সম্পত্তিতে অধিকারবঞ্চিত হিন্দু নারী

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

স্মৃতি চক্রবর্তী

বাংলাদেশে হিন্দু আইনে বিশেষ করে নারীর অধিকার প্রশ্নে আজও প্রাচীন ধ্যান-ধারণাই প্রতিষ্ঠিত। আসলে আমাদের দেশে হিন্দু নারীর অধিকার সংরক্ষিত হওয়ার মতো কোনো আইন প্রচলিত নেই। শুধু ১৯৪৬ সালের বিবাহিত নারীর বাসস্থান ও ভরণ-পোষণ আইনে অন্তর্ভুক্ত আদালতে দাম্পত্য অধিকার নিয়ে মামলা করা যায়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হিন্দু আইন সংস্কারের পক্ষে নানা সময়ে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সংস্কার প্রশ্নে যে গণতান্ত্রিক কিংবা সাংবিধানিক পরিবেশ দরকার, এর অনুপস্থিতি তখন যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। এই অনুপস্থিতির কারণে এক্ষেত্রে সংস্কার হয়নি। সময়ের দাবি মোতাবেক বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন প্রবর্তিত হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। শুধু নিজ উদ্যোগে যারা বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তারাই এই আইনের সুফল ভোগ করছেন। হিন্দু পারিবারিক আইন বহু পুরনো। সাড়ে তিন হাজার বছরেরও আগে গড়ে উঠেছে শাস্ত্রীয়ভিত্তিক এই হিন্দু আইন। হিন্দুদের প্রচলিত 'প্রথা'র ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে এই আইন। বিয়ে, দত্তক, অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার প্রভৃতি প্রশ্নে বাংলাদেশের আদালতে হিন্দুশাস্ত্রীয় আইন অর্থাৎ বিধিনীতির ওপর নির্ভর করে বিচারকার্য করা হয়। বিভিন্ন সময় প্রণীত সংসদীয় আইনেরও এখানে উল্লেখ থাকে। হিন্দু আইন যেহেতু 'প্রথা'নির্ভর আইন, তাই এই প্রথাগুলো ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। ফলে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন হিন্দু নারীরা। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন হচ্ছে। আগের দিনে হিন্দু নারীরা স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির অনেকেরই অবহেলা-অত্যাচার সহ্য করে জীবন-যাপন করতেন। কিন্তু এখন এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারিবারিকভাবে পরিবর্তন এসেছে।

আমাদের দেশে নারী সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়ে মামলা আদালতে আসে না। কারণ অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষই জানেন না পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ অনুযায়ী এখতিয়ার রয়েছে এ ব্যাপারে হিন্দু নারীদের আদালতে যাওয়ার। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক রিপোর্টে দেখা যায়, গত আট মাসে এই সংস্থায় মোট অভিযোগ  এসেছে ৯২৬টি। অধিকারবঞ্চিত হিন্দু নারীদের অভিযোগ এসেছে মাত্র ২৭টি। এর মধ্যে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কারণে ভরণ-পোষণ না দেওয়ার অভিযোগই বেশি।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চিত্রটা কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। সেখানে হিন্দু আইনে বিভিন্ন সময় এমন কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে এ জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়েছে এবং এর সুফল ভোগ করছে এই দেশের হিন্দু নারীরা। ১৯৪৭ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ কিংবা দেশ ভাগের পর ভারতে হিন্দু আইনে আরও সংস্কার সাধিত হয়েছে, যা হিন্দু নারীর সম্পত্তি অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচিত। নাবালকের সম্পত্তিবিষয়ক আইন ১৯৫৬, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৪৭ সালের পর হিন্দু আইনের ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার হয়নি। বাংলাদেশে হিন্দু আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রশ্নে আজও প্রাচীন ও রক্ষণশীল ধ্যান-ধারণাই প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে হিন্দু নারীদের পারিবারিক প্রায় ক্ষেত্রেই অধিকারের পথটি এখনও সংকুচিত। তারা বাবার, ভাইয়ের, সন্তান এমনকি স্বামীর সম্পত্তিতেও কোনো অধিকার রাখেন না। নানা প্রথার দোহাই দিয়ে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে- এই অভিযোগ নতুন নয়। হিন্দু নারীদের অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রচলিত পারিবারিক আইনে মামলা করা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে পথটা মসৃণ নয় এবং আইনের স্পষ্টতার কিংবা যথাযথ আইনের অভাবে সেই মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে যাচ্ছে না। এর ফলে সুফল পাচ্ছেন না অধিকারবঞ্চিত হিন্দু নারী। ভারতে ২০০৫ সালে সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার আইন পাস হয়েছে। কিন্তু আজও বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা এ ক্ষেত্রে অন্ধকারের অতলেই রয়েছেন। নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে নারীর সব অধিকারই আইনের কাঠামোবদ্ধ হওয়া উচিত। যুগ পাল্টাচ্ছে এবং এর আলোকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টানো উচিত। সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে নিরসন হতে পারে বৈষম্যের।

পরবর্তী খবর পড়ুন : বাসযোগ্য হোক পৃথিবী

সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে গিয়ে লাশ হলেন বাবা

সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে গিয়ে লাশ হলেন বাবা

মাগুরায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। সোমবার ...

জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ কী

জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ কী

বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক জোট-মহাজোট থাকার পর আবারও নতুন করে 'জাতীয় ...

তবুও জামায়াত ছাড়বে না বিএনপি

তবুও জামায়াত ছাড়বে না বিএনপি

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের দাবিতে জামায়াতকে ত্যাগ করবে না বিএনপি। ...

সাত বিভাগীয় শহরে হবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল

সাত বিভাগীয় শহরে হবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার দ্রুত ...

১৯৩ দেশই ভ্রমণ করবেন নাজমুন

১৯৩ দেশই ভ্রমণ করবেন নাজমুন

লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে এখনও হেঁটে চলেছেন নারী পরিব্রাজক ...

বঞ্চনার শেষ নেই শিক্ষা ক্যাডারে

বঞ্চনার শেষ নেই শিক্ষা ক্যাডারে

মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ১৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা। ...

বেদেপল্লীর বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ

বেদেপল্লীর বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ

পিচঢালা পথের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু বেদেপল্লীতে প্রবেশের রাস্তা। ...

শেষবেলায় আ'লীগের চমক ড. ফরাসউদ্দিন?

শেষবেলায় আ'লীগের চমক ড. ফরাসউদ্দিন?

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আর মাত্র তিন মাস পর একাদশ ...