মোহাম্মদ কায়কোবাদ

সম্ভাবনার বাংলাদেশ :প্রেক্ষিত তথ্যপ্রযুক্তি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

আমরা আমাদের দেশটি নিয়ে খুবই গর্বিত। পৃথিবী তার এক-সহস্রাংশ ভূখণ্ডে ২৪ সহস্রাংশ মানুষের আবাসন, চিকিৎসা ও খাদ্যের জোগান দিয়ে মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ উপাদান মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পক্ষান্তরে ৮৭ গুণ বড় জায়গা অস্ট্রেলিয়াতে জনসংখ্যা সাত ভাগের এক ভাগ। কানাডাতে এই অনুপাত আরও বেশি। উপরন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে, খাদ্যের জোগান হচ্ছে জটিলতর। মাটির নিচে প্রাকৃতিক সম্পদের ছড়াছড়ি নেই, যদিও গ্যাস সম্পদ আবিস্কারে পেট্রোবাংলার বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক সাফল্য জনগণকে উজ্জীবিত করছে। এমতাবস্থায় একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাংহাই জিয়াওটং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কনফারেন্সে জ্ঞানতাপসেরা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই বলে সতর্ক করছেন- একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হলে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে আমাদের জীবনধারায় পরিবর্তন আসছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্পর্শে আমাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড অধিকতর গতিশীল হচ্ছে। এখন দৈনন্দিন জীবন সফলভাবে চালাতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞানে দক্ষ হওয়ার বিকল্প নেই। কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম; যারা ৫০ বছর আগে উন্নয়নের মাপকাঠিতে আমাদের প্রায় সমকাতারে ছিল, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আকাশচুম্বী সাফল্য লাভ করেছে। পক্ষান্তরে আমাদের উন্নয়ন/উৎপাদনবিমুখ পরিকল্পনার ফলে আগে জাপান, জার্মানি থেকে আমদানি করলেও এখন করছি মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম আর চীন থেকে। কথিত আছে, পাকিস্তান সরকার যখন পিএল-৪৮০ থেকে গম পেয়েই খুশি হতো তখন ভারত সরকার বিদেশিদের গমের পরিবর্তে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা চেয়েছিল। যার ফলে আইআইটিগুলোর আবির্ভাব এবং গর্বের সঙ্গে ভারতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পতাকাকে আকাশে তোলা। স্বাধীনতার সময় যে ভারত ভালো মানের ব্লেড প্রস্তুত করতে পারত না; এখন তারা চাঁদে রকেট পাঠিয়ে পানির অস্তিত্ব খুঁজে পায়; এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠায়। পক্ষান্তরে আমরা আগে জাপানি বস্ত্র কিংবা জার্মানির ইলেকট্রনিক্স ব্যবহার করতাম, এখন বিদেশ থেকে আমদানি করেই তা ব্যবহার করি, তবে আমদানির দেশ এখন অনেক কাছে মালয়েশিয়া কিংবা ভিয়েতনাম। আমদানি সামগ্রীতে অবশ্যি যোগ হয়েছে বিস্কুট, ফলের রস কিংবা পরোটা। দেশের ৩২ কোটি হাতকে এমনকি পরোটা তৈরিতেও ব্যবহার করতে পারছি না। নিজের দেশের ছোট-বড় উন্নয়নে যদি বিদেশিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা কতটা অর্থবহ!

মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ আইন করে বসলেন- প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপদস্থ সব কর্মকর্তা মালয়েশিয়াতে তৈরি গাড়ি ব্যবহার করবেন। হয়েছেও তাই। এখন এমনকি বিদেশেও মালয়েশিয়ায় উৎপাদিত গাড়ি ব্যবহার করা হয়। ঠিক অন্যান্য দেশের মতো কোরিয়া আর মালয়েশিয়া শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। আমাদেরও একই পথ অনুসরণ করতে হবে। এখন এই বিপুল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ব্যবস্থা করাও সহজ কথা নয়। শিক্ষার গুরুত্ব ও সমাজে শিক্ষকের মানমর্যাদা হ্রাস পাওয়ায় স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষক হিসেবে যথাযথ মানের স্নাতকদের আকর্ষণ করতে পারছে না। ফলে শিক্ষকরা তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারছেন না। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণে সম্পদের অপর্যাপ্ততা হলো নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। এমতাবস্থায় এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্যও চাই শিক্ষাদানে অতি উৎপাদনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার। তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের নানা উদ্যোগ, তার ফলাফল এবং কী সব উদ্যোগ নিলে এর থেকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে পারি তা নিয়ে আমার কিছু ভাবনার কথা আলোকপাত করছি।

