বুলবুল চৌধুরী

অচেনা নদীতে ঢেউ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মাথার ওপর চাঁদ নিয়ে বসেছিল তারা। জোছনা ছিল হাতের ভাঁজে এবং গাছগাছালি, মৃত্তিকা, নদীজুড়ে। তারা বসেছিল ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে। দিন পরিস্কার বলে রাতের ভাগে লোকালয়ের বাইরে এই কাঁচা পথেও উজানি কই মাছের মতো একজন-দু'জন লোক চলাফেরা করছিল। কিরমান হঠাৎ গা-হাতপা ছড়িয়ে বসল। তাতে করে যে আড়ালটুকু নিয়ে বসেছিল তারা, তা নড়ে উঠল। ঘন ঝোপ-জঙ্গুলে জায়গা এটা। পাশে মোন্তাজ অনেকক্ষণ থেকেই বসে বসে ঝিমুচ্ছে। লাশের মতো দিন দিন ফুলে উঠছে শালা। ফুলতে ফুলতে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। শরীর চালাতে যদি টানাহেঁচড়া চালাতে হয় তাহলে জীবনের কী দাম! মনে হচ্ছিল, রামদা বসিয়ে চাপলে এই মাংস কাটবে মন্দ না। ভিতরে-বাইরে অস্থির হয়ে উঠছিল কিরমান। দু'হাত নিসপিস করছিল। মাঘের শীতে দু'জনে মিলে আফসার কাজীকে ধরে এনেছিল। খুন করার জন্য নয়, মারধরে শরীর পাঁকিয়ে দেবার জন্যই তেমন ব্যবস্থা। ইশারা মোতাবেক মোন্তাজ লাঠি উঁচিয়ে দু'ঘা লাগিয়েছিল মানুষটার পিঠে। মুখে কাপড় দু'জনেরই। মাথায় জড়ানো চাদর। আফসার কাজীর মুখে কথা ছিল না। মার খেয়েও চুপচাপ। কাজ শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে তারা গিয়ে বসে পড়েছিল আলের ধারে। আর মুখের কাপড় হেঁচকা টানে সরিয়ে ফেলেছিল কিছুক্ষণের জন্যে।

আসলে আদেশ পেয়ে কাজটা সারলে কী হবে- ইচ্ছাকৃত একটা গিট্টু যেন বাঁধিয়ে দিল মোন্তাজ। তাও কি বলা যায়! আসলে খেয়াল কম সঙ্গীর। প্রয়োজনীয় হুঁশ সে হারিয়ে ফেলে। বিপদ তাতেই বাধে। মার খেয়ে সেই রাতেই থানায় দৌড়েছিল আফসার কাজী। লাঠির ঘা খেলে কী হবে- বুড়োর হাড্ডি বেড়ালের মতোই শক্ত। ওখান থেকে উঠে সোজা হেঁটে বাড়ি ফিরে গেছে। অন্ধকারে নিশা-পাখির চোখও যেন তারই। মুখে কাপড় বেঁধে নিলে কী হবে, হাবে-ভাবে দু'জনকে সে ঠিক চিনে নিয়েছিল। ফলে দারোগার খাতায়ও নাম যায় তাদের।

দৌড়ে গিয়ে খবরটা কিরমানকেই পৌঁছাতে হয়। সেবারের ঝামেলাটা সামাল দিয়েছিল সাহেব আলী। কিন্তু কিরমানকে স্পষ্ট বলেও দিয়েছিল, কাম না পারে ঠিক আছে। ওরে যাইতে কয় কেডা? তোমারইবা হুঁশডা কেমুন? দিলা তো আমারে ঠেকাইয়া। থানায় টেকা দিলাম। সই। কিন্তু মাইনষে তো জানছে! এইরহম গুনগুন কথা উডলে আমার পাস করন দায়। কী কইবা?

কিরমানের নত মাথা। সে জবাব দিয়েছিল, কী করমু? এইতান একলার কাম? আবার কারে পামু?

