অপেক্ষার শেষ অপেক্ষার শুরু

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০১৮      

মশিউর রহমান টিপু

অপেক্ষার শেষ অপেক্ষার শুরু

বিশ্বকাপের রঙে সেজেছে মস্কোর রেড স্কয়ার- এএফপি

অপেক্ষার প্রহর কাটতেই চায় না। তারপরও সময় বয়ে যায় সময়ের নিয়মে। অধীর অপেক্ষাও ফুরায়। বিরহ-ক্লান্ত নয়, এ যে অপার আনন্দলোকে পরিভ্রমণের অপেক্ষা। ক্ষণ গণনার পালা শেষ করে সেই মহালগ্ন এলো অবশেষে। শুরু হলো 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ'- বিশ্বকাপ। এবার আসল লড়াই শুরু, মাঠের লড়াই। শুধু আবেগের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার অবকাশ নেই আর। এখন সবুজ গালিচায় আগুন ঝরানোর সময়। একের পর এক প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে বিরামহীন ছুটে চলার কঠিনতম প্রতিযোগিতা। রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপের একুশতম আসরে ৬৪টি ম্যাচে ৩২ দলের সেরা নৈপুণ্য দেখতে উদগ্রীব হয়ে আছে বিশ্বের শতকোটি মানুষ। এক অপেক্ষার শেষে আরেক অপেক্ষার শুরু। কে হবে এবারের চ্যাম্পিয়ন? আজ উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই শুরু হবে এ অমোঘ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আর হিসাব মেলানোর পালা।

বিশ্ব এখন দুলছে বিশ্বকাপ তরঙ্গে। দৃষ্টিজুড়ে শুধুই বিশ্বকাপের রঙ। পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে দৃশ্যমান সেই ঝলমলে রঙের প্রলেপ। বিশ্বকাপ যে কতটা সার্বজনীন উৎসব, তার সবচেয়ে বড় উপমা সম্ভবত বাঙালির অপরিসীম উচ্ছ্বাস আর অক্লান্ত উদ্দীপনা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, মেসি-নেইমার-সালাহ, রেফারির ভালো-মন্দ, কোচের বুদ্ধিমত্তা, লাতিন-ইউরোপ ঘরানার চিরন্তন দ্বৈরথ- সব বিষয়েই তাদের কৌতূহল অন্তহীন, আগ্রহ বিপুল। এত বৈচিত্র্যের সমাহার বিরল না হলেও সুলভ নয়। বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতির প্রতিযোগিতায় বাঙালিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। প্রিয় দলের রঙে পুরো বাড়ির রঙ বদলে ফেলার মতো ব্যয়সাপেক্ষ নিস্কলুষ বিলাসিতা ক'জনই-বা দেখাতে পারে। গত কয়েকদিনে দেশের অগণিত বাড়ির দেয়াল, সীমানা প্রাচীরের কোনোটা ব্রাজিল, কোনোটা আর্জেন্টিনার রঙে ছেয়ে গেছে।

এ তো গেল বাড়ির দেয়ালের কথা। অন্য আরেকটা দেয়ালও কিন্তু সমর্থনের রঙে প্রতিনিয়ত রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে উঠছে। ফেসবুকের কথা বলছি। সেখানে ফুটবল উচ্ছ্বাসের কী প্রবল জোয়ার বইছে এখন, সেটা ফেসবুকে না থাকলে কাউকে লিখে ঠিকঠাক বোঝানো যাবে না।

তবে আবেগের জোয়ারে সমর্থকরা যতই ভেলা ভাসাক, মাঠের খেলায় যারা নামছে তারা রয়েছে কঠিন বাস্তবতার সামনে। বিশ্বকাপ বাস্তবিকই এক কঠিন ঠাঁই। কোনো একটা দল ফেভারিট, তার মানে এই নয় যে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষকে বিশেষ পাত্তা না দিলেও তাদের চলবে। বরং দেখা গেছে 'ছোট' হিসেবে বিবেচিত দলগুলো প্রায়শই তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়। কারণ ওই ম্যাচগুলো তারা নামে 'হারানোর কিছু নেই' ধরে নিয়ে। আর নাম না জানা খেলোয়াড়রা এমনভাবে তাদের সেরাটা উজাড় করে দেন যে, তার সামনে বড় দলের তারকা খেলোয়াড়দের দ্যুতি কখনও কখনও ম্লান হয়ে যায়। আদতে বিশ্বকাপে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি দলকেই বাছাইপর্বের অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হয়েছে। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো প্রথমবার খেলতে এসে অতীতে অনেক দলই বিশ্বকাপে বিরাট অঘটনের জন্ম দিয়েছে। তাদের কেউ শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়নি, তবে অনেক সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে ছেড়েছে। এ ক্ষেত্রে 'পচা শামুকে পা কাটা'র প্রবাদটা ব্যবহার করলে নূতনের কেতন ওড়ানো ওই দলগুলোর অর্জনকে খাটো করে দেখানো হবে। তাই বলা উচিত, বিশ্বকাপ হচ্ছে এমন আসর যেখানে ডারউইনের সেই বিখ্যাত তত্ত্ব- 'সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট বা যোগ্যতমের ঊর্ধ্বতন' সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। বিশ্বকাপের ইতিহাসজুড়ে অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্মকথা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নক্ষত্র পতনের ইতিকথাও। বিশ্বকাপের মাঠে কখনও কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি, বলবেও না। এখানে জপমন্ত্র একটাই- 'বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্রমেদিনী।'

