সমকালের গোলটেবিলে বক্তারা

ন্যায্য হিস্যা চায় চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০১৮      

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে শনিবার সমকাল ব্যুরো কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় 'কেমন চট্টগ্রাম চাই' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক—সমকাল

চট্টগ্রামের উন্নয়ন হলেও নেই পরিকল্পনার ছাপ। বন্দরনগরীকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। পাল্টাতে হবে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি। সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বাড়াতে হবে। ব্যাংক-বীমাসহ সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপন করতে হবে। উন্নয়নের সঙ্গে যোগ করতে হবে জনগণের প্রত্যাশা। এসব মেনে প্রকল্প গ্রহণ না করায় মানুষের মনে দানা বাঁধছে ক্ষোভ। চট্টগ্রামবাসী চায়, উন্নয়নের ন্যায্য হিস্যা। তারা চায়, বৈষম্যমুক্ত বরাদ্দ; আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত প্রশাসন।

দৈনিক সমকাল আয়োজিত 'কেমন চট্টগ্রাম চাই' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেছেন।

সমকাল চট্টগ্রাম ব্যুরো কার্যালয়ে শনিবার আয়োজিত এ বৈঠকে সিটি মেয়র, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক মেয়র, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, বন্দর, সিটি করপোরেশন, পিডিবি, ওয়াসা, গ্যাসসহ সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা বক্তব্য উঠে এসেছে। বক্তারা জানিয়েছেন তাদের ক্ষোভের কথাও।

সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এস এম শাহাব উদ্দিন।

ব্যুরোপ্রধান সারোয়ার সুমনের সঞ্চালনায় গোলটেবিলে বক্তব্য দেন সিটি করপোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান, সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ড মেম্বার জাফর আলম, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহাবুবুল আলম, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, পিডিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মকবুল হোসেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বোর্ড মেম্বার হাসান মুরাদ বিপ্লব, নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারী, চট্টগ্রাম ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) রতন কুমার সরকার, বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক আবুল বশর চৌধুরী, কনফিডেন্স সিমেন্টের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমদ, চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) প্রকৌশলী মঞ্জুরুল হক, পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মকবুল হোসেন, সমকালের সহকারী সম্পাদক ও সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় প্রধান সিরাজুল ইসলাম আবেদ, ডিজিএম (মার্কেটিং) সুজিত কুমার দাশ, চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম।

সমকাল আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন-সমকাল

কাঙ্ক্ষিত চট্টগ্রাম নগরী গড়তে না পারার জন্য '৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ব্যর্থতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে বৈঠকে উল্লেখ করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, 'মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ায় এ শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। যে যেভাবে পারছে, নিজেদের মতো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর নেতিবাচক ফল এখন সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে সেবাধর্মী সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চট্টগ্রামের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। উন্নয়নের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে চট্টগ্রামবাসীকে। সিটি করপোরেশনকে সত্যিকারের ক্ষমতা দিতে হবে। প্রকল্প পাঠানোর পর তা যেন দ্রুত পাস হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে।'

এ সময় মেয়র সব দল-মতের মানুষকে নিয়ে প্রত্যাশার চট্টগ্রাম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।

সমকাল চট্টগ্রামের মুখপত্র হিসেবে কাজ করবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, 'চট্টগ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণভোমরা। দেশের স্বার্থেই চট্টগ্রামের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে এ কাজ করতে হবে।'

সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, 'গত নয় বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। চট্টগ্রামে এ উন্নয়নের ছোঁয়া থাকলেও রয়েছে পরিকল্পনার অভাব।' প্রত্যাশার চট্টগ্রাম গড়তে মেয়রের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারাকে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের বড় সার্থকতা বলে উল্লেখ করেন সমকাল সম্পাদক। চট্টগ্রামের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে রাজধানীতে আরও বড় পরিসরে গোলটেবিল বৈঠক করার ঘোষণা দেন তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে সমকালের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এস এম শাহাব উদ্দিন বলেন, 'ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রামের বিশেষ অবদান রয়েছে। অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে সেই অনুপাতে চট্টগ্রামবাসী তেমন কিছু পেয়েছেন বলে মনে হয় না। চট্টগ্রাম বন্দর ও শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। চট্টগ্রামবাসীর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি মূল্যায়িত হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। চট্টগ্রামের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সেটিও অক্ষুণ্ণ রাখা যায়নি। শুধু বলার খাতিরে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী না বলে বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চাই। চট্টগ্রামকে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে হবে।'

সাবেক সিটি মেয়র ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'সংসদ, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ না থাকলে দেশ কীভাবে চলবে। চট্টগ্রামের অবস্থাও হয়েছে তাই। আগে মেয়র প্রতি মাসে সভা করতেন। ওয়ার্ড কমিশনাররাও থাকতেন। সকল সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন অফিসিয়াল কমিশনার। সব সেবা সংস্থার প্রধানের এ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন মেয়রের ক্ষমতা ছিল। এখন মেয়রের হাত-পা আইন দিয়ে বাঁধা। সিটি করপোরেশনকে তার গতিতে কাজ করতে দিতে হবে।'

