স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

'৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও '৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। 'জাগরণী' সংগঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক পটভূমি রচনায় শিল্পীসমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং অসহযোগ আন্দোলনে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র...

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে তাদের সোচ্চার ভূমিকা জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনে উজ্জীবিত করে। ২৫ মার্চের পর অনেক শিল্পী অবরুদ্ধ দেশেও সাংস্কৃতিক লড়াই অব্যাহত রেখেছিলেন। অনেকে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে অবস্থান করে স্থির করেছিলেন তাদের কর্তব্যকর্ম। তারা শত প্রতিকূলতা ও বৈরিতার মধ্যেও সাংস্কৃতিক দল গঠন করে পালন করেন জাগরণী ভূমিকা। শরণার্থী শিল্পীরা দেশমাতৃকার ঘোর দুর্দিনে গ্রহণ করেন যথাসাধ্য উদ্যোগ। মুক্তিযোদ্ধা শিবির, শরণার্থী শিবির, যুব শিবির এবং স্থানীয় জনগণের মাঝে মুক্তির গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা শক্তি ও সাহস সঞ্চার করেছেন। ভারতসহ নানা দেশের শিল্পীসমাজও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও তহবিল সংগ্রহের জন্য নানা প্রয়াস নিয়েছিলেন।

'৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও '৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। 'জাগরণী' সংগঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক পটভূমি রচনায় শিল্পীসমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং অসহযোগ আন্দোলনে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ঢাকায় বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের আলোকে শহরের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা এ বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হন। সে সময় একেএম হারুনুর রশীদ ও জীবন বর্মণের গান রেকর্ড করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অল্প দিনের ব্যবধানে বেতার কেন্দ্রটি ধ্বংস করে দেয়। সংস্কৃতিকর্মীরা প্রাণভয়ে আশ্রয় নেন সন্নিকটবর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায়।

এরই মধ্যে দেশের, বিশেষত পূর্বাঞ্চলের অনেক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জড়ো হয়েছেন আগরতলার কলেজটিলায় এমবিবি কলেজে, বিপুল আত্মতাগিদে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্পীসমাজ এ ক্ষেত্রে সূত্রধরের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এদেরই সম্মিলিত প্রয়াসে ৩ জুন ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গঠিত হয় 'বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা'। এমবিবি কলেজের নির্মীয়মাণ ভবনে স্থাপিত হয় সংস্থার কার্যালয়। মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বীকৃত পূর্বাঞ্চলের একমাত্র এই সাংস্কৃতিক দলে দেশের নানা প্রান্তের শরণার্থী শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। শিল্পীদের উদ্যোগে 'জয়বাংলা' অফিসে গিয়ে বলা হয়- তারা ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জাগরণী গান করবেন। তখন সরকার এদের পৃষ্ঠপোষকতা করার উদ্যোগ নেয়। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী ও এমআর সিদ্দিকীর ভূমিকা ছিল মুখ্য। ৩ জুন এমআর সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়। চিঠিতে তালিকাভুক্ত শিল্পীবৃন্দের মধ্যে ছিলেন হরিপ্রসন্ন পাল, অমল দত্ত, চিত্তরঞ্জন ভূঁইয়া, আজিজুল্লাহ চকলেট, আশিষ চৌধুরী, কামালউদ্দীন আহমদ, সালাম কবির, গীতশ্রী চৌধুরী, জয়শ্রী চৌধুরী, ছায়া রায়, সুমিত্রা ভট্টাচার্য, জয়ন্তী ভূঁইয়া, নিয়তি ভূঁইয়া, বেণু চক্রবর্তী ও সৈয়দ মামুনুর রশীদ। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী সম্পৃক্ত হয়েছেন। সংস্থার আহ্বায়ক ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নৃত্য ও মঞ্চশিল্পী একেএম আজিজুল্লাহ ওরফে চকলেট। নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ও মঞ্চাভিনেতা এসএম মহসীন। মুজিবনগর সরকারের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের প্রধান জাতীয় পরিষদ সদস্য এমআর সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমের পৃষ্ঠপোষকতা এ সংস্থার কার্যক্রমকে গতিশীল করে।

নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই 'বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা' আনুষ্ঠানিকভাবে জন্মলাভ করে। সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, রবীন্দ্র-নজরুলের স্বদেশ পর্বের গান, জাগরণী সঙ্গীত প্রভৃতির মাধ্যমে গণজাগরণ সৃষ্টি, শরণার্থীদের মনোবল অটুট রাখা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনে মুক্তির আগুন জ্বালিয়ে দেওয়াই ছিল এ সংস্থার মূল উদ্দেশ্য। ত্রিপুরায় শরণার্থী শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে জড়িত হয়েছেন এ সংস্থার সঙ্গে। তাদের কেউ কেউ হয়তো অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্যত্র চলে গেছেন কিন্তু কর্মকাণ্ড পুরোদমে চলেছে বিজয়ের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত। এখান থেকে গিয়ে যারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল গনি বুখারী, সরদার আলাউদ্দিন, অরূপ রতন চৌধুরী, বিপুল ভট্টাচার্য, অজিত রায়সহ অনেকে। মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বলে নানা পর্যায়ের রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা এ সংস্থাকে অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেন। ফলে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি বিশেষ বিস্তৃতি লাভ করে। সেই সূত্রে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে এ সংস্থার কার্যক্রম গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়।

