন্তু বমি হলো কেন?

বমি বমি হয়েছিল, ঠিক বমি হয়নি।

কিন্তু কেন?

ও কিছু না; খুব টায়ার্ড ছিলাম আমি।

কিছু না হলেই ভালো। এখন কেমন লাগছে।

ভালো লাগছে, তুমি রয়েছ।

কোথাও একটু পানির ব্যবস্থা নেই, ঘরের মধ্যে আবর্জনা। কিন্তু এখন তো কোনো কিছুই করা সম্ভব না। তুমি একটু হাত-মুখ ধুতে চাও না?

কিছু প্রয়োজন নেই।

ঠিক আছে, কাল সব ব্যবস্থা হবে। এখন?

এখন আমরা শুয়ে পড়ব- এসো শুয়ে পড়ি।

কিন্তু কিছু খাওয়া তো দরকার।

আমি কিছু খাব না।

আরো ক্লান্ত হয়ে পড়বে কুঁড়ি।

কিন্তু আমি কিছুই খাব না এখন। তুমি খাবে তো?

আমাকে খেতে হলে কোনো হোটেলে যেতে হয়- যে কোনো হোটেল হলেই চলে। কিন্তু তা সম্ভব না।

কেন?

তোমাকে এখানে একলা রেখে যাওয়া যায় না।

খুব যাওয়া যায়, খুব যাওয়া যায়, যাও তুমি। এক্ষুনি যাও, কিছু খেয়ে এসো।

এই অন্ধকারে তোমাকে একা রেখে!

কিছু ভাবতে হবে না- যাও তুমি।

কিন্তু-

আঃ যাও না তুমি।

ঠিক আছে এত করে বলছ যখন। আচ্ছা, আমি দশ মিনিটেই ফিরব।

তোমার কিছু তাড়াতাড়ি করার প্রয়োজন নেই। যাও তুমি।

সে গেল। গেছে সে- মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটি ভাবল, চিরদিনের জন্য না, কিছুক্ষণের জন্য। ততক্ষণ আমি একা। আমি অন্ধকার চেয়েছিলাম, একা হতে চেয়েছিলাম, আমি অন্ধকার পেয়েছি, একা হয়েছি। হঠাৎ বমি বমি হলো কেন? কেউ কি আসছিস? অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ কি আসছিস আমার কাছে? কেউ যদি আসে, সে ঘৃণ্য হওয়ার আগেই আমরা ব্যবস্থা করব। ততক্ষণ অন্ধকার আমাকে গ্রাস করুক। অন্ধকারের সঙ্গে ক্লান্তি আসছে দেখছি। ক্লান্তি তো শেষে অসে- এত আগে কেন- ভাবতে ভাবতেই শূন্য চৌকির পিঠে ধুলো, অন্ধকার এবং দুর্গন্ধের মধ্যে মেয়েটি ঘুমালো। চুল, দাড়ি, নখ, না কাটা সুন্দরবনের কাপালিকের মতো বাড়িটা ক্রোধে গর্জন করতে লাগল অন্ধকারের দিকে।

ছেলেটি সন্তর্পণে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মেয়েটিকে স্পর্শ করে বলে, আমি একটা চাদর পাততে চাই- স্যুটকেসের মধ্যে চাদর আছে।

চাদরের দরকার নেই। শুয়ে পড় তুমি। ইস, গন্ধ কেন এত, কী খেয়েছ?

কিছু খেয়েছি।

কতক্ষণ পর তুমি এলে?

ঘণ্টা দুই হবে।

আমি কিছুই জানিনে- প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে মেয়েটি বলে- না, না, টেনো না আমাকে, জড়িয়ো না কোনো কিছুর সঙ্গে- বলেই ঘুমিয়ে পড়ে। তখন ছেলেটি সেই মৃত মাংসস্তূপের মধ্যে আগুন জ্বালানোর আয়োজন করল। আগুন জ্বলল না। সে নিজেই জ্বলল। তারপর নিভে গেল। তারপর চুল ছিঁড়ল। উঠল, দাঁড়াল, দু'হাতে মাথা টিপে বসে রইল।

অন্ধকারের দিকে চেয়ে বাড়ি গর্জন করে।

লেখক



কথাসাহিত্যিক

প্রাবন্ধিক



রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের এবারের সাধারণ অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরবেন ...

ডিজিটাল পাঠ্যবই যুগের সূচনা

ডিজিটাল পাঠ্যবই যুগের সূচনা

অডিও, ভিডিও, টেক্সট এবং এনিমেশন সমৃদ্ধ ডিজিটাল পাঠ্যবইয়ের যুগে প্রবেশ ...

নগ্ন পোস্টারে বিতর্কের মুখে 'মায়া'

নগ্ন পোস্টারে বিতর্কের মুখে 'মায়া'

প্রকাশিত হলো সরকারি অনুদানের ছবি ‘মায়া দ্য লস্ট মাদার’ এর ...

টেকনাফের ‘ইয়াবা রানি’ তিনি!

টেকনাফের ‘ইয়াবা রানি’ তিনি!

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ৭২ হাজার ২৯০ পিস ইয়াবাসহ ইয়াসমিন আক্তার ...

ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন ভারতের তিন ক্রিকেটার

ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন ভারতের তিন ক্রিকেটার

চিন্তাটা গতকালই মাথা চাড়া দিয়েছে ভারতীয় দলে। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ...

আগামী নির্বাচনে ইভিএমের পক্ষে নয় জাতীয় পার্টি: এরশাদ

আগামী নির্বাচনে ইভিএমের পক্ষে নয় জাতীয় পার্টি: এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জানিয়েছেন আগামী জাতীয় সংসদ ...

খিদে পেলেও খাওয়া ঠিক নয় যেসব খাবার

খিদে পেলেও খাওয়া ঠিক নয় যেসব খাবার

খুব বেশি খিদে পেলে খাবার নিয়ে অনেকসময় কারও বাছ বিচার ...

পুনম পান্ডের একী কাণ্ড!

পুনম পান্ডের একী কাণ্ড!

বরাবরই নানা কাণ্ড নিয়ে খবরের শিরোনাম হন পুনম পান্ডে। এবারও ...