ময়ুখ চৌধুরী

অন্ধকারের মোমবাতি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার ফলিত-তত্ত্ব

মানুষের মতো, পত্রিকাও মরণশীল। বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যেতে দেখেছি কলকাতার 'অমৃতবাজার পত্রিকা'কে। 'যুগান্তর' কীভাবে মারা গেল- খবর পাইনি। কলিযুগে প্রকাশিত কলিকাতার আর একটি পত্রিকা 'সত্যযুগ'-এর অবস্থা কী হতে পারে, তা তো নামেই বোঝা গেছে। উপমহাদেশ-বিভাজনের কালে (১৯৪৭) পশ্চিমবঙ্গের কে বা কারা নাকি বলেছিল, 'পদ্মার ইলিশ আর দৈনিক আজাদ তা হলে আর পাচ্ছি না।' সেই 'আজাদ'ও এন্তেকাল করেছে ভূমিকম্পের আঘাতজনিত কারণে। মালিকের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার ফলেও কোনো কোনো পত্রিকার মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারটা হৃদয়বিদারক বলে উদাহরণ দিলাম না। আবার অন্য পত্রিকার সঙ্গে কর্তাব্যক্তির সম্পর্ক স্থাপনের ফলেও একাধিক পত্রিকা ডুবে গেছে।

বোঝা যাচ্ছে- মানুষের মতোই, পত্রিকাও নানা কারণে মরে যায়। কিন্তু মৃত্যু যত অনিবার্যই হোক না কেন, মরে যাওয়াটুকুই জন্মগ্রহণের আরাধ্য লক্ষ্য নয়।- লক্ষ্য হলো :সার্থকভাবে বাঁচা; মৃত্যুর পরেও স্মরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকা। বলা বাহুল্য, এ রকম পত্রিকার সংখ্যা খুব কম।

গুটিকতক চালু পত্রিকা বাদে বাকিগুলো টিকে আছে দেয়াল পত্রিকা হিসেবে। এমনকি কোনো কোনো পত্রিকা যে জন্ম নিয়েছিল, সেটা জানা যায় মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরে।

অস্তিত্বের বোঝাপড়া

পাঠকের অগোচরে চিপাচাপা থেকে অনেক পত্রিকাই বেরোয়,- কোনোমতে টিকে থাকে অথবা টিকিয়ে রাখা হয়। সরলমতি পাঠক জিজ্ঞাসা করতে পারেন- 'ক্লিনিক্যালি ডেড' মার্কা এসব পত্রিকা টিকিয়ে রাখার দরকারইবা কী? এর উত্তর ভয়ঙ্কর জটিল। ভিন্নমাত্রার এই 'অস্তিত্ববাদ' গভীর রহস্যময়; তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ হবে না। পাঠকের পক্ষে এইটুকু বোঝা যথেষ্ট যে, নিজে টিকে থাকার জন্য টিকিয়েও রাখতে হয়।

তত্ত্বের কচমচি বাদ দিয়ে বরং একটা গল্পই বলি। বেশ চালু একজন তরুণ;- কাজও পেয়েছে চালু একটা পত্রিকায়। অথচ তার শ্রদ্ধেয় এক বন্ধু এমন পত্রিকায় আছে, যেটা চলে না। এ কারণে তার খারাপ লাগে। একদিন মিনিবাসে করে সে যাচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়লো- এক ভদ্রলোক খুব মনোযোগ দিয়ে সেই অচল পত্রিকাটিই পড়ছে! অনুজপ্রতিম সাংবাদিক এই দৃশ্যে স্বভাবতই পুলকিত বোধ করলো। এর কিছুদিন পরে, সিনিয়র-বন্ধুর পত্রিকা অফিসে সে গেল। হঠাৎ দেখতে পেল- মিনিবাসের সেই ভদ্রলোকটি বসে আছেন সার্কুলেশন ম্যানেজারের সিটে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, পাঠককে অনুরোধ করব পরবর্তী অংশটুকু পড়তে।

করিয়াছি পণ, হে বিজ্ঞাপন...

