জয়নুল আবেদিন

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

জয়নুল আবেদিন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার বিখ্যাত অন্যান্য শিল্পকর্ম হলো- ১৯৫৭-তে নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাডোনা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার দীর্ঘ দুটি স্ট্ক্রল ১৯৬৯-এ অঙ্কিত 'নবান্ন' এবং ১৯৭৪-এ অঙ্কিত 'মনপুরা-৭০' জননন্দিত

দুটি শিল্পকর্ম...

জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে তার আমৃত্যু প্রচেষ্টা এবং চিত্রশিল্পে তুলনারহিত প্রতিভার জন্য তিনি শিল্পাচার্য অভিধা লাভ করেন।

জয়নুল আবেদিন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার বিখ্যাত অন্যান্য শিল্পকর্ম হলো- ১৯৫৭-তে নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাডোনা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার দীর্ঘ দুটি স্ট্ক্রল ১৯৬৯-এ অঙ্কিত 'নবান্ন' এবং ১৯৭৪-এ অঙ্কিত 'মনপুরা-৭০' জননন্দিত দুটি শিল্পকর্ম। তিনি চিত্রাঙ্কনের চেয়ে চিত্রশিক্ষা প্রসারের ওপর অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছেন। অনুমান করা হয়, তার চিত্রকর্মের সংখ্যা তিন সহস্রাধিক।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে দুটি দেশের সৃষ্টি হয়- ভারত ও পাকিস্তান। পূর্ববঙ্গ নতুন নাম লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান, যা পরবর্তীকালে ১৯৭১-এ বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে একটি চিত্রকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। পূর্ববঙ্গের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণ কক্ষে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। সূচনায় এর ছাত্রসংখ্যা ছিল মাত্র ১৮। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সালে এই আর্ট ইনস্টিটিউট সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে সে আর্ট ইনস্টিটিউট শাহবাগে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে এটি একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর একই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়'। জয়নুল আবেদিন ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জয়নুল আবেদিনের আগ্রহ ও পরিকল্পনায় সরকার ১৯৭৫-এ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করে।

তিনি তার নেতৃত্বগুণে অন্যান্য শিল্পীকে সংগঠিত করার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি এমন এক স্থানে এটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যেখানে বাস্তবিক পক্ষে অতি নিকট অতীতেও শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাভিত্তিক কোনো ঐতিহ্য ছিল না। জয়নুল আবেদিন ও তার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী সহকর্মীর অক্লান্ত চেষ্টায় মাত্র এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পকলা তার স্থান করে নেয়।

জয়নুল আবেদিনের কাছে প্রাচ্যের অঙ্কন ধারা অতিমাত্রায় রীতিনির্ভর ও অপরিবর্তনশীল মনে হয়েছে, যা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ধারা তার কাছে সীমাবদ্ধ হিসেবে প্রতিভাত। এ সবকিছু মিলিয়ে তিনি রিয়ালিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন। রেখাচিত্রের ওপর তার দুর্বলতা অবশ্য থেকেই যায় এবং দৈনন্দিন জীবনচিত্রের উপস্থাপনায় তিনি এর ব্যবহারে এনেছেন বৈচিত্র্য। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে জয়নুল আবেদিন ধারাবাহিকভাবে একাধিক চিত্রের স্কেচ করেন। এ দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। সস্তা প্যাকিং পেপারে চায়নিজ কালি ও তুলির আঁচড়ে 'দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র' নামে পরিচিত জয়নুলের এ চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে শব-সওদাগরদের নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক কলুষতা, সেই সঙ্গে নিপীড়িতের অমানবিক দুর্দশা। সেসব চিত্রকর্ম জয়নুলকে ভারতব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। তার চেয়েও বড় কথা, এগুলো মানুষের দুর্দশা, কষ্ট ও প্রতিবাদকে সামনে এনে বাস্তবধর্মী চিত্র অঙ্কনে তার স্বকীয়তাকে বিকশিত করে। 'দ্য রেবেল ক্রো' (জলরঙ, ১৯৫১) এ ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন। উচ্চ মার্গের নন্দনতত্ত্বের মিশেলে সামাজিক অনুসন্ধিৎসা ও প্রতিবাদের সম্মিলিত প্রকাশ রিয়ালিজমের এ নির্দিষ্ট ধারা বিভিন্ন সময়ে জয়নুলকে প্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন ১৯৬৯ ও ১৯৭১-এ জয়নুল তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজ করেছেন এ স্টাইলে।

দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার আন্দোলনে তিনি নিজেকে সংক্রিয়ভাবে জড়িত করেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, পাশ্চাত্য টেকনিক ও রীতির প্রভাব, যা এখানকার কিছু চিত্রশিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছিল, তা দেশীয় রীতিকে ধ্বংস করবে। কিন্তু ফুসফুসে ক্যান্সারের কারণে তিনি তার কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। তার স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে ঢাকায় এ মহান চিত্রশিল্পীর মৃত্যু হয়।

জয়নুল আবেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্ময়কর শিল্প-প্রতিভা- এ সত্য উন্মোচিত হয়েছিল তার বয়স যখন মাত্র ২৯; তার আঁকা ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার মাধ্যমে। অবশ্য তার কিছু আগে থেকেই তিনি একজন প্রতিভাবান ও দক্ষ চিত্রশিল্পী হিসেবে সর্বভারতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, তবে সেগুলো ছিল প্রায় প্রথাসিদ্ধ বাস্তববাদী নিসর্গ দৃশ্য রচনার জন্য। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা জয়নুলকে একেবারে ভিন্নমাত্রায় পরিচিত করায়। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় তার ছবির আঙ্গিক ও বক্তব্য ছিল রীতিমতো বিপ্লবাত্মক। পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল, বিশেষ করে দেশভাগ ও পাকিস্তান নামক এক নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা তার ব্যক্তিগত জীবনও বদলে দেয়। তিনি স্বপ্ন দেখেন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালির জন্য আধুনিক শিল্পকলার জগৎ প্রতিষ্ঠার। তার প্রতিভা, শ্রম, ব্যক্তিত্ব ও সাংগঠনিক মেধা এই স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার জনক এবং এখন পর্যন্ত এদেশের চিত্রকলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।

১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিনের হাতে যে চারুকলা বৃক্ষের চারা রোপিত হয়েছিল, আজ ৬৭ বছরে সেটিকে মহীরুহ বলেই মনে হয়। বিশেষ করে যখন দেখি, স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্পচর্চায় ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পীর সংখ্যা বেড়েছে; পৃষ্ঠপোষকতার মাত্রা, গ্যালারি ও শিল্পাঙ্গনের সংখ্যা বেড়েছে; প্রদর্শনীর সংখ্যা বেড়েছে। শিল্প বিষয়ক প্রকাশনার ধরন ও মান বেড়েছে। শিল্পে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং শিল্পকর্মের চাহিদা ও আর্থিক মূল্যও বেড়েছে। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিল্পীসমাজ ও শিল্পকলার মর্যাদা বেড়েছে। এ সবকিছুর জন্যই বাংলাদেশের শিল্পীসমাজ ও সমগ্র জাতি শিল্পাচার্যের প্রতি কৃতজ্ঞ। া
‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ প্রচারে সমস্যা নেই: ইসি

‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ প্রচারে সমস্যা নেই: ইসি

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে নির্মিত ‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ বিজ্ঞাপন হিসেবে টেলিভিশনে ...

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই: সুজন

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই: সুজন

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে ...

দেশে হঠাৎ বন্ধ স্কাইপি

দেশে হঠাৎ বন্ধ স্কাইপি

দেশে হঠাৎ করে সোমবার বিকেল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্কাইপি ...

জেনে-শুনে মন্তব্য করা উচিত: দুদক চেয়ারম্যান

জেনে-শুনে মন্তব্য করা উচিত: দুদক চেয়ারম্যান

'তদন্ত করলে দুদকেও দুর্নীতি বেরুবে'- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের ওই ...

আগাম প্রচার সামগ্রী সরানো না হলে জরিমানা: ইসি

আগাম প্রচার সামগ্রী সরানো না হলে জরিমানা: ইসি

জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আগাম প্রচার সামগ্রী যারা সরাননি, তাদের জরিমানা ...

পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি

পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি

'বৈষম্য নয় পুরুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক' প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ...

উচ্চশিক্ষায় নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করবে ইউজিসি

উচ্চশিক্ষায় নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করবে ইউজিসি

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ স্নাতক ...

টমটমের ধাক্কায় প্রাণ গেল প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থীর

টমটমের ধাক্কায় প্রাণ গেল প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থীর

চট্টগ্রামে প্রাথমিক সমাপনী (প্রাইমারি এডুকেশন সার্টিফিকেট-পিইসি) পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে ...