চিত্রভাষায় ঐতিহ্যের সন্ধান

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮      
বাংলাদেশের চিত্রকলায় গুণ ও রীতিতে অনন্য শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ। আবহমান বাংলার জীবন-সংস্কৃতির নির্যাসে রাঙানো তার শিল্পের ভুবন। একান্ত আলাপচারিতায় এ শিল্পীর চর্চা ও জীবন নিয়ে খেরোখাতা মেলে ধরেছেন সঞ্জয় ঘোষ

ক্যানভাসে রঙ চাপানোর আগেই ছবিটির কল্পনাকে তিনি হাড়-মাংস দিতে থাকেন নিজের খেরোখাতার পাতায়। নানা রকম আঁকিবুঁকির মাধ্যমে ঝালাই করে নেন মাথার ভেতরে ঘনিয়ে আসা চিত্রকর্মটি। স্টুডিওতে বসে ছবি আঁকার ফাঁকে এ রকম অসংখ্য ড্রইংয়ের পৃষ্ঠা বের করে দেখাচ্ছিলেন শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ। হাতের সামনে থাকা অসম্পূর্ণ চিত্রকর্মটি দেখিয়ে বলছিলেন, 'এই ছবিটি আঁকার আগে তিন-চারবার স্কেচ করেছি।' বললেন, 'রাফ করতে করতে অনেক সময় স্কেচের সঙ্গে কারও ফোন নম্বর, টাকা-পয়সার হিসাবও ঢুকে পড়ে।' ছবি আঁকার এমন হিসাবের সঙ্গে যাপিত জীবনের বেহিসাব ঢুকে পড়া একজন শিল্পীর জন্য অস্বাভাবিক নয়; যে শিল্পী জীবনব্যাপী নিরন্তর ঘনিষ্ঠ থাকেন শিল্পচর্চায়। বললেন, 'বাংলার মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়ে বড় হয়ে শিল্পী হবে- এমনটি ভাবার সুযোগ ছিল না আমাদের সময়ে।'

আবদুস শাকুর শাহর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বগুড়ায়। বগুড়া ধ্রুপদী শিল্ক্ক-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। তা ছাড়া যে লোক-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ আমাদের বাংলাদেশ, তাতেও বগুড়া বিশেষভাবে বিকশিত। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি বাঁশ-বেত ও কাঁথা শিল্পেও বগুড়া অনন্য। এ সবকিছুই আবদুস শাকুর শাহকে শৈশব থেকে সৌন্দর্যমনস্ক করে তুলেছিল। সেই সঙ্গে বগুড়ার সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও লোক-সাংস্কৃতিক পরিম লে বিচরণ তার সব সময়ই ভালো লাগত। তিনি বলেন, 'গান-বাজনা, পূজায় যেতাম। পূজাম পের নকশা, মাটি দিয়ে বানানো প্রায় জীবন্ত সাপ, পাখি অবাক হয়ে দেখতাম!'

সুন্দর করে ঘুড়ি বানাতে পারতেন তিনি। তবে ছোটবেলায় তেমন ছবি আঁকা হয়ে ওঠেনি তার। কিন্তু মনের ভেতরে ছিল সেই আকাঙ্ক্ষা। মনের গভীরে জমে ওঠা এই শিল্পাকাঙ্ক্ষাই একদিন তাকে ছবি আঁকা শেখার উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছিল। তখন সবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করলেন। কিন্তু আশপাশে কোথাও এমন কিছু পেলেন না, যা দিয়ে তার শিল্প-তৃষ্ণা মেটে। কিছুদিন খোঁজখবরের পর ঢাকায় আর্ট কলেজের সন্ধান পেলেন ঠিকই, কিন্তু পারিবারিক মুসলিম রক্ষণশীলতা বাদ সাধল। বাবাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালেও শর্ত ছিল- মানুষের ছবি আঁকা যাবে না। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় এসে ভর্তি হলেন আর্ট কলেজে। শিল্পী বলেন, 'প্রথম যেদিন আর্ট কলেজে এলাম, আমার কাছে কলেজটিকে চারপাশের মনোরম পরিবেশের মধ্যে রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়েছিল।' শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো প্রখ্যাত শিক্ষকদের সান্নিধ্যে চলতে থাকে ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ। পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীবনযাত্রা থেকে নেওয়া সেই পাঠ শিল্পীকে ঋদ্ধ করে। ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে বিএফএ শেষ করে কিছুকাল সিলেটে ছিলেন। এর পর ছবি আঁকার উচ্চতর পাঠ নিতে চলে যান ভারতের বরোদা এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন বিখ্যাত শিল্পী কেজি সুব্রমানিয়ামকে। ছবি আঁকায় চারুকলার নিয়মিত পদ্ধতি, স্টাইল ও অঙ্কনশৈলী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রপ্ত করেছেন। সে অনুযায়ী ল্যান্ডস্কেপ ও ইম্প্রেশনিস্ট ধারায় ছবি এঁকেছেন অনেক। কিন্তু বরোদায় তিনি দীক্ষা পেলেন কীভাবে ঐতিহ্যের নবায়ন, শিল্পে ব্যক্তির নিজস্ব্ব সত্তা ও স্ব্বাদেশিক নানা বৈশিষ্ট্য সম্পৃক্ত হয়। শৈশবের ভালো লাগা বাংলার লোককলার পাশাপাশি সেখানে পরিচিত হলেন উড়িষ্যা, বিহার, গুজরাট, রাজস্থ্থানের ঐতিহ্যিক শিল্পের সঙ্গে। লোক-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এসব চিত্রকলা আবদুস শাকুর শাহকে উজ্জীবিত করে। প্রেরণার সেই যোগসূত্রে ভালো লাগতে থাকে যামিনী রায়, কেজি সুব্রমানিয়াম, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পীর ছবি। বরোদার পাঠ শেষে দেশে ফিরে আবার এলেন ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে। তবে এবার এলেন শিক্ষক হিসেবে। বললেন, 'তখন পিওর অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকতাম। কিন্তু বেশি দিন ভালো লাগেনি।'

১৯৯১ সালের কথা। জাপানে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন শাকুর শাহ। সেখানে যে ছবিটি জমা দিয়েছিলেন, সেটি ছিল কাগজের ওপর জলরঙে আঁকা ক্ষুদ্রাকৃতির একটি চিত্রকর্ম, যাতে বাংলার চিরাচরিত কারুশৈলীতে একটি ময়ূর এঁকেছিলেন। আর 'ট্র্যাডিশন' নামের ছবিটির প্রান্তদেশ ঘিরে বর্ণিল বাংলা অক্ষরে লেখা হয়েছিল 'জারি গান, গম্ভীরা, ভাটিয়ালি, একতারা, অচিন পাখি, লালন ফকির, হাছন রাজা, রমেশ শীল।' ছবিটি সেবার পুরস্কৃত হয়েছিল। আর শিল্পী অবাক হয়ে আয়োজকম লীর একজনকে বলেছিলেন, 'সারা পৃথিবী থেকে এত নামি-দামি শিল্পীর ছবি এসেছে! এর মধ্যে আমার এই ছোট্ট ছবিটি কীভাবে নির্বাচিত হলো?' উত্তরে বিচারকম লীর একজন বলেছিলেন, এটা দিয়ে তোমার দেশকে বোঝা যায়। এতে শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ স্ব্বদেশি ঐতিহ্য ও তার মর্যাদা সম্পর্কে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হলেন। এর পর আর থেমে থাকেননি। বলেন, 'তখন আমার মনে হয়েছিল, এত ছোট একটা ছবি দিয়ে যদি আমার দেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা সম্ভব হয়, তবে তা-ই হোক।' ধীরে ধীরে শিল্পী বাংলার ঐতিহ্যিক বিষয়কে পোস্টমডার্ন করে তুলে আনার চর্চায় ব্রতী হলেন। কথা বলতে বলতে আসন্ন প্রদর্শনীর জন্য আঁকা ছবিগুলো আগ্রহভরে দেখাতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন কোন ছবিটির পেছনে মৈমনসিংহ গীতিকার কোন কাহিনী লুকিয়ে আছে। চিত্রকর্মগুলোর একেকটির নামও সেই কাহিনীর চরিত্রগুলোর নামানুসারে। কোনোটির নাম মহুয়া, চন্দ্রাবতী, কাজল রেখা আবার কোনোটির নাম মলুয়া, নদের চাঁদ। বাংলার অকৃত্রিম এই লোককাহিনীকে ভিত্তি করেই গ্রামবাংলার কারুশিল্পের আঘ্রাণে ছবি আঁকেন আবদুস শাকুর শাহ্‌। বলেন, 'আমি দেশকে, দেশের ভাষাকে আগে দেখি। আমার বাংলাদেশ, আমার ঐতিহ্য- এর বাইরে আমি আর কিছু ভাবতে চাই না।' আমাদের নকশিকাঁথা, পাটি, নানা ধরনের পট, মাটির কলস, তৈজসপত্রে আবহমানকাল থেকে যে চিত্রশৈলীর চর্চা পাওয়া যায়, এর সঙ্গে নিজস্ব্ব শিল্প-দক্ষতা ও চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে ছবি আঁকেন তিনি। চিত্রে ফুল, পাখি, নকশা আঁকতে কোথাও কোথাও গামছা, নকশিকাঁথা ব্যবহার করেন। লোকজ শিল্পীরা যেমন উজ্জ্বল রঙে ছবি আঁকেন; শিল্পী আবদুস শাকুর শাহও অ্যাক্রিলিক, জলরঙ ও প্যাস্টেলে সেই উজ্জ্বলতাকে ধরে রাখেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ আর সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণ ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করতে পছন্দ করেন শিল্পী। গান শুনতে শুনতে ক্যানভাসে তুলির আঁচড় বসাতে ভালো লাগে তার। বলেন, 'ছবি আঁকাটাও এক ধরনের ধ্যান। ছবি আঁকা তো শুধু উপার্জনের জন্য নয়। এর সঙ্গে মনের এবং দেশের স্বার্থ জড়িত।'

সত্যিই শিল্পীর মন দেশের রঙ-রূপ ও লোকরসের সান্নিধ্যে প্রাণ পায়, আর দেশও প্রাণরসে উজ্জীবিত হয় তার ভালোবাসায় শিল্পী-মনের পাল্টা জবাব পেয়ে। এ বছর ডিসেম্ব্বরে শেষ হতে চলেছে চারুকলার শিক্ষক জীবন। বললেন, 'অন্য পেশার তুলনায় ছবি আঁকার সময় এখানে বেশি পাওয়া যাবে- এ কারণে শিক্ষকতায় আসা।' তা ছাড়া শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কেজি সুব্রমানিয়াম তাকে বলতেন- 'শিক্ষকতা করলে প্রতিদিন তুমি একটা সবুজ জীবনের সান্নিধ্য পাবে। আর ছাত্রছাত্রীদের শুধু তুমিই শেখাবে এমন নয়। প্রতিনিয়ত তুমিও শিখতে পারবে তাদের কাছ থেকে।' আসছে অক্টোবর মাসে প্রদর্শনী। তাই নিয়মিত ছবি আঁকছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে বলেন, 'উত্তরার রাজলক্ষ্মীতে একটি গ্যালারি করার কথা আছে। মেয়ের ইচ্ছা, আমার নামে একটি গ্যালারি চালু করবে। সেখানে ছবির পাশাপাশি বাংলার কারুশৈলীর অন্যান্য নিদর্শনও তুলে ধরা হবে।' মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলার আবহমান গ্রামীণ সমাজজীবনের নিদর্শন। বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা, প্রেম-বিরহের এই আখ্যানকে চিত্রভাষায় রূপায়িত করেন শিল্পী। স্টুডিও ঘুরে দেখা যায়, ক্যানভাসে চিত্রিত মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতীর রূপ শিল্পী তার আপন কল্পনায় মন্দ্রিত করেছেন কখনও ক্যানভাসে, কখনও কাগজে। তার সঙ্গে মৈমনসিংহ গীতিকার বিষয়-সংশ্নিষ্ট নানা পঙ্‌ক্তিও জুড়ে দিয়েছেন অনেক চিত্রকর্মে। একটি চিত্রকর্মে দেখা গেল, মহুয়ার রূপ বর্ণনার কিছু কথা- 'দেখিতে সুন্দরী কইন্যা পরম যৌবন/ কিঞ্চিৎ করিব তার রূপের বর্ণন/ চান্দের সমান মুখ করে ঝলমল/ সিন্দুরে রাঙিয়া ঠুঁট তেলাকুচ ফল' শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ এভাবেই নিরন্তর চিত্রিত করে চলেন বাংলার আবহমান ঐতিহ্যের সুরেলা বয়ান। চিত্রভাষায় সে সুর আমাদের সামনে স্ব্বদেশি ঐতিহ্যের খনিকে উন্মোচিত করে। আর আমরা আবিস্কার করি আমাদের হারানো গান। া
কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

ধানমণ্ডিতে সুপরিসর একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ী আহাদুল ইসলাম। ...

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির বৃহস্পতিবারের সম্ভাব্য জনসভায় ২০ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে কৌশলগত ...

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব ধারা-উপধারা বহাল ...

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্লাইটের এক কেবিন ক্রুর মাদক সেবন ও ...

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

মিয়ানমার থেকে নানা কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে সারা ...

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে অপতৎপরতা ...

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

হুট করেই ইমরুল কায়েস এশিয়া কাপের দলে ডাক পান। এরপর ...

মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ!

মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ!

বরিশালে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ...