মনজুর হোসেন

এসএমই খাতের ভূমিকা

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বার্ষিক প্রায় ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছর ২০১৯ সালে ৮ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চায়। এ জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও অভিযোজনক্ষম প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন। উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল হাতিয়ার শিল্পায়ন। অনেকের মতে, বাংলাদেশের এ চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মূলে রয়েছে ক্রমবর্ধমান কৃষিবহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

গত দশকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে এবং সেবা খাতে হয়েছে ৭ শতাংশ হারে। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান প্রায় ৩১ শতাংশ, যা ১৯৯০ সালে ছিল ২১ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের মোট জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫০ শতাংশ। গত দু'দশকে জিডিপিতে কৃষির অবদান ব্যাপকভাবে কমেছে। ১৯৯০ সালের ২৯ শতাংশ থেকে কমে ২০১৪-১৫ সালে প্রায় ১৬ শতাংশে নেমে আসে। জিডিপিতে কৃষির অবদান হ্রাস পেলেও কৃষি এখনও কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস (প্রায় ৪৮ শতাংশ)। কৃষি কর্মসংস্থানের বড় উৎস হলেও প্রবৃদ্ধি মূল চালিকাশক্তি হলো শিল্প খাত। দেশের মোট জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। কিন্তু দেশের বিশাল কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি নিয়োজনে শিল্প খাত তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনও সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসএমই খাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বিকাশ ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তাকরণের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

ম্যানুফ্যাকচারিং কর্মকাণ্ডের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে এখন টেক্সটাইল পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, ফিনিশড লেদার, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, ফার্নিচার, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ ইত্যাদি শিল্পের প্রসার ঘটছে। বিশ্বে বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় হলেও বিশ্ব রফতানি বাজারের মাত্র ৫ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছর ২০১৯ সালে বিশ্ব রফতানি বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ৫৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মাত্রা অর্জন আবার বিভিন্ন বিষয় যেমন রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অন্ব্বেষণ ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। এ পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসএমই খাতের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক বাজারে এসএমই পণ্যের প্রবেশ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নীতি এজেন্ডা হতে পারে।

এসএমই খাতের প্রবৃদ্ধির ধারা :বাংলাদেশের শিল্প কাঠামোতে এসএমই খাত প্রাধান্য বিস্তার করছে। অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ অনুযায়ী, দেশের সব আন্তর্জাতিক ইউনিটের ৯৭ শতাংশের বেশি ক্ষুুদ্র ও মাঝারি (কুটির শিল্প ও অতি ক্ষুুদ্র প্রতিষ্ঠানসহ) আকারের শিল্প ইউনিট। দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের সংখ্যা ৮ লাখ ৬৮ হাজার (২০১৩), যা ২০০১ ও ২০০৩ শুমারিতে উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি। দেশের মোট ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের মধ্যে এসএমই ইউনিটের সংখ্যা ৩৪ হাজার এবং এসব ইউনিটে প্রায় ৭০ লাখ জনবল নিয়োজিত। অথনৈতিক শুমারি-২০১৩ অনুযায়ী, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কর্মসংস্থানে অতি ক্ষুুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবদান যথামে ৭.৮, ১৬.২ ও ৬.৫ শতাংশ তবে অর্থনৈতিক শুমারিতে মূল্য সংযোজন সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের সার্বিক মূল্য সংযোজনে এসএমই খাতের অবদান পরিমাপ করা যায়নি। তবে এসমআই জরিপ-২০১২ এর উপাত্ত ব্যবহার করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মোট মূল্য সংযোজনে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনৈতিক ইউনিটের অবদান হিসাব করা হয়েছে যথাক্রমে ৫.৯, ২৩.৭ ও ২৩.৩ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, মাঝারি আকারের শিল্প ইউনিটের বৃদ্ধি অন্য আকারের ইউনিটের মতো দ্রুত হারে হয়নি, যা ক্ষুুদ্র প্রতিষ্ঠানের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপান্ত্মরের সমস্যা বা জটিলতাকে নির্দেশ করে।

