বুঝতে পারলাম না মুখের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ফরিদুর রেজা সাগর

মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হঠাৎ দেখা।

পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল- 'আমার হাজব্যান্ড'।

দেশে থাকার সময়ে বড় এক চাকরি করত। সরকারি চাকরি। মান্যগণ্য ব্যক্তিত্ব। এখন প্রবাসে এসে হয়েছে পেশাদার পরামর্শদাতা। নানাজনের ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে পরামর্শ দেয় সে।

মেয়েটির সঙ্গে ওর সেই বরের বয়সের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। পরিচয় পর্ব শেষে স্মিত হেসে তাকালাম তাঁর দিকে।

আমার কাছে বিস্ময়টা অন্য জায়গায়।

ঢাকায় মেয়েটির সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘ দিনের। ঢাকায় আমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ ছিল। ঢাকায় মেয়েটি বেতার আর টেলিভিশনে কাজ করত। সেই সূত্রে যোগাযোগ ছিল।

আমি দেখেছি এক সময় ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনে ওকে অংশ নিতে। পুরান ঢাকায় থাকত মেয়েটি। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে মাঝে মাঝে আসত। পুরান ঢাকার মেয়ে হলেও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারে। এ কারণে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করত সবার।

আমিও মেয়েটিকে যথেষ্ট স্নেহের চোখে দেখেছি।

টিভি-রেডিওতে নানাভাবে ওকে সুযোগ করে দেয়ার চেষ্টা করেছি। তখন আমার ক্ষমতাও ছিল সামান্য। বেশ সীমিত।

সেই মেয়েটি একদিন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে বিভ্রান্তির ছায়া। আমি এক পলক দেখলাম এবং অবাক হলাম। এমন একটা স্মার্ট মেয়ের দৃষ্টিতে এমন বিধ্বস্ত ভাব কেন!

আমার বিস্ময়ভরা চোখ দেখে মেয়েটিই বলল, 'আমার বাবা-মা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন।'

'বাবা-মা?'

'জি। ওনারা আমাকে বিয়ে দেবে বলে মনস্থ করেছেন। আমাকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন তারা।'

হেসে বললাম, 'বিয়ে দেবে বলে ঠিক করেছেন- এখানে সমস্যা কোথায়?'

মেয়েটি প্রবল জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল, 'বিয়ে ঠিক করবেন কেন? আমি বিয়ে করার জন্য রেডি কি-না, সেটা জেনে নেবেন না? আমার বিয়ের জন্য কি বয়স হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?'

'আমার মনে হওয়া না-হওয়ায় তো কিছু যায় আসে না।'

মেয়েটির উত্তর, 'এ বয়সে তো আমার বিয়ে করার কথা না।'

ওর সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম।

'আমার সব ভাই বিদেশে চলে গেছে। পুরান ঢাকায় আমাদের বিশাল বাড়ি। সেই বাড়িতে আমি একমাত্র থাকি, আর থাকেন বাবা-মা। সে জন্য ওনারা আমাকে বিয়ে দিতে চান। আমাকে যদি বিয়ে দিতে পারেন, তবে বড়সড় বাড়িটা ভেঙে ফেলতে পারেন। ভেঙে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর প্ল্যান করতে পারেন। অথবা ডেভেলপারের হাতে তুলে দিতে পারেন। কিংবা অন্য কিছু করতে পারেন। ভাইদেরও এর মধ্যে একটা সমর্থন রয়েছে। তবে এর মধ্যে কোনো অভিসন্ধি নেই। আমাকে ঠকাবেন না। ভাগ দিতে চান আমাকেও। কিন্তু আমি আমার পৈতৃক বাড়ি যেমন ভেঙে ফেলার পক্ষপাতী নই, তেমনি এখনই বিয়েটাও করতে চাই না।'

কিন্তু সবাই ওকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

মেয়েটি বলল, 'আপনি আমাকে বাঁচান।'

আমি বললাম, 'এটা পারিবারিক সিদ্ধান্ত। আমি কীভাবে এর মধ্যে ইন্টারফেয়ার করব? করতে গেলে তাঁরা তা শুনবেনই বা কেন? তোমার একটা ভাই বিদেশ থেকে এসেছেন, শুনেছি। প্রায় সবকিছু সমাধান করতে চাইছেন তারা। আমার কথা বলাটা এখানে কতটা যৌক্তিক হবে?'

মেয়েটি শুধু বেতার-টিভিতে অনুষ্ঠান করত, তা নয়; সাংবাদিকতায়ও মোটামুটি ব্যস্ত হয়ে উঠছে তখন।

বললাম, 'তুমি তো মিডিয়ার অনেককেই চেনো, প্রেসের অনেকের সঙ্গেই তোমার জানাশোনা। বিখ্যাত সব মানুষ ইতিমধ্যে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী। এ বিষয়ে সবার সাহায্য নাও। তোমার নিজের পত্রিকারও মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বল।'

মেয়েটি বলল, 'উহুম। এ ব্যাপারে কেউ মাথা ঘামাবে না। আপনিই একমাত্র হেল্প করতে পারেন। আমার ভাইরা আপনাকে অনেক পছন্দ করেন। মানেনও অনেক। তাদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার কথা তারা শুনবেন।'

হতাশার সুরে বললাম, 'আমি তোমাদের ভাইদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। মুখোমুখি বসে বোঝাতে পারি। ফোন করতে পারি বিদেশের নাম্বারেও। কিন্তু ওই যে বললাম- আমাকে কতটা গুরুত্ব দেবেন, বলতে পারছি না। শোনো, আমি কথা বলব। কথা বললে বলবেন, আমরা ভালো পাত্র পেয়েছি। ভালো পাত্রের সঙ্গে আমরা বিয়ে দিতে চাই।'

মেয়েটি উত্তর দিল, 'তবু আপনি কথা বলুন।'

কথা বললাম আমি, ঢাকায় আসা ভাইটির সঙ্গে।

ভাইটি ঠাণ্ডা গলায় বিনীতভাবে বললেন, 'দেখেন, আমরা সবাই বিদেশে থাকি। বাবা-মার বয়স হয়েছে। আমাদের বোন সেই হিসেবে একা থাকে। ভালো পাত্রের সঙ্গে আমাদের বোনের বিয়ে হোক, আমরা চাই। বেশ ভালো পাত্রের সন্ধান পেয়েছি। ফাইনাল করছি সে জন্যই। ছেলেটি মধ্যপ্রাচ্যে বড় চাকরি করে।'

বিয়ের পর দ্রুত কাগজ তৈরি হয়ে যাবে। মেয়েটিকে নিয়ে তখন বিদেশ পাড়ি দেবে।

আমতা আমতা করলাম, 'আপনাদের বোন এখানে কাগজের সাংবাদিক। টিভি-বেতারে প্রোগ্রাম করে। বিদেশে গেলে তো সেই সুযোগটা আর থাকবে না।'

'সেই সুযোগটা তো একটা সুন্দর জীবনের জন্য সব নয়।' ভাইটির পরিস্কার উত্তর।

'একটা মেয়ের সুন্দর একটা সংসার হোক- সেটা তো নিশ্চয় আপনিও চান?'

আমি বোবা। এ কথার আমি কী জবাব দেব?

পরের শুক্রবারেই বিয়ে। সব চূড়ান্ত হয়ে গেল। ঠেকানো গেল না বিয়েটা।

মেয়েটি ফোন দিল, 'আমার বিয়েতে যদি আসেন, আমি খুশি হবো। পুরান ঢাকার ভয়ঙ্কর জ্যাম ঠেলে আমার পক্ষে বিয়েতে যাওয়া সম্ভব হলো না। বললাম, 'আসা হবে না। দোয়া থাকবে।'

এর পর অনেক দিন আর মেয়েটির খোঁজখবর পেলাম না। একদিন হুট করে আবার দেখা। বলল, 'বর বিয়ে করে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পর মাঝে একবার মাত্র এসেছিল। তারপর আর খবর নাই। আমিও তার খবরাখবর জানি না। নিতেও ইচ্ছে করে না।'

মেয়েটির সঙ্গে এর বেশ কিছুদিন পর ফোনে কথা। জানাল, 'আমি চেষ্টা করছি আমেরিকায় যাওয়ার; একটা ভিসা পাওয়ার জন্য।'

ওই কথার পর আর যোগাযোগ নেই।



অনেক দিন পরের কথা।

আমাকে মধ্যপ্রাচ্যের একটা দেশে যেতে হলো। কাজের পর ক্লান্তি ভাংতে এক স্টারবাক্স-এর দোকানে ঢুকেছি কফি খেতে। গরম কফি খেয়ে শরীর চাঙ্গা করছি। কফির মগটা যে সাজিয়ে দিয়ে গেল, এক পলক দেখে মনে হচ্ছিল, ছেলেটি বাংলাদেশের হতে পারে, মিসরেরও হতে পারে।

স্মার্ট ছেলেটি হঠাৎ পরিস্কার বাংলায় প্রশ্ন করল, 'আপনি কি চ্যানেল আইয়ের অমুক?'

মাথা নাড়লাম, 'জি'।

পরের প্রশ্ন ছিল- 'আপনি কি অমুককে চেনেন? জার্নালিজম করত। টিভি প্রোগ্রামও করত অনেক।'

বুঝলাম সে ওই মেয়েটির কথাই বলছে। তার মুখের দিকে তাকালাম, 'হ্যাঁ, চিনি তো।'

'উচ্চাভিলাষী খুব, তাই না?'

ছেলেটির এ প্রশ্নে খানিক ভড়কালাম, 'মানে!'

'মানে, মেয়েটির চোখ সব সময় ওপরের দিকে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে থাকতে চায় না।'

পাল্টা স্পষ্ট হতে চাইলাম, 'বুঝলাম না আপনার কথা।'

সুদর্শন ছেলেটি সুন্দর করে হাসল, 'ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল। যখন ও জানতে পারল আমি স্টার বাক্স-এ কাজ করি, তখন থেকে শুরু হয়ে গেল খটমটি। কিছুতেই ওই মেয়ে এই চাকরি করা ছেলের সঙ্গে বিদেশে এসে থাকবে না। জোর করে ডিভোর্স আদায় করল। এখন নিশ্চয় ওই মেয়ে এতদিন আবার অন্য কোথাও চলে গেছে?'

বললাম, 'হ্যাঁ, আমি জানি, সে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে।'

ছেলেটি স্মিত হেসে বলল, 'দেখবেন, ও ওখানে বড় কাউকে বিয়ে করে সুখে-শান্তিতে ঘর করছে।

বললাম, 'তা তো ঠিক বলতে পারব না। যাই হোক, তোমার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম।'

তার পরের ঘটনা। মেয়েটির সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা। স্টার বাক্স'-এর স্মার্ট ছেলেটি যা বলেছিল তার সঙ্গে ব্যাপারটা মেলালাম।

যথেষ্ট বয়স্ক একজন মানুষকে বিয়ে করে মেয়েটি জীবন যাপন করছে। তবে ওর মুখাবয়ব দেখে, মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে একটুও বুঝতে পারলাম না, এখন ও বেশি সুখী নাকি দুঃখে আছে!

পরবর্তী খবর পড়ুন : সুতানদী

তোশাখানা জাদুঘর উদ্বোধন

তোশাখানা জাদুঘর উদ্বোধন

রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের পাওয়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উপহারসামগ্রী সংরক্ষণে তোশাখানার জন্য নিজস্ব ...

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে ...

শেকড়ের গান গেয়ে মাতালেন আব্দুল হাই দেওয়ান

শেকড়ের গান গেয়ে মাতালেন আব্দুল হাই দেওয়ান

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্টিত ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট-২০১৮' র প্রথম দিনে ...

নয়াপল্টনের আকাশে ড্রোন

নয়াপল্টনের আকাশে ড্রোন

রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর দিন ...

নয়াপল্টনে সহিংসতার ৩ মামলা ডিবিতে, রিমান্ডে ৩৮

নয়াপল্টনে সহিংসতার ৩ মামলা ডিবিতে, রিমান্ডে ৩৮

নয়াপল্টনে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলা বৃহস্পতিবার তদন্তের জন্য ...

বর-বধূ সাজে রণবীর-দীপিকা

বর-বধূ সাজে রণবীর-দীপিকা

বলিউডের আলোচিত জুটি রণবীর-দীপিকার বিয়ের ছবি দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন ভক্তরা। অবশেষে ...

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা স্বদেশে ...

ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে: কাদের

ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে: কাদের

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, 'জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় ...