ফারুক আলমগীর

দর্শককেও তৈরি হতে হবে

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

প্রতিটি স্পর্শকাতর ব্যক্তিসত্তা যেমন তুষ্ট নন তার অনুভবের জগৎ নিয়ে, কেন তিনি এমনটি অনুভব করেছেন সতত এই জিজ্ঞাসা তাকে আলোড়িত করে; তেমনি টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে মানব-সংযোগের ক্ষেত্রে নন্দন-তাত্ত্বিক সচেতনতার মিতি একজন যোগসূত্র-রচকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু মূল্যবান অভিজ্ঞতাকে চিহ্নিত করবেন না; অন্যের কাছে তা আরো সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রচার করবেন। একজন দর্শককেও বিভিন্ন পর্যায়ের মনন ও অনুভূতি-সমৃদ্ধ টেলিভিশন যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করতে হবে। এত করে টেলিভিশনের প্রতি কাণ্ডহীন মন্তব্য হ্রাস পাবে এবং টেলিভিশন-অনুষ্ঠান দেখে স্পর্শকাতর হবেন না; আসলে [গবফরধ অবংঃযবঃরপং] বা যোগাযোগের মাধ্যম নন্দনতত্ত্বে আমাদের প্রত্যেকের অনুভূত-স্বাক্ষরতা রুচিবোধ এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত হওয়া উচিত, যে অবস্থান থেকে আমরা একটি চিত্রকলা, একটি নির্মল চলচ্চিত্র এবং একটি টেলিভিশন-অনুষ্ঠান অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে বিচার ও আত্মস্থ করতে পারঙ্গম হতে পারি। নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় অভিধা-সমৃদ্ধ একজন যোগাযোগ রচক [ঈড়সসঁহরপধঃড়ৎ] রুচি কাণ্ডজ্ঞানহীনতার মন্তরে নিজস্ব দায়িত্ব যেমন এড়াতে পারবেন না, একজন দর্শকও এ অবিবেচক মন্তব্য করতে সাহসী হবেন না। জীবনধারণ বা বাঁচার জন্যে বললে অত্যুক্তি হবে, ব্যক্তিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ববহ ও কার্যকর মাধ্যমরূপে নন্দনতত্ত্বে ব্যাপক প্রসার অপরিহার্য।

বর্তমানের শ্রুতিলোকন মাধ্যম আগামী দিনের বহুমুখী তথ্য-প্রবাহের সূচক মাত্র

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত 'টেলিভিশন; চলমান দৃশ্যও ধ্বনির লাবণ্য' গ্রন্থে লিখেছিলাম আগামী ৩০ বছরে টেলিভিশনের উত্তরণ কোথায়? অভাবিত উত্তরণ ঘটতে পারে। মার্কিন গবেষকদের মতে, টেলিভিশন দ্বিমুখী যোগাযোগ মাধ্যমে পরিণত; একতরফা বিনোদনের বদলে দর্শকদের সরাসরি গৃহ থেকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা তথ্য-সংবাদ প্রবাহ ও শিক্ষামূলক ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করবে। তাদের মতে এই সময় পেনসিলভানিয়ার একটি গৃহে হয়তো বয়োবৃদ্ধ একদল দর্শক শুধু নিরুত্তর দর্শকের মতো টিভি দর্শন করবে না বরং তারা কোনো একটি ঘটনার বিশদ জানার জন্য সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজস্ব টিভি গ্রাহকযন্ত্রের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেবে।

নিজস্ব গ্রাহকযন্ত্রে না হোক বর্তমানে ঘরে বসে টেলিফোনে সরাসরি প্রশ্ন করে দর্শক তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর জেনে নিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে টেলিভিশন এখন দ্বিমুখী যোগাযোগ মাধ্যমরূপে পরিণত হয়েছে টেলিফোনে আরব্ধ ব্যক্তির সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে।

কল্মবিয়ার হয়তো ৫ হাজার টেলিভিশন ক্যাবল সার্ভিসের গ্রাহকরা একটি কম্পিউটারে সংযুক্ত হবেন যার ফলে তারা যে অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহী সেসব অনুষ্ঠান দেখবেন ও যার জন্য অর্থ দেবেন। কেউ হয়তো স্বইচ্ছায় পেশাগত কুস্তি প্রতিযোগিতা দেখতে চাইবেন, অন্য কেউ এ সময় ইঙ্গমার বেয়ারিম্যানের 'ওয়াইল্ড স্ট্রবেরি'র মতো ধ্রুপদ চলচ্চিত্র দেখবেন।

সুতরাং এখন আগামী তিরিশ, চল্লিশ বছরের টেলিভিশনের সঙ্গে সর্বোত প্রযুক্তি নির্ভর আগামী পৃথিবীর কথা চিন্তা করাই সঙ্গত হবে। কী রূপ ধারণ করবে বর্তমান শতকের পৃথিবী?

বিটিভির এককালীন মেধাবী প্রযোজক ও পরবর্তীতে ঢাকা কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার আলী ইমাম ১৯৯৪ সালের দিকে একবার শ্রীলংকায় একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।

যেহেতু ক্লার্ক ইতোপূর্বে ২০৩০ সালে মানুষ কৃত্রিম জীবন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে বলে উল্লেখ করেছিলেন, সেহেতু আলী ইমাম ঐ সময়ে এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন এই কৃত্রিম জীবন বলতে তিনি মানুষের কথা বোঝাচ্ছেন কি-না!

ক্লার্ক বলেছিলেন, 'কৃত্রিম জীবন যদি বলা হয়, সেটা তা তৈরি হয়ে গেছেই। প্রাণকোষের সবচাইতে বড় লক্ষণ সে নিজে থেকে বিভাজিত হতে পারে। মানে জৈবিক পদ্ধতিতে একটি কোষ থেকে বহু কোষের জন্ম। আমরা ডিএনএ তৈরি করেছি। ডিএনএ অবশ্য কোষ নয়, তবে কোষ তৈরির প্রাথমিক অংশ অনু। এই অনু নিজেরা বিভাজিত হয়। এই অর্থে জীবন সৃষ্টির প্রাথমিক কাজটি আমরা করে ফেলেছি। এরপর কী হয়, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।'

ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান অনেক কিছুই করবে যা আজকের দিনের চিন্তা-ভাবনায় অবিশ্বাস্য। এ কথায় আস্থাশীল বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক হিসেবে ক্লার্ক মনে করেন মানুষকে বাদ দিয়ে সায়েন্স ফিকশন হতে পারে না। বিজ্ঞানের যা কিছু উত্তরণ তার সমস্তই ঘটেছে মানুষের হাতে। সায়েন্স ফিকশনের অতিরিক্ত দায়িত্ব ওই সমস্ত ঘটনার সারমর্ম উদ্ধার করা, তাদের সম্ভাব্য দিকগুলো সম্পর্কে ব্যাখ্যা জোগানো এবং বাস্তব যুক্তির প্রেক্ষিতে জনসাধারণের কাছে তা পৌঁছে দেয়া।

অবশ্য একবিংশ শতকের পৃথিবীর রূপরেখা নিয়ে ক্লার্ক অন্যত্র তার চিন্তা-ভাবনার কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, পেট্রোলিয়াম থেকে হয়তো তৈরি হবে মাংস। মানুষের প্রচলিত খাদ্যাভ্যাস বদলে যাবে। খাদ্য সংশ্নেষণের জন্য পারমাণবিক শক্তি কাজে লাগানো হবে। মলিকুলার বায়োলোজির ভূমিকা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিজ্ঞানের এই শাখায় ঘটবে নতুন নতুন আবিস্কার যা জটিল রোগ নিরাময়ে অকল্পনীয় ব্যাপার সাধন করবে। কারও যদি অঙ্ক শেখার প্রয়োজন হয় তখন তার মধ্যে প্রবেশ করানো হবে রাসায়নিক নিউরন, যার মধ্যে থাকবে সেই বিশেষ সংকেত। তিনি এর নাম দিয়েছেন ্তুঈধঢ়ংঁষব ভড়ৎ রহংঃধহঃ সবসড়ৎু্থ।

এই শতকের পরার্ধে হয়তো শহর তৈরি হবে কাগজের মতো হালকা অথচ ইস্পাতের চেয়েও শক্ত পদার্থের ছাউনি দিয়ে। শহরগুলো হবে ছোট ছোট- দুশ' থেকে পাঁচশ' মিটারের, যার মধ্যে থাকবে জীবন ধারণের সব উপকরণ। বেলুনের মতো এই শহরগুলো নির্মাণ পরিকল্পনায় প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভেসে চলে যাবে। কোথাও বেশি শীত হলে ভেসে ঈষৎ গরম স্থানে এবং কোথাও বেশি গরম হলে ঈষৎ শীতল স্থানে ইচ্ছানুযায়ী বেলুন-শহর নিয়ে তার মানুষেরা চলাফেরা করতে পারবে। ক্লার্কের এই চলন্ত খুদে শহরের চিন্তা-ভাবনাকে নিয়ে লেখা হয়েছে ইতোমধ্যে কয়েকটি সায়েন্স ফিকশন। মহাকাশ যানে চড়ে বিভিন্ন গ্রহে মানুষের যাতায়াত বা ঘুরে বেড়ানো তখন প্রাত্যহিক ব্যাপার হবে।

মানুষের মেধার অমিত সম্ভাবনা কী না সম্ভব করেছে? গুহা মানবের সেই যুগ থেকে মানুষ এখন মহাকাশ পাড়ি দিচ্ছে। ছায়াপথ অতিক্রম করেছে মানুষেরই মহাকাশ যান। ক্লার্কের একদার ধারণা শিক্ষায়-দীক্ষায় যে আন্তর্জাতিকতা আসবে তার সফল বাস্তবায়ন ঘটেছে ইন্টারনেট ওয়েবসাইট এবং টেলিভিশনের সঙ্গে কম্পিউটার সংযুক্তিতে। এমন দিন অদূর ভবিষ্যতে আসবে, যখন ঘরে বসেই একজন শিক্ষার্থী তার জানার সবকিছু জানতে পারছে তার শিক্ষকের কাছ থেকে। নিজের ঘরে টিভি গ্রাহকযন্ত্রের বোতাম টিপে ২০ মাইল দূরের তার শিক্ষক থেকে ২০ হাজার মাইল দূরের কোনো বিশেষজ্ঞর কাছ থেকে জেনে নিচ্ছে তার প্রার্থিত প্রশ্নোত্তরগুলো।

ইতিমধ্যে আমাদের ধারণায় এমন কথাও উচ্চারিত হয়েছে তথ্য নাড়াচাড়া করছেন এমন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা বার্তায়। তারা বলছেন ইন্টারনেটের তথ্য পাঠানোর প্রবণতা যদি অধিক হারে বাড়তে থাকে তবে দেখা যাবে কিছুকাল পরে তথ্য মহাসরণি [ওহভড়ৎসধঃরড়হ ঝঁঢ়বৎ যরমযধিু] তার নিজের ওজনে নিজেই ভেঙে পড়বে। ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ বিল থমসন এই আশঙ্কা প্রকাশ করলেও তথ্য মহাসরণি এখনও টিকে আছে। হয়তো ট্রাফিক জট কোথাও তথ্য আটকে যেতে পারে ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো রয়েছেন এই জ্যাম মুক্ত করে নতুন নতুন দ্বার উন্মোচনের জন্য।

আমরা যদি গেল শতকের নব্বই দশকের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব তখন সবে অনলাইনে টেক্সট ই-মেইল শুরু হয়েছে। একেকটা ই-মেইলে থাকত মাত্র কয়েক বাইট তথ্য। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ডাটা লাইনের ধারণক্ষমতা ছিল মাসে কয়েক টেরাবাইট। কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হয়নি কেননা প্রতিবছর এর ধারণক্ষমতা ছিল দ্বিগুণ। কিন্তু ৯০ দশকের মধ্যভাগে পরিস্থিতি বদলে গেল। নেট লাইনে এলো ছবি, ওয়েবসাইট। তার সঙ্গে নতুন এক প্রযুক্তি এমপি-থ্রি। নেট ব্যবহারকারীরা সঙ্গত কারণে মেগাবাইট আয়তনের ছবি ও গান ডাউনলোড আদান-প্রদান শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে নেট লাইনে মাসিক ট্রাফিক সংখ্যা রীতিমতো বিস্টেম্ফারিত হলো। এরপর দেখা গেল বছরওয়ারি সাইবার স্পেসে ট্রাফিক দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে আর তার সঙ্গে পালা দিয়ে তথ্য মহাসরণির তথ্য পরিবহন ক্ষমতাও বাড়ছে। কিন্তু ২০০৩ সালে নেটে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন প্রযুক্তি ট-ঞঁনব এবহধৎধঃরড়হ অর্থাৎ, অনলাইনে ট্রিম-ভিডিও বা ভিডিও চিত্র আদান-প্রদান। এবারে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতিটি ই-মেইল প্যাকেজে প্রায় গিগাবাইট সাইজের ফাইল উড়হিষড়ধফ বা প্রেরণ করা শুরু করল। একটি অনলাইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান 'সিসকো সিস্টেম'-এর মার্কেটিং প্রধান ফিল স্মিথের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন নেটে পাঠানোর ডাটার পরিমাণ হলো ৭৫ বিলিয়ন ই-মেইলের সমান। তারই আশঙ্কা, যে কোনো সময়ের তুলনায় সাইবার স্পেসের ক্যাপাসিটি বেড়ে চলেছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্মিথের এই আশঙ্কার কারণ ভিডিও নিয়ে। ভিডিও হচ্ছে রিয়েল টাইম প্রযুক্তির বিষয়, তাই নেটে পর্যাপ্ত গতি থাকা বাঞ্ছনীয়। ই-মেইল কিছুটা ঝখঙড হলে ক্ষতি নেই, একটা টেক্সট ফাইল ১০ সেকেন্ডের স্থানে ১১ সেকেন্ডে ডাউনলোড হলে কিছু যায় আসে না। কিন্তু ভিডিওর বেলায় তা দৃষ্টিকটু, বিশেষ করে যখন টেলিভিশন এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে চায়।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান চাহিদার কথা ভেবে দুই হাজার সালের পর দ্রুতগতির অপটিক্যাল ফাইবার বসানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন আত্মবিশ্বাসী এসব অপটিক ফাইবার লাইনে আলোক ফর্মে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুততার সঙ্গে তথ্য পৌঁছে দিতে পারবেন। কিন্তু দুই হাজার সালেই দেখা গেছে একটা ইধপশনড়হব খরহব অতি ভারী হয়ে যেতে। সেই দুর্ঘটনা মহাসাগরের বিভিন্ন প্রান্তে জড়ঁঃবৎ বসানোর প্রযোজনীয়তা তুলে ধরে। বিল থমসনের ভাষায়, যদি আটলান্টিকে একটি ইধপশনড়হব ড়ঢ়ঃরপ ষরহব বিছানো হয় তাহলে তার মধ্যে দিয়ে প্রতি সেকেন্ড আসা শত কোটি তথ্যের গন্তব্য হবে একেক দিকে। সে ক্ষেত্রে ওই প্রান্তে যদি একটি রাউটার বসানো হয় তবে সে দেখিয়ে দেবে কোন্‌ তথ্যর গন্তব্য কোন্‌ দিকে। কম্পিউটারের এটি কোনো জটিল কাজ নয়। তবে স্বীকার করতেই হবে এ ক্ষেত্রে খুব দ্রুত লক্ষ লক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় জড়িত। বিশ্বের অধিকাংশ রাউটারের নির্মাতা সিসকো। বিল থমসন যখন রাউটারের ওভারলোড হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন তোলেন তখন সিসকো অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে সে আশঙ্কা অমূলক। এখন আধুনিক রাউটার প্রতি সেকেন্ডে ৯২ টেরাবাইট ডাটা বাছাই ও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে।

তারপরও প্রশ্ন থাকে, দ্রুতগতিতে তথা আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসেও গ্রাহক পর্যায়ে ঘটল বিপত্তি; গ্রাহক পাচ্ছে না তথ্য কারণ ডাটা সরবরাহকারী ওঝচ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যান্ডউইথ কার্টল করছে। একে বলা হয় ব্যান্ডউইথ শেপিং, যেমন একটি ওঝচ প্রতিষ্ঠানে হয়তো ১০০ থেকে ২০০ গ্রাহক আছে। কিন্তু সবার কাছে ডাটা পৌঁছানোর কোনো ক্যাপাসিটি হয়তো তার নেই। কিন্তু এক সঙ্গে সব গ্রাহক যদি ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেন, তবেই লাইন ওভার লোড হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে কিছু গ্রাহকের ক্ষেত্রে ডাটা কার্টল অথবা ব্যান্ডউইথ স্লো করে সবার মধ্যে স্পিড ভাগ করে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত নাম হচ্ছে ইধহফরিফঃয ঝযধঢ়রহম। এ ছাড়া সাইবার স্পেসের জন্য আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে, যেমন কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপে কোথাও নেটলাইন ধ্বংস করা হলো, যেমন, আমাদের দেশে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের পথে একাধিকবার সন্ত্রাসীরা ঙঢ়ঃরপধষ ভরনবৎ কেটে দিয়েছে। অথবা হাঙ্গর সাবমেরিন ক্যাবল কেটে ফেলল, সে ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমস্যা দেখা দেবে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। কিন্তু সাইবার লাইনের জাল এমন ভাবে ছড়ানো আছে, যে কোনো কারণে একটি লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রাফিক অন্য একটি লাইন বেছে নেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা নেটের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ভূমিকম্পেকে সাগরের তলদেশে। সুনামির সময় ও ২০০৬ সালে একটি ভূমিকম্পে নেটের অবকাঠামোর বিপর্যয় ঘটেছিল। সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত নেটে ট্রাফিক নতুন রুট বেছে নিলেও সেটি ছিল খুব ধীরগতির; ফলে প্রায় দু-সপ্তাহ গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ রূপে স্থলভাগের ভূমিকম্পে অবশ্য এ ধরনের বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়নি। যেমন এবারে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেটের ক্ষতিসাধন হয়নি। তবে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা যার সংযোগে গ্রাহক পর্যায় নেট পৌঁছাবে কিংবা নেটের ব্যবহার কার্যকর হচ্ছে সেখানের স্থল উপরিভাগের বড় ধরনের বিপর্যয় নেটেরও বিপর্যয় ঘটাবে।