কথায় কথা আসে। বিশ্বকাপের কথায় কেন জানি একজন ভদ্রলোকের কথা হঠাৎ মনে পড়ল। তিনি কোনো ফুটবল তারকা নন। তবে একটা সময় ছিল, যখন ফুটবলবিশ্বের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো তার অঙ্গুলি হেলনে। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার সভাপতি ছিলেন জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ। আজকের এই বিশ্বায়নের পথে ফুটবল অনেকখানি এগিয়েছে তার হাত ধরে। যদিও শেষদিকে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তিনি বাধ্য হন পদত্যাগ করতে। কিন্তু আক্ষরিকভাবে বিশ্বকাপের 'বিশ্বকাপ' হয়ে ওঠার পেছনে তার অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পেশায় আইনজীবী হলেও ব্রাজিলের এই মানুষটি আপাদমস্তক ছিলেন একজন নিবেদিত ক্রীড়া সংগঠক। ১৯৭৪ থেকে টানা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন ফিফা প্রধান হিসেবে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। রিও ডি জেনিরোতে জন্ম ৮ মে ১৯১৬ সালে। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট মারা যান ১০০ বছরের কর্মমুখর জীবন অতিবাহিত করে।

রাশিয়ায় এবার নতুন দল হিসেবে নামছে আইসল্যান্ড আর পানামা। এর মধ্যে আইসল্যান্ড প্রথম রাউন্ডে 'ডি' গ্রুপে খেলছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ফেভারিট আর্জেন্টিনা, ক্রোয়েশিয়া এবং নাইজেরিয়া। কেন জানি, ইউরোপ থেকে আসা আইসল্যান্ডকে নিয়ে একটা বাড়তি কৌতূহল কাজ করছে। সেটার একটা কারণ হতে পারে এই যে, প্রথমত দেশটা আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে বেশ খানিকটা ছোট (১ লাখ ২ হাজার ৭৭৫ বর্গকিলোমিটার)। দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ৩ লাখ। এইটুকু একটা দেশ বিশ্বকাপ খেলছে, ভাবতেই অবাক লাগে। অথচ চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি, বরাবরের ফেভারিট হল্যান্ডের মতো আরও বেশকিছু জায়ান্ট দল এবার নেই। নবাগত পানামাকে নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশার কথা শোনা যাচ্ছে না। তাছাড়া অঞ্চলভিত্তিক বাছাই প্রতিযোগিতায় সামান্য হলেও কখনও কখনও বাড়তি কিছু সুবিধার জায়গা থাকে। তবে তাই বলে কনকাকাফ (উত্তর ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলো নিয়ে গঠিত) জোন থেকে কোয়ালিফাই করা পানামাকে মোটেও উড়ে এসে জুড়ে বসা দল হিসেবে বিবেচনা করার কিছু নেই। তারা 'জি' গ্রুপে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, তিউনিসিয়া- যে কারও ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণ হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

'এ' গ্রুপে স্বাগতিকদের সঙ্গে আছে মোহামেদ সালাহর মিসর, উরুগুয়ে আর সৌদি আরব। মিসরকে নিয়ে যা কিছু প্রত্যাশা, তার সবটুকুই সালাহকে ঘিরে। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ এ মুহূর্তে বিশ্বফুটবলের অন্যতম নন্দিত তারকা।

ভলগার বুকে কত জলরাশি বয়ে যাবে আগামী এক মাসে। কত কিছুই না ঘটে যাবে রাশিয়ার মাঠে-মাঠে। অভাবনীয় সব ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটে বলেই তো বিশ্বকাপ এত রোমাঞ্চকর, এত উদ্দীপনাময়। আজ রাশিয়া-সৌদি আরব ম্যাচ দিয়ে একুশতম বিশ্বকাপের উদ্বোধন, যার পর্দা নামছে ১৫ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। কোন দুটি দলকে সে দিন দেখা যাবে শিরোপাযুদ্ধে? সময়ই তার উত্তর বলে দেবে। তবে শুধু সময়ের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকার বাধ্যবাধকতা তো আর সমর্থকদের নেই! অতএব চলুক বাক্যবাণ আর জল্পনা-কল্পনার দুর্দান্ত লড়াই। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালটা মেসির আর্জেন্টিনা আর নেইমারের ব্রাজিলের মধ্যে হতেই পারে। ফিকশ্চারের রুটম্যাপ ধরে ভালোয় ভালোয় এগোতে পারলে সেটা খুবই সম্ভব। বিশ্বকাপ অন্তপ্রাণ আপামর বাঙালির কায়মনো প্রার্থনা- তবে তাই হোক। বিশ্বকাপ ট্রফি ফিরে আসুক লাতিনের করতলে। জয় হোক ছন্দময় ধ্রুপদী ফুটবলের।

পরবর্তী খবর পড়ুন : ট্রফিটা হাতে নিতেই হবে

সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

সারা বিশ্বে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ত্রুটি

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রবেশ ...

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই: ইসি সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ...

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজত: শফী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে না হেফাজতে ...

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন: ফখরুল

ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আন্দোলনেই দেশে স্বাধীন মানুষের পতাকা উড়বে বলে জানিয়েছেন ...

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

বর্ণচোরাদের ভোটে জবাব দেবে জনগণ: নাসিম

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বি চৌধুরীর বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ...

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

২২৪ আসনে জাসদের প্রার্থী চূড়ান্ত

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২২৪ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ...

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেফতার করা ...