আতাউর রহমান

মুক্তচিন্তা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

আমরা সারাজীবন বরাভয় হওয়ার জন্য নিজেদের উদ্বুদ্ধ করি, কিন্তু ভয় আমাদের ছাড়ে না। এই ভয়টা কিসের? দুঃখ, কষ্ট, নির্যাতন, মানসিক অশান্তি, অপরাধবোধ এবং সর্বোপরি মৃত্যুভয় আমাদের জীবনকে আকীর্ণ করে রাখে। আমরা মহাপুরুষদের জীবন-দর্শন ও কবি-সাহিত্যিক, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, নৃত্যপটীয়সী- এককথায় মানুষের জ্ঞানের অধিগম্য সকল সৃজনে জীবনের আনন্দ, দুঃখ, বেদনা, হতাশাকে খুঁজে পাই; খুঁজে পাই জীবনের সারাৎসার ; তবুও আমরা 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির' হতে পারি না। আমরা কেবল 'ভয়শূন্য' হওয়ার প্রয়াস গ্রহণ করি। বাঙালির গৌরব, জগৎসভার সবচেয়ে বড় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রায় সব সাহিত্য সৃজনে আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। তিনি যেমন অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছেন, তেমনি মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তবুও জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুভয় আমাদের পদে পদে শঙ্কিত করে। আমরা দীর্ঘ জীবন লাভের সামান্য ইঙ্গিত পেলে খুশি হই। আমরা হাজারো দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। আত্মহন্তারকের সংখ্যা এই পৃথিবীতে খুবই নগণ্য। সংবাদপত্রে একটি খবর পড়ে আমি আনন্দিত হয়েছি এবং আরও অনেকেই হয়েছেন। মানুষের গড় আয়ু নাকি কালে বর্ধিত হয়ে একশ' পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের বুড়িয়ে যাওয়া দেহ-কোষকে নতুন বা তাজা করে তুলতে পারবে এবং ভবিষ্যতে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাবে। আমি মনে মনে ভাবছি, গৌতম বুদ্ধ মানুষের জরা-ব্যাধি ও মৃত্যু অবলোকন করে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং এই জীবন অনীহার কারণেই উনি সংসারত্যাগী হয়ে বোধি বৃক্ষের নিচে বসে চরম আলোকপ্রাপ্ত হন অথবা বোধিত্ব লাভ করেন। গৌতম বুদ্ধ হওয়া তো সহজ নয়; তাই আমি আমাদের মতো নিত্যদিনের মানুষের কথাই বলি। আমি মাঝেমধ্যে রুগ্‌ণ, ক্লিষ্ট, জরা ও ব্যাধিগ্রস্ত অতিদরিদ্র মানুষকে দেখে মনে মনে বলি, উনি কেন বেঁচে আছেন! এর জীবনে আর কী-ই বা আশা থাকতে পারে! তখনই রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার নিল্ফেম্নাক্ত লাইনগুলো মনে পড়ে :

তবুও তো পেঁচা জাগে

গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে

আরেকটি প্রভাতের ইশারায়-অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।



আমরা আরেকটি প্রভাতের সূর্যালোক দেখব, ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু দেখব- এই আশায় হাজারো দুঃখ, কষ্ট ও হতাশা নিয়ে বেঁচে থাকি। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার নেশা মনে হয় সবচেয়ে বড় নেশা। 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য' করার আমাদের, অর্থাৎ মানবজাতির সারাজীবনের সাধনা। বাংলা সাহিত্য সৃজনের প্রধান কাণ্ডারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই জীবনকে ভয়শূন্য করার জন্য লিখেছেন অজস্র কাব্য, সঙ্গীত, নাটক ও উপন্যাস। মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার উল্লেখ আছে তার একাধিক রচনায়। যিশুখ্রিস্ট থেকে শুরু করে অনেক মহামানব ও মহাপুরুষ প্রাণ দিয়েছেন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। 'ভয়' কী, তারা জানতেন না।

আমি তরুণ বয়সে রবীন্দ্রনাথের 'তাসের দেশ' নাটকে রাজপুত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমি গান গাইতে পারতাম না, আজও পারি না। 'রাজপুত্রে'র সব গান নেপথ্য থেকে সে সময়ের প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক জাহেদুর রহিম গাইতেন আর আমি ঠোঁট মেলাতাম। একটি গানের কথা হলো- দক্ষিণে চাই, উত্তরে চাই, ফেনাই ফেনা, আর কিছু নাই।/ যদি কোথাও কূল নাহি পাই/ তল পাব তো তবু।/ ভিটার কোণে হতাশামনে রইব না আর কভু।

নদীর কূল না পেলেও তল তো পাব- এই কথাগুলো এই পরিণত বয়সে আমার চিত্তকে কিছুটা হলেও ভয়শূন্য করেছে। রবীন্দ্রনাথের 'রক্তকরবী' নির্দেশনা দিতে গিয়ে নাটকটির মর্মকথা আমি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছি। 'রক্তকরবী' নাটকের মুখ্য চরিত্র নন্দিনী। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষায় এই নাটক সম্পর্কে হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যা সে সময়ের বিলাতের 'দ্য ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। 'নন্দিনী' নাটকের রাজা মকররাজ নামে পরিচিত- যিনি দুষ্টচক্র, বিত্তের পর্বত ও অসুস্থ লোভ-লালসার প্রতীক, যিনি মহাশক্তিধর তাকে নিজেরই হাতে তৈরি করা দুষ্টচক্র ধ্বংস করার জন্য নন্দিনী উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। জীবনের শেষ যুদ্ধে তিনি রাজার হাতে হাত রেখে রাজারই আদেশে তৈরি লৌহপ্রাচীরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। রাজা ও নন্দিনী দু'জনেই জীবনের শেষ যুদ্ধে আত্মাহুতি দিলেন। রক্তকরবীর 'নন্দিনী' এভাবেই মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জীবনের জয়গান গাইলেন; তিনি হয়ে উঠলেন আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী নায়িকা। সত্য, সুন্দর ও সাহসের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।

মৃত্যুভয় জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়। জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ড ব্রেশ্‌টের 'গ্যালিলিও গ্যালিলি' নাটকে দেখি জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও চার্চের বিচারের ভয়ে নিজের সত্য আবিস্কারকে মিথ্যা বলে জীবন রক্ষা করেছিলেন। তিনি তার এই কাপুরুষতার পক্ষে তার প্রিয় শিষ্য আঁন্দ্রিয়াকে এই বলে বুঝিয়েছেন যে, তিনি মৃত্যুভয়ে তার সত্য আবিস্কারকে চার্চের বিচারসভায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; কারণ মৃত্যুভয় তো জীবনের স্বাভাবিক ভয়। পরে অবশ্য জানা যায়, সত্যকে মিথ্যা বলে তিনি তার বিজ্ঞানশাস্ত্রের বিখ্যাত বই 'ডিসকোর্সিকে' সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রকৃত বিচারে দেখা যায়, সত্যকে মিথ্যা বলে তিনি সত্যকেই রক্ষা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রেও আমরা তাকে পরোক্ষভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী পুরুষ বলতে পারি।

রবীন্দ্রনাথের 'মুক্তধারা' নাটকে ছোট রাজকুমার অভিজিৎ 'মুক্তাধারা'র বাঁধ ভাঙেন এবং নিজেও সে বাঁধের জলস্রোতে ভেসে যান। রাজা রণজিদের আদেশে যন্ত্ররাজ বিভূতি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করে সাধারণ কৃষিজীবীদের ক্ষেতের জল আটকেছিলেন নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু ভয়শূন্য গণমানুষের হৃদয়ের মানুষ, রাজা রণজিতের কনিষ্ঠ পুত্র অভিজিৎ বাঁধের একটি ত্রুটির সন্ধান জানতেন। উনি গোপনে বাঁধের সেই ত্রুটিপূর্ণ ছিদ্র খুলে দিলেন, ফলে কৃষকদের ফসলের মাঠ জলে ভরে গেল এবং জলস্রোতের বাঁধনহারা শক্তির তোড়ে উনিও ভেসে গেলেন অসীমের ঠিকানায়। যুবরাজের অনুসারী গণেশ ধনঞ্জয় বৈরাগীকে জিজ্ঞাসা করল, যুবরাজকে আমরা যে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম, তা হলে তাকে কি আর পাব না। ধনঞ্জয় বৈরাগী উত্তর দিয়েছিলেন, চিরকালের মতো পেয়ে গেলি। অর্থাৎ চিরকালের জন্য কুমার অভিজিৎ সাধারণ মানুষের প্রাণে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে অধিষ্ঠিত হলেন।

শেকসপিয়রের জগৎ বিখ্যাত 'হ্যামলেট' নাটকে হ্যামলেটের স্বগতোক্তির অংশ উদ্ধৃত হলো- মৃত্যু মানে সেই দেশ, যেই দেশ থেকে কখনও ফেরে না কেউ- কোনো যাত্রী। আর সেই ভয়ে সংকল্প আছাড় খায়, মনে হয় অজানার চেয়ে জানা যে কষ্টের চিত্র, সেখানেই আঁকা থাকা ভালো। অতএব, জন্ম নেয় একেকটি কাপুরুষ এই আমাদেরই প্রত্যকের ভেতরে।

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির- মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আমাদের ভেতরে এই সংগ্রামের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আমরা হাতেগোনা কয়েকজন ঋত্বিক পুরুষকে পেয়েছি। যারা সমগ্র পৃথিবীকে অভয় মন্ত্র শুনিয়েছেন। তাদের অন্যতম প্রধান পুরুষ হলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার মানুষ তাকে মারতে পারে না, এই বিশ্বাস তার ছিল এবং তাকে সত্যিকার অর্থে মারতে পারেনি। যত দিন যাচ্ছে, ততই এই ভয়শূন্য মৃত্যুঞ্জয়ী পুরুষ শক্তিশালী হচ্ছেন এবং বাঙালির হৃদয়ে চির আসন লাভ করেছেন। উনিই আমাদের কাছে 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্যর সবচেয়ে অগ্রণী প্রতিভূ।

লেখক



নাট্যকার

প্রাবন্ধিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : যেভাবে তুমি যুগে যুগে

শাহবাগে পুলিশের গুলিতে ২ ছিনতাইকারী আহত

শাহবাগে পুলিশের গুলিতে ২ ছিনতাইকারী আহত

রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের গুলিতে বিল্লাল হোসেন কবির ও সালমান নামে ...

নির্বিকার মুখোশধারী হয়ে পড়ছি আমরা

নির্বিকার মুখোশধারী হয়ে পড়ছি আমরা

এখন ছবি তোলা কোনো ব্যাপার? 'ক্যামেরা উইথ বিউটি অ্যাপ' সবার ...

নরসিংদীতে দুই ভাইয়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার

নরসিংদীতে দুই ভাইয়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার

নরসিংদীতে একটি বিল থেকে দুই ভাইয়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা ...

আইনজীবী বাবু সোনা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ

আইনজীবী বাবু সোনা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ

রংপুরে বিশেষ জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক ...

ঢাকা রওনা দিয়েছেন সাকিব

ঢাকা রওনা দিয়েছেন সাকিব

বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে চোটের কারণে পাকিস্তানের বিপক্ষে বুধবার খেলতে ...

কোটা বাতিলের প্রস্তাব যাচ্ছে মন্ত্রিসভায়

কোটা বাতিলের প্রস্তাব যাচ্ছে মন্ত্রিসভায়

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে মেধার ...

নিরাপদ ডিজিটাল বিশ্ব গড়তে জাতিসংঘের ভূমিকা চান প্রধানমন্ত্রী

নিরাপদ ডিজিটাল বিশ্ব গড়তে জাতিসংঘের ভূমিকা চান প্রধানমন্ত্রী

নিরাপদ ডিজিটাল বিশ্ব গড়তে জাতিসংঘকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে ...

এফডিসিতে ডিরক্টরস গিল্ডের নির্বাচন

এফডিসিতে ডিরক্টরস গিল্ডের নির্বাচন

২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্টিত হবে নাট্য-নির্মাতাদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ডের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন। ...