দৈনিক পত্রিকা ব্যয়বহুল একটি অস্তিত্ব। অতএব, তারও খাদ্য দরকার, পুষ্টি দরকার। খাদ্য হচ্ছে বেসরকারি বিজ্ঞাপন, ভিটামিন হচ্ছে সরকারি বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন না পেয়ে ঢাকার একটা দৈনিক মরেই যাচ্ছিল; ছয় মাস বেতন না পেয়ে বেশকিছু সাংবাদিক এদিক-ওদিক পালিয়ে বেঁচেছেন। এক পর্যায়ে, সরকারি বদান্যতায় পত্রিকাটি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে; কলেবরও বৃদ্ধি পেয়েছে তার।

মালিকপক্ষের অন্যতম গুণ :সজাগতা। তাই, মাঝরাতে বিজ্ঞাপন ম্যানেজারের ঘুম ভাঙিয়ে জানতে চান- 'কত কলাম গেল?' সকালবেলায় ব্রাশে পেস্ট লাগাবার আগেই আবার ফোন,- 'অমুক পত্রিকায় তমুকের বিজ্ঞাপন গেল,- আমাদেরকে দিল না যে! ফোন করো, ফোন করো, এক্ষুনি করো।'

এটাই বাস্তবতা। সংবাদকর্মীরাও তা জানেন এবং মানেন। তাই, গলা বাড়িয়ে জানতে চান- 'বস, একটা তিন ইঞ্চি বক্স আইটেম আছে,- জায়গা হবে? জবাব আসে- 'না। জায়গার মালিকানা নিয়ে একটা বিজ্ঞাপন আছে; কালকে যেতেই হবে।' অতএব 'দোষী ছাত্রের পরিবর্তে শিক্ষককে কানে ধরানোর খবরটা খসে পড়ে। কিছুদিন আগেও দেখা গেছে- চার পূর্ণপৃষ্ঠা বিজ্ঞাপনের চিপায় বিজ্ঞাপন। এমনই এক জাদুবাস্তবতা (গধমরপ-ৎবধষরঃু)।

কম্বল মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে আছে মূল পত্রিকা।

বিজ্ঞাপন বিরতি

সরিষার তেলে মাখা মুড়ি খেতে খেতে পত্রিকা পড়ার মজাটাই অন্য রকম। তাই, নামকরা এক কোম্পানির তেল কিনে আনলাম। সপ্তা দেড়েক পরে দেখি তলানির দেড়/দুই ইঞ্চি মিনারেল ওয়াটারের মতো স্বচ্ছ। বুঝতে আমার ভুল হয়েছিল; ১০০% খাঁটি সরিষার তেল দোকানে পাওয়া যায় না- বিজ্ঞাপনেই পাওয়া যায়।এবার দুধ। দুধে পানি মেশানোর দায়ে আমরা গোয়ালাকে বিদায় দিয়েছি। তারপর থেকে গুঁড়ো দুধে আমরাই পানি মেশাচ্ছি। এতে আমরা অভ্যস্তও হয়ে গেছি! হঠাৎ একদিন হৈ হৈ রৈ রৈ! কী ব্যাপার? গুঁড়ো দুধে ম্যালামাইন। সংঘাতিক খবর। কয়েক দিন পরেই, সব ঠাণ্ডা, আবার আগের মতো শান্ত। এবার কী হলো! না, তেমন কিছুই হয়নি, মাঝখানের বিশাল একটা বিজ্ঞাপন-বিরতি ছিল। প্রিয় পাঠক, আর একবার নসিহত করি; ঠকাবার ক্ষমতা যেহেতু নেই, সেহেতু ঠকতেই হবে। -ঠকতেই হবে? ...

পত্রিকার নেশা :যতোই বলি না কেন; কমলাকান্তের নেশা যেমন অফিস, বঙ্কিমের নেশা যেমন 'বঙ্গদর্শন', তেমনি বঙ্গবাসীর নেশা পত্রিকা পড়া। পত্রিকা না পেলে আমাদের সকাল হয় না। এক ভদ্রমহিলা বলেছেন- 'অমুক পত্রিকা হাতে না পেলে আমি সকালের চা পর্যন্ত মুখে তুলি না'। সদ্যকালের ওই পত্রিকাটি বেরোবার আগে ভদ্রমহিলা চা খেতেন কি-না, ভেতরে আর পড়ে দেখিনি। আমি একটু অন্য রকম; সকালে চা খাওয়ার আগে নিজের মুখও দেখতে ইচ্ছা করে না। আমার ছেলে ঠিক উল্টো; পত্রিকার কারণেই সে মর্নিং কলেজ ধরতে পারছে। ঘরে সে-ই প্রধান পাঠক। সকালে চোখ বুলিয়ে যায়। দুপুরে ফিরে এসে ইউনিফর্ম পাল্টানোর সময়টুকুও সে নষ্ট করে না। সেই যে পত্রিকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে,- দুপুরের ভাত খায় ৫টায়, কোনোদিন ৬টায়। দৈনিক পত্রিকা যে ক্ষুধাও উধাও করে দিতে পারে,- স্বীকার করতেই হবে। দৈনিক পত্রিকা না থাকলে মৌচাক মার্কেটের ট্রাফিক জ্যামে দুর্বিষহ আয়ুস্কাল কী করে কাটাতাম? পাঁচ ঘণ্টার ট্রেনে ১০ ঘণ্টা বসে থাকতাম কী করে? দ্রব্যগুণ বলে কথা! দৈনিক পত্রিকা না থাকলে পাঠক কী করে জানত 'আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ'!

বিশ্বাসের দরজা :তারপরও মানুষ পড়বে; পড়াটা উচিতও। প্রথম কারণ :যাবতীয় নেশার মধ্যে পড়ার নেশাই শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় কারণটা একটু ভেঙে বলতে হবে।

প্রয়োজনের সামগ্রী কিনতে মানুষ দোকানে যায়। নিঃস্ব অবস্থায় হাত পাততে যায়। হতাশ ব্যক্তি গণকের কাছে হাত পাততে যায়। রোগী ডাক্তারের কাছে। কিন্তু অন্যায়-অবিচারে অতিষ্ঠ মানুষ কার কাছে যাবে?

রাষ্ট্র যখন বিপন্নতা বোধ করে, তখন তার সেনাবাহিনী এগিয়ে আসে। সরকার যখন বেকায়দায় পড়ে, তখন পুলিশসহ অন্যান্য প্রশাসনিক হাতিয়ার সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দল যখন বেকায়দায় পড়ে, তখন তার মাস্তান-ক্যাডাররা দৃষ্টিনন্দন ভূমিকা পালন করে। মাস্তানরা যখন বিপদে পড়ে, তখন গডফাদাররা নিজেদের স্বার্থেই এগিয়ে আসে। কিন্তু, একজন দাপটহীন সজ্জন ব্যক্তি যখন আপদগ্রস্ত হন, তখন তার জন্য কে থাকে, যাকে তিনি 'গড' বলে মনে করতে পারেন?-

কেউ বলে- 'মাতব্বরের কাছে যাও-না।'- যাবে কী করে? অভিযোগ যে খোদ মাতব্বরের সোনার ছেলের বিরুদ্ধে! কারও পরামর্শ- 'থানায় গিয়ে অভিযোগ করো'। ভদ্রলোক থানায় গিয়ে দেখেন- চা-সিগারেট খেতে খেতে রঙ-তামাশায় মেতে আছে ওই সোনার ছেলেটাই। সাধে কী বলে- 'থানার ধারে কানাও যায় না!' যারা চক্ষুষ্ফ্মান, তারা মামলা-মোকদ্দমায় জড়াতে চান না। এবার কার কথা বলবেন? স্বঘোষিত 'দেশ ও দশের সেবায় নিয়োজিত' মহাজনদের কথা?- সাধারণ মানুষের চোখে তারা দেবলোকের বাসিন্দা। তাদের ঘিরে থাকে শনির বলয়। সেই বলয়ে নবরত্বের একজন ওই সোনার ছেলেটাই!

একজন নাগরিক যখন ন্যায়সঙ্গত অধিকারের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হন, তখন তিনি প্রতিকার চাইতেই পারেন। প্রতিকার না পেলে প্রতিবাদও করতে পারেন। কিন্তু করবেনটা কোথায়? তার যোগ্যতা আছে, ক্ষমতা নেই; এক ধরনের প্রতিষ্ঠাও হয়তো আছে, কিন্তু সাংগঠনিক ছত্রছায়া নেই। অভিজ্ঞতার ফলে, প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোকে তিনি বিশ্বাসের আওতায় আনতে পারছেন না। এ অবস্থায় তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কে আছে? ঠিক তখনই বেজে ওঠে সাইকেলের ঘণ্টি; হকার এসেছে; এসে গেছে পত্রিকা। নেপথ্যে যাই থাক, এখনও মানুষ তার বিশ্বাসের দরজাটা খোলা রাখে পত্রিকার জন্য। মানুষ বিশ্বাস করে, পত্রিকাকে ভরসা করা যায়। তারা বিশ্বাস করে, 'দেশ ও দশের কথা' সার্থকভাবে পত্রিকাই বলতে পারে। একমাত্র সংবাদপত্রই সাধারণ মানুষের নির্ভরযোগ্য মুখপত্র, এমনকি মুখপাত্রও বটে। খোদ শাসকগোষ্ঠীও এ কথা জানেন। তাই পত্রিকাকে সমীহ করে চলতে হয়। তারা জানেন পত্রিকার শক্তির উৎস :জনগণের ভালোবাসা।

অতএব, পত্রিকাকেও মনে রাখতে হবে,-

ভালোবাসা উপভোগ করা সহজ, ভালোবাসার দায়িত্বটুকু পালন করা কঠিন। মনে রাখতে হবে, জনগণ বিজ্ঞাপন দেয় না, কিন্তু ভালোবাসার মূল্যটুকু ঠিকই দিতে জানে।

সিন্দাবাদের কাঁধে একটাই ভূত ছিল; পত্রিকার কাঁধে বহুবিধ ভূত। সে কথাও পাঠক বোঝে। তবু তারা আশা করে- একটা জাতির ২৪ ঘণ্টার ইতিহাস পত্রিকাই রচনা করবে।

আশা করি : কথা আর বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি কী বলেছি, আপনারা পড়েছেন। আমি কী বোঝাতে চেয়েছি, তাও আপনারা বুঝেছেন। আমি কী বলতে পারিনি এবং কেন বলতে পারিনি, আশা করি তাও বুঝতে পেরেছেন।

লেখক



কবি

প্রাবন্ধিক
এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

গল্পে পড়া উঠের পিঠে চড়া সেই বেদুইনরা নাকি এখন শুধুই ...

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

সিলেটের প্রাণ সুরমা নদীকে খুবলে খাচ্ছে বালুখেকোরা। অথচ এই নদী ...

বরিশালেও প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন

বরিশালেও প্রকাশ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন

হিজলা ও মুলাদী উপজেলার মধ্যবর্তী নয়াভাঙ্গুলী নদীর ৮-১০টি পয়েন্টে এবং ...

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহযোগিতার জন্য ফের আহ্বান জানাবেন ...

সালাহ ফিরেছেন, জিতেছে লিভারপুল

সালাহ ফিরেছেন, জিতেছে লিভারপুল

'ফর্মে নেই সালাহ।' কথাটা উঠে গিয়েছিল। কারণ মিসর তারকা মোহামেদ ...

২০ হাজার টাকা ঘুষের জন্য ওসির রাতভর নাটক

২০ হাজার টাকা ঘুষের জন্য ওসির রাতভর নাটক

একটি প্রতারণার মামলায় দুর্গাপুরের ঝালুকা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোজাহার ...

আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করতে হবে: প্রধান বিচারপতি

আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করতে হবে: প্রধান বিচারপতি

জনগণের হয়রানি বন্ধে আয়কর রিটার্ন দাখিল আরও সহজ করার আহ্বান ...

ষড়যন্ত্রের ঐক্য কোনো ফল দেবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

ষড়যন্ত্রের ঐক্য কোনো ফল দেবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ...