আকিমুন রহমান

যেভাবে তুমি যুগে যুগে

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

এই লেখাটা আমি আপনার জন্য লিখছি, আইঞ্জা মামা!

রতন মামা, এই লেখাটা আমি আপনার জন্যও লিখছি!

আর লিখছি আপনার জন্য, মরি- মরিয়ম খালা!

সেই কোন আগেকার কালে, সামান্য এই গৃহ-সংসারে ছিলেন আপনারা! মাটির সংসারের পোলা-মাইয়া! মুরব্বিদের কত রকমে তা-পোড়া,তা-পোড়া করেছেন!

সেই জ্বালা-যাতনা সহ্য করতে না পেরে, ঘরের লোকেরা নিজের কপালেরে দুষেছে! তাতে শান্তি পায় নাই তাদের অন্তর! তাই, ফাতফাতাতে থাকা পরানরে ঠাণ্ডা করার জন্য গালিগালাজের তুফানও তুলতে হয়েছে তাদের!

এমন ঘাড়তেরা, ঘাউরা পোলাপান ক্যান দিলো খোদায়!

এমন নাদান পোলাপান পাওয়ার কষ্টে তাদের কত আফসোস! কত শরম পাওয়া!

তারপর একদিন সবকিছু কেমন বদলে যায়! মুরব্বিরা দেখতে পায়, বেত্তমিজগুলার ভেতরে কেমন সোনার টুকরা মানুষ বসত করছে! আহা! এতদিন তো এইটা বোঝা যায় নাই!

'কী খোশনসিব! এই সোনার চান বেত্তমিজেরা তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছে! আর আপৎকালে বাপ-মায়ের কেমন বল-ভরসা, শক্তি-সাহস হয়ে উঠেছে এরা সব কয়জন! খোদার কী মেহেরবানি!' এইসব কথা মুরব্বিজনের মনের মধ্যে উঠতে-নামতে থাকে, আর ক্ষণে ক্ষণে তাদের বুকের ভেতরে সুখের ঝাপটা পড়তে থাকে!

যে কোনো ছুতায় অই পোলাপানগুলারে জাবড়ে ধরার জন্য মুরব্বিজনের মন ছটফটাতে থাকে! তার বাদে অকারণে তাদের চক্ষে কেন জানি পানি আসতে থাকে! তারপর সেই পানি আর চক্ষে থাকতে চায় না! মাটির দুনিয়া ভিজায়ে দিতে চাইতে থাকে!

কী এমন ঘটেছিল যে, হঠাৎ ময়মুরব্বিরা আপনাদের নিয়ে অমন গৌরবে ভরে উঠছিল? আইঞ্জা মামা, কী ঘটিয়েছিলেন আপনারা?

দুই

সেই কবে এসেছিল ১৯৬০ সাল!

সেই কালের নারায়ণগঞ্জ নামের এক গঞ্জে ভীষণ সাদাসিধে আর ছোট একটা গ্রাম ছিল। একদম গোড়া থেকেই গ্রামের বেশির ভাগ গৃহস্থ ছিল হিন্দু! তাদের সঙ্গে সেই গ্রামে অল্প কয় ঘর মুসলমান গৃহস্থও বসত করত!

১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে, হিন্দু-গৃহস্থদের অনেকে বাপ-পিতামহের ভিটির মায়া ত্যাগ করতে পেরেছে কোনোরকমে! তারা দেশ ছেড়েছে! তবে অনেক গৃহস্থ সেই মায়া কিছুতেই কাটাতে পারে নাই!

বুকের ভেতরে কীরকম অচিন একটা ভয়ের ঢিবিঢিবি নিয়েও, তারা পূর্বপুরুষের ভিটিতেই বসত করে চলছে তখন; সেই ১৯৬০ সালে!

তাদের মনের মধ্যে ভয় থাকলে কি, অড়শি-পড়শি যেই কয় ঘর মুসলমান আছে; তাদের মুরব্বিজনেরা সাহস দিতে কিছু কম দেয় নাই! সাহস হয়ে, শক্তি হয়ে তারাই পাশে থাকছে তখন!

তারা পরিস্কার গলায় বলেছে, নিজেদের জান থাকতে তারা এই চিরদিনের বান্ধব হিন্দু পড়শিদের বিপদ হতে দেবে না! হিন্দু ভাইবেরাদর কিংবা মা-বইন যারা আছে- তাদের শরীরে আঁচড়খানও পড়তে দেবে না তারা!

জানের বিপদ তো আটকাবেই, সেইসঙ্গে মাল-সম্পদের ভালা-বুরাও দেখে রাখবে! তাইলে, ডর কী!

কোন দুঃখে তাইলে তারা চৌদ্দগুষ্টির ভিটি ছাইড়া রিফুজি হইতে যাইব, হিন্দুস্থানে? কতকাল ধইরা এক লগে এক পাড়ায় আছে এই হিন্দু-মুসলমানেরা! কোনোদিন কেউ কাউরে বেইজ্জত করছে? না, কেউ কারো অহিত ঘটাইছে? মামুলি কাইজ্জা-ঝগড়া হইছে,আবার মিলমিশও হইয়া গেছে! তাইলে, এমুন চিন-পরিচয়ের বান্ধবগো ছাইড়া,অচিন মুল্লুকে ক্যান পাও বাড়াইব তারা?

এই ময়মুরুব্বিদের কথারে খুব ভরসা করা যায়! কারণ, কোনোদিন কোনো বিষয়েই এদের কখনো বেফজুল কোনো কথা বলতে দেখা যায় নাই। ফালতু কথা বলতে জানে না এই মুরব্বিরা! যা বলে, তা করতে পারবে জেনেই বলে!

কিন্তু তাও যেন ভয়টা ঘোচে না হরিনাথ, বংশীমালীর!

কোন সময় না আবার গঞ্জের গুণ্ডারা এসে আচমকা হানা দেয়, এই আশঙ্কাটা তো থাকেই তাদের মনে। সেইসঙ্গে থাকে অন্য আরেকটা চিন্তা আর আশঙ্কা!

কোন বিষয়ে?

মুসলমান প্রতিবেশীদের সাংসারিক এক নীরব জ্বালা-যাতনা বিষয়ে!

পাড়ার মুসলমান প্রতিবেশী প্রায় সকলের ঘরেই, একরকমের একটা অশান্তির আগুন, ধিকিধিকি জ্বলেই চলছে অনেকদিন ধরে!

কী সেই অশান্তি?

না, প্রায় প্রতি বাড়িতেই পোলাগুলা দিনে দিনে জোয়ান হয়ে উঠছে, কিন্তু কী কপাল! যত না তারা জোয়ান হচ্ছে, তত যেন অলক্ষ্মীর অলক্ষ্মী হয়ে উঠছে একেকজন!

কোনো কাজে মন নাই কোনোজনের! একজনকেও কোনো একটা কর্ম করতে পাঠানো যায় না! তারা খালি থাকে বাবুগিরিতে, আর খালি থাকে যাত্রার নেশায়! নাইলে থাকে বায়োস্কোপে যাওয়ার ধান্দায়!

'যা বায়োস্কোপে- তরে যহন বায়োস্কোপের নিশায় ধরছে! যা তুই পোলা যত ইচ্ছা! তয়,কামাই-রুজি কইরা তো যাবি, নাকি? নাইলে বায়োস্কোপে যাওনের টেকাটা তুই জুটাবি কইত্তেনে?' মা-চাচি বা বাপ-চাচারা ঠারেঠোরে কতভাবে কথাগুলা বলে; কিন্তু পোলারা কানেও তোলে না কথাখান!

না, তারা কোনোজনই কোনো প্রকার কর্মে লাগতে রাজি না! তারা কেবল বাপের কামাই খাইতে রাজি!

গঞ্জে কত আড়তে কত রকমের কর্ম করার সুযোগ আছে! নাইলে র‌্যালি ব্রাদার্সেও তো কর্মের ব্যবস্থা করা যায়! সেই সবের কোনো দিকেই কোনোজন যায় না! বিদ্যাশিক্ষা করার দিকেও নেওয়ানো গেল না কোনোটারে! কেউ কেউ কোনোরকমে পড়তে পারে। কোনোজন একেবারে বকলম! এগো উপায় কী! এগো দিন যাইব কান প্রকারে!

তাইলে না হয় নিজেদের চাষাবাদ দেখাশোনা কর! বাপেরা এদিকে ক্রমে কাহিল বুড়া হয়ে উঠছে! সেই বাপের পাশে খাড়া হয়ে জোয়ান পুতে তো নিজেদের ক্ষেতি-খোলার আবাদকর্ম দেখভাল করতে পারে?

পারে; কিন্তু কোনোজনই সেটা করতে যায় না!

কেবল তারা করে কি,বায়োস্কোপ নাইলে যাত্রা দেইখ্যা, দুপুর রাইতে বাড়িতে ফিরে! আর বেলা বারোটা পর্যন্ত নিদ্রা যায়! এমুন আইলসা, কুঁইড়া পোলা দিয়া বাপ-মায়ে কী করব!

সেই পোলারা আরো কী কী ফুটানি যে করে!

তারা মাথার চুল আঁচড়ায় বড় আজব রকমে! বাপ-চাচাগো মতন টেরি কাটে না। বরং সাপটে উল্টানি দিয়া রাখে! তার বাদে বিকাল করে এই বাড়ি সেই বাড়ি গিয়া গিয়া, আবিয়াত মাইয়াগুলার লগে, হাসিঠাট্টা করে!

আর নাইলে ঘরে ঘরে কি ভাউজেরা মইরা গেছে? যায় নাই! তাগো লগে মশকারি করার সীমা রাখে না!

পোলাগুলা নিজেরা এমন অকর্মা হইছে তো হইছে, তার সাথে সাথে নিজেদের আবিয়াত বোন- ভাগ্নিগুলারেও বেশরমের বেশরম বানানোর তালে আছে! সেগুলারেও মাঝেসাঝে বায়োস্কোপে নিয়া গিয়া শরম-হায়া ভুলতে শিখাইতাছে! হায় হায়! এই মেয়েগুলারে এখন পরের ঘরে পার করাও তো বিষম মুশকিলের বিষয় হয়ে দাঁড়াইছে! এমন বেহায়া ছেড়িগো কে কার সংসারে নিয়া বিপদে পড়ব?

পাড়ায় এমন বেলেহাজ মেয়েকয়টার সর্দার বলতে হয় মরি-রে! তার পুরা নাম মরিয়ম! কিন্তু লোকে অত বড় নাম কতবার বলবে? সেই কারণে লোকে ডাকে মরি! সেই মরি দিনরাত বায়োস্কোপের গীত গায়, আর রুমালে সিলি দেয়!

আচ্ছা সিলি দেও ভালো কথা, সেইটার লগে লগে তোমারে চুলার পাড়েও তো গিয়া বওনের কাম করতে হইবো? তাই না? রান্ধন-বাড়ন না করলে কিয়ের মাইয়া জনম তোমার?

কিন্তু সেই ছেড়ি এইসব কথা কানেও তোলে না! তার দেখাদেখি অন্য কয়জনও একই কীর্তি করা ধরছে!

হায় হায় হায়! দেশে তো ঘোর কলি আইয়া পড়ছে! বুড়া মুরব্বিরা খাইট্টা মরে, আর জুয়ান পোলামাইয়ায় কি-না গীত গাইয়া বেড়ায়! আগে তো সংসারে এমুন কারবার দেখা যায় নাই! কোন পাপে পোলামাইয়াগুলি এমুন নষ্ট-বজ্জাত হইয়া গেল!

এমন মনঃকষ্ট নিয়ে মুসলমান বাড়ির মুরব্বিরা নিজেরাই বলে জারেজার! তারা তাদের হিন্দু পড়শিদের বালামুসিবতের কথা কতক্ষণ স্মরণে রাখবে?

আচ্ছা, দেশ নাইলে ভাঙছে! তছনছ না হয় হয়ে গেছে নিয়ম-সংসার, শান্তি-বিশ্বাস ! কত কত ভিটায় সন্ধ্যাবাতি জ্বলা বন্ধ হয়ে গেছে- এই তো চিরতরেই!

আচ্ছা, হইছে সেইসব! তাও মানা গেছে! কিন্তু আর কত পেরেশানিতে থাকবে সংসারের মানুষ! আর কত! আর কত ডরে ডরে থাকব এই হিন্দুজনেরা?

খালি ডর খালি ডর! এই না রায়ট লাগে আবার! না জানি কী হয়! না জানি নয়া কোন বিপদ ঘনায়!

নিজেদের ঘরের জোয়ান পোলাগুলারে মুসলমান বাড়ির মুরব্বিরা ডাকতে থাকে; 'আয় রে তরা! অগো গিয়া বল-ভরসাখান দে! খালি বুড়ারা গিয়া ভরসা দিলেই কি ভরসা পায় মানুষগিলি? জুয়ান পোলাটির কি উচিত না, গিয়া অগো অভয় দেওয়া?'

বাপে-মায়ে নিজেদের পোলা আইঞ্জারে এইমতে বোঝায়। রতনরে তার মায়ে-বাপে সোনাধন করে। অন্য যারা যারা আছে, তারাও এমন কত মিনতি পেতে থাকে তাদের মুরব্বিদের কাছ থেকে!

জোয়ান পোলাগুলি সেইসব কথা শোনে, কিন্তু কোনো জবাব দেয় না! একটুক্ষণ যেন একটু স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখা যায় একেকজনকে ; কিন্তু কোনোটায়ই কোনো হিন্দু পড়শিরে ভরসা দিতে যায় না! উল্টা একেকজন আগের চেয়ে জোরে জোরে শিস বাজাতে বাজাতে গঞ্জের দিকে হেঁটে যেতে থাকে!

মুরব্বিরা আফসোসে গুঁড়াগুঁড়া হয়ে যেতে থাকে! 'আহারে! কলিকালের পোলাপানগুলার দিলে আল্লায় দরদ-রহম দেয় নাই! নাইলে, এই যে লগের ভাইবেরাদরেরা এমুন বিপদে কাঁপতাছে, তাগো কাছে গিয়া বওনের তাগাদাটা পর্যন্ত আসে না এইগুলার চিত্তে! এমুন অমানুষ কেমনে হইলো এরা! অগো এই বাপ-দাদারা তো এমুন নিদয়া না!'

'তাইলে আর কী! এখন তাইলে আল্লা ভরসা! এখন নিজেদের এই কাহিল হাত দুইটা দিয়াই রক্ষা করতে যাইতে হইব! নিজেগো লগের এই হিন্দু ভাই-বইনটিরে এই বুড়ারাই যেমনে পারে, দেইক্ষা রাখব! তয় মনে হয়, আর কোনো বিপদ আইব না! আল্লায় রেহাই দিছে!'

নিজেদের এইমতে তারা বুঝ দিতে শুরু করেছে মাত্র, অমন সময়ে কি-না সেই সর্বনাশা ঘটনাটা ঘটে!

সেইদিন সকালে আকাশভরা খটখটা রোদ! সেই রোদের নিচে আচমকা দেখা যায়, মাথায় লাল ফেটি বাঁধা কারা যেন হাইধাই করে ছুটে আসছে! ছুটে আসছে এই ছোটমোট গাঁওটার দিকে! তাদের হাতে লম্বা লম্বা দা!

রাম দাও হাতে তারা ছুটে আসতে থাকে! কারো কারো হাতে থাকে কেরোসিনভর্তি টিন! কেরোসিন ছিটিয়ে ঘরে আগুন ধরানো বড় সহজ তো! মুখে তাদের হুঙ্কার উঠতে থাকে বিরামহীন!

যারা চৌদ্দ পুরুষের ভিটির মায়া ছাড়তে না পেরে, মাটি কামড়ে পড়ে ছিল; তারা বুঝে যায়- এই যাত্রা আর তাদের রক্ষা নাই! যারা অভয় দিয়েছিল, তারা আগলে আছে ঠিকই!

কিন্তু আহারে! তারা যে কমজোর কয়জন বুড়ালোক! তাদের দিল দরদে বোঝাই, কিন্তু হাতেরথে যে সেই দুষমনদের ঘায়েল করার শক্তিটা নাই! আহারে!

তাও সেই অশক্ত বুড়ারা হাল ছাড়ে না! তারা তাদের কাঁপতে থাকা শরীর দিয়ে হিন্দু ভাইবোনগুলারে চারপাশ দিয়ে ঘিরে নেয়! আর বলতে থাকে, 'বাঁচাইতে যদি না-ই পারি- তাইলে একলগে মরতে তো পারমু! একলগে মরমু আমরা!'

মৃত্যুর জন্য তারা অনেক অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে; কিন্তু কেন যেন রাম দা হাতের সেই রাক্ষসগুলা তাদের কাছে এসে পৌঁছায় না! কিছুতেই পৌঁছায় না!

কী ঘটনা? আসে না কেন ওরা? ওদের তেড়ে আসার আওয়াজও যেন শোনা যায় না আর! কী ঘটনা?

বয়স্করা কেউ কেউ বিষয়টা পরিস্কার করে বুঝে ওঠার জন্য এগোয়!

কী ঘটনা?

ঘটনা এই যে, গ্রামের সেই আইলসা, কুঁইড়া পোলাগুলি নিজেদের ছোট গ্রামটাকে ঘেরাও দিয়ে আছে! যে যা হাতের সামনে পেয়েছে, সে কি-না তাই হাতে নিয়ে এসে খাড়া হয়েছে! কারো হাতে ট্যাঁটা আছে, কারো হাতে বঁটি! কেউ শাবল নিয়ে দাঁড়ায়ে গেছে, কারো হাতে কেবল এক টুকরা বাঁশ!

আর কী আশ্চর্য! তাদের পেছনে একই রকম তেজ নিয়ে দাঁড়ানো আছে সেই বেশরম হয়ে যাওয়া মেয়েগুলা! তাদের কঠিন হাতে একটা করে বঁটি ধরা!

'আল্লা! কী তোমার মেহেরবানি খোদা!' মায়েরা কেঁদে ওঠে! বাবারা কান্না লুকাতে লুকাতে কোনো রকমে জিজ্ঞেস করে, 'এই নি তগো মোনে আছিলো?'

'থাকব না ক্যান?' পোলাগুলা বলে! 'তোমারা চিরকাল লাউপাতা বিলাইয়া গেলা! চিরটা কাল মানুষ থাকলা তোমরা! দয়া-রহমঅলা সেই তোমাগো ঘরে আমাইনষের ছাও কেমনে জন্মাইবো?'

তিন

নিজেদের ময়মুরব্বির চক্ষে গৌরবের সেই কান্দন জাগায়ে দিয়ে, ক্রমে বয়স্ক হয়েছেন আপনারা সকলে, রতন মামা! তারপর একদিন চলে গেছেন মাটির গৃহস্থালি ছেড়ে, ক্রমে ক্রমে!

তার আগে, আপনাদের ঘরে-সংসারে অন্য নতুনেরা এসেছে! অন্য নাম তাদের! কারো নাম মন্টু। কোনোজনের নাম খায়ের, বা মনসুর বা রাজু বা ডেইজি বা রুহী!

তারা যেই একটু মাথা উঁচিয়েছে, তখন পরিস্কার বোঝা গেছে যে, তারা যেন তেমন সুবিধার পোলাপান না! এরা- এই নতুনেরা- যেন ঠিক আপনাদের মতোই বেয়াদ্দব!

না না! যেন বা তারা আপনাদের মতো বেয়াদ্দবও নয়! আরো যেন বেশি তারা! আরো বেশি যেন স্বার্থপর! আরো বেশি যেন বেত্তমিজ! মুরব্বিদের কথা কানে না তোলার জন্য তারা যেন সদাসর্বদা এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকা ছেলেমেয়ে সব!

এত যে সব সুশিক্ষা দিতে থাকেন তাদের, সুকথা শোনাতে থাকেন তাদের, বারে বারে শোনাতে থাকেন; সেগুলো তারা শুনতে পায়?

তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, কিছুই শুনতে পায় না তারা কোনোজন! কোনো লাজ-লজ্জার ধার ধারে না! কী দয়ামায়াশূন্য এইসব ছেলেপেলে! এরা তো তাইলে সত্যিকারের মানুষ হবে না! সেটা হওয়ার কোনো লক্ষণই তো নাই এদের মধ্যে! নাইই তো!

এইগুলা কী রকমের বাচ্চা জন্ম নিলো, সংসারে! নিজের খেয়াল মিটান্তি ছাড়া দেখি এরা আর কিচ্ছুর তোয়াক্কা করে না! কোনো সুকথা কানে তোলে না! কোনো সুপরামর্শরে গ্রাহ্য মাত্র করে না! ইয়া আল্লা! বাপ-মায়ের কষ্টের দিকে তো দেখি ফিরেও চায় না এরা!

এরা হবে মুরব্বিজনের শেষকালের নিদান?

মনে তো হয় না! উঁহু!

এইসব কথা বারে বারে তখন আপনাদের মনে আসতে থাকে, আইঞ্জা মামা!

ঠিক অনুমান করতে পারি রতন মামা, আপনার মনেও একদম অবিকল এই একই আফসোসেরই ভয়ঙ্কর আনা-যানা শুরু হয়েছিল!

নির্ঘাত একই রকম হায়-হুতাশে আপনিও ছিলেন তখন মরি খালা!

যারা তাদের খামখেয়ালিপনা দিয়ে দিয়ে আপনাদের শরীর ও মন অনেক অনেক বিষাক্ত করে তুলছিল, অনেক অনেক অনেক বিষ-জর্জর করে তুলেছিল; তারপর একদিন দেখা গেল আপনাদের বিষ-জর্জর করে দিতে দিতে তারা আসলে নিজেদের গড়ে তুলছিল! নীরবে-গোপনে তারা আসলে নিজেদের তৈরি করে তুলছিল, আপনাদের আগলে রাখার জন্য!

কখন? মনে আছে সেটা? মনে আছে?

সেই ১৯৭১ সালে!

ঠিক একদিন আপনারা যেমন করে আপনাদের পিতৃপুরুষকে আগলে রাখার জন্য কঠিন পায়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন, অবিকল তেমন করেই! কিচ্ছু সম্বল ছিল না তাদের! শুধু সাহসটুকু ছাড়া! প্রচণ্ড ভালোবাসাটুকু ছাড়া আর কী ছিল তাদের বলুন?

অই দিয়ে অসাধ্য সাধন যে করা যায়, ওরা তা দেখিয়েছে!

তখন আপনাদের অন্তরাত্মা জুড়িয়ে গিয়েছিল তো? ঠিক যেমন করে আপনাদের পূর্বপুরুষের প্রাণ জুড়িয়েছিল; তেমন করেই তো, তাই না আইঞ্জা মামা?

ঠিক বুঝতে পারি, অবিকল একইরকম গৌরব আর সুখের অশ্রু মুড়িয়ে নিয়েছিল আপনাদেরও, রতন মামা!

এই লেখাটা আমি সেই বেয়াদব আর গুরুজনদের কথা মান্য-না-করা ছেলেপিলেদের জন্য লিখছি! লিখছি তোর জন্য মনসুর ভাই! তোর জন্য লিখছি রাজু! লিখছি ডেইজির জন্য! তোর জন্যও এই লেখাটা, রুহী!



চার

রুহীদের ঘরে-সংসারে তারপর নতুন কালের অন্য নতুনেরা এসে যায় ! নতুন রুহী বা ডেইজি আসে! তার নাম এখন নাবিলা বা চৈতী বা বৃষ্টি!

নতুন রাজু বা মনসুর বা নাসির এসে যায় নতুন চেহারায়! তাকে এখন সাগর বলে ডাকে সকলে! বা ডাকে হিশাম নামে, বা সেলিম বা নোমান বা সৌরভ অথবা জয়ন্ত!

তারা কি সুবোধ পুত্র-কন্যাসকল?

হায়! সুবোধ বলা যায় তাদের, কিন্তু এরা এইটা কেমন সুবোধ? নড়ে না চড়ে না, কেবল ফোন টেপে! নাইলে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে!

না না! তারা আগের কারো মতো না! এরা বড় অদ্ভুত এক গোত্র!

শিশুবেলায় আর কিশোরকালে খালি কোচিং সেন্টারে যায় তারা! এক কোচিং সেন্টার থেকে আরেক কোচিং সেন্টার। পুরো দিন এইভাবে কাটে!

যারা একটু ডাঙ্গর, তাদের কানে কানে দড়ি ঝোলে। কী শোনে তারা কে জানে! যে-কোনো ছুতায় মোবাইল ফোনের স্ট্ক্রিনে ঝুঁকে আসে তাদের চোখ! সমস্তটা দিন, প্রায় পুরোটা রাত- অই নিয়েই থাকে যেন তারা!

আর কি কিছু করে? আর তো কিছু করে বলে নজরে আসে না! বেহদ্দ সেলফ-সেন্টারড ছাড়া আর তো কিছু মনে হয় না এদের!

'কী সর্বনাশ!' বয়স্করা ফিসফিসাতে থাকে নতুন রকমে!' ঘরে ঘরে তো মানুষের আকারে সব ফার্মের মুরগি জন্মে আছে! হায় হায়! জাতির ভবিষ্যৎ তো পুরা অন্ধকার!'

এইসব কথা এই নতুন কালের বাচ্চাকাচ্চাদের কানে আসে বটে, বাট তারা এইসবকে কেয়ার করে না! এত কেয়ার করার কী আছে! ইউসলেস কথাবার্তা সব!