১। সুখের বিষয় এই যে, সম্পদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সীমিত সম্পদের দেশে অসীম চাহিদা মেটাতে একদিকে যেমন সম্পদের যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন, অন্যদিকে তার সর্বোত্তম ব্যবহারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সর্বক্ষেত্রে উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জন করা প্রয়োজন। আর এসব সমস্যার কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধান হলো সর্বক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির যুৎসই সমাধান বের করা। তথ্যপ্রযুক্তির দায়িত্বে নিয়োজিত তরুণ, উদ্যোগী প্রতিমন্ত্রী উদ্যোগ গ্রহণে সদাতৎপর। এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে হলে চাই তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়। আর সেই লক্ষ্যে দেশজুড়ে হাই স্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তির তরুণ স্নাতকদের বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে অত্যন্ত মর্যাদাকর আইসিটি ফেলোশিপ দেওয়া হচ্ছে, যাতে এই ফেলোশিপ প্রাপ্তির জন্য স্নাতকদের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানি তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রদের সৃজনশীলতা ব্যবহার করে জাতি ও সমাজে মূল্য সংযোজন করতে পারে এমন অ্যাপ্লিকেশন্স তৈরির অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে আমাদের তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশের প্রতি মমত্ববোধও বিকশিত হবে।

২। বর্তমান সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সূচনা করছে যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে সাফল্য পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারছে না। আমরা আমাদের উদ্যোগগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য কেন পাচ্ছি না, তা বিশ্নেষণ না করলে কখনও অধিকতর কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই। অতি সম্প্রতি দোয়েল ল্যাপটপ নিয়ে আর কথা হচ্ছে না। আমরা কি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়েছি? না পেয়ে থাকলে কারণ কী? আমাদের এই উদ্যোগ কি সুচিন্তিত ছিল? সিলিকন ভ্যালিতে শেয়ার্ড অফিস খুলে কী আমাদের সুবিধা হয়েছে, আইসিটি ইনকিউবেটর তৈরি করে, আইসিটি ফেলোশিপ দিয়ে, ইইএফ ফান্ড প্রবর্তন করে? হাইটেক পার্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা অনেক দিনের। তার পরও তা হচ্ছে না কেন? ইলেকশন কমিশনের কম্পিউটারায়নের জন্য অর্থায়ন হয়েছে বহুবার। ন্যাশনাল আইডি কার্ড প্রকল্পে আইডি নাম্বারের ম্যাপিং যে কতবার হলো; পক্ষান্তরে আমেরিকার ৯ অংকের সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বারের পরিবর্তন হচ্ছে না যুগযুগ ধরে কোনো সমস্যা ছাড়াই। সীমিত সম্পদের দেশ হিসেবে এক কাজ বারবার নয়, বিভিন্ন কাজ কীভাবে সমন্বিতভাবে এক খরচে করা যায় তার জন্য আমাদের তৎপর হওয়া উচিত। যেমন একই নাম্বার ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র, তা দিয়েই ভোটার, গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটিসহ অন্যান্য বিল, ব্যাংকিং, নিরাপত্তা- সবই করতে পারা উচিত। নানা উদ্যোগ তৎপরতা সত্ত্বেও কেন যেন আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন)-এর নানা সূচকে আমাদের অগ্রগতির তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। সময় এসেছে আমাদের সব উদ্যোগের একটি ডাটাবেজ তৈরি করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্নেষণ করা। সম্ভবত তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোগগুলো মাত্রাতিরিক্ত বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সাফল্যের শত মাতা পাওয়া গেলেও ব্যর্থতার কোনো পিতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তির নামে মন্ত্রণালয় তাও নানা নামে, এসআইসিটি নামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান যাতে করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব না ঘটে, আবার শক্তিশালী এটুআইসহ নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির ভিটামিন/কোরামিন দেশের দেহে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তেমন কোনো সাফল্য ছাড়াই।

৩। বাংলাদেশে এখন যেখানেই তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোগ সেখানেই বিদেশি বিশেষজ্ঞ; তা ভারত থেকেই হোক আর শ্রীলংকা থেকে হোক। যে দেশে একমাত্র উদ্বৃত্ত হলো মানুষ সেই দেশে বিশেষজ্ঞের নামে যে কোনো দেশ থেকে সেবা দিতে পারুক আর নাই পারুক হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের স্থির বিশ্বাস থাকতে হবে- বিদেশি কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার এবং মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার ভাড়া করে অন্ততপক্ষে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাহলে তো কুয়েত আর সৌদি আরব কবেই ডিজিটাল হয়ে যেত। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যদি একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তা হবে দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানে দক্ষতায় বলীয়ান করা। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত সম্পদ দিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা মোটেই সহজ নয়। তবে সরকার যা করতে পারে তাহলো বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের জন্য সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নানা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

বিগত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনে আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই সুখকর। বাংলাদেশের তরুণরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পছন্দ করে। না হলে কি প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে শ্রেয়তর শিক্ষা পদ্ধতির সাত গুণ বড় ভারতের নামকরা আইআইটির ছাত্ররা আমাদের জাহাঙ্গীরনগর এবং শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে পড়ে? ২০১৫ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের দল দুটি সব ক'টি (৭) দলকেই পেছনে ফেলতে পারে? এবারও আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দল উপমহাদেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই মেধাবী তরুণ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের দেশে আমরা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলেও ভিনদেশি গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুকসহ নানা দামি উদ্যোক্তা অল্প ওজনের শ্যামলা চেহারার ঠেকে ঠেকে ইংরেজি-বলা বাংলাদেশের কম্পিউটার স্নাতকদের লুফে নিচ্ছে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোক্তাদের ভাবনায় থাকা উচিত- বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পেছনে না ঘুরে দেশের তরুণদের দাম দিতে হবে, কাজের সুযোগ দিতে হবে। বিদেশিরা আমাদের দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য আসে না; সমস্যাকে দীর্ঘজীবী করতে আসে ও অর্থ লোপাট করে।

৪। পৃথিবীর প্রায় ৪০ জন মানুষের একজন হলো বাংলাদেশের। কিন্তু পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যদি র‌্যাঙ্কিং করা হয় তাহলে ৪০ কেন; শ্রেষ্ঠ ৪শ'টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিও বাংলাদেশে নেই। এই মাপকাঠিতে যারা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে তার মধ্যে রয়েছে কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এমনকি বেশ কিছু আরব দেশ। এর অনেক দেশ থেকেই এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসত। আমাদেরকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ করতে হবে। শুধু তাই নয়, এই বরাদ্দের যাতে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয় তার জন্যও অন্তত শুরুতে গবেষকদের প্রোফাইল দেখে প্রকল্প বাছাই করতে হবে। নানা ফান্ডিং এজেন্সির মধ্যে সমন্বয় আবশ্যক, যাতে একই গবেষণার জন্যও একাধিকবার একাধিক সংস্থা থেকে বরাদ্দ দেওয়া না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্জনের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে বহুল প্রচার নিশ্চিত করে তাদের র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করা ও সে অনুযায়ী পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫। বেশ কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে পরীক্ষার আগেই প্রচারিত হওয়ার ফলে কোমলমতি ছাত্রদের মূল্যবোধে চিড় ধরছে। এতে অভিভাবকদের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র প্রাপ্তির উৎসাহ তাদের হতবিহ্বল করছে। একাধারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়; অন্যদিকে প্রশ্নপত্র সিলগালা করে শের শাহের ঘোড়ার ডাক অথবা কিঞ্চিৎ অধিক গতির বাহনে পাইক-পেয়াদার তত্ত্বাবধানে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোয় প্রেরণ করার কাজটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখন নিশ্চয়ই একটি প্রশ্নপত্র ৩০/৪০ জন মানুষের দূর থেকে হলেও দেখার সুযোগ হয়। মোবাইল ফোনের কল্যাণে এই প্রশ্নপত্রগুলোর ছবি তোলা থেকে বিরত রাখার কাজে নিশ্চয় মাত্রাতিরিক্ত গোয়েন্দা নিয়োগ করেও লাভ হবে না। আবার গুগল গ্লাসেরও আবির্ভাব ঘটেছে। তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ছবি তোলার কাজটি হয়ে যাবে। এই সমস্যার প্রাগৈতিক সমাধান নেই তবে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান অবশ্যই আছে। আমাদের সেই পথে অগ্রসর হওয়ার বিকল্প নেই। প্রশ্নই যদি পরীক্ষা শুরু হওয়ার দিন প্রণীত হয় তাহলে ফাঁস হওয়ার বিষয়টি আর আসবে না। প্রকৃতপক্ষে মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন সম্ভব।

৬। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়াবলিতে ছাত্রদের অনাগ্রহ অত্যন্ত শঙ্কার বিষয়। ১৬ কোটি মানুষকে শুধু ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত রাখা যাবে না। উৎপাদন কাজেও ব্যবহার করতে হবে। এক সময়ে দেশের শ্রেষ্ঠ ছাত্ররা বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে চাইত। এখন সম্ভবত এ ক্ষেত্রে চাকরির অভাব তাদের অন্যান্য বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট করছে। এমনকি বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতে ভালো জিপিএ নিয়ে পাস করার পরও বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। দেশকে উন্নত করতে হলে উৎপাদনের বিকল্প নেই। আমাদের উৎপাদনমুখী হতে হবে, কলকারখানা তৈরি করতে হবে, দেশের চাহিদা মেটাতে হবে, আমদানির পরিমাণ কমাতে হবে।

আমরা চাইব, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে আমরা ডিজিটালি যাতে পরাধীন না হই। আমাদের ব্যাংকগুলো আমাদের দেশের নিয়মে চলবে, আমাদের দেশের সফটওয়্যার সেখানে ব্যবহূত হবে। কোনো সমস্যা হলে আমাদের একজন তরুণ তা ঠিক করে দেবে। আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্থানে আমাদের দেশে তৈরি সফটওয়্যার চলবে, আমরা তা গর্বের সঙ্গে চালাবো। আমাদের প্রকৌশলীরা তার উন্নয়ন করবে, পরিমার্জন করবে, ব্যাংকগুলোর দিনের কাজ শেষ করার জন্য কোনো বিদেশির নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে না। যে দেশে পাঁচ কোটি মোবাইল ফোন, সে দেশে একটি মোবাইল ফোন কারখানাও স্থাপিত হতে পারে। হতে পারে কম্পিউটার তৈরির কারখানা। অন্য কোথায়ও বাজার খুঁজতে হবে না; আমরাই যথেষ্ট। আমাদের ভালো হাসপাতাল হবে যেখানে রোগী আমাদের, ডাক্তারও আমাদের। অন্য দেশের রোগীর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আমাদের সেতু আমরাই তৈরি করব। বড় বড় স্থাপনাও যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গর্বের কারণ হবে। সেদিন আমাদের স্বাধীনতা অর্থবহ হবে। আমাদের মধ্যে সক্ষমতা অর্জনের এই স্বপ্ন, বিশ্বাস থাকতে হবে। তা হলেই এই অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল দেশটি উন্নতির মাপকাঠিতেও অনুরূপ মর্যাদাকর একটি আসন লাভ করতে পারবে। সারা পৃথিবীর বোদ্ধাদের তাক লাগিয়ে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত পোশাক শিল্পের কর্মী এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষের কল্যাণে আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। এবার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দেশকে দেওয়ার পালা। তাদের কর্মতৎপরতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত দেশে পরিণত হতে হবে।

লেখক



বিজ্ঞানী

শিক্ষাবিদ
চট্টগ্রাম টেস্টে বাদ পড়ছেন কে?

চট্টগ্রাম টেস্টে বাদ পড়ছেন কে?

জিম্বাবুয়ে সিরিজের সপ্তাহখানেক বাদেই মাঠে নামছে বাংলাদেশ দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ...

নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে নিহত ৩

নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে নিহত ৩

খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে নৌবাহিনীর তিতুমীর ঘাঁটিতে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে ...

বিয়ের প্রস্তাবের সাক্ষী একদল বেজিও!‍

বিয়ের প্রস্তাবের সাক্ষী একদল বেজিও!‍

জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিয়ে। সেই বিয়ের প্রস্তাবকে স্মরণীয় করে ...

ফ্রিজ বিস্ফোরণে বাড়িঘর পুড়ে ছাই

ফ্রিজ বিস্ফোরণে বাড়িঘর পুড়ে ছাই

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অগ্নিকান্ডে একটি বসত বাড়ির দুটি ঘর পুড়ে ছাই ...

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ

নরসিংদীর পলাশে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের ...

প্রধানমন্ত্রী তরুণদের মুখোমুখি হচ্ছেন ২৩ নভেম্বর

প্রধানমন্ত্রী তরুণদের মুখোমুখি হচ্ছেন ২৩ নভেম্বর

তরুণদের মুখোমুখি হতে আগামী ২৩ নভেম্বর 'লেটস টক উইথ শেখ ...

‘সিনেমা করবো,ওয়েব সিরিজ নয়’

‘সিনেমা করবো,ওয়েব সিরিজ নয়’

ঢাকাই চলচ্চিত্রের এ সময়ে যে ক’জন নায়িকা চলচ্চিত্রে লিড দিচ্ছেন ...

রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পুলিশের ওপর হামলা: মনিরুল

রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পুলিশের ওপর হামলা: মনিরুল

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ...