খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সু-অর্থনীতির জন্য সুশাসন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

সুশাসনের অর্থ আইনের শাসন। আমাদের বাংলাদেশে আইনের কোনো অভাব নেই। পর্যাপ্ত আইন-ই আছে প্রায় সব বিষয়ে। কিন্তু এই আইনগুলো বাস্তবায়ন হয় না। যে কারণে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না এবং সুশাসনের তীব্র অভাব আমরা প্রায়ই বোধ করছি। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে বোধ করি। কয়েক দিন আগে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে ঢাকার যানবাহন যে কয়দিন নিয়ন্ত্রণ করেছিল, ওই কয়েকটি দিন ঢাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো ঝঞ্ঝাটও হয়নি। সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রদের সঙ্গে চালকদের কোনো সংঘাতও হয়নি। কিন্তু তারা যখনই উঠে গেল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ পুলিশ নামল- তখনই দেখা গেল প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষ মারা যাওয়া শুরু করল। এমনকি পুলিশের একজন এসআইও মৃত্যুর মুখে পতিত হলো মিরপুরে একটা দুর্ঘটনায়। এর থেকে যেটা আমরা বুঝতে পারি, স্কুলের ছেলেমেয়েদের একটাই চাওয়া ছিল- আইন আছে প্রয়োগ হচ্ছে না, সেই আইনের যেন প্রয়োগ হয়। সে জন্য যাদের লাইসেন্স নেই এবং যেসব বাসের ফিটনেস নেই সেগুলোকেতারা রাস্তায় চলতে দেয়নি। তারা কিন্তু সরকারের বিরোধিতা করেনি। তাদের কোনো নির্দেশ দেওয়ারও প্রয়োজন হয়নি। আমরা দেখেছি, ওই কয়টি দিন ভাঙাচোরা বাস রাস্তাতেই নামেনি। কারণ বাস মালিক এবং চালকরা বুঝেছেন, ছোটরা আইন ছাড়া কিছু বোঝে না, ওরা তাদের ধরে ফেলে আইনের সম্মুখীন করবে। আইনের শাসনের পক্ষে এই যে এক ধরনের ইমেজ, যা অবশ্যই থাকা দরকার এবং সেটা ছাত্রদের ছিল। কিন্তু দৃশ্যপটে আবার পুলিশ চলে আসার পর এসব অপরাধ আবার বেড়ে গেল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা বলেছে, এ ক'দিনে তারা প্রচুর সংখ্যক যানবাহন আটক করে মামলা দিয়েছে এবং মামলার জরিমানাস্বরূপ কয়েক কোটি টাকা আদায় করেছে। আমাদের কথা হলো মামলা দেওয়া, জরিমানা আদায় করা এসব হলো প্রসেস বা প্রক্রিয়া। এগুলো আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো, রাস্তায় আইনের প্রয়োগ এবং সঠিকভাবে গাড়ি চালানো। সেটি করতে কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন। এর মোটা দাগের কারণ বিশ্নেষকরা বলছেন, পুলিশ আইনের শাসন কায়েম করতে পারছে না প্রধানত দুর্নীতির কারণে। যখনই কোনো ফিটনেসবিহীন বাস ধরা পড়ে বা লাইসেন্স থাকে না তখনই ঘুষ নিয়ে তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। ছাত্র আন্দোলনের পরে যা হয়েছে তা হলো ঘুষের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আগে ১০০ টাকা প্রয়োজন হতো এখন ৫০০ টাকায় ঠেকেছে। মূলত এ প্রক্রিয়া থেকেই তারা বেরুতে পারেনি।

কয়েকদিন আগে টিআইবি তাদের একটি গবেষণার ফল প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা পরিস্কার পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ সংস্থা হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অর্থাৎ পুলিশ। রাস্তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ এ সংস্থাটি। রাস্তায় সুশাসনের অভাব এবং এই গবেষণার ফলাফল, দুটি বিষয়কে যদি মেলাতে চেষ্টা করি হিসাব কিন্তু মিলে যায়। আমরা তবে বলতেই পারি, সারাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে হচ্ছে না, এটি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে দুর্নীতির মাধ্যমে।

এটা তো গেল সামাজিক দিক। এবার আসি অর্থনৈতিক দিকের কথায়।

আইন অমান্য করা কেন ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল সেই কথাই বলব এবার। ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অতি সংবেদনশীল খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম বলেই মানি। এ খাতটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অকৃত্রিম সততার। জনগণের টাকা নিয়ে ব্যবসা করা হয় এখানে, দুর্নীতি করলে জনগণের টাকা হুমকির মুখে পড়ে যায়। যে কারণে ব্যাংকের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগে দেখা যেত, শুধু ভালো ছাত্র হলেই ব্যাংকে চাকরি পাওয়া যেত না, একই সঙ্গে তার ও তার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা হতো। কারণ ব্যাংক পরিচালনা পরিষদ মনে করত, ব্যাংকে কোনোভাবেই দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। ব্যাংকের নিয়োগ এখন নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে থাকে, এই প্রক্রিয়াও এখন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এমনও শোনা যায়, প্রভাবশালীদের সুপারিশেও ব্যাংকে চাকরি হয়ে যায়। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এভাবে নিয়োগের মাধ্যমে যা হয়- নিয়োগপ্রার্থীদের শিক্ষার মানের ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়, অন্যদিকে তাদের নৈতিকতার বিষয়েও কোনো পরীক্ষা করা হয় না। ফলে ব্যাংকে এক ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা সরকারি সেক্টরের বেসিক ব্যাংকের কথা বলতে পারি। আকারে ছোট হলেও এ ব্যাংকটি ছিল সরকারি সেক্টরের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক। যার খারাপ ঋণের পরিমাণ ছিল এক থেকে দেড় শতাংশের মধ্যে। কিন্তু সরকার কর্তৃক একজন চেয়ারম্যান ও একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাংকটির চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। ব্যাংকটির খারাপ ঋণের পরিমাণ ৮০ শতাংশ পৌঁছে গিয়েছিল, এখন যা ৬০ শতাংশের কিছু ওপরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ ব্যাংকটি রীতিমতো লুটপাট হয়েছে। সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওই ব্যাংকে বছর পাঁচেক ছিলেন, তারা ওই কাজটি করেছেন। সরকারের উত্তর হতে পারে, আমরা কী করে বুঝব যে তিনি এমনটা করবেন। ধরে নিলাম সরকারের কথাটি ঠিক। কিন্তু এক বছর পরেই যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ড জানিয়ে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিল, অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলেন না বরং তাকে চুরি চালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন। সবশেষে তার নিয়োগ শেষ হওয়ার এক মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং আইনের ৪৬ ধারার অধীনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলল, তাকে অবিলম্বে পদচ্যুত করার সুপারিশ করল তারা। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় চিঠিটি পেয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন আগে ওই ভদ্রলোক পদত্যাগ পত্র দাখিল করে চলে যান। পদচ্যুত করার আইন ও পদত্যাগ পত্র দাখিল করে নিজের ইচ্ছায় চলে যাওয়ার মধ্যে বেশ তফাত আছে। একজন দোষী ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে ব্যাংক থেকে চলে গেলেন। এ থেকে যা বোঝা গেল, সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে এ ধরনের অন্যায় সংগঠিত করার ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক টেকানোর জন্য সরকার বাজেট থেকে বরাদ্দ দিয়েছে। বাজেটের টাকাও তো জনগণের টাকা। একদিক থেকে টাকা লুট হবে আরেক দিক থেকে জনগণের টাকা দিয়ে সেটা পূরণ করা হবে, এটি তো আইনের বিধান নয়।

প্রাইভেট ব্যাংকের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। ফারমার্স ব্যাংকের কথা বলা যেতে পারে। এখানেও বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে এবং এই ব্যাংকটিকেও রক্ষা করার জন্য সরকার উঠে পড়ে লাগল। এখানেও জনগণের টাকা রক্ষা করার দোহাই দিল সরকার। কিন্তু আসলেই কি তাই, নাকি দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করাই ছিল সরকারের উদ্দেশ্য। সরকারের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক যাদের নিজেদেরও মূলধনের ঘাটতি রয়েছে তাদের বলা হলো, এমন ব্যাংকগুলোকে মূলধন দিতে হবে।

তবে ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় রকমের আইনের লঙ্ঘন যেটা করা হয়েছে, সেটা উল্লেখ করতেই হয়। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টে নিয়ম ছিল একটি ব্যাংকে একটি পরিবার থেকে দু'জনের বেশি ডিরেক্টর নিয়োগ দেওয়া যাবে না। জনগণের টাকার নিরাপত্তার জন্য এই আইন করা হয়েছিল। আমাদের প্রাইভেট খাতের একটি ব্যাংকের মালিক পক্ষ সরকারের খুব ঘনিষ্ঠজন। সেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে মালিক পক্ষের পাঁচজন ব্যক্তি ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের এই বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠির জবাব ওই ব্যাংক থেকে আসেনি। কারণ তারা সরকারের বেশ ঘনিষ্ঠ। উল্টো তারা করল কি, তাদের শাস্তি না দিয়ে বরং আইনকেই যেন শাস্তি দেওয়া হয়! আইনে কেন রয়েছে একই পরিবার থেকে দু'জনের বেশি ডিরেক্টর থাকতে পারবে না! এবং সরকারের পক্ষ থেকে আইনটি পরিবর্তনে উদ্যোগও নেওয়া হলো। দু'জনের পরিবর্তে সেটা চারজন করা হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংসদীয় কমিটি এমনটি করা সঠিক হবে না মর্মে আপত্তি জানাল। কিন্তু সরকারের কোনো এক পর্যায়ের নির্দেশে বা অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংসদীয় কমিটি তারা তাদের মতামত পরিবর্তন করল এবং অবশেষে আইনটি পাস হলো।

একটি বেআইনি কাজকে সঠিক করতে যেখানে আইনের পরিবর্তন করা হয়, এর চেয়ে গর্হিত কাজ আর কী হতে পারে। সরকারের এসব কর্মকাণ্ডে দেশে দুর্নীতি বিস্তারে সহায়ক হচ্ছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এমনটা হতে থাকলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। সুশাসনের অভাব চলতেই থাকবে।

লেখক



অর্থনীতি বিশ্নেষক

প্রাবন্ধিক

নওয়াজ শরিফকে মুক্তির আদেশ

নওয়াজ শরিফকে মুক্তির আদেশ

দুর্নীতির মামলায় কারাগারে থাকা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে মুক্তির ...

তপ্ত দুবাইয়ে আরও উত্তপ্ত ম্যাচ

তপ্ত দুবাইয়ে আরও উত্তপ্ত ম্যাচ

বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালক জামিল জানালেন, বাইরে এখন ৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা। পরিচয় ...

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সারাদেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি যাতে কোনো গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক ...

আফজাল শরীফের চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আফজাল শরীফের চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘ ৪ বছর ধরে মেরুদণ্ড, কোমর ও হাড়ের ব্যথায় ভুগছেন ...

শহিদুলের জামিনের শুনানি হতে পারে আগামী সপ্তাহে

শহিদুলের জামিনের শুনানি হতে পারে আগামী সপ্তাহে

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ...

সালমান শাহকে স্মরণ করে যা বললেন ঋতুপর্ণা

সালমান শাহকে স্মরণ করে যা বললেন ঋতুপর্ণা

'নায়ক সালমান শাহ বাংলা ছবির অমর নায়ক। তাকে নিয়ে অনেক ...

রাজপথের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে: মওদুদ

রাজপথের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে: মওদুদ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, রাজপথের মাধ্যমেই দলের ...

লেবাননের জালে ৮ গোল বাংলাদেশের মেয়েদের

লেবাননের জালে ৮ গোল বাংলাদেশের মেয়েদের

এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বের ম্যাচে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা ...