হামিদিয়া মসজিদ ও সাইড-কার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মঈনুস সুলতান

হামিদিয়া মসজিদ ও সাইড-কার

হামিদিয়া মসজিদ

জোহানেসবার্গের জেনিংস্‌ স্ট্রিটে এসে পড়তেই দূর থেকে চোখে পড়ে হামিদিয়া মসজিদের সাদা মিনার। ওদিকে হাঁটতে গিয়ে চলে আসি ফুটপাতে ছড়ানো বাজারে। সড়কের পেভমেন্টে সাজানো ভাস্কর্যের দোকান। দাঁড় করিয়ে রাখা লাইফ সাইজের রিয়ালিস্টিক ও বিমূর্ত প্রকরণের মিশেল দেয়া বেশ কিছু মূর্তি। বিক্রেতা একটি হেলমেট হাতে নিয়ে হাসিমুখে আমাকে অ্যাপ্রোচ করবেন কি-না তা নিয়ে ইতস্তত করেন। এদিকে ট্রফিক জ্যাম খুব খারাপ না। তবে সিগনাল লাইটে লাল বাতির জন্য থেমে পড়েছে এক সারি গাড়ি। তখন খেয়াল করি, গাড়িগুলোর পাশ দিয়ে হাতে অনেক রঙিন শপিং ব্যাগ বয়ে হনহন করে হাঁটছেন খিন্ন চেহারার এক লোক। তার চোখমুখের দিকে তাকালে কেন জানি মনে হয়, মানুষটি জীবনে অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছেন আত্মহত্যার। কিন্তু সংসারে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের কথা ভেবে নিজে থেকেই ত্যাগ করেছেন স্বহননের পরিকল্পনা। আর আজকে তার পরিবারে বিবাহ বার্ষিকী বা এ ধরনের কিছু সেলিব্রেট করার জন্য প্রচুর গিফ্‌ট শপিং করে বাসায় ফিরছেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ একটি মোটরকারের জানালায় দাঁড়িয়ে হাতে এক তাড়া সানগ্লাস নিয়ে দেখাতে শুরু করলে বুঝতে পারি, মানুষটি সম্পর্কে যা ভেবেছি তা স্রেফ কষ্টকল্পনা। আদতে তিনি সাদামাটা একজন ফেরিওয়ালা। সড়কে ঘুরছেন রোদ চশমা জাতীয় পণ্য বিক্রির প্রয়াসে।

বড় বড় শহরের লেন-বাই লেনের গোলকধাঁধায় আমি পথ হারাই হামেশা। সুতরাং কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়া হামিদিয়া মসজিদের কাছাকাছি এসে পড়তেই দিক নির্ণয়ের দক্ষতায় নিজের ওপর খুব খুশি হই। জোহানেসবার্গের এ মসজিদটি আমি অন্তত এক নজর দেখতে চাচ্ছি। কারণটি ঐতিহাসিক। স্থাপত্যের নিরিখে হামিদিয়া মসজিদ আলিশান কিছু না, তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু বাসিন্দা ও পাশ্চাত্যের পর্যটকদের কাছে প্রার্থনার এ অনাবিল পীঠ 'গান্ধী মসজিদ' নামে পরিচিত। মহাত্মা গান্ধী ব্যারিস্টারি করতে জোহানেসবার্গ আসেন ১৯০৩ সালে। এদেশে তিনি বাস করেন ২১ বছরের মতো। মহাত্মাজি সম্পৃক্ত ছিলেন হরেক কিসিমের সামাজিক কর্মকাণ্ডে। এগুলোর মধ্যে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় তার উদ্যোগে হিন্দুস্তানি অভিবাসীদের ঠিক এ মসজিদের সামনে এসে তাদের শনাক্তকরণ পাস পুড়িয়ে ফেলার বিষয়টি।

তখন শ্বেতাঙ্গ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজ করছেন ভারত থেকে আসা প্রচুর অভিবাসী। হঠাৎ আইন হলো- তাদের ও চীনা অভিবাসীদের বহন করতে হবে এক ধরনের পাস, যাতে পরিস্কারভাবে লেখা থাকবে 'নন-হোয়াইট' কথাটি। এর অর্থ হচ্ছে, শাসক হিসেবে হোয়াইটরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, যেমন ট্রেনের ফার্স্টক্লাসে চড়া, পার্কে বেড়াতে যাওয়া, থিয়েটারের অপেরা বা বক্সে বসা- এসব থেকে হিন্দুস্তানিরা বঞ্চিত হবে। উপরন্তু সব হিন্দুস্তানিকে দল বেঁধে থানায় গিয়ে চোরচোট্টা-ক্রিমিনালদের মতো দিয়ে আসতে হবে ফিংগার প্রিন্ট। গান্ধীজি বিষয়টি মেনে নেননি। তার ডাকে ১৯০৮ সালের ১৬ আগস্ট হামিদিয়া মসজিদের সামনে জড়ো হন ৩০০০ হিন্দু, মুসলিম, পার্সি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ভারত থেকে আসা মানুষ, যারা সবাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দক্ষিণ আফ্রিকায় হিন্দুস্তানি হিসেবে পরিচিত। জোগাড় করা হয় কালো ব্রোঞ্জের শিরনির ডেগের মতো বিশাল একটি কালড্রন। তাতে পাসগুলো রেখে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

মসজিদের ঠিক উল্টোদিকে আছে এ শনাক্তকরণ পাস পুড়িয়ে ফেলার স্মারক মিনার। ব্রোঞ্জের কালড্রনের ওপর কালো বোর্ডে লেখা 'ট্রুথ' শব্দটি। মসজিদ থেকে সম্ভবত বেরিয়ে আসা টুপি পরা দুটি বাচ্চা ছেলে মিনারে দাঁড়িয়ে দেখছে কালড্রনের ভেতরে শিল্পিত কৌশলে রাখা দগ্ধ পাস-এর প্রতীক। ভাবি, কিছুটা হেঁটে গিয়ে মিনারটি খুঁটিয়ে দেখব। জোহানেসবার্গে আসার আগে ওয়েবসাইটে এ মিনারের ছবি দেখেছি। এখানকার বনেদি পত্রিকা 'সানডে টাইমস্‌' তাদের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে জোহানেসবার্গে অনেক স্ট্রিট-আর্ট প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। পাস-পোড়ানো মিনারটি তাদেরই এক নিদর্শন। এ স্মারক যিনি নির্মাণ করেছেন তিনিও ভারতীয় অভিবাসীদের বংশধর। পেশায় ভাস্কর এ তরুণীর নাম ঊষা সিরজারিম। ইন্টারনেটে তার কাজের নমুনা দেখে মনে হয়েছে, নানা মিডিয়াতে কাজ করেন তিনি। মনে হয়, মানসিক ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক রিচ্যুয়েল- এ দুই বিষয়বস্তু যুগ্ম থিম হিসেবে প্রচ্ছন্ন থাকে তার অভিব্যক্তিতে। আর্ট ক্রিটিকরা বলেন, ঊষা সিরজারিম তার অভিজ্ঞতার সাথে মেলান চিরায়ত সত্য। পড়েছি যে, তিনি বাস করেন জোহানেসবার্গের কাছাকাছি একটি টাউনশিপে। তার রঙিন বিড দিয়ে করা একটি কাজ আমার এত প্রিয় যে, তার ছবি আমি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে আমার ল্যাপটপে স্ট্ক্রিন সেভার হিসেবে ব্যবহার করছি। ভাবি, হয়তো তার নিবাস খুঁজে পেতে একদিন তাঁর সাথে কথাবার্তা বলতে যাব।