সুখের বিষয় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে সংযুক্তির পরিকল্পনা বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী বছর অর্থাৎ, ২০১৬ সালেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের অধীনে এলে দেশে নেটের ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে যাবে। ফলে সেই সঙ্গে শ্রুতিলোকন মাধ্যমে আরো নতুন নতুন প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটবে।

যার কাছে যত তথ্য সেই তত পরাক্রমশালী, এ কথা বলেছিলেন ৫০ দশকে ম্যানেজমেন্টের একজন অধ্যাপক। সেদিন টেলিভিশন আজকের মতো বিশ্বে এমনকি, একটি গোটা দেশেও ছড়িয়ে পড়েনি। তথ্যের বহুধা আদান-প্রদান তো দূরের কথা। কিন্তু অধ্যাপক ড্রেকের কথাটি আজ প্রচণ্ডভাবে সত্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ফোন, টিভি চ্যানেলের কল্যাণে কিংবা কার্যক্রমে মানুষ এখন প্রচুর তথ্যের জন্ম দিচ্ছে। ব্যবহার ও বিনিময় করছে। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষকদের এক সমীক্ষায় বলা হয়, বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের জন্য এখন বছরে গড়ে এক হাজার মেগাবাইটের তথ্য সৃষ্টি হচ্ছে।

গত শতকের অপরার্ধে গধৎংযধষষ গধপষরযধহ উচ্চারণ করেছিলেন এষড়নধষ ঠরষষধমব-এর কথা, চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের পদপাত এবং উপগ্রহের মাধ্যমে টেলিভিশন সম্প্রচারের বিপুল প্রসার নিরীক্ষণ, একযোগে ঘটনার সংঘটন প্রত্যক্ষ করার উপলব্ধি থেকেই এই ধারণার জন্ম নিয়েছিল তার মনে। তিনি যোগাযোগ রচকের কেউ নন বরং ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু এই ধারণাকে পল্লবিত করে আজ প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বায়নের পথে আমাদের সবার এক সঙ্গে অন্বয় যাত্রায় যে আলোকের ঝর্ণাধারায় আমরা নিরন্তর অবগাহিত হচ্ছি, এর শেষ কোথায়?

এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, উন্নত দেশের মানুষেরা মাসে কুড়ি ঘণ্টায় ফোনে কথা বলে, প্রায় একশ' ঘণ্টা রেডিও শোনে, একশ' ত্রিশ ঘণ্টারও বেশি টিভি দেখে। এসব মানুষের অধিকাংশই আবার ইন্টারনেট ব্যবহার করে ঘরে এবং অফিস মিলিয়ে প্রায় একশ' ঘণ্টা। অর্থাৎ, তাদের জীবনের মুখ্য অংশই ব্যয় হচ্ছে মিডিয়ার সঙ্গে বসবাস করে। তাই আজকের আগামীর বিশ্ব মিডিয়ার আলোর ঝর্ণাধারায় অবগাহন বৈকি!

লেখক



কবি

প্রাবন্ধিক

পরবর্তী খবর পড়ুন : তথ্যপ্রযুক্তির পথরেখা

সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রবেশ ...

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ...

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজতে ...

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আন্দোলনেই দেশে স্বাধীন মানুষের পতাকা উড়বে বলে জানিয়েছেন ...

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ...

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২২৪ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ...

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেফতার করা ...