সংস্থাটি বিশালগড়, হাতিমারা, বিশ্রামগঞ্জ, উদয়পুর, লেম্বুচড়া, দুর্গা চৌধুরীপাড়া, বাগমারা, অম্পিনগর প্রভৃতি ক্যাম্পে অনুষ্ঠান করেছে। মুক্তিযুদ্ধে ২, ৩ নং সেক্টরের অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি শরণার্থী শিবির, যুব শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা শিবির এবং জনসমাগমস্থলে এ সাংস্কৃতিক সংস্থা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী গাড়ি করে সদস্যদের নিয়ে যেত। জয়শ্রী চৌধুরী অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণে বলছিলেন, আমাদের গানে সবাই একাত্ম হয়ে যেত। আবেগাপ্লুত হয়ে কেউ কেউ কেঁদেও উঠত। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল উঁচিয়ে উদ্দীপনায় স্লোগান ধরতেন- 'জয় বাংলা'। গভীর রাত পর্যন্ত গান হতো। অনেক সময় সারা রাত অনুষ্ঠান করে সকালে কাছাকাছি কোনো শিবিরে অনুষ্ঠান করে ফিরে আসত দল। তিনি আরও বলছিলেন, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা অনেক কষ্ট স্বীকার করে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন। গান গাওয়ার সময় সেই কষ্ট ও যন্ত্রণা বাঙ্‌ময় রূপ লাভ করত। এসএম মহসীন বলছিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার আগের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উজ্জীবিত করা হতো। দেশকে শত্রুমুক্ত করার দুর্দমনীয় ভাব জেগে উঠত তাদের চোখে-মুখে।

ওপরে বর্ণিত প্রতিটি অনুষ্ঠানে ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সেখানে সংস্থার শিল্পীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেছেন। পরিবেশনার মধ্যে থাকত নাট্যাংশ, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গচিত্র। নাট্যাংশ ও গীতিনাট্য রচনায় একেএম হারুনুর রশীদ ও সুধাময় করের ভূমিকা ছিল মুখ্য। এভাবে জুন মাস থেকে বিজয়ের প্রান্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা একের পর এক অনুষ্ঠান করেছে। শিবিরে শিবিরে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করত বলে একে ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক সংস্থাও বলা হতো। শুধু মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত গান নয়; সে সময়ের পটভূমিতে রচিত হয় নতুন অনেক গান। সেই গান ধ্বনিত হতো সংস্থার শিল্পীদের মুখে।

মুক্তিযুদ্ধে নানা জায়গায় নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিকভাবে মানুষকে মুক্তিচেতনায় উজ্জীবিত করা। সে ক্ষেত্রে 'স্বাধীনতা সঙ্গীত দল'-এর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ববহ।

সেদিন শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা অন্তরের দরদ ঢেলে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের যে সাহস জুগিয়েছিলেন তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সেদিনের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ও অবদানকে কোনোমতে উপেক্ষা করা যায় না। তাদের ভূমিকায় অসহায় মানুষ সেদিন ভরসা পেয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছিলেন বিপুল উদ্দীপনা। আজ তাই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি তাদের, যারা জাতির দুর্দিনে সংস্কৃতির অমিয় ধারায় উজ্জীবিত করেছিলেন মানুষকে; জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তির তৃষ্ণা; ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মুক্তির বারতা। া
ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারতের শ্বাস রুদ্ধ করে ’টাই’ আফগানদের

ভারত 'বধ' করেই ফেলেছিল আফগানিস্তান। কিন্তু ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত টাই ...

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

১৪ দল-বিএনপি মুখোমুখি

রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এবার ...

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

পল্টন-সোহরাওয়ার্দী কোনোটাই পাচ্ছে না বিএনপি

আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে রাজধানীতে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ওইদিন ...

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

শীর্ষ চার রুশ ব্লগার বাংলাদেশে

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে রাশিয়ার জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং দ্বিপক্ষীয় ...

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দ জমিতে বড়লোকের পুকুর

মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চলতো ভূমিহীন ...

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

জাতীয় ঐক্যকে চাপে রাখবে আ'লীগ ও ১৪ দলীয় জোট

শুরুতে স্বাগত জানালেও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠন এবং সরকারবিরোধীদের নিয়ে ...

জিততেই হবে আজ

জিততেই হবে আজ

অতীতের ভুল তারা কখনোই স্বীকার করে না। মানতে চায় না ...

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

প্রশাসনে নির্বাচনী রদবদল

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ...