রিজওয়ানুল ইসলাম

জনশক্তি নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

বাংলাদেশের মতো দেশে জনসংখ্যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে- এটিই সাধারণ ধারণা। কারণ, এখানে জনবসতি ঘন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও উচ্চ। কিন্তু জনসংখ্যা ইতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারে- বিশেষ করে তার বড় অংশ যদি কর্মক্ষম হয়। জনসংখ্যার কর্মক্ষম অংশটিকে জনশক্তি বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে এবং এই জনশক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগানো যেতে পারে।

মোট জনসংখ্যায় কর্মক্ষমদের অংশ কত বড় হবে, তা নির্ভর করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের বিবর্তনের ওপর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রাথমিক স্তরে শিশুদের সংখ্যা বেশি হয় এবং তার ফলে কর্মক্ষমদের ওপর নির্ভরশীল জনসংখ্যার অংশও উচ্চপর্যায়ে থাকে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যায় বলে মোট জনসংখ্যায় বিভিন্ন বয়সের লোকের অংশে পরিবর্তন ঘটে। একদিকে শিশুদের অংশ কমে, অন্যদিকে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের অংশ বাড়ে। আর তার অর্থ হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষের অংশের বৃদ্ধি। তবে এই অবস্থা চিরস্থায়ী হয় না; তৃতীয় স্তরে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর তার ফলে আবার কর্মক্ষম লোকের অংশ কমে যায়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিবর্তনের যে দ্বিতীয় স্তরের কথা উল্লেখ করা হলো সে সময় কর্মক্ষম জনসংখ্যা বা জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা যায়; এবং এই প্রক্রিয়ায় যে বাড়তি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায় তাকেই বলা হয় "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" বা জনশক্তি থেকে পাওয়া লাভ। তবে এ লাভের ধারণাটিকে জনশক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও সুপরিসর কাঠামোতে দেখা যায়।

জনসংখ্যার বয়স কাঠামোয় কী পরিবর্তন হচ্ছে সেদিকে তাকালে দেখা যাবে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমার ফলে (অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে) শিশুদের অংশ কমে যায়। তখন পারিবারিক এবং সরকারি উভয় পর্যায়েই ব্যয় কমে এবং সঞ্চয় বাড়ে। সঞ্চয় বিনিয়োগের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত; সুতরাং সঞ্চয় বাড়লে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এভাবে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়লে সেটাকেও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সঞ্চয় বৃদ্ধির কতটুকু জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য হলো, সেটি পরিমাপ করা সহজ নয়। সে যাই হোক, বর্তমান রচনায় আমরা জনশক্তি থেকে লাভ পাওয়ার সম্ভাবনার দিকেই নজর দেব।

জনশক্তি থেকে লাভ পেতে হলে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক যেহেতু নারী, শ্রমশক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ কম হলে মোট শ্রমশক্তি সম্ভাব্য সংখ্যার চাইতে কম হবে। সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার পুরুষের চাইতে অনেক কম, এই হার বাড়াতে পারলে শ্রমের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।

জনশক্তি থেকে ফায়দা তুলতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে

প্রথমত, শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম লোকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত করে তুলতে হবে। উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো কোনো কাজে (যেমন কৃষি, সনাতন পদ্ধতির যানবাহন, অনানুষ্ঠানিক খাতের সেবা ইত্যাদিতে) হয়তো নিরক্ষর ব্যক্তিরাও কাজে লাগতে পারেন। কিন্তু একটু উপরের স্তরে উঠলেই কিছু শিক্ষার দরকার হয়ে পড়ে। যেমন, কৃষিকাজে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে বা নিজের কোনো উদ্যোগ চালু করতে গেলে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার প্রয়োজন হয়। শিল্প খাতে একেবারে নিম্ন পর্যায়ের কাজেও কিছু দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আর একটু উপরের স্তরে উঠতে হলে শিক্ষা এবং দক্ষতাতেও উঠতে হবে ওপরে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাত যতই আধুনিক এবং জটিল হতে থাকবে, প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের স্তরে এবং ধরনেও ঘটবে পরিবর্তন। দেশের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

মানব উন্নয়নের অন্যান্য দিকেও যেমন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শ্রমের উৎপাদিকা শুধু শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং যন্ত্রের ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না; শ্রমিকের স্বাস্থ্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অপুষ্টিতে ভোগা শ্রমিকের মাধ্যমে জনশক্তির ফায়দা তোলার আশা করা যায় না।

এ তো গেল শ্রমের সরবরাহের দিক। শিক্ষিত এবং দক্ষ শ্রমিক কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণে এবং সঠিক ধরনের কর্মসংস্থান। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমন হওয়া চাই যে তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের রণনীতির ওপর নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির ধাঁচ কেমন হবে এবং তার ফলে কোন খাতে কী ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সুতরাং জনশক্তি থেকে ফায়দা তুলতে হলে উন্নয়নের রণনীতি এবং নীতিমালা প্রণয়নের সময়ই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়লে আপনা-আপনি তা থেকে লাভ ঘরে উঠে আসবে- এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

কর্মক্ষম জনসংখ্যার অংশ বাড়ছে না

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরোর এক প্রক্ষেপণে (২০১৫ সালে প্রকাশিত) দেখানো হয়েছিল যে মোট জনসংখ্যায় ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষের অংশ ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাড়বে। একই প্রতিবেদনে প্রক্ষেপিত হয়েছিল যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০৪১ সাল থেকে কমতে শুরু করবে। এই দুটো হিসাব থেকে মনে করা হয়েছিল কর্মক্ষম জনসংখ্যার অংশ ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তির জরিপ থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালের পর থেকেই কর্মক্ষম জনশক্তির অংশ কমতে শুরু করেছে। ২০১০ সালে এই অনুপাত ছিল ৫৮.২ শতাংশ, যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেড়ে ৬৮.৯ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালে সংখ্যাটি কমে ৬২.৩ শতাংশে নেমে যায়। এ দুই বছরের জরিপ থেকে এও দেখা যায় যে যুবকদের মধ্যে (অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে) শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে গেছে। এসব উপাত্ত থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কি তবে শ্রমশক্তি থেকে লাভ করার পর্যায় পার হয়ে গেছে? আসলে বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখা ঠিক হবে না।

শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার সামগ্রিকভাবে বাড়তে পারে

প্রথমত, এমন হতে পারে যে জন্মহার হ্রাসের যে ধারা প্রক্ষেপিত হয়েছিল, তার চেয়ে দ্রুত কমতে শুরু করেছে অথবা তা অনুমানের চেয়ে তাড়াতাড়ি হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অংশ কমতে শুরু করলেও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বাড়তে পারে। কারণ শেষোক্তটি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বাস্তবেও ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে এই হার সামান্য হলেও বেড়েছে (সারণি ১)।

দ্বিতীয়ত, যুবকদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমলেও তিরিশোর্ধ্বদের মধ্যে তা বেড়েছে। বিভিন্ন কারণে তা হয়ে থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষায় বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বাড়লে যুবকদের শ্রমশক্তিতে প্রবেশের হার কমতে পারে। তবে তারা শিক্ষা সমাপ্ত করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে মধ্যবয়সীদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বাড়তে পারে। সারণি ১-এর উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ৩০-৬৪ বছর বয়স্কদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সারণি ১ :বিভিন্ন বয়সের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার, ২০১৩ এবং ২০১৫-১৬

বয়স ২০১৩ ২০১৫-১৬

মোট পুরুষ নারী মোট পুরুষ নারী

১৫-২৯ ৫৩.৮ ৬৭.১ ৪১.৪ ৪৯.৯ ৬৯.৬ ৩২.৩

৩০-৬৪ ৬৩.৩ ৯৭.২ ৩০.২ ৬৮.০ ৯৪.৬ ৪১.০

৬৫+ ৩৩.৬ ৫৪.৬ ১২.৫ ৩৪.২ ৫২.৩ ১১.১

সব শ্রেণি ৫৭.১ ৮১.৭ ৩৩.৫ ৫৮.৫ ৮১.৯ ৩৫.৬

উৎস :শ্রমশক্তি জরিপ



তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ৩০ থেকে ৬৪ বছর একটি দীর্ঘ বয়সসীমা; ত্রিশ বা চল্লিশ বছর বয়সের ব্যক্তি এবং পঞ্চাশ বা তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষা, দক্ষতা, কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। যাদের বয়স অপেক্ষাকৃত কম, একদিকে তাদের শিক্ষার স্তর উঁচু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং অন্যদিকে তাদের শিক্ষার ক্ষেত্র এবং প্রশিক্ষণের ধরন শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর বাংলাদেশ যেহেতু এখনও জনসংখ্যার বিবর্তনের দ্বিতীয় পর্যায়েই রয়েছে, শ্রমশক্তির বয়স কাঠামোতে তুলনামূলকভাবে কম বয়সের ব্যক্তির অংশ বেশি হওয়ারই কথা। তবে শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে ৩০ থেকে ৬৪ বয়সসীমার মধ্যেকার ভাগগুলো দেখানো হয়নি বলে এই বিষয়ে দৃঢ়ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

তৃতীয়ত, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার এখনও বেশ কম এবং তা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে কিছুটা বাড়লেও এই হার ২০১০ সালের হারের চেয়ে নিচে রয়ে গেছে। তাছাড়া পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে এই হার আরও বাড়তে পারে। তা অর্জন করতে পারলে জনশক্তিতে থেকে লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কিছুকাল থাকতে পারে।

সংখ্যায় বাড়াই যথেষ্ট নয়, শিক্ষা এবং দক্ষতায় জনশক্তির গুণগত মান বাড়াতে হবে

সাধারণ শিক্ষায় বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা উন্নতি হলেও তাতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি। প্রথমত, ১৯৯৯-২০০০ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে অশিক্ষিত শ্রমশক্তির অংশ বেশ কিছুটা কমলেও ২০১৫-১৬ সালে তা আবার বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ২০১০ সালে মালয়েশিয়ায় এই শ্রেণির শ্রমিকের অংশ ছিল মাত্র ৩.২ শতাংশ, আর বাংলাদেশে ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৩২.৫ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, তৃতীয় স্তরের (স্নাতক বা তদূর্ধ্ব) শিক্ষাপ্রাপ্তদের অংশ সে সময়কালে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল, কিন্তু ২০১৩ সালের পর তা কমে গেছে। তৃতীয়ত, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের অংশ খুবই কম। ২০১০ সালে মাধ্যমিক এবং তার ওপরের স্তরের শিক্ষায় নিয়োজিতদের মধ্যে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার অংশ ছিল মাত্র ২.৪ শতাংশ। সে সময় মালয়েশিয়া ও চীনে এ হার ছিল যথাক্রমে ৬.৩ এবং ১৮.৪ শতাংশ। এসব উপাত্ত থেকে বোঝা যায় যে শিক্ষার স্তরের দিক থেকে বাংলাদেশের জনশক্তি বা শ্রমশক্তির গুণগত মান বেশ নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে। তবে শিক্ষা এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজনের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে শুধু বেশি শিক্ষা বিশেষ কাজে আসে না।

অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার কম শিক্ষিতদের চেয়ে বেশি। রেখাচিত্র-১ থেকে দেখা যায়, তৃতীয় স্তরের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, আর যাদের প্রাথমিক শিক্ষাও নেই তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম। এটা অবশ্য বিভিন্ন কারণে হতে পারে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের অন্যতম কারণ চাকরি খোঁজায় বেশি সময় ব্যয় করা অথবা চাকরি বদল করা। কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে অনেক নিয়োগকর্তাই অভিযোগ করেন, তারা যে ধরনের যোগ্যতা এবং দক্ষতা চান, ঠিক সে ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পান না। তার অর্থ এই যে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মজগতের সামঞ্জস্যের অভাব রয়েছে। সুতরাং উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং দেশের জনশক্তিকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাবে- এমনটি ভাবার বিশেষ কারণ নেই।

অনেক সময় মনে করা হয় যে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন বেশি; সুতরাং দ্বিতীয়টির ওপর বেশি জোর দিয়ে কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটালেই জনশক্তি থেকে লাভ পাওয়া যাবে। ওপরে বাংলাদেশ ও এশিয়ার অন্য দুটি দেশের তুলনা থেকেও এটাই মনে হতে পারে। বস্তুত, উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও যারা বেকারত্বের হার কম রাখতে পেরেছে (যেমন জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড) সেসব দেশে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর অনেক বেশি। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে সেসব দেশে এ ধরনের শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সম্পর্ক অনেক নিবিড়। শিক্ষার পাঠক্রম হওয়া চাই নমনীয় এবং গতিশীল, যাতে শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সহজেই পরিবর্তন করা যায়। আর সে কাজে নিয়োগকর্তাদেরও সংশ্নিষ্ট করে তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাবিদ এবং নিয়োগকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়ে শিক্ষা এবং কাজের জগতের মধ্যে দূরত্ব কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কি যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে?

জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে কি-না তা অনেকাংশে নির্ভর করে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেমন ধাঁচের অর্থাৎ প্রবৃদ্ধিতে জনশক্তিকে কাজে লাগানোর মতো উপাদান রয়েছে কি-না। সাম্প্রতিক উপাত্তের দিকে তাকালে এ ব্যাপারে আশান্বিত হওয়ার মতো বিশেষ কারণ পাওয়া যায় না। এশিয়ার যেসব দেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছিল (যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া) তাদের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সবসময়ই কিছুটা পিছিয়ে ছিল। সম্প্রতি বিশেষ করে ২০১০ সালের পর অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে।

২০০৫-০৬ থেকে ২০১০ সময়কালে প্রতি এক শতাংশ পয়েন্ট জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল ০.৫৫ শতাংশ। ২০১০-২০১৩ সময়কালে সেটা কমে ০.৩৯ শতাংশে নেমে যায়, আর ২০১৩ থেকে ২০১৫-১৬ সময়ে তা আরো কমে ০.১৮ শতাংশে নেমে যায়। শুধু তাই নয়, শিল্প খাতে মোট নিয়োজিতদের সংখ্যা ২০১৩ সালের ৯৫ লাখ থেকে ২০১৫-১৬ সালে ৮৬ লাখে নেমে যায়। ২০১৬-১৭ সালে সংখ্যাটি সামান্য বেড়ে ৮৮ লাখে পৌঁছায়, কিন্তু ২০১৩ সালের স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। অথচ ২০১০ সালের পর এই সময় শিল্প খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা মোটামুটি ভালোই ছিল- বার্ষিক ১০ শতাংশ বা তার ওপর। এর অর্থ এই যে ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের শিল্প খাতে কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে। এ ধরনের কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হলে জনশক্তি থেকে লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা কম হবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ হয়তো বলতে পারেন, উৎপাদনে কম পরিমাণ শ্রম লাগলে সেটা ভালো। কারণ, তার অর্থ হচ্ছে শ্রমে উৎপাদিকা বেড়েছে। কথাটায় সত্যতা আছে; তবে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে শ্রমের সরবরাহ এখনও প্রচুর, সেখানে শুধুমাত্র উৎপাদিকা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক রণনীতি সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে বাস্তবসম্মত রণনীতি হওয়া উচিত উৎপাদিকা এবং শ্রমিকের নিয়োগ যুগপৎভাবে বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানো। পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি খুবই সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায় শ্রমঘন শিল্পের দ্রুত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং উৎপাদিকা দুই-ই বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশের শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না কেন, এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, জনশক্তি থেকে লাভ পাওয়ার বিষয়টি সরবরাহ এবং চাহিদা দু'দিক থেকেই দেখতে হবে। শুধুমাত্র সংখ্যার দিকে দৃষ্টি সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রমশক্তির গুণগত মানের দিকে যেমন নজর দিতে হবে, একই সঙ্গে দেখতে হবে উন্নয়নের রণনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটা সহায়ক।

লেখক



সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা, এমপ্লয়মেন্ট সেক্টর

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), জেনেভা

পরবর্তী খবর পড়ুন : আরজ আলী মাতুব্বর

বিশ্বে প্রতি ৫ সেকেন্ডে ১ শিশুর মৃত্যু: জাতিসংঘ

বিশ্বে প্রতি ৫ সেকেন্ডে ১ শিশুর মৃত্যু: জাতিসংঘ

ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগ ও বিশ্ব ...

বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ৬ বছরের শিশুর মৃত্যু

বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ৬ বছরের শিশুর মৃত্যু

লিজা আক্তার। বয়স মাত্র ৬ বছর। চোখের সামনে বাবা ট্রেনে ...

বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির সম্ভাবনা

বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির সম্ভাবনা

ব্রহ্মপুত্র, আপার মেঘনা ও গঙ্গা অববাহিকার পানি কমা অব্যাহত রয়েছে। ...

স্ত্রীসহ ডিআইজি মিজানুরকে দুদকে তলব

স্ত্রীসহ ডিআইজি মিজানুরকে দুদকে তলব

ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশ সদর দপ্তরের ...

বিএনপির কথা-কাজে জনগণের আস্থা নেই: হানিফ

বিএনপির কথা-কাজে জনগণের আস্থা নেই: হানিফ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ...

জানালার গ্রিল কেটে শাবিপ্রবির ছাত্রী হলে চুরি

জানালার গ্রিল কেটে শাবিপ্রবির ছাত্রী হলে চুরি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শহীদজননী জাহানারা ইমাম ছাত্রী ...

দেশের মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার: কামরুল ইসলাম

দেশের মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার: কামরুল ইসলাম

বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করেছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ...

'গ্রিন টি'র ঘোষণা দিয়ে ইথিওপিয়া থেকে আনা ২০৮ কেজি খাথ জব্দ

'গ্রিন টি'র ঘোষণা দিয়ে ইথিওপিয়া থেকে আনা ২০৮ কেজি খাথ জব্দ

চট্টগ্রামে 'গ্রিন টি' হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আনা নতুন ধরনের ...