কী কয় হারামি? হ। খুন-খারাবির কামে মানু পাওয়া ভাবনা।

সামনে ইলেকশন। তাকে বিশেষ ঘাঁটাতেও সাহস পায় না সাহেব আলী। ভোটের সময় আরেক নতুন ভয়ের উদয় হলো। এক সময় স্টু্কল মাস্টারি ছিল আফসার কাজীর। বয়স হওয়ায় এখন অবসর। এলাকায় তার সম্মান বেশি। নিজে চেয়ারম্যান হলেও লোকজন বিচার-আচারে মাস্টারকেই ডাকে। কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে আফসার কাজী চেয়ারম্যানের পদে দাঁড়াবে। সে ভোট চাইলে সাহেব আলীর যে তলগতি হবে সে-কথা এখন গ্রামে গ্রামে। তেমন আশায় কিরমানকে ডেকে মাস্টারের প্রতি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। লাভ হলো কই! এখন উলটে যেন আফসার কাজী তাকে নানাভাবে হেস্তনেস্ত করে চলেছে।

নিজের মনের সাথে প্রথম বোঝাপড়াটা সেরে নেয় সাহেব আলী। রাতের ভাগে সে ডাকায় কিরমানকে। বলে, কী করবি ক? আমার সোম্মানডা তো যায় যায় দেহি। মাস্টার না জানি ইলেকশন পাস কইরা যায়।

এসব কাজে কিরমানের কোনো মজা নেই। পাপের ভার সে নিরুপায় হয়েই টেনে টেনে চলে। করার আছেটাইবা কি? মোন্তাজ বেঁকে বসেছে। শরীর ফোলা রোগে পেয়েছে তাকে। তাছাড়া বোকাসোকা মানুষ। পুলিশের মার খাওয়ার আগেই সে সব ফাঁস করে দিতে পারে। সাথে একজন না থাকলে কি কাজ হয়! শক্ত সমর্থ কোনো জোগানদার তো চাই। আগের দিনে ডেঙ্গু ছিল, খাদেম ছিল। পেট বাঁচাতে তারাও এ পথ ধরেছিল। প্রয়োজনে ডাকলে পয়সার বদলে তাদের হাতের কাছে মজুত পাওয়া যেত। কিন্তু গতবছর কারারচরের মিয়া-বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে বিপদ হলো। পালাবার সময় পিঠে কোচ-গাঁথা হয়ে সেখানেই মারা গেল ডেঙ্গু। খাদেমও ধরা পড়ল। ছেনির কোপে এক পা গেছে তার। সেই অবস্থাতে জেল হলো খাদেমের। চেষ্টা করলে, টাকা ঢাললে তাকে ছাড়িয়ে আনা যেত। জেলটা হতো না।

অবশ্য সাহেব আলী গা করল না। নিজের কাজ ছাড়া টাকা ঢালবে না শালা।

কি রে, চুপ কেরে? কিরমান ঝাঁজের সাথে জবাব দিয়েছিল, আপনের লগে আছি বছর তো কম অইলো না। কী পাইলাম হেই কথা আপনেরে জিগাই না। পাইছি, আপনের পয়সায় আমার সংসার কিছু না কিছু চলছে। কী করমু কন, দলের বেবাকরে তো খাইছি! অখন আমার লগে যাইবো কেডা?

সাহেব আলীর বিস্মিত স্বর, কেরে? মোন্তাজ। কামডা কী হেইডা তো কইবেন! সাহেব আলী চারপাশ দেখে নিয়ে ফিসফিস গলায় জবাব দিয়েছিল, কি আবার, খুন। খুন করবি মাস্টররে। সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে অপেক্ষা করেছে। একবার বলতে যাচ্ছিল, কাজটা করতে পারবে না। কিন্তু চুপ রইল। টাকার দরকার। বউ ঘরে প্রসবের দিন গুনছে। তাছাড়া এর আগেও দুটো খুন সে করেছিল। থানা থেকে তাকে বাঁচিয়ে এনে এখন পুষছে সাহেব আলী। ফলে তাকে চুপ করে যেতে হয়। দিন কয়েক পরে পাওয়া গেল মোন্তাজকে। সে রাজি।

বেরুতে হলো অবশেষে। কিন্তু মোন্তাজকে নিয়ে তার শঙ্কা কাটে না। তখন কথা ঠিক বললেও পরে যেন কেমন আবোল-তাবোল বকে মানুষটা। তা-ই সই। অন্য কাউকে তো পাওয়া যাবে না। দু'জনের দেখা হলে কিরমান জানতে চেয়েছে, কিরে, নিয়ত ঠিক আছেনি?

হ। যেন কিছুটা বুঝতে পেরে আর কিছুটা বুঝতে না পেরেই জবাব করল মোন্তাজ। তবে যাকে খুন করবার নিয়ত সেই মানুষটার গতিবিধির ওপর চোখ রাখছিল মোন্তাজ। একদিন সন্ধ্যারভাগে সে দৌড়ে আসে কিরমানের বাড়ি। বলে, ওস্তাদ, খবর হুনছো?

কী?

জানলাম আইজ ঘরে ফিরতে দেরি অইবো মাস্টরের। এইত্তো সুযোগ। রাইত যাইবো আন্ধাগুন্ধি। কেউ থাকবো না রাস্তায়। লও, যা করনের সাইরা আসি। লক্ষ্যার তীর ধরেই বাঁশগাঁও হয়ে বাড়ি ফিরবে আফসার কাজী। তারা তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায় ঠিক সময়ে।মাস্টারের ফিরতি পথ হিসাব করে খানিক ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসল দু'জন। যতক্ষণ আফসার কাজী ফিরে না আসবে, অপেক্ষা করতে হবে তাদের। তারপরও ভাবনা। খুন শেষ করার পর লাশেরও গতি করা লাগে। থানা-পুলিশ যদি মৃত আফসার কাজীকে পায় তাহলে সেই জের গড়াবে মূলত কিরমানকে ঘিরে।

অনেকক্ষণ থেকেই অপেক্ষা করছে তারা। মোন্তাজ ফিসফিস করে, বলে দে, দেশলাইডা দে। ঘরে থাকলে বিড়ি-সিগরেট হেমুন খাই না। পয়সাও লাগে হেতে। অখন আমার কি অইছে কইতে পারস?।

আমি কেমনে জানমু?

খালি পিয়াস, পিয়াসরে। খালি সিগরেট খাইতে মোনে কয়। মোনে অয় ধুয়ায় পেট ভরে না। চাবাইয়া খাইলে যেমুন বাঁচি।

কিরমান বুঝতে পারে সঙ্গীর ভেতরের অবস্থা। সে মানুষ খুন করেছিল আজ থেকে চার বছর আগে। আবার সেই সাহেব আলীর নির্দেশেই আজ তৃতীয় খুন করতে আসা। মোন্তাজ জিজ্ঞেস করে, কিরে, ম্যাচডা যেমুন দিলি না?

অন্যজনের কণ্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জবাব দেয়, কী যে কাম তর। ডরাই। না জানি ভুল কইরা ধরা খাওয়াছ আমারে!

কেরে, কী দোষ করলাম আমি আবার তর ধারে?

কিরমানের কর্কশ গলা শোনা যায়। বলে, জানস না? না জানলে কেমনে বুঝামু। কি চিন্তা করি জানস?

কী?

তুই জবর গটমট করস। কোন কথায় কারে কী কইয়া সারবি। ওই, সিগরেট খাইতে গিয়া অত্তো আগুন দেহাইস না। কোন সোমে না কোন সোমে কেউ নজর করে। দেখলে তখন ধরা পড়বি।

একটা বাতাস ছিল। অপেক্ষাকালে তা কমে এসেছে। চোখের কাছে নক্ষত্রের মতো জ্বলছিল-নিভছিল জোনাকি পোকা। গরমও লাগছিল। তাদের ঠিক পেছনেই নদী। তবুও এদিকে ঠা ার কোনো পরশ নেই যেন।

কিরমান ভাবছিল, মাস্টার কখন ফিরবে। এই পথে যদি না ফেরে, তেওতার দিক দিয়েও সাইকেল ঘোরাতে পারে সে। তাহলে কাজ হাসিল করা যাবে না।

ঝোপের আড়ালে বসে মোন্তাজ অনর্গল ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। কিরমানের হাত খারাপ। মোন্তাজ সেটুকু অনুভব করছিল। মাঝেমধ্যে রামদাটা নিজের চোখের সামনে তুলে নিয়ে দেখছিল মানুষটা। কী যেন অস্পষ্ট কথাও শোনা যায় তার মুখে।

আজ মোন্তাজের গলা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছিল। পিপাসা, পানির দরকার। আবার খুঁটিয়ে দেখল, পানি চাই কিনা তার। কিন্তু না, আসলে এটা পিপাসা নয়। আফসার কাজীকে ধরে আনবার দিন, মাঘের শীতেও এমন হয়েছিল। ভালো লাগে না কিছু। মনের সায় পায় না আর।

কিরমানও এসেছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে। বাধ্য সে সাহেব আলীর কাছে। নইলে সাহেব আলী পুরনো খুনের মামলা আবার থানার দারোগাকে বলে চড়িয়ে দেবে কিরমানের গলায়। খুবই অসহিষুষ্ণ হচ্ছিল সে। কখন থেকে উৎকর্ণ হয়ে আছে, দূরে একটা সাইকেলের ঘণ্টা বেজে উঠবে বলে। কিন্তু ভুল করেও তারা সাইকেলের চেনের শব্দ, কি পথের উঁচু-নিচুতে থেঁতলে উঠবার শব্দ, কি ঘণ্টার শব্দ- কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না।

মোন্তাজ ভাবছিল বউটাকে এভাবে ফেলে আসা উচিত হয়নি। আয়নায় মুখ দেখবার মতো করে এই কথাটাই বারবার ফুটে উঠছিল মনে। স্ত্রী এসব বিষয়ে সারাক্ষণ ঝগড়া করে স্বামীর সাথে। বলে, ছাড়ান দেও, ছাড়ান দেও এই কাম। তোমার পাপে আমার পেডে তিন-তিনডা পোলা গেল।

অসহায় মোন্তাজ। বউয়ের কথা শুনতে গেলে আহার জোটে না। ফলে সে ধমকায়, ওই, চুপ, চুপ মাগি। এইরহম কাইজা করলে কেউ না কেউ জানবো। পুলিশ-দারোগা আইবো আমারে লইতে।

কিন্তু তাতেও থামবার নয় বউ। খিস্তি করে। কেঁদে কেঁদে প্রশ্ন করে, আবার কিয়ের লাগি কামে পাপ কামডা কান্ধে লইলা হুনি? তুমি না কইলা মুন্সির ধারে গিয়া তউবা করবা? ছাড়ান দেও দেহি। কেউ পয়সা দিলেই মানুষ হইয়া মানুষ খুন করতা পার? আর হেই খুনির বউ অইয়া আমারে চুপেচাপে থাকতে কও?

সেই জবাব স্বামী তখন দিতে পারেনি। তাকিয়ে দেখে সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে ম্যাচ ঠুকে কিরমান বিড়িতে আগুন দেয়। কিন্তু সিগারেটে তার কোনো আগ্রহ নেই। আঙুলের ফাঁকেই পুড়তে পুড়তে সেইটুকু ছাই হয়ে যায় সিগারেট।

আস্তে আস্তে দু'জনেই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লান্তির দিকে পৌঁছে যাচ্ছিল। মোন্তাজ প্রথম থেকেই ধীর, উৎসাহহীন। যেন এখান থেকে উঠতে পারলেই ভালো। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল, আত্মীয় বাড়িতে আফসার কাজী এক রাত থেকেও যেতে পারে। তেমন হলেই ভালো। শান্ত মনে তাহলে ঘরে ফিরে যেতে পারে সে। বউকেও একটা নিশ্চিত জবাব দিতে পারে। এ সময় কী হলো আকাশের, হালকা মেঘে ঢাকা হচ্ছিল সবদিক। ফাঁকে চাঁদ এইটুকু উঁকি দিতে না দিতেই গেল আবার হারিয়েও। সেদিকে তাকিয়ে কিরমান বলে, আসমান যেমুন সুবিধার না।

মেঘ আইবোনি? কেমুন হাজ করতাছে দেখ। লক্ষণে হেইডাই কয়।

মোন্তাজ কথা শেষে উঠি-উঠি ভাব দেখায়। যেন দিনের কাজ শেষ। এখন তাগাদা ঘরে ফেরার। কথাও ভাঙা হয়ে গেছে, এবার ওঠার পালা।

কিরমান চুপ। আকাশে আস্তে আস্তে মেঘের খেলাই বাড়ছিল। অন্ধকার নেমে আসছিল আলতো। ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে, কাছাকাছি থেকেও একজন অন্যজনকে এই অন্ধকারে দেখতেই পাচ্ছিল না আর। কিরমান হঠাৎ শিউরে উঠল। কারণ কি? কোনো কারণই খুঁজে পেল না সে। সব বেজায় আবছা আবছা হয়ে যায়। বৃষ্টি নিশ্চিত হয়ে আসছে। কিরমান বুঝতে পারে, বৃষ্টি নামবার সাথে সাথে মাটি আড়মোড়া ভেঙে গরম ছড়ায়। তখন সেদ্ধ ধানের ভাপের মতো গরমে ভরে যাবে সব।

কিছু করবার না থাকায় মোন্তাজ রামদার ধার দেখতে থাকে। ধার আছে। মানুষের রক্তের ছোঁয়া পড়লে সেই ধারটায় জং ধরে না কোনো দিন। বরং দিন দিন আরও চকচকে হয়ে ওঠে।

ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসছিল, তখন বউ নিষেধের বেড়াজাল দিচ্ছিল, যাইও না!

খাবি কি মাগী?

অমনি সব চুপ।

ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে মোন্তাজ। প্রায় সন্ধ্যা থেকে এখানে তারা অপেক্ষারত। অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ ধরে তারা বসে আছে। বউয়ের কথা মনে হচ্ছিল মোন্তাজের। অস্বীকার করতে পারে না, বউ তার সুন্দরী। সাহেব আলী সময় সময় মোন্তাজের দরোজায় গিয়ে দাঁড়াত। কাজ? কিচ্ছু না। খোঁজখবর নেওয়ার উছিলা করে চেয়ারম্যান প্রায় ঢুকে পড়ত বাড়িতে। বউটা একরাতে ঘুমোবার কালে কাঁদল।

কান্দস কেরে?

জবাব নেই। জিজ্ঞেস করে করে, শেষে রেগে উঠল সে। বউয়ের চুলে জোর টান দিয়ে বলল, ফ্যাকরা পছন্দ অয় না।

সেই অবস্থায়ও উত্তর কোনো আসেনি। সেদিন জিনে পাওয়া মানুষের মতো শরীর বাঁকাচ্ছিল তার বউ।

দু'-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। ফিরে যাবে নাকি বাড়িতে? কিন্তু কিরমান পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে আছে।

মোন্তাজের শরীরময় অস্বস্তি বেড়াতে থাকে। সে ডাকল, কিরমান।

কি?

বাতাস ঝড়ো গন্ধ বয়ে নিয়ে এলো। ডালপালায় উঠল বাতাস। নদীতে দেখা দিল ঢেউয়ের গর্জন।

সাহেব আলী শুয়ারের বাচ্চা, সাহেব আলী কুত্তা, আমার বউডারে...। হেরে খুন করলে কেমুন অয়?

অবশিষ্ট কথা যেন বাতাস লুফে নিয়ে পালিয়ে গেল।

কিরমানের চোখে আগুন ধরল একবারের জন্য। নদী-তীরে জমি ছিল তার। আলু বুনত প্রত্যেক বছর। হঠাৎ টাকার দরকার হয়েছিল কিরমানের। সাহেব আলীর কাছে চাইল।

টেকের মাথার জমিটা নিয়ে টাকাটা দিল। সেই জমি আর ফেরাতে পারল না কিরমান। ব্যর্থতা তার আছে। কিন্তু সাহেব আলীর প্রতি একটা প্রতিশোধস্পৃহা সঙ্গোপনে লুকায়িত ছিল এতদিন। এখন আলো পেয়ে গেল।

বউডার অখন বিয়ানের সময় অইলো। চইত গেল হগলে। আমার কেমুন ফের যাইতাছে দেখছস? এফি আত এককেরে খালি। এক ফোঁডা ধান নাই ঘরে। মাথা শইন না অইয়া যায়?

নিজেকে কিছুটা উগড়ে দিতে পারে যেন কিরমান। সে দাঁড়ায়। পায়ের তলার মাটি যেন টাল খায় কোনো দিকে। তারপর হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর যায় বদলে। আর্দ্র ঠেকে খুব। বলে, মাস্টরের গলা কাডবি? এমুন মানুষ, দোষ করে নাই কোনোখানে। হগলে কয় ভালা মানুষ আফসার কাজি। ভোটে পাস করবো। হেরে শেষ করতে কি, একগগা কোপ দিলেই না কাম সারা। হেরপরে লাশ টাইন্না নিয়া গাঙ্গে ডুবাইয়া ফিরলেই অয়। চিন্তা কি?

মোন্তাজেরও কি ওই কথা, নির্দোষ লোককে খুন করা কেন? মাস্টরের গলা কেটে সাহেব আলী নদীতে ভাসাতে বলেছে? সে বলল, মাইনষে মাস্টররে ভালা জানে, বিচারে-আচারে ডাহে। বুঝ-পরামর্শ করে ভালা। সৎ মানুষ। তয়। হেরে ভোট না দেওনের কি আছে?

কিরমান রামদা দিয়ে ঝোপ-ঝাড়ের আগা কাটে। মেঘ একত্রিত হচ্ছে। বৃষ্টি নেমেছে জোর। লোকটাকে মারবে কেন? কয়টা টাকার জন্যে? টাকার জন্যে অনেকদিন অনেক কাজই করতে হয়েছে তাদের। আজ কোথায় যেন বাঁধা থাকে তার। এমন চেনা-জানা ভালো মানুষটাকে সরিয়ে দেবে? সাহেব আলীর ক'টা টাকার এমনই জোর?

মোন্তাজ বলে, সাহেব আলী খুনি। মিছা না তো? তুই হেই সাক্ষী দিবি না? মোনে আছে খাদেমের ছাড়ানডা যে লয় নাই? বেও পড়লে দেহিস আমাগো ফাসাইয়া দিয়া সইরা যাইবো। দুই জনে ফাঁসিতে ঝুলমু হেষে। অর্ডার দেওনের মালিক বেডায়। তার কথায় আকাম করি। ভুগি তাইতে।

বিদ্যুৎ চমক খেলে গেল কয়েকবার। তারা সেই আলোতে দেখল পরস্পরকে, ভিজে সারা। ঠা া উঠছে শরীরের হাড়ের দিকে। মোন্তাজ বলল, মানুষডা বুঝি ভিজতে ভিজতে আইয়ে। মেঘ-তুফানের লগে আবার সাইকেলের ঠেলাডাও আছে।

কোন্‌ মানুষটা ভিজছে? আফসার কাজী? যাকে খুন করতে এই লক্ষ্যা তীরে অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে তারা? কিরমান সব বুঝতে পারে। মাস্টরের জন্যে মোন্তাজের দরদটাও স্পষ্ট তার কাছে। তবুও জিজ্ঞেস করল, কার কথা কস?

কেরে, আফসার কাজী।

মোন্তারে!

কি?

একখান কাম করলে কি অয়?

কি?

ল যাই, মাস্টররে মারতে আমার মোন কয় না। তাইলে কি ফিরা যাবি? হ।

সাহেব আলী জিগাইলে?

রামদার ধারাটুকু বাঁহাতের পাঁচ আঙুলের ওপর রাখল কিরমান। বলল, হেই জবাব করমু আমি। তুই আমার লগে লগে থাকবি। আল্লার কসম ক।

জবাব আসে, আল্লার কসম। এই দুনিয়াতে আকাম-কুকাম যা করছি, তুই সাক্ষী। আর কদ্দুরা খবর জানে সাহেব আলী।

কি কস তুই? হ।

তুই খালি আমার লগে লগে থাকবি। কাম যা করনের হেইডা আমি সামাল দিমু।

বৃষ্টি ও বাতাসে পথ চলছিল তারা। মধ্যে মধ্যেই পা কাটছিল পিছল। নদীর ঢেউয়ে উথাল-পাথাল ঢেউয়ের আওয়াজটুকুও চলছিল তাদের পিছু পিছু। সাহেব আলীর বাড়িতে যখন পৌঁছল, তখন বাতাস খানিক নিম্নমুখী। বৃষ্টির বেগ রয়েই গেল।

কিরমান দরোজার শিকল নাড়তে গিয়ে থামল। কাঁদে কে? কান্না না? কোনো মেয়েমানুষ? অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কান্না। কিন্তু কে? ছোট গিন্নি? সাহেব আলীর বউয়ের তো কাঁদবার কথা নয়। সে জোরে জোরে দরোজার শিকল নাড়ে।

কেডা? কম্পিত স্বর পাওয়া গেল, আ-মি অ-ই। কিরু।

ঝটিতি দরজা খুলে গেল। বারান্দায় হারিকেনের এক ফালি আলো ছড়িয়ে পড়বার মতো করে সাহেব আলী জিজ্ঞেস করল, কাম ফতে?

কিরমান বলে, কান্দে কেডা?

সাহেব আলী কিরমানের কাঁধে হাত রাখে। ডাকে, আয়, ভিত্তে আয়। ভিজ্জা আইছস জবর।

মাথা উঁচু করে ভেতরে দেখল কিরমান। মেয়েটা ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। যতীনের বউ। যতীনের খোঁজখবর নাই দেড় বছর। পাগল হয়ে কোথায় না কোথায় চলে গেছে। যতীনের না বেশ কিছু জায়গাজমিন ছিল? সেই ফসলে বছর ত চলে। তাহলে কোন অভাবে এই ঘরে আসা যতীনের বউয়ের? স্বেচ্ছায় এলে কাঁদবেইবা কেন মানুষ?

কিরমানের সামনে যদুর সম্ভব বুক-মাথা আড়াল তুলে সাহেব আলী। জিজ্ঞেস করে, খবর কইলি না?

মাস্টররে শ্মশানঘাটে গাছের লগে বাইন্দা থুইয়া আইছি।

সাহেব আলী গর্জে ওঠে, কি?। কি জানি কইতে চায়, কামের কথা। আপনের লগে। কথাডা হোনা দরকার কইল। ভাবলাম অইতেও পারে। হেইতে আপনেরে লইতে আসলাম। কেডা জানি কি, কথাডা আপনের কামেও লাগতে পারে।

সাহেব আলী কথাহীন, স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যায়, রাগটা আর ফাটবে না। মোন্তাজ রামদা হাতে এগিয়ে আসে। নিচু মাথায় বলে, শুইন্না আসেন একবার। কি জানি কইব! কামের কথা হইতেও পারে।

লোকটা কি বিশ্বাস করছে ব্যাপারটা? কিরমান আরও সাবধান হয়ে কণ্ঠ পাল্টায়, ছাতিডা মাথায় দিয়া লন। কামের কথাও হইতে পারে। যেই পিছমোরা বান দিছি, ছুটতে পারলে না? লন যাই, আবার তো অখনেই আইসা পড়বেন। মারতে হয় তো গলা পাতারি এক কোপ দিমু আপনের সামনে। হের পরে গাঙ্গে ভাসাইয়া দিমুনে।

তখন লোকটা যেন একটু সহজ হয়। ভেতরে ঢুকে ছাতাটা বের করে আনে। শিকল তুলে দিয়ে তালা লাগায় দরোজায়। জায়গাটা খুব দূরের নয়। নদীর কাছাকাছি হতে বোঝা গেল নদীর ঢেউয়ে, স্রোতে খুব বড় একটা তোলপাড় চলছে। সাহেব আলী টর্চ ফেলে দেখল, শ্মশানখোলার কোনো গাছেও কোনো মানুষের বাঁধন নেই। তখন আকাশে একবার বিদ্যুৎ চমকায়। সাথে সাথে সাহেব আলী কয়েক পা পিছিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল, কির-মা-ইন্না-রে...।

কিরমান চট করে ধরে ফেলল সাহেব আলীকে। তার হাতটা সন্ধ্যা থেকেই বড় অস্থির। সাহেব আলীর গলার দিকে জোর কোপ দেয় সে একটা। এই ধারা কোপে আওয়াজ নিশ্চয়ই হয়। গল গল রক্তও বয়। কিন্তু অল্পেই বৃষ্টি, বাতাস, ঢেউয়ে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

ঝড় বাড়ল আরও। আকাশ এক একবার ডেকে ডেকে ভেঙে পড়তে চাইছে যেন। এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল নদী।

লেখক



কথাসাহিত্যিক
ফেনসিডিল আত্মসাতের ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

ফেনসিডিল আত্মসাতের ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা ফেনসিডিল আত্মসাতের অভিযোগে শিবগঞ্জ থানার দুই ...

৭ থেকে ২৮ অক্টোবর ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ

৭ থেকে ২৮ অক্টোবর ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ

আগামী ৭ অক্টোবর থেকে প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিন ইলিশ ...

অনলাইনের আওতায় ৮৭ শতাংশ ব্যাংক শাখা

অনলাইনের আওতায় ৮৭ শতাংশ ব্যাংক শাখা

গ্রাহকদের চাহিদা বিবেচনায় দ্রুত প্রসার হচ্ছে অনলাইন ব্যাংকিং সেবার। বেসরকারি ...

নির্বাচনের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না: অর্থমন্ত্রী

নির্বাচনের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না: অর্থমন্ত্রী

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ...

উজিরপুরে সাংসদের পিএসের বিরুদ্ধে মামলা

উজিরপুরে সাংসদের পিএসের বিরুদ্ধে মামলা

বরিশালের উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টু হত্যায় ...

রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধে ধস, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা

রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধে ধস, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা

রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর পুলিশ লাইনের সামনে পদ্মা নদীতে শহর রক্ষা ...

ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানো হলো মোনালিসার অভিযুক্ত খুনিকে

ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানো হলো মোনালিসার অভিযুক্ত খুনিকে

নারায়ণগঞ্জে ১২ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী মোনালিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ...

নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচন হবে: আইনমন্ত্রী

নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচন হবে: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে এখনও অনেকে সংশয়ের মধ্যে ...