একটু সময় দাঁড়িয়ে আমি দূর থেকে স্মারক মিনারের দিকে তাকাই। এদিকের পেভমেন্টেও কারুপণ্য বিছিয়ে তৈরি কয়েকটি দোকানপাট। একটি দোকানে শৌখিন কিছু দ্রব্যের পাশে সাজানো ছানাসহ ছাগলের মূর্তি, জুতা-স্যান্ডেল ও লেডিস শু। অল্প বয়সী এক মহিলা ক্রেতা, সম্ভবত জাপান বা কোরিয়া থেকে আগত পর্যটক গ্রীবা বাঁকিয়ে খুব কিউট ভঙ্গিতে তাকান।

তো স্মারক মিনারের দিকে যেতে গেলে দশাসই চেহারার এক হকার পথ আগলে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দেন- 'স্টপ হিয়ার ম্যান, হ্যাঙ অন, হ্যাঙ অন; যাচ্ছ কোথায় হন হন করে?' উটকো ঝামেলায় বিরক্ত হয়ে বলি, 'স্ট্রিট আর্ট দেখব।' তিনি 'দ্যাট ইজ ফাইন, দ্যাট ইজ টোটালি ফাইন' বলে হাতখানেক লম্বা ক্লে-পাইপে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে খ্যাকখ্যাক করে হাসেন। তার গাত্রবর্ণে ঘন হয়ে জমে আছে দুর্যোগ রাতের তিমির। ভাবেসাবে মনে হয়,সড়কের তিনি যেন শাহান শাহ আমির, এমনভাবে সিনা চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে এড়াব কীভাবে ঠিক বুঝতে পারি না। 'তা তুমি স্ট্রিট আর্ট দেখবে, আমরা লোকাল আর্টিস্ট, আমরা আর্ট বিক্রি করছি স্ট্রিটে। আমাদের সওদা প্রথমে দেখ' বলে এ স্ট্রিট-কা-আমির তুলে ধরেন মস্ত বড় গাছের গুঁড়িতে কুঁদা ঝকমকে রঙিন বিড বসানো একটি কুমির। আমি নেতিবাচকভাবে মাথা হেলালে তিনি পথ আগলে তা কেনার জন্য চাপাচাপি করেন। পোলাইটভাবে বলি, 'দেখেন, হামিদিয়া মসজিদের আঙিনায় স্মারক মিনার দেখা হলে পর আমি আরও কিছুক্ষণ সড়কে সড়কে ঘুরে বেড়াব। তা এখনই একটি আস্ত কুমির কিনে ঘাড়ে করে তা ক্যারি করতে চাচ্ছি না।' হকার হিসেবে অত্যন্ত নাছোড়বান্দা তিনি; বিক্রি করার ধান্দা থেকে এক পা-ও নড়তে চান না। বলেন, 'পেমেন্ট করে কিনে রাখো, তারপর ঘোরাঘুরি শেষ করে ফিরে এসে সামান নিয়ে যাবে। কুমির কাঁধে নিয়ে মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়াও, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি। লুক হিয়ার.. আমি কুমিরের গায়ে অলরেডি সোল্ড লেখা স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছি।' আমি এবার বেঁকে উঠে বলি, 'নো, আই অ্যাম নট গোনা বাই দিস।' ক্লে-পাইপ থেকে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে তিনি দাঁতে দাঁত ঘষে বলেন, 'দেন ইউ আর নট গোনা গো টু দি মনুমেন্ট ইদার।' বুঝতে পারি, তার সাথে জোরাজুরি করে মিনারের দিকে যেতে চাইলে ঝামেলা হবে। তো আমি রিট্রিট করি।

দ্রুত হেঁটে সড়ক ধরে মোড় ফিরতেই হঠাৎ বেড়ে যায় ট্রাফিকের চলমানতা। আর চারদিক থেকে ধেয়ে আসে জনাপাঁচেক হকার। এদের কারও হাতে রঙিন তার-গুনা দিয়ে তৈরি গণ্ডারের খÿ, কেউ ধরে আছে গাছের ছালে আঁকা তিমি মাছ বা মহিষের প্রতীক। সবাই বলে, 'হ্যালো ম্যান, দিজ আর অল স্ট্রিট আর্টস্‌, বাই সাম ফ্রম মি।' অজানা অতিথির দিকে লেলিয়ে দেওয়া সরালী কুকুরের মতো হাতে নানাবিধ সওদা, হরেক রকমের ধকড়মাকড় নিয়ে জনা দুই হকার আমার গায়ের ওপর এসে পড়ে। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে একজন চেঁচাচ্ছে, 'ওয়াকিং স্টিক ওয়াকিং স্টিক'। সে হাতে যা ধরে আছে তা দেখতে অনেকটা দারোগার ডাণ্ডার মতো, দক্ষিণ আফ্রিকার ঝাণ্ডা হাতে ট্রাফিকে খাবি খেতে খেতে ছুটে আসে টি-শার্ট পরা দুই হকার। তারা এক সাথে ফুকারে- 'দিস ইজ নাও অ্যা নিউ কান্ট্রি, নিউ লাইফ, নিউ স্টার্ট, নিউ ফ্ল্যাগ- পতাকাকে সম্মান কর, কিনে নাও একটা।' তাদের বক্তব্যের সাথে আমি একমত হলেও এ মুহূর্তে ঝাণ্ডা কিংবা ডাণ্ডা কিছুই কেনার বাসনা নেই। তাই বলি, 'লিভ মি ইন পিস, আই অ্যাম নট গোনা বাই এনিথিং রাইট নাও।' হলুদ টি-শার্ট পরা এক হকার যেন আমার মন্তব্যে অবাক হয়ে তার জটাজুট বাম হাতের আঙুলে বিলি করতে করতে বিষণ্ণভাবে বলে, 'হোয়াই নট ম্যান? কামঅন, একটা দেশের পতাকাকেও কি তুমি রেসপেক্ট করবে না?'

আমি দ্রুত হেঁটে ঢুকে পড়ি ট্র্যাফিকের ভিড়ভাট্টাহীন গলিতে। পতাকাওলার অবাক বিষণ্ণ দৃষ্টি যেন আমার সাথে সাথে হাঁটে। একটি পণ্য না কিনলেই কি অসম্মান দেখানো হয়? কিন্তু তার দৃষ্টিতে আরও কিছু একটা ছিল। কিসের যেন ইশারা, আমি ঠিক ধরতে পারি না। চলে আসি খোলামেলা ছোট্ট এক মাঠের কাছে। চোখ মুদে খুব আকুল হয়ে গান করছে এক গায়ক, সুরে-তালে মারিমবা বাজিয়ে তাকে সঙ্গত্‌ করছে তারই মতো আরেক তরুণ। তাদের ঘিরে জনা কয়েক পথচারী; সবাই কৃষ্ণাঙ্গ, মৃদু ড্যান্স করে; এ স্ট্রিট জলসাটি যেন ভাসছে ঝঙ্কারের সপ্তডিঙায়। এ সুরের রেশ এমনই আলাভোলা, ঠিক অবজ্ঞা করতে পারি না। আপনা-আপনি দাঁড়িয়ে পড়তেই বালুচরে ধেয়ে আসা তরঙ্গের মতো ছন্দ-সুর উথলে ওঠে নিজের ভেতর। লিরিকের কথা, শব্দ বিবেচনায় বিচিত্র হলেও তা ছড়ায় অসামান্য ধ্বনি। আমি জার্নালের নোটবুক বের করে তাতে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া একটি দুটি বাক্য টুকে নিতে থাকি। কে যেন পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে, 'দিস ইজ জুলু সঙ মিস্টার।' আমি লিখি, 'সাইয়াহামবা হামবা/হামবা নাথি ..মকোহোলুলি.. মকোহোলুলি.. মকোহোলুলি।' গায়ক যেন দিল উজাড় করে গাইছে। একটু আগে স্ট্রিটে হকারদের উৎপাতে আমার মনে আবর্জনার মতো জমেছে যে ক্লেশ ও ক্লেদ; সুরের তরঙ্গ এসে তা ভাসিয়ে সাফ-সুতরা করে দেয় নিমিষে। পাশের পথচারী আবার ফিসফিসিয়ে আমার জন্য তর্জমা করেন গানের কথা- 'উই আর মার্চিং ইন দ্য লাইট অব গড।' দেখতে দেখতে গানের তোড়ে যেন ভরে উঠছে কালো মানুষদের চোখ-মুখে ঈশ্বরপ্রাপ্তির স্বর্ণালি আলো।

দিব্যি রিলাক্সভাবে দাঁড়িয়ে গান শুনছিলাম। এদিকে আবার হলো কী? চাপা হল্লার সাথে লোকজনের চলাচলে ছড়িয়ে পড়ছে হুড়াহুড়ি। একটি পিকআপ ট্রাকে মারিমবা ও বাদ্যযন্ত্রাদি তুলে গায়ক-বাদকরা লাফিয়ে ওঠে তার পেছনে। পিকআপ টায়ারে স্কিড করে খুব ড্রামাটিকভাবে ছুটে যায়। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমিও পা বাড়াই অন্য এক গলির দিকে। দেখতে দেখতে খুরে ক্লাপ ক্লাপ আওয়াজ তুলে এসে পড়ে অশ্বারোহী পুলিশের দুটি ঘোড়া। বিষয়টি রুটিন টহলের মতো দেখালেও বুঝতে পারি, কাছেই কোনো সিচুয়েশন ডেভেলপ করেছে, এবং তার সাথে গায়ক-বাদকদের সংযোগ থাকাও বিচিত্র কিছু না।

আমি সড়কে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করি। খেয়াল করে দেখি, একটি ছোট্ট ছেলে- স্ট্রিট কিড বা টোকাই আসছে আমার পেছন পেছন। সে এসে আমার হাত ধরে বলে, 'মিস্টার, তুমি মোবাইল ফেলে এসেছ; একটি ছেলে তা কুড়িয়ে পেয়েছে। ২০ রেন্ড দিলে তা ফেরত দেবে। চলো আমার সাথে, তার কাছে নিয়ে যাচ্ছি, আমাকে কিন্তু ৩ রেন্ড দিতে হবে।' তার সাথে যেতে যেতে ভাবি, একটু আগে সড়কে হকারদের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষির সময় হয়তো মোবাইল ফোনটা সড়কে পড়ে গেছে। একটু এক্সপেনসিভ গোছের ফোনটি মাত্র কাল পেয়েছি। ফিরে পেলে ভালো হয়। দিলাম না হয় টোকাইদের ২০ প্লাস ৩, মোট ২৩ রেন্ড; ৩ ডলারেরও কম। প্রায় নির্জন গলিতে ঢোকামাত্রই টোকাই হাওয়া হয়। খানিক দূর থেকে হলুদ টি-শার্ট পরা ফ্ল্যাগওলা আমাকে অবাক চোখে দেখছে। সে যেন কিছু বলতে চায়। সচরাচর মিলিটারি পুলিশ ব্যবহার করে এ ধরনের একটি সাইড-কার সড়কে পার্ক করা। তার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মোবাইল হাতে সাদা কোট পরা এক প্রৌঢ় কৃষ্ণাঙ্গ। তিনি মৃদু হেসে আমাকে 'গুড আফটারনুন' বলতেই কে যেন খপ করে আমার চোখ থেকে তুলে নেয় চশমা। আমি ঘুরে তাকাতে গেলে খুব দক্ষতায় আমার দু'হাত পিছমোড়া হয়ে বাঁধা পড়ে। আমি চশমাহীন চোখে খুব লাউড কালারের চক্রাবক্রা শার্ট পরা তরুণের মুখের দিকে তাকাই। সে আমার বাইফোকাল চশমাটি পরে তা কপালের ওপর দিয়ে তুলে কিন্তলি চুলে গোঁজে। আমি হতবাক হালতে তার চোখে চোখ রাখি। তাকে কিন্তু স্ট্রিট থাগ বা ক্রিমিনাল মতো দেখায় না একেবারে। বরং তার চেহারা-সুরত দেখে মনে হয়, কলেজে যায়নি সে আজ, একটু পর তার গার্লফ্রেন্ড এলে পার্কের বেঞ্চে বসে ওয়াকম্যানের ইয়ারফোন ভাগাভাগি করে তারা শুনবে হিপহপ সঙ্গীত। সাদা কোট পরা প্রৌঢ় গলা খাকারিতে 'এক্সকিউজ মি' বলে জানান, 'এ ইয়াংম্যান তোমাকে একটু সার্চ করবে। এ সময় কথাবার্তা না বলে চুপচাপ থাকলে বিবস্ত্র করে স্ট্রিপ সার্চের প্রয়োজন পড়বে না।' সড়কে দিগম্বর হওয়ার কোনো খায়েশ আমার নেই, তাই চুপচাপ খামোশ মেরে থাকি। ছেলেটি হিপ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে পথ খরচের একতাড়া রেন্ড ক্যাশিয়ারের দক্ষতায় দ্রুত গোনে। তার পর ব্যাকপ্যাক থেকে সস্তা নন-ডিজিটাল জেনিথ ক্যামেরা বের করে নিলে প্রৌঢ় কপাল কুঁচকে কী যেন ভাবেন। আমি অনুকম্পার জন্য তার চোখে চোখ রাখতে গেলে দেখি, তিনি আঙুলে ধূসর উলের গুটলির মতো অমসৃণ দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে কী একটা হিসাব নিকাশ করে নিচ্ছেন! ধবধবে সাদা কোটে তাকে দেখায় হাসপাতালের সার্জনের মতো। তিনি যেন রোগীর কী অসুখ হয়েছে, তার ডায়াগনোসিস করছেন। এমনভাবে বলেন, 'তোমার ওয়ালেটে কোনো ক্রেডিট কার্ড, ডলার বা ইউরো নেই, ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করছ নন-ডিজিটাল ক্যামেরা...ইউ আর ইনডিড অ্যা ক্লেভার চ্যাপ, কিন্তু পুরা বিষয়টা আমরা যারা স্ট্রিটে অপারেশন চালাই তাদের সাথে চিটিং করার মতো, ইয়েস, ইট ইজ অ্যা প্লেইন চিটিং অ্যান্ড ইউ ডিজার্ভ অ্যা মাইল্ড ট্রিটমেন্ট, ডলার, ইউরো, ক্রেডিট কার্ড গেস্ট হাউসের আয়রন সেফে রেখে তুমি জোহানেসবার্গের স্ট্রিটে নেমেছ। দিস ইজ মিন স্পিরিটেড, এ রকম ছোটলোকির পরিচয় যাতে ভবিষ্যতে না দাও সে জন্য দিস ইয়াংম্যান তোমাকে একটু ট্রিটমেন্ট দেবে।'

তরুণটি আমার কান ও মাথার একাংশ ছোট্ট একটা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে দিয়ে দ্রুত জেনিথ ক্যামেরা ক্র্যাশ করে। প্রচণ্ড বাড়ির তোড় সামলাতে না পেরে আমি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ি সড়কে। সে তোয়ালে দিয়ে সামান্য রক্তের দাগ মুছিয়ে আমাকে বসিয়ে দেয় ফুটপাতে। দৃষ্টি পরিস্কার হয়ে এলেই প্রৌঢ় ঝুঁকে এসে বলেন, 'দিস ইজ জোহানেসবার্গ, আমাদের অত্যন্ত ডিয়ার ডার্লিং সিটি। আমরা বলি জোজি, এখানে ল্যান্ড করামাত্র কোজি ফিল করাটা ঠিক না; আন্ডারস্ট্যান্ড?' আমি কোনো জবাব দেয়া বা রিঅ্যাক্ট করার আগেই তিনি বলেন, 'স্ট্রিটের দরিদ্র ব্ল্যাক হকারদের সাথে খারাপ আচরণ করাটা আমরা জোজি'তে একসেপ্ট করি না। আর স্ট্রিট আর্টিস্ট যারা তাদের সাথেও যাতে সম্মানজনক ব্যবহার কর, সে জন্য এ ইয়াংম্যান এবার তোমাকে একটু এডুকেশন দেবে।'

