জাহানারা ইমাম

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ষাট ও সত্তর দশকে সাহিত্যজগতে জাহানারা ইমাম অল্প-বিস্তর পরিচিত ছিলেন শিশু-কিশোর উপযোগী রচনার জন্য। কিন্তু তাঁর সর্বাধিক খ্যাতির কারণ দিনপঞ্জিরূপে লেখা অনবদ্য গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি'। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পুত্র রুমী ও স্বামীকে হারান। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস কেটেছে তাঁর একদিকে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে; অন্যদিকে মনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন।

জাহানারা ইমাম শহীদ জননী হিসেবে খ্যাত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক রূপে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামের এক রক্ষণশীল পরিবারে ১৯২৯ সালের ৩ মে জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবকালে মুসলিম পরিবারের মেয়েদের কাছে আধুনিক শিক্ষালাভের দ্বার উন্মুক্ত ছিল না। তবে তিনি তাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা আবদুল আলীর তত্ত্বাবধানে রক্ষণশীলতার বাইরে এসে আধুনিক শিক্ষালাভ করেছিলেন। বিবাহিত জীবনে লেখাপড়ায় তিনি পুরকৌশলী স্বামী শরীফ ইমামের দিক থেকেও উৎসাহ ও আনুকূল্য পেয়েছিলেন।

জাহানারা ইমাম ছিলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। তিনি ছিলেন সুন্দর এক জীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন বহনকারী, যে জীবন-স্বপ্ন বাঙালি নারীদের স্বভাবগত, গড়ে তুলবেন সুখী গৃহকোণ, পিতা-মাতা, স্বামী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবৃত্ত মিলে জীবন হবে সুন্দর ও সার্থক। সেই সঙ্গে যুক্ত থাকে আরও কিছু চাওয়া, কল্যাণময় হোক সবার জীবন, দেশ ও সমাজ যেন পেতে পারে মুক্ত ও স্বাধীন বিকাশের সুযোগ। তবে আপন জীবনবৃত্তে জাহানারা ইমাম কতক বাড়তি গুণের অধিকারী ছিলেন। সামাজিক জীবনে তিনি বিপুলভাবে আগ্রহী এবং চরিতার্থতা খুঁজে পেয়েছিলেন শিক্ষকতায়, পঠন-পাঠনে আর লেখালেখিতে।

পিতার চাকরিসূত্রে জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। বিএড পাস করার পর ১৯৬৫ সালে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন। পরে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ফুলব্রাইট স্কলার জাহানারা ইমাম আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬৮ সালের দিকে সে চাকরি ছেড়ে দেন। পরে তিনি নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ব্যক্তিত্বময়ী জাহানারা ইমাম ষাটের দশকে ঢাকার সংস্কৃতি মহলে সুপরিচিত ছিলেন।

ষাট ও সত্তর দশকে সাহিত্যজগতে জাহানারা ইমাম অল্প-বিস্তর পরিচিত ছিলেন শিশু-কিশোর উপযোগী রচনার জন্য। কিন্তু তাঁর সর্বাধিক খ্যাতির কারণ দিনপঞ্জিরূপে লেখা অনবদ্য গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি'। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পুত্র রুমী ও স্বামীকে হারান। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস কেটেছে তাঁর একদিকে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে; অন্যদিকে মনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। সেই দুঃসহ দিনগুলোতে প্রাত্যহিক ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার বৃত্তান্ত লিখেছিলেন তিনি নানা চিরকুটে, ছিন্ন পাতায়, গোপন ভঙ্গি ও সংকেতে। ১৯৮৬ সালে গ্রন্থরূপ পাওয়ার পর তা জনমনে বিপুল সাড়া জাগায়। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি শিহরণমূলক ও মর্মস্পর্শী ঘটনাবৃত্তান্ত হলো 'একাত্তরের দিনগুলি'।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাহানারা ইমাম লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় কাটান এবং তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলো এ সময়ে প্রকাশ পায়। গল্প, উপন্যাস ও দিনপঞ্জি জাতীয় রচনা মিলিয়ে তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : অন্য জীবন (১৯৮৫), বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫), জীবন মৃত্যু (১৯৮৮), চিরায়ত সাহিত্য (১৯৮৯), বুকের ভিতরে আগুন (১৯৯০), নাটকের অবসান (১৯৯০), দুই মেরু (১৯৯০), নিঃসঙ্গ পাইন (১৯৯০), নয় এ মধুর খেলা (১৯৯০), ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস (১৯৯১) ও প্রবাসের দিনলিপি (১৯৯২)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাহানারা ইমামের নাম ছড়িয়ে পরে তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য। অতীতে তিনি রাজনীতিসচেতন হলেও রাজনীতিবিদ ছিলেন না। এবার ভবিতব্যই তাঁকে রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে। একাত্তরে তাঁর প্রথম পুত্র রুমী ছাত্রত্ব ত্যাগ করে দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে নিহত হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। তখন থেকেই তিনি 'শহীদ জননী'র মর্যাদায় ভূষিত।

মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জাহানারা ইমাম নিজেও সর্বদা সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ ঘাতক-দালালদের পর্যায়ক্রমিক পুনর্বাসনে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করে এবং লিখে জনসচেতনতা গড়ে তোলেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের পরিচালিত 'সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী নাগরিক কমিটি', 'স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি' ইত্যাদি উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কিন্তু অচিরেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের একত্র করতে না পারলে বিরোধী দুষ্ট চক্রকে প্রতিরোধ করা যাবে না। এ সময় তিনি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি ছিলেন মূলত সংস্কৃতি অঙ্গনের লোক, কিন্তু এ সময় থেকে তিনি রাজনীতির অঙ্গনেও সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক হন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক দল ও কর্মীবৃন্দ, দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজ এবং প্রজন্ম '৭১ তাঁর আহ্বানে এগিয়ে আসেন। তাঁদের সক্রিয় সমর্থনে জাহানারা ইমাম ১৯৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে গণআদালত গড়ে তোলেন।

গণআদালত ছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। কিন্তু তৎকালীন সরকার জাহানারা ইমামসহ গণআদালতের সঙ্গে যুক্ত ২৪ জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে এবং জাহানারা ইমাম মৃত্যুকালেও এ অভিযোগ থেকে মুক্তি পাননি।

১৯৮১-র দিকে জাহানারা ইমাম মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন; রোগ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে, কথা বলাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু কর্কট রোগ তাঁর কর্মস্পৃহা ও আদর্শকে বিন্দুমাত্র স্তিমিত করতে পারেনি। সব ব্যথা-বেদনা উপেক্ষা করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির কর্মকাণ্ড সমান উৎসাহে চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। সেখান থেকে ঢাকায় এনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। া

স্বাধীনতার সুফল জনগণের ঘরে পৌঁছাতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীনতার সুফল জনগণের ঘরে পৌঁছাতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলায় তার ...

শাহজালালে বিমান থেকে সাড়ে ৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার

শাহজালালে বিমান থেকে সাড়ে ৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা একটি বিমান থেকে ...

ঢালাও নয়, বিএনপি সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছে: ফখরুল

ঢালাও নয়, বিএনপি সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছে: ফখরুল

'বিএনপি ঢালাও অভিযোগ করছে'— নির্বাচন কমিশনের এমন বক্তব্যের জবাবে বিএনপি ...

নেইমার-এমবাপ্পের চোট বড় নয়

নেইমার-এমবাপ্পের চোট বড় নয়

প্রীতি ম্যাচ খেলতে কাছাকাছি সময়ে মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল এবং ফ্রান্স। ...

অজিদের কাছে হারে শুরু ভারতের

অজিদের কাছে হারে শুরু ভারতের

অস্ট্রেলিয়া সফর হার দিয়ে শুরু হলো ভারতের। টি২০ সিরিজ দিয়ে ...

প্রতিবছর এশিয়া কাপ আয়োজনের চিন্তা এসিসি'র

প্রতিবছর এশিয়া কাপ আয়োজনের চিন্তা এসিসি'র

এশিয়া কাপের নিজস্ব জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোকে ক্রিকেটের ...

'অতীত নিয়ে পড়ে নেই উইন্ডিজ'

'অতীত নিয়ে পড়ে নেই উইন্ডিজ'

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজটা ভালো যায়নি। ভারতের মাটিতে বড় ...

সন্দ্বীপে অপহৃত শিশুর খোঁজ মেলেনি ৩৬ ঘণ্টায়ও

সন্দ্বীপে অপহৃত শিশুর খোঁজ মেলেনি ৩৬ ঘণ্টায়ও

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে স্কুল ভ্যান থেকে নামিয়ে অপহরণ করা আট বছরের ...