গত এক দশকে যেখানে কৃষিবহির্ভূত খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হারে, সেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ হারে (বিবিএস :অথনৈতিক শুমারি, ২০০১/৩ ও ২০১৩)। দেশের মোট কৃষি-বহির্ভূত অথনৈতিক ইউনিটের মাত্র ১০ শতাংশের সামান্য বেশি ম্যানুফ্যকচারিং সংশ্নিষ্ট এবং অবশিষ্ট ইউনিটগুলো ব্যবসা (ট্রেডিং) ও সেবা সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এ থেকে প্রতীয়মান, অর্থনৈতিক ইউনিটের মোট সংখ্যায় ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের অংশ কমছে, যা ব্যবসা ও ম্যানুফ্যাকচারিং বহির্ভূত সেবা খাতের দ্রুত বিকাশ ও বৃদ্ধিকেই নির্দেশ করে।

এসএমই খাতের প্রবৃদ্ধির ধারা বাংলাদেশের এসএমই খাতের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে। ২০১৩ সালে দেশের কৃষি-বহির্ভূত অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ৮২ মিলিয়ন, যা ২০০১/৩ ও ১৯৮৬ সালে ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ও ২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০০১/৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০০১/৩ সাল থেকে ২০১৩ সময়কালে ৭ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়। ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের সংখ্যা ২০০১/৩ সালের শুমারিতে ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩ সালের শুমারিতে ৮ লাখ ৬৮ হাজারে উন্নীত হয়। অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কৃষি-বহির্ভূত অর্থনৈতিক ইউনিটের মোট সংখ্যায় ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের অংশ ১৯৮৬ সালের ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০০১/৩ সালে ১২ দশমিক ১ শতাংশ ও ২০১৩ সালে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। এ থেকে বোঝা যায়, এসএমই খাতে ব্যবসা ও ম্যানুফ্যাকচারিং-বহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রাধান্য বিস্তার করছে, যদিও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের তুলনায় ম্যানুফ্যাকচারিং কর্মকাণ্ড সামান্য দ্রুত হারে (৮ দশমিক ২ বনাম ৭ দশমিক ৯ শতাংশ) বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তঃশুমারি সময়কালে কৃষি-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রবৃদ্ধি গ্রাম এলাকার (৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ) চেয়ে শহর এলাকায় সামান্য বেশি (৮ দশমিক ৪ শতাংশ)। গত আন্তঃশুমারি সময়কালে গ্রাম এলাকায় কৃষি-বহির্ভূত অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বার্ষিক কম্পাউন্ড ৮ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। যার ফলে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটে কৃষি-বহির্ভূত অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ২০০১ সালের ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩ সালে ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ হয়।

জাতীয় অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান :জাতীয় অর্থনীতিতে এসএমই খাতের প্রকৃত অবদান নিরূপণ করা বেশ কঠিন। কারণ এসএমই শিল্প সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় উপাত্তের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি এসএমইর সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। বিভিন্ন নমুনা জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান হিসাব করা হয়েছে। এডিবি (২০১৫) পরিচালিত এক সমীক্ষা অনুসারে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে আইএফসি-ম্যাককিনসে (২০১১) অনুসারে এসএমই খাতের অবদান ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিবিএস বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা এখন পর্যন্ত জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান হিসাব করার কোনো চেষ্টা করেনি। আইএফসি-ম্যককিনসে সমীক্ষা হিসাব করে দেখেছে, দেশের মোট রফতানিতে এসএমই খাতের অবদান ১১ শতাংশ। এসএমআই ২০১২ সমীক্ষার উপাত্ত ব্যবহার করে বলা যায়, ম্যানুফ্যাকচারিং মূল্য সংযোজনে এসএমই খাতের অবদান হলো ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং কর্মসংস্থানে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। যার মানে এসএমই হলো শ্রমের দক্ষ ব্যবহারকারী।

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস হলো এসএমই খাত। প্রায় ২৪ মিলিয়ন লোক এ খাতে নিয়োজিত। এদের প্রায় ২৩ শতাংশ আবার ম্যানুফ্যাকচারিং এসএমইতে। দেখা গেছে, কর্মসংস্থান বেশি হয়েছে মূলত সেসব প্রতিষ্ঠানে, যেখানে ১০-৪৯ জন এবং ৫০-৯৯ জন কর্মী রয়েছে। তাই অন্যান্য গ্রুপের চেয়ে এ দুটি গ্রুপ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে গতিশীলতা এনেছে।

এসএমই খাতের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ :বাংলাদেশের এসএমই খাতভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে থাকে সেগুলো হলো :প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের অভাব, কার্যকরী মূলধনের অপর্যাপ্ততা, প্রযুক্তির নিম্নমান, নিম্ন উৎপাদনশীলতা, পণ্য বিপণন সুবিধাদির অভাব, বাজার প্রবেশের সমস্যা ইত্যাদি। অধিকন্ত অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, দুর্বল অবকাঠামো, কমপ্লায়েন্স ইস্যু, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।

অর্থায়ন সুবিধা :২০১৩ সালে  INSPIRED ১,২০০ ম্যানুফ্যাকচারিং এসএমইর ওপর এক জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা গেছে, ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান এবং ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ মাঝারি প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। অপর্যাপ্ত অর্থায়ন সুবিধা আরও প্রকট হয় উচ্চ সুদের হার, জামানত প্রদানের কঠোর বিধান, ঋণ গ্রহীতাদের অধিকারের অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ইত্যাদি কারণে। ঋণ ঝুঁকি নিশ্চয়তা স্কিমগুলো (জামানতবিহীন অর্থায়ন প্রসারে অপরিহার্য) কার্যকর নয়। বিকল্প অর্থায়ন সুবিধা বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারকে বহুমুখীকরণে (ক্ষুুদ্রঋণ থেকে শুরু করে লিজিং, ফ্যাক্টরিং, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ইক্যুইটি ফান্ড ইত্যাদি) আইনি কাঠামো/নীতি পদক্ষেপের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ১৯ শতাংশ এসএমইর দখলে। এসএমই খাতে বর্তমানে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ ও বিশেষ নির্দেশনার কারণে। এসএমই ঋণের এরূপ প্রবাহ টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ব্যাপী অব্যাহত থাকা অপরিহার্য। এসএমই খাতকে অর্থায়ন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৮৮ সালে বেসিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলেও বেসিক ব্যাংক সে উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য এসএমই অর্থায়নে আলাদা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এসএমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হলেও দেশের ৪০ শতাংশের বেশি এসএমই এখনও আনুষ্ঠানিক ঋণ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাচ্ছে সেখানেও কিছুটা ক্রেডিট গ্যাপ রয়েছে। এভাবে ব্যাপক ক্রেডিট গ্যাপের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ঋণের চাহিদাও বিদ্যমান।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন সমস্যা। অর্থায়ন সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সাধারণ বাধাগুলো ছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের সেবা দেওয়ার জন্য ব্যাংক শাখায় আলাদা ডেস্ক বা নির্দিষ্ট ব্যাংক সুবিধা না থাকা, অপর্যাপ্ত পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, আর্থিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি নারী মালিকানাধীন এসএমইগুলোর উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়।

এসএমই ঋণের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া এখনও একটি জটিল বিষয়। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে মানসম্মত পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত জ্ঞান/ধারণা ও কর্তৃত্বের অভাবের কারণে ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণের আবেদন অনুমোদনে দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকে। ঋণ অনুমোদনে বেশির ভাগ ব্যাংক কেন্দ্রীকৃত অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করায় ঋণ অনুমোদনে প্রতিটি ব্যাংকের ৪০ থেকে ৬০ দিন লাগে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

ব্যবসা সহায়ক সেবা সুবিধা :ব্যবসা সহায়ক সেবা সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করতে কর্মপরিকল্পনা না থাকা, কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার না থাকা, ব্যবসা উন্নয়ন সেবাকেন্দ্রের দুর্বল সেবা প্রদান, ই-কমার্স ও ই-গভর্নমেন্ট সার্ভিসের জন্য আইনি কাঠামো না থাকা ও সেসব সার্ভিসের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং এসএমইর জন্য নির্ভরযোগ্য অনলাইন পোর্টাল না থাকার কারণে বাংলাদেশের এসএমইগুলো কার্যকর ব্যবসা সহায়ক সেবা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হচ্ছে এসএমইর জন্য গৃহীত প্রধান ব্যবসায়িক কৌশল। ব্যবসা সহায়ক সেবা প্রদানের পদক্ষেপ হিসেবে পণ্যের গুণগত মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ, মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তথ্য প্রয়োজন। বিভিন্ন ব্যবসায় সংগঠন ও সংস্থার পাশাপাশি এসএমই খাতের সঙ্গে সরকারি খাতের সংস্থাগুলোর (যেমন এসএমইএফ, বিসিক, বিএসটিআই, বিএবি ইত্যাদি) নিবিড় যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা দরকার। কীভাবে কমপ্লায়েন্স স্ট্যান্ডার্ড প্রতিপালন করা হবে, আইএসও ৯০০০ এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্ব্বীকৃত সার্টিফিকেশন পাওয়া যাবে ইত্যাদি বিষয়ে এসএমই খাতকে ব্যবসা সহায়ক সেবা সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ :আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের এসএমইগুলো নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে থাকে। অপর্যাপ্ত রফতানি সম্প্রসারণ কর্মসূচি, অপর্যাপ্ত পরামর্শ ও পর্যাপ্ত উচ্চ মানসম্পন্ন তথ্য না থাকা ইত্যাদি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসএমই পণ্য প্রবেশে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য একটি সুসমন্বিত ও পদ্ধতিগত উপায়ে রফতানি সক্ষমতা গঠনমূলক কর্মসূচি তৈরি করে দেশব্যাপী পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এসএমইগুলোকে বিদেশে বাজার (কম সময় ও কম খরচে শুল্ক্ক ছাড়সহ) সম্প্রসারণে উৎসাহ জোগাতে অধিকতর আর্থিক সেবা সহায়তামূলক ব্যবস্থা (ব্যবসা ঋণ, অনুদান, বীমা স্কিম) থাকা প্রয়োজন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রফতানি সংক্রান্ত ও এসএমই পণ্যের গতিধারা সংক্রান্ত কোনো তথ্য সংরক্ষণ করে না বিধায় বাংলাদেশি এসএমইদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের মাত্রা ও বিস্তৃতি বোঝা যায় না। সুতরাং এসএমই পণ্য রফতানি সংক্রান্ত সঠিক তথ্যসহ সেসব পণ্যের রফতানি গন্তব্য সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

উদ্যোক্তা শিক্ষার প্রসার :অনেক দেশেই এসএমই উন্নয়ন কৌশলগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উদ্যোক্তা শিক্ষার প্রসার ঘটানো। আর এসএমই উন্নয়নে এ ধরনের কর্মসূচি সফলও হয়েছে। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা শিক্ষা যেমন উদ্যোক্তা প্রসার নীতিতে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি তেমনি পর্যাপ্ত বাজেট, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাসহ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সাধারণ ও উচ্চশিক্ষায় উদ্যোক্তা শিক্ষা সঠিকভাবে প্রবর্তন করা হয়নি এবং কারিকুলাম তৈরি, গবেষণা, কাস্টমাইজড ট্রেনিং, কোচিং, ইন্টার্নশিপ, বিজনেস অ্যাওয়ার্ড, বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের সঙ্গে কার্যকর পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার অভাব রয়েছে। দেশে এসএমই ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা বিষয়ক অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার তেমনভাবে ঘটেনি।

স্বল্প খরচ ও স্বল্প সময়ে স্টার্টআপ এবং উন্নত আইন ও বিধিবিধান :এসএমই খাতে স্বল্প খরচ ও স্বল্প সময়ে নতুন ব্যবসা উদ্যোগ/প্রতিষ্ঠান শুরু এবং উন্নত আইন ও বিধিবিধান তৈরির ক্ষেত্রে নীতিমালায় ঘাটতি রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা নিবন্ধন পদ্ধতি ও ব্যবসার কার্যক্রম শুরুর সার্বিক প্রক্রিয়া যেমন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল, তেমনি সময় সাশ্রয়ীও নয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমইর ভূমিকা- বৈশ্বিক পর্যায় :বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এসএমই কৌশলগত গুরুত্ব দখল করে রেখেছে (বালা সুব্রাম্যানিয়া-২০০৮)। শিল্পায়নে এসএমই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জাপানের সফলতা বিপুল প্রশংসিত। জাপানের এসএমইগুলো সাবকন্ট্রাক্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বৃহৎ ফার্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে (ম্যাকমিলান-১৯৯৬)। সাবকন্ট্র্রাক্টিং হলো বৃহৎ ফার্ম থেকে এসএমইতে কারিগরি সহায়তা, আর্থিক সহায়তা, উপকরণ সরবরাহ, ব্যবস্থাপনাগত সহায়তা ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফার্মগুলোর মধ্যে উলম্ব সহযোগিতা স্থাপনের মাধ্যমে এসএমইগুলোর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে (রঘাভেন্দ্র ও বালা সুব্রাম্যানিয়া-২০০৫)।

এসএমই খাতে এ পর্যন্ত সাধিত অগ্রগতিকে ধরে রেখে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কেননা, এসএমই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখছে। দেশের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা দলিল, যেমন কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২১, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, শিল্পনীতি ২০১৬তে উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে এসএমই খাতের উন্নয়ন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশে এসএমই খাত বিকাশের অমিত সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে পর্যাপ্ত মানবসম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের কারণে। তবে এ খাতকে গতিশীল করতে অনুকূল ও সাযুজ্যপূর্ণ নীতি পরিবেশের যথেষ্ট ঘাটতিও রয়েছে। এসএমই খাতের বিকাশকে বেগবান করার লক্ষ্যে এ খাতের সংস্থাকে এগিয়ে নিতে সঠিক কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক



সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইডিএস

মনোনয়ন পাচ্ছেন না বদি-রানা: কাদের

মনোনয়ন পাচ্ছেন না বদি-রানা: কাদের

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের উখিয়ায় আবদুর রহমান বদি এবং টাঙ্গাইলের ...

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খেতে পারেন পেঁয়াজ

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খেতে পারেন পেঁয়াজ

গোটা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সময় মতো ...

তবুও জয় পেলো না জার্মানি

তবুও জয় পেলো না জার্মানি

জার্মানি ইউরোপিয়ান নেশনস লিগের গ্রুপ 'এ' থেকে 'বি' তে নেমে ...

‘এরশাদকন্যা’র বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

‘এরশাদকন্যা’র বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পালিত কন্যা ও জাতীয় ...

ভালো নেই আমজাদ হোসেন

ভালো নেই আমজাদ হোসেন

অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেনের। ...

৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাতীয় পার্টি: এরশাদ

৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাতীয় পার্টি: এরশাদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনশ' আসনেই জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী ...

শাস্তি কমছে না স্মিথ-ওয়ার্নারদের

শাস্তি কমছে না স্মিথ-ওয়ার্নারদের

শাস্তি কমতে পারে স্মিথ-ওয়ার্নার ও বানক্রফটের। সোমবারের খবর ছিল এমনই। ...

বাবার বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন সারা, সাজিয়ে দিয়েছিলেন মা

বাবার বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন সারা, সাজিয়ে দিয়েছিলেন মা

অমৃতার সঙ্গে সাইফ আলী খানের বিয়েবিচ্ছেদ হয়েছে বহু বছর আগে। ...