রোদে রূপালি ঝলক দেখামাত্র আমি চোখ বন্ধ করি। সার্জনের দক্ষতায় চাকুর অগ্রভাগ শার্টের কাপড় ফেড়ে ঢুকে পড়ে বাহুর নরম মাংসে।

সাইড-কার ছেড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনি। চোখের কোণ দিয়ে দেখি, তা স্টার্ট দিয়ে তরুণটি গিয়ারে ফেলছে, পাশের সিটে বসে প্রৌঢ়। ততক্ষণে আমার চোখ খুলছে অনুমান করে চলে যেতে যেতে তিনি বলেন, 'জেন্টেলম্যান, হ্যাভ অ্যা নাইস আফটারনুন ইন জোজি। অ্যান্ড ডোন্ট গেট মাচ্‌ কোজি।'

মনে হয় কানের ওপরে মাথায় ফুলে উঠছে। চোখে আলোর ফুলঝুরি নিয়ে ভাবি, এর চেয়ে খারাপ কিছু আর আজকে ঘটবে না। যা খোয়া গেছে যথা মোবাইল, কিছু রেন্ড বা ক্যামেরা, সবই রিপ্লেস করা যাবে। তখনই খেয়াল হয়, বাহু ভিজিয়ে ফুটপাতে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে রক্ত। সামান্য রক্তপাতে মৃত্যু আমার হবে না বটে, তবে এ ছুরিকা দিয়ে একদিন আগে যদি বিদ্ধ করা হয়ে থাকে অন্য কোনো এইচআইভি-এইডসে আক্রান্ত পথচারী পর্যটককে, তাহলে তার জীবাণু অবধারিতভাবে সংক্রমিত হবে আমার ধমনীতে। আতঙ্ক এবার গরম ভাতের ফ্যানের মতো বলকে ওঠে আমার মস্তিস্কের কোষে কোষে।
জাতীয় ঐক্যে আসতে আওয়ামী লীগকেও ৫টি দাবি মানতে হবে: ড. মোশাররফ

জাতীয় ঐক্যে আসতে আওয়ামী লীগকেও ৫টি দাবি মানতে হবে: ড. মোশাররফ

বিরোধী রাজনীতিকদের গড়া জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে হলে ক্ষমতাসীন ...

দক্ষিণ এশিয়া থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে শুধু বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়া থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে শুধু বাংলাদেশ

আগামী বছরের ফ্রেবুয়ারিতে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ...

ইলিশ উৎপাদন এ বছর ৫ লাখ টন ছাড়াবে

ইলিশ উৎপাদন এ বছর ৫ লাখ টন ছাড়াবে

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দ বলেছেন, চলতি বছর ইলিশের ...

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হেফাজত নেতা

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হেফাজত নেতা

ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভা সদরে এহসান সোসাইটি নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ...

সরকারি হলো আরও ৪৩ মাধ্যমিক বিদ্যালয়

সরকারি হলো আরও ৪৩ মাধ্যমিক বিদ্যালয়

দেশের বিভিন্ন উপজেলার আরও ৪৩টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি করা ...

বাংলা ভাষা ও বই কখনও অস্তমিত হবে না, লন্ডন বইমেলায় বক্তারা

বাংলা ভাষা ও বই কখনও অস্তমিত হবে না, লন্ডন বইমেলায় বক্তারা

যা শোভাবর্ধন করে তাকেই বলা হয় অলংকার। শরীরকে চাকচিক্যময় রাখতে ...

কালাইয়ে সমকাল প্রতিনিধির ওপর হামলা

কালাইয়ে সমকাল প্রতিনিধির ওপর হামলা

দৈনিক সমকালের জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা প্রতিনিধি শাহারুল আলমের ওপর ...

অবশেষে প্রেমের জয়

অবশেষে প্রেমের জয়

গত কয়েক দিনের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জয় হলো ...