ওয়ারল্ডে কেয়ার করার ম্যাটার কম আছে নাকি! ওফ! নেটে কত কত গেম! সেগুলা কী চারমিং! তার পাশে ওই যে নদীফদি এইসব দাঁড়ায়?

কোনো এক সময় নদীর কথা শোনে বটে তারা, ফেসবুকে দেখেও বটে কত কত নদীর ছবি! কিন্তু আদত নদী যে আসলে কেমন- তাকিয়ে দেখার টাইম পায় না তারা!

এই দেশ নদীমাতৃক নাকি! গস! ওয়ার্ডটা কী জোশ! মিনিংটা জানি কী?

ন্যাশনাল এন্থেমরে রেসপেক্ট করে তারা, বাট এইটা দিয়া কী হবে ? উফ! এইটা মুখস্থ করতে গিয়া মেজাজ গরম হইয়া যাইতে থাকে! জীবনটা তেজপাতা হইয়া যাইতে থাকে, অইটা পড়তে গিয়া!

হায় হায়! এদের দিয়ে দেশের কোনো উপকার হবে না! এরা নিজেরটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু নিয়ে ভাবনা করার শক্তি রাখে না! নিজের সুবিধাটুকু ছাড়া অন্য কিচ্ছু বোঝে না- এমন এক সর্বনাশা প্রজাতি এরা! এদের- এদের মধ্যে মনুষ্যত্বের আলো ঢোকাবার উদ্যোগ নিতে হবে! পরিবারগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে শক্ত পায়ে! নয়তো দেশের ভবিষ্যৎ বলে কিচ্ছু থাকবে না! সর্বনাশ!

আমরা মাঝবয়সীরা এমন আহাজারিতে আহাজারিতে যখন নিজেদের ছিন্নভিন্ন করে করে একধরনের সুখ পাচ্ছি, নিষ্ফ্ক্রিয় বিলাপের সুখ; তখন আমাদের আধবোজা চোখের সামনে এ কেমন আলো ঝলকে উঠছে আজ, অকস্মাৎ?

কেমন আলো এটা? কে সৃজন করল আচমকা একে? কে?

একে সৃজন করছে আমার কন্যা, আমার পুত্র, আমার ছাত্র!

যাকে আমি আর আমরা- খুব গোপনে- পরিহাস করে এসেছি, অশ্রদ্ধা করেছি, অবজ্ঞা করেছি; সে আজ আমাদের মতন আধা অন্ধদের সামনে জাগাচ্ছে নতুন দিন! আনছে পরিস্কার রকমে দেখতে পাবার আলো!

তুমি আছ বাবা! ভয় কী!

তুমি আছ মা! সাহস পাচ্ছি আজ!

এই যে লেখাটা, এটা আমি তোমার জন্য লিখছি নাবিলা!

লিখছি তোমার জন্য, সাগর!

তোমার জন্য নোমান!

তোমার জন্য আমার এই লেখা, হিশাম!

তোমার জন্য সেলিম!

আর তোমার জন্য, প্রিয় জয়ন্ত!

লেখক



কথাসাহিত্যিক

প্রাবন্ধিক
শ্রীনগরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত

শ্রীনগরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবক নিহত

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মো. তাজেল (৩৫) নামে এক ...

খাঁটি দুধ চেনার ঘরোয়া উপায়

খাঁটি দুধ চেনার ঘরোয়া উপায়

ভেজাল দুধের ভিড়ে খাঁটি দুধ চেনা যেন দুষ্কর। কোথাও দুধে ...

নেইমারের গোলে উরুগুয়েকে হারাল ব্রাজিল

নেইমারের গোলে উরুগুয়েকে হারাল ব্রাজিল

ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে পেনাল্টি। না হলে আসল ব্যবধান ব্রাজিলের ...

মেক্সিকোর বিপক্ষে সহজ জয় আর্জেন্টিনার

মেক্সিকোর বিপক্ষে সহজ জয় আর্জেন্টিনার

ম্যাচের তখন দুই মিনিট। বার কাঁপানো এক শট নেয় মেক্সিকো। ...

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীক ছেড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা ...

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

রংপুর বিভাগের ১১ আসনে আ'লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ...

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

চট্টগ্রামে জাপা শরিকদের স্বপ্নভঙ্গ

বিএনপি ভোটে না এলে ১০০ আসন ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ- ...

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

ভোটের মাঠে একঝাঁক তারকা

বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নতুন নয়। বিশেষত উপমহাদেশে এই ...