শিশুশ্রম

শুনতে কি পাও?

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০১৮      

জোহরা শিউলী

ছোট ছোট হাত। সেই হাতের মাপে আঙুল। যতটুকু তার শরীর, ঠিক সেই মাপেরই এক বালতি। ঘর মোছার। প্রতিদিন আমি তাকে দেখি। খেয়াল করি। সে তাকায় আমার দিকে। কিন্তু খেয়াল করে না। আমি করি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। একদিন কমলা রঙের গেঞ্জি। তো আরেকদিন সবুজ। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টে সেই গুঁজে গেঞ্জি। ছোট্ট শরীরটায় প্রতিদিন বারান্দা মুছতে আসে। হয়তো পুরো বাড়ি মোছার পর এই বারান্দা মুছতে আসাটুকুই তার বিনোদন। ঝুলে ঝুলে গ্রিল মোছে। এরই মধ্যে উঁকি-ঝুঁকি মেরে গ্রিল গলিয়ে রাস্তার বারো রকমের জিনিস দেখে সে। খুশিতে চোখ কিছুটা চকচক করে তখন। আমি প্রতিদিন দেখি এই দৃশ্য। গোপনে। ওর সময়টা আমি জানি। তাই শীত-গ্রীষ্ফ্ম-বর্ষা আমি সকালের সেই সময়টার জন্য প্রতীক্ষা করি। কখন আসবে ছোট্ট সেই দেহধারী। কুটকুট করে ওর কাজ করে যাওয়া। অস্ম্ফুট আক্ষেপ প্রায়ই বের হয় আমার মুখ থেকে। এই শরীরে- এটুকু বয়সে কীভাবে পারে মানুষ ওকে দিয়ে কাজ করাতে! ছোট্ট সে মানুষ। ছোট্ট সে মন। যে মানুষ, যে মন বাঁধা পড়ে আছে চার দেয়ালের ইটপাথরে। কতই হবে আর বয়স? আট কিংবা নয়। এই বয়সে দু'বেলা পেটের দায়ে সে মানুষের বাসায় পড়ে আছে। এমন ছোট্ট ছোট্ট কচি হাত। এমন ছোট্ট কচি মুখ হয়তো আমরা রাজধানীসহ দেশের সব জায়গায় দেখতে পাব। শিশুশ্রম প্রতিরোধ নিয়ে হয়তো আমরা সমাবেশ করব। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে থেকে যাবে এমন কচি হাত, কচি মুখ।

শুধু কি বাসায়? কোথায় নেই আমাদের এই শিশুশ্রমের দৃশ্য! দোকানে। রাস্তায়। আর গণপরিবহনে তো দেখাই যায়। বিভিন্ন গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে শিশুদের সংখ্যা। জাতীয় শিশুনীতি অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশের সব ব্যক্তিই শিশু। ঢাকার বিভিন্ন পাবলিক বাস, মানব বহনকারী লেগুনা, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্যান্টিন- এসব জায়গায় শিশুশ্রমিকদের আধিক্য। এদের গড় বয়স ১২-১৩ বছরের কাছাকাছি। যে বয়সে একজন শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, সারাদিন ছোটাছুটি করার কথা, সেই বয়সে সে সারাদিন বিভিন্ন কাজের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দিন ব্যয় করছে। ফলে একদিকে যেমন এই শিশুরা তাদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা 'শিক্ষা' থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে এরা খারাপ সঙ্গের কারণে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এরা যখন কোনো কাজ পায় না কিংবা তাদের অর্থের চাহিদা বেড়ে যায় তখন তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফলে তাদের দ্বারা উপকারের চেয়ে সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণটা বেড়ে যায়। ঢাকায় বিভিন্ন রুট যেমন : নিউমার্কেট-ফার্মগেট, নীলক্ষেত-গুলিস্তান, জিগাতলা-মিরপুর, নীলক্ষেত-যাত্রাবাড়ী রুটে চলাচলকারী লেগুনাগুলোর প্রত্যেকটিতে টাকা আদায় করার জন্য শিশুদের নিয়োজিত করা হয়। কারণ, তাতে মালিক পক্ষের খরচ অনেক কম হয়। বয়স্ক শ্রমিককে যেখানে দৈনিক



৪০০-৫০০ টাকা দিতে হতো, সেখানে শিশুশ্রমিকদের মাত্র ১৫০-২০০ টাকা দিলেই হয়ে যায়। আবার অনেক পরিবহনের চালকের আসনেও শিশুদের দেখা যায়। আমরা প্রতিদিনই আমাদের চারপাশে দেখতে পাই বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বহু শিশুশ্রমিক। আজ শিশুরা শ্রম দেওয়া পর্যন্তই ক্ষান্ত নয়। সামান্যতম ভুলের কারণে অনেক শিশুর ওপর নির্যাতন করছেন বিভিন্ন বাসা ও অফিসের মালিকরা। অথচ ওই সব শিশুর বয়স এখন হাতেখড়ি বা পাঠশালা যাওয়ার আর খেলাধুলার। শুধু পরিবারের অর্থের জোগান দিতে তাদের যেতে হচ্ছে বিভিন্ন কলকারখানা ও বাসাবাড়িতে শ্রম দিতে। আর সে সুযোগে অনেক শিশুকে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। অথচ এই শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের কর্ণধার, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অতি দ্রুত যদি আমরা শিশুশ্রম বন্ধ করতে না পারি তাহলে একটা দুর্বল জাতির জন্য অপেক্ষায় আছি হয়তো আমরা।

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশের ওপরে। এ বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ২০ শতাংশের কম নয়। এত অল্প বয়স থেকে যদি তারা কঠোর পরিশ্রম করতে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে দেশের উৎপাদন কমে যাবে; কমে যাবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও। তাই ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকেই শারীরিক পরিশ্রমজনিত যে কোনো কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তাদের উপযুক্ত পরিবেশে বসবাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলে তারা দেশের জন্য অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদে পরিণত হবে। সর্বোপরি শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের ভবিষ্যৎ যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শ্রমিক নিয়োগে আমাদের সবার একটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরি, শ্রমিক এবং নিয়োগকর্তাদের মধ্যে ভালো শিল্প সম্পর্ক ও সম্পর্ক উন্নয়ন বজায় রেখে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য কমানো। আর সে ক্ষেত্রে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ দেওয়া আছে, বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। এই নিরসনের মধ্য দিয়ে হয়তো আমরা হাসিমুখের প্রতীক্ষা করতে পারব।

পরবর্তী খবর পড়ুন : শিখতে পারেন সাঁতার

একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

রাজনীতির নানামুখী হিসাব-নিকাশের কারণে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক আসনে ...

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। নারী-পুরুষ-শিশু সব ...

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক এমএনএইচ বুলু ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর রোড ...

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

একাদশ সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ...

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে ...

কলেজ শিক্ষকের ধর্ষণে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা!

কলেজ শিক্ষকের ধর্ষণে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা!

মাত্র ১০ বছরের মেয়েটি স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, ...

কর্নেল (অব.) জাফর ইমামের মনোনয়ন ফরম ছিনতাই!

কর্নেল (অব.) জাফর ইমামের মনোনয়ন ফরম ছিনতাই!

ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চাওয়া কর্নেল (অব.) জাফর ...

চোখ হারানো প্রত্যেকে পেলেন ৫ লাখ টাকা

চোখ হারানো প্রত্যেকে পেলেন ৫ লাখ টাকা

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে ...