নেপথ্যে বিপুল অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭     আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭      

আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী। বন্দরের পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আনা-নেওয়ার জন্য যেসব ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ব্যবহার হয়, সেগুলোর অধিকাংশই ভাড়া হয় এখান থেকে। পণ্য খালাসের পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া নেয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের মাধ্যমে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিগুলোকে গাড়ি ভাড়া করে দেন বন্দোবস্তকারীরা। প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে দেশজুড়ে আসা-যাওয়া করে প্রায় আট হাজার ট্রাক-কাভার্ডভ্যান। গাড়িগুলো ভাড়া করে দিয়ে বন্দোবস্তকারীরা বার্ষিক আয় করেন প্রায় তিনশ' কোটি টাকা। এই টাকার কমিশন বাণিজ্যের দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে নগরের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের অনুসারীদের অবৈধভাবে বন্দোবস্তকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে চাপ দিতে থাকে তারা। বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় পরিবহন ব্যবসায়ী হারুন চৌধুরী। এর জের ধরে তাকে খুন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে পাঁচ দিন পেরোলেও খুনে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

নগর পুলিশের কোতোয়ালি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, 'কদমতলীকে ঘিরে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এতে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে একটি সন্ত্রাসী চক্রের। তারা এটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এর জের ধরে হারুনকে খুন করা হয়েছে বলে ধারণা করছি। জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।'

কদমতলীর বাসিন্দা, পরিবহন ব্যবসায়ী ও বন্দোবস্তকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কদমতলী, মতিয়ারপুল, ধনিয়ালাপাড়া, পশ্চিম ও পূর্ব মাদারবাড়ীকে ঘিরে রয়েছে কয়েক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে

রয়েছে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, তেল, পুরনো লোহা-লক্কড় ও স্টিল শিট বিক্রির প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রয়েছে শুভপুর বাস ও কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড। এখানে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার গাড়ি সরবরাহ করেন বন্দোবস্তকারীরা। বিনিময়ে প্রতিটি ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের মালিকের কাছ থেকে কমিশন নেন ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। কদমতলী এলাকায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বন্দোবস্তকারী রয়েছে প্রায় ৫০০ জন। তাদের কোনো কার্যালয় নেই। তাদের প্রতিদিন গড় আয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিদিন সকালে কদমতলীর পলাশী মোড়ে জমায়েত হন সবাই। এরপর সারাদিন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির চাহিদা অনুযায়ী পরিবহন সরবরাহ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলার পরিবহন মালিক ও চালকদের সঙ্গেও বন্দোবস্তকারীদের যোগাযোগ রয়েছে। তারাও চট্টগ্রামে পণ্য নিয়ে এলে ফিরতি ভাড়া নিয়ে দেওয়ার জন্য বন্দোবস্তকারীদের অনুরোধ করেন। কমিশনের মাধ্যমে বন্দোবস্তকারীরা ভাড়া নিয়ে দেন মালিক ও চালকদের। প্রতিবছর এখানে কমিশন লেনদেন হয় প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা।

আরও জানা যায়, এর বাইরে প্রতিদিন কদমতলী মোড় থেকে মাদারবাড়ী ও কদমতলী রেলগেট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত প্রায় এক হাজার গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। প্রতিটি গাড়ি থেকে স্থানীয়রা আদায় করেন গড়ে ৩০০ টাকা। যার বাড়ির সামনে এসব গাড়ি রাখা হয়, তারাই এই টাকা নিয়ে থাকেন। এ খাতে লেনদেন হয় বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সড়কের পাশে কয়েক শতাধিক হকার বসে প্রতিদিন। তাদের কাছ থেকেও স্থানীয় লোকজন নিয়মিত টাকা তুলে থাকেন। এখানে বার্ষিক লেনদেন হয় প্রায় দুই কোটি টাকা। এ কমিশন বাণিজ্যে নজর পড়ে নগরের সিআরবি কেন্দ্রিক একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের। তাদের হয়ে এ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে সদরঘাটের মরিচ্যাপাড়ার মোশাররফ হোসেন লিটন, পশ্চিম মাদারবাড়ী চট্টলা বেকারি এলাকার মো. নুরনবী, আলমগীর, জাহাঙ্গীর, কায়সার ও তাদের সহযোগীরা। তারা সহযোগী হিসেবে তাদের অনুসারীদের নিয়োগ দিতে নিয়মিত বন্দোবস্তকারীদের চাপ দিতে থাকে। চাপের মুখে প্রায় অর্ধশতাধিক নিয়োগও দেওয়া হয়। কিন্তু গত ২৭ নভেম্বর পলাশী মোড়ে এসে তাদের আরও অনুসারীদের নিয়োগ দিতে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। এ ছাড়া তাদের অনুসারীরা কাজ করুক আর না করুক তাদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা করে দিতে হবে বলে জানায়। নইলে লাশ পড়বে বলে হুমকি দেয়। তাদের এসব দাবির প্রতিবাদ করেন হারুন চৌধুরী। এ সময় লিটনকে ধরে পুলিশের হাতেও তুলে দেওয়া হয়। পরে সে ছাড়া পায়। এর জেরে গত ৩ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় হারুনকে।

চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা ট্রাক-কাভার্ডভ্যান বন্দোবস্তকারী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুর খান সমকালকে বলেন, 'এতদিন শান্তিপূর্ণভাবে সবাই ব্যবসা করে আসছিল। গাড়ি সরবরাহ করতে না পারলে বন্দোবস্তকারীরা টাকা দেবে কীভাবে। হারুন চৌধুরীও বন্দোবস্তকারী ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। তাই তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। এর জের ধরে তাকে খুন করা হয়েছে।'

এ হত্যার পর তার ভাই হুমায়ুন চৌধুরী মামলা করেন। সেখানে স্থানীয় ১০ সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার এজাহারে কমিশন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সুফিউর রহমান টিপু সমকালকে বলেন, 'কিছুদিন ধরে একটি সন্ত্রাসী চক্র এখানে ঢুকে ব্যবসার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করা হয়েছে।'

প্রতিবাদ সমাবেশ

গতকাল বিকেলে কদমতলী এলাকায় এ হত্যার প্রতিবাদে সন্ত্রাস দমন কমিটির ব্যানারে সমাবেশ করেছেন স্থানীয় লোকজন। এতে নিহত হারুনের পরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী নেতা, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতি ও বন্দোবস্তকারী সমিতির নেতারা বক্তব্য দেন। তারা পাঁচ দিনেও খুনিদের গ্রেফতার করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিষয় : চট্টগ্রাম

পরবর্তী খবর পড়ুন : নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে বিএনপি

আরও পড়ুন

জম্মু ও কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন জারি

জম্মু ও কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন জারি

ভারতে বিজেপি তাদের জোটশরিক মেহবুবা মুফতির পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) ...

সাংবাদিকদের সত্যতা যাচাইয়ের প্রশিক্ষণ দেবে গুগল

সাংবাদিকদের সত্যতা যাচাইয়ের প্রশিক্ষণ দেবে গুগল

সাংবাদিকদের হাত দিয়ে যাতে কোনও ভুল খবর বেরিয়ে না যায় ...

৩ সিটি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিক্রি করছে বিএনপি

৩ সিটি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিক্রি করছে বিএনপি

রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় ...

তিন বন্ধুকে নিয়ে আবারও আসছে 'থ্রি ইডিয়টস'!

তিন বন্ধুকে নিয়ে আবারও আসছে 'থ্রি ইডিয়টস'!

বলিউড পরিচালক রাজকুমার হিরানি পরিচালিত 'থ্রি ইডিয়টস' ২০০৯ সালে বক্স ...

বাসস্ট্যান্ডে ঢলে পড়লেন ওসি, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু

বাসস্ট্যান্ডে ঢলে পড়লেন ওসি, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু

সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিয়াজুল ইসলাম স্ট্রোকে আক্রান্ত ...

অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি: কাদের

অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি: কাদের

আগামী অক্টোবর মাসে নির্বাচকালীন সরকার গঠন করা হতে পারে জানিয়ে ...

খালেদা জিয়াকে আইনের চেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে: আইনমন্ত্রী

খালেদা জিয়াকে আইনের চেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আইনে ...

বলিউডের সবচেয়ে খারাপ অভিনেতা সালমান খান!

বলিউডের সবচেয়ে খারাপ অভিনেতা সালমান খান!

বলিউড সুপারস্টার সালমান খান অভিনীত 'রেস ৩',' টাইগার জিন্দা হ্যায়', ...