মফিদুল হক

সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্প্রীতি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

একবিংশ শতকে সভ্যতার নবযাত্রা ঘটবে, এমন আশাবাদ পোষণ মোটেই অসঙ্গত ছিল না। এর আগে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল প্রায় রাতারাতি, ফলে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মধ্যে বিশ্ববিস্তৃত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু সেই দ্বন্দ্বের অবসানে শান্তির জয় প্রতিষ্ঠা হলো না, পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত শোষণ-পীড়ন-সংঘাত তো ছিলই, আরও নতুন নতুন দ্বন্দ্বও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সহিংসতার বিস্তার ঘটল বিশ্বব্যাপী, যার থেকে কোনো দেশই আজ আর নিরাপদ নয়। হানাহানির প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠল ধর্ম; ধর্মের বৈচিত্র্য হয়ে উঠল ধর্মসংঘাতের হেতু। সে-এক সময় ছিল, যখন মনে করা হতো সমাজের সব সমস্যার সমাধান হবে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটলে। শত বছর আগের কথাই যদি ধরি, তাহলে সমাজতন্ত্রীরা তখন সবে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করেছে রাশিয়ায়। পুঁজিবাদী সমাজে শৃঙ্খলিত মানুষ মুক্তির বার্তা যেন পেয়েছিল সমাজতন্ত্রী রূপান্তরের বাস্তব অভিযাত্রায়। রুশ সমাজ হয়ে উঠেছিল বিশাল গবেষণাগার, উৎপাদনের উপায়গুলো তথা কলকারখানা ও জমির ব্যক্তিমালিকানা রদ করে প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মালিকানা। এর ফলে অবসিত হবে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, দূর হবে সব রকম বৈষম্য, সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা সমাজের অসঙ্গতি দূর করে গড়ে তুলবে সম্প্রীতির সমাজ, এমন স্বপ্ন তাড়িত করেছিল বিশ্বের অগণিত মানুষকে। জোরদার হয়ে উঠেছিল সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম; ঘটেছিল এর বিস্তৃতি ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়ায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-উত্তর পৃথিবী সমাজতন্ত্রের সাফল্য বয়ে আনলেও ক্রমে জানা যেতে থাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের পীড়নের কথা, যা অর্জন করেছিল রক্ত-হিম করা নৃশংসতা। এর আগে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উপান্তে ইউরোপে ইহুদি নিধনে হিটলারের ফ্যাসিস্ট সরকারের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার পরিচয় উদ্ঘাটিত হতে থাকে। ইহুদিদের পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলে সমস্যার ফাইনাল সলিউশন করতে উদ্যোগী হয়েছিল নাৎসিরা। জার্মান দক্ষতা নিয়ে বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে গ্যাসচেম্বারে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হয়। ইউরোপের এক বনেদি সুসভ্য রাষ্ট্রের এই বর্বরতা এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পীড়নমূলক বাস্তবতা বিশ্বসমাজকে হকচকিয়ে দিয়েছিল। এর কার্যকারণ অনুসন্ধানে সমাজবিশ্নেষকদের নানামুখী চেষ্টা চলছিল, জেগে উঠেছিল অনেক জিজ্ঞাসা। ভায়োলেন্স কি মানবচরিত্রের গভীরে প্রোথিত, ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির সহিংসতা কীভাবে রাষ্ট্রের সংহারক রূপে পর্যবসিত হয়, সহিংসতা ব্যক্তি থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে পরিবাহিত হওয়ার লক্ষণ কী কী, এর থেকে পরিত্রাণের উপায়ই বা কী ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উত্থিত হয়েছিল সভ্যতার সংকট থেকে।

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য প্রয়োজন ছিল বাস্তবের চুলচেরা বিশ্নেষণের সঙ্গে দার্শনিক বিচার। তেমন প্রয়াসের প্রতিফলন আমরা দেখি ইতিহাস ও দর্শনের অধ্যাপক চিন্তাবিদ হান্‌না আরেন্ড-এর রচনাদিতে, বিশেষত ১৯৬৩ সালে নিউইয়র্কার সাময়িকীতে প্রকাশিত তার সিরিজ রচনা 'আইখম্যান ইন জেরুজালেম'-এ। ইউরোপে ইহুদি নিধনের অন্যতম হোতা পলাতক নাৎসি অফিসার অ্যাডল্‌ফ আইখম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে জেরুজালেমের আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হলে কোর্টরুমে হাজির থেকে এর রিপোর্ট প্রণয়ন করেন হান্‌না। সেই রিপোর্ট তাৎক্ষণিকতা ছাপিয়ে পেয়েছিল চিন্তাশীল প্রবন্ধের স্থায়িত্ব, তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন হন্তারকের মানস, কীভাবে সুসভ্য পরিমার্জিত এক ব্যক্তি গণনিধনের উদ্‌গাতা হয়ে উঠতে পারে বিবেকের বিন্দুমাত্র তাড়না অনুভব না করে, নিষ্ঠুরতা কীভাবে হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন আচারের মতো স্বাভাবিক ক্রিয়া, 'ব্যানালিটি অব ইভিল' শব্দবন্ধ সেই থেকে ঠাঁই পেয়েছে সন্ত্রাসের বিশ্নেষণের উপাদান হিসেবে।

তারপর তো গঙ্গা-ভোলগা-রাইন নদী দিয়ে কত জল বয়ে গেছে সাগরে, কিন্তু ব্যানালিটি অব ইভিলের কূলকিনারা আর মেলেনি। আমাদের কবি শহীদ কাদরী তাই লিখেছিলেন, 'দেখলাম আইখম্যানের মতো মুখ করে/ একজন ইমাম দাঁড়িয়েছেন মিনারের/ উঁচু মাইক্রোফোনে/ এবং চতুর্দিকে/ নক্ষত্রের মতো নিষ্পাপ ক্লাবগুলো/ চকচক করছে। অ-ন-ব-র-ত।'

তখনও বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের নবতর বিস্তার ঘটেনি, ধর্মীয় জঙ্গিবাদের নয়া-উত্থান শান্তির ধর্ম ইসলামকে কলঙ্কিত করেনি, জঙ্গিবাদ দমনের নামে ক্ষমতা-মদমত্ত মার্কিনি প্রশাসন রক্তাক্ত সামরিক অভিযানে ধ্বংস করে দেয়নি একাধিক রাষ্ট্র, বাংলাদেশের রাজধানীর অভিজাত রেস্তোরাঁ হলি আর্টিসানে দেশ-উদ্ভূত তরুণ ঘাতক দল নিষ্ঠুরতার নতুন অধ্যায় রচনা করে বিমূঢ় করে দেয়নি সবাইকে। সে সময় ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো এই কবিতা লিখেছিলেন শহীদ কাদরী। সহিংস ঘটনার দীর্ঘ ফিরিস্তিদানের কোনো প্রয়োজন নেই, বাস্তবতা হলো সন্ত্রাস আজ হয়ে উঠেছে জাতীয় ও বিশ্বজনীন বাস্তবতা। বড় ছবি স্মরণে রাখলেও আমাদের এর থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে স্বদেশ ও স্ব-সমাজের নিরিখে। গভীরভাবে তলিয়ে দেখতে হবে হন্তারকের মানস, কীভাবে ঘটে মানবের নির্মাণবীকরণ।

সমাধানের কোনো দাওয়াই নেই আমাদের হাতে, কিন্তু সূত্র কিছু পাওয়া যেতে পারে সার্বজনীন অভিজ্ঞতায়, যার সারকথা হলো অন্তর থেকে বিদ্বেষ বিষের নাশকরণ, যা কার্যকর হতে পারে ব্যক্তি মানুষের পর্যায়ে, আর বৃহত্তর পরিসরে সমাজে রাষ্ট্রে সম্প্রীতির ভাবধারা জোরদারকরণ এবং অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি অপরের প্রতি ঘৃণা সঞ্চারমূলক বক্তব্য-বিবৃতি-প্রচারণা বন্ধ করে।

শেষোক্ত বিষয়টি একসময় ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমনি প্রয়াসকে নাগরিকের ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। সমাজচিন্তাবিদদের মধ্যে এখন একটি ঐকমত্যের আবহ তৈরি হয়েছে, হেইট স্পিচ বা অপরের প্রতি ঘৃণামূলক বাণী প্রচার কোনোভাবেই অনুমোদন করা যায় না। এর প্রচারণা বন্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে উপযুক্ত বিধিবিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। এই প্রচেষ্টা নানাভাবে পরিচালিত হচ্ছে, আমেরিকার নিউজার্সির যে বিশ্ববিদ্যালয়ে হান্‌না আরেন্ডের রচনা, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, তথ্য সংগৃহীত রয়েছে, তারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষ সংক্রান্ত কোর্স প্রবর্তনে। তাদের এ উদ্যোগে বাংলাদেশকে শামিল করতে আগ্রহী ছিল হান্‌না আরেন্ড ফাউন্ডেশন। উপযুক্ত তহবিল সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ায় এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি, তবে বিষয়টির গুরুত্ব আমাদের জন্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হওয়ার নয়। সম্প্রতি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সরকার এবং নাগরিক সংস্থা মিলে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এতদঞ্চলে সহিংসতার বিস্তারের সমস্যা মোকাবেলার নীতিনির্ধারণে। এই উদ্যোগে প্রধান জোর পড়েছে অঞ্চলের দেশগুলোয় নতুন প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যম কীভাবে ঘৃণা ও উস্কানিমূলক ভাবধারা প্রসারে ভূমিকা পালন করছে তার খতিয়ান নেওয়ায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বড় রকম ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে, যার সামাজিক বিশ্নেষণ একান্ত জরুরি। ফেসবুকের অপব্যবহারের অজস্র দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে, সংগঠিতভাবে অপপ্রচার ও ঘৃণা সঞ্চারের জন্য ফেসবুক ও নতুন প্রযুক্তি হয়ে উঠছে বড় বাহন। কেবল আইন প্রয়োগ ও দমনমূলক ব্যবস্থা দ্বারা এর মোকাবেলা সম্ভব নয়, চাই অতিরিক্ত আরও অনেক কর্মকাণ্ড। সেই বিচার-বিশ্নেষণ, পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণের কাজটি বড়ভাবে সূচিত হওয়া এখন বিশেষ প্রয়োজন। এই তাগিদটুকু প্রকাশের জন্যই বর্তমান ক্ষুদ্র নিবন্ধের অবতারণা।

লেখক



ট্রাস্টি

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

প্রাবন্ধিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : পথ তৈরি হয়ে আছে

জানালার গ্রিল কেটে শাবিপ্রবির ছাত্রী হলে চুরি

জানালার গ্রিল কেটে শাবিপ্রবির ছাত্রী হলে চুরি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শহীদজননী জাহানারা ইমাম ছাত্রী ...

দেশের মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার: কামরুল ইসলাম

দেশের মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার: কামরুল ইসলাম

বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করেছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ...

'গ্রিন টি'র ঘোষণা দিয়ে ইথিওপিয়া থেকে আনা ২০৮ কেজি খাথ জব্দ

'গ্রিন টি'র ঘোষণা দিয়ে ইথিওপিয়া থেকে আনা ২০৮ কেজি খাথ জব্দ

চট্টগ্রামে 'গ্রিন টি' হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আনা নতুন ধরনের ...

সরকারের জুলুমে দেশের মানুষ দিশেহারা: ফখরুল

সরকারের জুলুমে দেশের মানুষ দিশেহারা: ফখরুল

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেছেন, আওয়ামী ...

সেই দুই কিশোরীর লাশের পরিচয় মিলেছে

সেই দুই কিশোরীর লাশের পরিচয় মিলেছে

সাভারের আশুলিয়া ব্রিজ সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে বুধবার উদ্ধার করা ...

ভোট ছাড়া ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবেন না: কাদের সিদ্দিকী

ভোট ছাড়া ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবেন না: কাদের সিদ্দিকী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর ...

প্রথমবার কলকাতার ছবিতে কোনালের গান

প্রথমবার কলকাতার ছবিতে কোনালের গান

ঢাকাই মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রির জনপ্রিয় শিল্পী সোমনুর মনির কোনাল। এ প্রজন্মের ...

আদিবাসী কোটা বহাল রাখার দাবি

আদিবাসী কোটা বহাল রাখার দাবি

সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিসহ সকল নিয়োগে ৫% আদিবাসী ...