তারও একটা প্রেস্টিজ আছে

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

বাসার তাসাউফ

মোতালিব একটি ছেলের নাম, একজন ছাত্রের নাম। আমি যে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা করছি, মোতালিব সেখানে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের ক্লাসে আমি বাংলা পড়াই। মোতালিব প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যেদিন ক্লাসে খুব বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত হতে পারে না এবং সব রকমের দুর্যোগ উপেক্ষা করেও যে ক'জন শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হয়; মোতালিব তাদের মধ্যে একজন। দশম শ্রেণিতে উঠে সে একদিনও স্কুল কামাই করেনি। মোতালিব ক্লাসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে হান্ড্রেড পার্সেন্ট মার্ক পেলেও পড়ার ক্ষেত্রে টেন পার্সেন্টও মার্ক পায় না। মনে আছে, তাদের ক্লাসে আমি একবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, 'লোকটিকে দশ টাকা দাও'- এটি কোন কারক হবে?'

মোতালিব সোজাসাপটা জবাব দিয়েছিল, 'ক্ষতিকারক!'

ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীরা হো হো করে হেসে উঠেছিল। কিন্তু মোতালিবের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই। আমি তার এরূপ জবাবে বিচলিত না হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, 'এটা কীভাবে ক্ষতিকারক হলো বুঝিয়ে দাও।'

মোতালিব আমাকে বোঝাল, 'লোকটিকে যদি আমি দশ টাকা দিয়ে দিই- তাহলে আমার দশ টাকা লস হবে, আমি টিফিনের সময় শিঙ্গাড়া খেতে পারব না। আমাকে উপোস থাকতে হবে। সুতরাং এটা ক্ষতিকারকই হবে।'

মোতালিবের সহপাঠীরা আবারও হেসে উঠল। সে বিরক্তিমাখা চোখে তাদের দিকে তাকাল। বোধ হয় একটু রাগ হচ্ছিল তার। আমি আর কথা না বাড়িয়ে তাকে নিজ আসনে গিয়ে বসতে বলে পাঠদানে মনোযোগী হলাম। তারপর ক্লাস শেষে যখন আমি কক্ষ থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন মোতালিব ছুটে এসে সহপাঠীদের অলক্ষ্যে আমাকে বলেছিল, 'স্যার! আপনি তো জানেন আমি পড়া মনে রাখতে পারি না। কোনোমতে বন্ধুদের খাতা দেখে দেখে লিখে পরীক্ষায় পাস করে টেন পর্যন্ত উঠেছি। এখন আর আমাকে এভাবে লজ্জা না দিলে হয় না? আমারও তো একটা প্রেস্টিজ আছে!'

আমি তার প্রেস্টিজ রক্ষার কথা ভাবতে ভাবতে অন্য ক্লাসে প্রবেশ করলাম।

এর মধ্যে স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেল। মোতালিবের বাংলা খাতা নিরীক্ষণ করতে গিয়ে আমি যা দেখলাম, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি'র পাঠ থেকে উদ্দীপক উল্লেখ করে যে সৃজনশীল প্রশ্ন করা হয়েছে, জ্ঞান ও অনুধাবনমূলক প্রশ্নের যা উত্তর লিখেছে, তা তো ভুল হয়েছেই, প্রয়োগে এসে অর্থাৎ 'গ' প্রশ্নের জবাবে সে যা লিখেছে তা পড়ে আমি বিস্ময়ে ত থ দ হয়েছিলাম। প্রশ্নটা ছিল-

গ. সংক্ষেপে সিপাহী বিদ্রোহ লেখ।

মোতালিব উত্তর দিতে গিয়ে যা লিখেছে তা হুবহু তুলে দিলাম এখানে:

'একদল সিপাহী ও এক গাদা (গাধা) ইংরেজ।

সিপাহী এগোল, ইংরেজ পিছোল, এরপর ইংরেজ বন্দুক বেড় (বের) করল। সিপাহী দৌড় মারিল। যুদ্ধ শুরু।

সিপাহী : ধুস, ধুস, ডিসকাও।

ইংরেজ : ঐ (ও) মাই গড! গুলি ইন মাই পেট। আহ্‌ আহ্‌।

সিপাহী : ধর বেটা ইংরেজকে।

ইংরেজ : কিপ রানিং। সিপাহী কামিং। ধুস, ধুস, ধুস, ডিসকাও, ধরাম।

এই ভাবে সকল ইংরেজ মরিল।

ক্লাসরুমে এসে মোতালিবকে ডেকে নিয়ে আমি বললাম, বলো তো সিপাহী বিদ্রোহ কাকে বলে?

মোতালিব চুপ, একেবারে নিঃশব্দ হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীরা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেও আড়চোখে একবার সবাইকে দেখে নিয়ে লাজনম্র গলায় আমাকে বলল, স্যার, আমি যা জানি, তা তো খাতায়ই লিখে দিয়ে এসেছি।

আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, খাতায় যা লিখেছ, তা-ই আরেকবার বলো, শুনি।

আমার মনে নেই।

মনে নেই কেন? খাতায় তো তুমিই লিখেছ। এখন মনে নেই কেন? তাহলে কি তুমি নকল করে খাতায় লিখেছ?

জি না স্যার। নকল করিনি। আমি কখনও নকল করি না।

আমি জানি, মোতালিব কখনও পরীক্ষায় নকল করে না। পাশে বসা কোনো সহপাঠীর খাতা থেকে দেখে লেখে নয়তো নিজে বানিয়ে বানিয়ে লিখে পরীক্ষা দেয়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মোতালিব বলল, স্যার, আমি এই প্রশ্নের উত্তরটা বানিয়ে লিখেছিলাম তো তাই এখন আর মনে পড়ছে না।

শুধু এখানেই শেষ নয়। মোতালিবের খাতায় আরও একটি মজার বিষয় ছিল। অন্য একটি উদ্দীপকের সৃজনশীল ধারার জ্ঞানমূলক প্রশ্নের জবাবে যা লিখেছে, তা পড়ে আমি না হেসে পারিনি। হাসতে হাসতে তখন আমার মনে হয়েছে, মোতালিব এই লেখাটি তার কোনো সহপাঠীর খাতা দেখে দেখে লিখেছে। কিন্তু চুরি করে অন্যের খাতা দেখে লিখতে গিয়ে সে কিঞ্চিৎ ভুল করে ফেলেছে। মূলত উত্তরটি হবে, 'সল্ফ্রাট জাহাঙ্গীর কিছুতেই ভাঙ্গিয়া পড়িত না।' আর মোতালিব তা চুরি করে লিখতে গিয়ে না বুঝে লিখেছে 'সম্রাট জাহাঙ্গীর কিছুতেই জাঙ্গিয়া পরিত না।'

মোতালিব ভুল করে লিখেছে। কিন্তু আমি ভুল করিনি। তাই তার সহপাঠীদের সামনে এসব কথা কথা প্রকাশ করিনি। কারণ আমি ভুলে যাইনি- তারও একটা প্রেস্টিজ আছে।
সিরাজগঞ্জে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

সিরাজগঞ্জে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

সিরাজগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর মৃত্যদণ্ডের রায় দিয়েছেন ...

টেস্ট দলে ঢুকলেন সাদমান ইসলাম

টেস্ট দলে ঢুকলেন সাদমান ইসলাম

বাংলাদেশ ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের জন্য ১৩ ...

মমতাজের পরিবারে নতুন সদস্য

মমতাজের পরিবারে নতুন সদস্য

দাদি হলেন ফোক গানের জনপ্রিয় শিল্পী মমতাজ বেগম। সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ...

ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটের পুনঃভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটের পুনঃভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‌‘ঘ’ ইউনিটের পুনঃভর্তি পরীক্ষার ফল ...

সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ...

বাংলাদেশ ফিল্ডারদের দৃষ্টিভঙ্গি দ. আফ্রিকার মতো!

বাংলাদেশ ফিল্ডারদের দৃষ্টিভঙ্গি দ. আফ্রিকার মতো!

বড় রান তাড়া করার পেছনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বড় সমস্যা ধরা ...

খালেদা জিয়া নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন: ফখরুল

খালেদা জিয়া নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন: ফখরুল

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ...

‘ছবি মুক্তি না পাওয়ায় শান্তি পাচ্ছি না’

‘ছবি মুক্তি না পাওয়ায় শান্তি পাচ্ছি না’

যশোরের মেয়ে আইরিন সুলতানা। ঢাকাই ছবির এই প্রজন্মের অন্যতম পরিচিত ...