পুরো চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় একটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি করার প্রস্তাব করেন তিনি। চট্টগ্রামে সব বড় প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে যাওয়ার আগে এ কমিটি থেকে ছাড়পত্র নিলে সহজে প্রকল্প পাস হবে বলে মনে করেন তিনি।

চট্টগ্রামের উন্নয়নে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন সাবেক পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, 'সমস্যার কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন। এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন তো সেই বলার অধিকারও নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় আমলারা এখন কথা শুনতে চাইছেন না। গণতন্ত্রকে তালাবদ্ধ করে রেখে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে খুলে দিতে হবে।'

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'চট্টগ্রামের জন্য ১৯৬১ সালে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল। একই সময়ে চেন্নাইয়ের জন্য একই মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। তারা এটি বাস্তবায়ন করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা পড়ে আছি সেই তিমিরেই। চট্টগ্রামে কী পরিমাণ জনসংখ্যা আছে, তার কোনো বাস্তব হিসাব নেই। শিল্পায়ন ছাড়া কোনো পরিকল্পনা হতে পারে না। শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পায়নকে ঘিরেই নগরায়ণ। শিল্পের জন্য মানুষ আসবে। এ মানুষকে ঘিরেই গড়ে উঠবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য বিষয়। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামের মানুষকে মর্যাদা দিতে হবে, নয়তো পুরো দেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে।'

গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণের কড়া সমালোচনা করেন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান। তিনি বলেন, 'যা হয়েছে, হয়েছে। আর না। নগরীর লালখান বাজার থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ফ্লাইওভার করা হলে খুব খারাপ অবস্থা হতে পারে। আবার কর্ণফুলী নদীকে দেশের প্রাণ বলা হচ্ছে। এটাকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। অথচ নদীটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কর্ণফুলী নদী কার নিয়ন্ত্রণে, সেটাই বুঝতে পারছি না।'

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'চট্টগ্রামের অগ্রগতির জন্য বিমান ও রেলওয়ের কানেকটিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যেসব পণ্য অন্যত্র যাচ্ছে, তা সরাসরি বন্দর থেকে খুব কম সময়ে চলে যেতে পারবে। সেইসঙ্গে এপপ্রেস লাইনও খুব প্রয়োজন। কর্ণফুলী ড্রেজিং অবশ্যই দরকার। কর্ণফুলী না বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে না। বন্দরকে বাঁচাতে হলে কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে। বর্তমানে জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের বড় অভিশাপ। অথচ ড্রেজিং করা হলে এই জলাবদ্ধতা থাকবে না। বন্দর জেটির প্রতিটি গেটে স্ক্যানার বসানো সম্ভব হয়নি। এটি আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সর্বোপরি সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া চট্টগ্রামের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না।'

চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, 'আমরা বায়ু-শব্দদূষণের, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া চট্টগ্রাম চাই না। বাস্তবায়নহীন মাস্টারপ্ল্যান চাই না। পরিকল্পিত একটি চট্টগ্রাম চাই। সুশৃঙ্খল একটি বন্দর চাই। বন্দরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ারও বাড়ানো উচিত। যে কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে ভালো করে স্টাডি করতে হবে। তাতে মানুষের চাওয়া-পাওয়াও সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।'

গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, 'চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হলেও এখানে রাজধানী ঢাকার মতো বিশেষায়িত কোনো হাসপাতাল নেই। এ জন্য চট্টগ্রামে হৃদরোগ, ক্যান্সার, শিশু হাসপাতালসহ বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য হেলথ কার্ড ও টেলিচিকিৎসা ব্যবস্থাও চালু করতে হবে।'

মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক ও বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, 'সব দিক দিয়ে বিবেচনা করলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন অসম্ভব। তাই যা করণীয়, তার বাস্তবিক প্রয়োগ করে বসবাস উপযোগী একটি বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তোলা উচিত। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও এর কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, কী থাকলে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে তা ভুলে বসে আছি। নতুন কোনো ব্যাংক আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। উল্টো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এখান থেকে সরে যাচ্ছে। সর্বশেষ চা বোর্ডও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন কিন্তু ফ্রি ইকোনমি। অথচ আমাদের এখনও ঢাকায় দৌড়াতে হচ্ছে আইপির জন্য। কেন এমন হবে?'

কনফিডেন্স সিমেন্টের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহির উদ্দিন আহমদ বলেন, "আমরা নিজেরাই চট্টগ্রামের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করি। ব্র্যান্ডিং না করে চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতার নগরী হিসেবে স্বীকৃতি দিই। অথচ চট্টগ্রাম শহর থেকে দেড় ঘণ্টায় রাঙামাটি, দুই ঘণ্টায় বান্দরবান ও আড়াই ঘণ্টায় কপবাজারের মতো দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায়। এর পরও আমরা চট্টগ্রামকে ওই জায়গায় নিয়ে যেতে পারিনি। তাই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী, বন্দরনগরী নয়, চট্টগ্রামকে 'থ্রি বি'স নগরী হিসেবে নতুন করে ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন।"

তিনি আরও বলেন, 'ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আট লেন করতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় চরম মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যতে।'

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য হাসান মুরাদ বিপ্লব বলেন, 'চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চসিকসহ সব দপ্তরকে একত্র হয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলে এই নগরীর উন্নয়ন অনেক এগিয়ে যাবে। নির্মাণসামগ্রীর নকশা প্রণয়নে নিজ নিজ এলাকার কাউন্সিলরদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটা হলে কেউ অবৈধভাবে যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। চট্টগ্রামে বর্তমানে যানজটের অবস্থা ভয়াবহ। সেইসঙ্গে গণপরিবহনগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। শুধু বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করলে হবে না। পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার অনেকগুলোই চলমান।'

মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য নগরী করা সম্ভব হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রাম ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন কুমার সরকার বলেন, '১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো ওয়াসা অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালে মধ্যে চট্টগ্রামে পানির শতভাগ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। বর্তমানে নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ পানির চাহিদা সরবরাহ করে চট্টগ্রাম। আগামী জুনের মধ্যে চালু হবে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-২ নামে আরও একটি প্রকল্প। এ ছাড়া নগরীর স্যানিটেশন ও স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জন্যও প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।'

পিডিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মকবুল হোসেন বলেন, 'চট্টগ্রামে এখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের যে সমসা হচ্ছে, তা মেইনটেন্যান্স কাজের জন্য হচ্ছে।'

তিনি বলেন, 'ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার খুঁটি ও ২২টি সাবস্টেশন স্থাপন করা হচ্ছে। শিগগির এর সুফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া আট লাখ গ্রাহককে হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে মিটারগুলো প্রি-পেইডে রূপান্তর করা হচ্ছে।'

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রাম কসমোপলিটনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিট বলেন, ২০০৮ সাল থেকে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে সাত-আট হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে আছে। আরও ২০ বছর ব্যবসা করলে সে টাকা উঠে আসে কি-না সন্দেহ। এলএনজি দিয়ে এত বড় ক্ষতি আদৌ পুষিয়ে নেওয়া যাবে কি-না সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, 'জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ প্রজন্ম। এই তরুণ প্রজন্মকে অর্থনীতির মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিমালা করা প্রয়োজন। তাদের সিঙ্গেল ডিজিটে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। তরুণদের জন্য চট্টগ্রামে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।'

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারী বলেন, চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপদানে সিডিএ মাস্টারপ্ল্যানের দিকনির্দেশনার আলোকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এরই মধ্যে নগরের অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অনেক প্রকল্প কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম পরিকল্পিত নগরে পরিণত হবে।

সমকাল আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা-সমকাল

সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ বলেন, হাজার বছরের ইতিহাস অতিক্রম করে আমাদের আজ প্রশ্ন করতে হচ্ছে- কেমন চট্টগ্রাম চাই। এর পেছনে বড় কারণ হলো, পরিকল্পনা যা ছিল তার বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হয়নি। আধুনিক একটি চট্টগ্রাম পেতে চাইলে সব সেক্টরের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সেইসঙ্গে লিঙ্গবৈষম্য রোধ ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এই গোলটেবিল বৈঠককে 'যেমন চট্টগ্রাম চাই'- এই ক্যাম্পেইনে নিয়ে যেতে হবে। যেখানে পুরো চট্টগ্রামবাসী অংশগ্রহণ নিতে পারবে। শিক্ষার্থীসহ প্রতিটি সেক্টরের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। তিনি প্রস্তাব দেন, ক্যাম্পেইনের একটি পুস্তিকা তৈরি করে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) প্রকৌশলী মঞ্জুরুল হক বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা হচ্ছে ৫১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয় মাত্র ২০৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১০ সালের পর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব আবাসিক সংযোগও। লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) বাস্তবায়ন হলে আগামী এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত গ্যাসের চাহিদা থাকবে ৬১২ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে আবাসিক-অনাবাসিকসহ গ্রাহক ছয় লাখ দুই হাজার। অন্যদিকে গ্যাসের অপচয় রোধ করতে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের জন্য একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছি। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। ইউনিটপ্রতি আবাসিক গ্রাহকদের গুনতে হবে ১৫ টাকা করে, যা বাস্তবায়ন করা হলে কোনো ধরনের অসন্তোষও হবে না। সারাদেশের সঙ্গে মিল রেখে ইউনিটপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনাকালে চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান সারোয়ার সুমন বলেন, 'পরিকল্পিত চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সবার পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সমকাল এ কাজ আন্তরিকভাবে করতে এগিয়ে এসেছে।'

সমকাল চট্টগ্রাম ব্যুরো ডিজিএম (মার্কেটিং) সুজিত কুমার দাশ বলেন, 'চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণায় আছে, বাস্তবে নেই। বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও এখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় নেই। ফলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সবাইকে দৌড়াতে হয় ঢাকায়।'

ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির তথ্য নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়

ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির তথ্য নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়

সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের শীর্ষ ১০ জন ঋণ খেলাপির তথ্যসহ ব্যাংকগুলোর ...

কামরানের নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন

কামরানের নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন

শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির শহর হিসেবে হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত ...

বোমা হামলার অডিও ফাঁস জড়িত দুই 'ভাই'

বোমা হামলার অডিও ফাঁস জড়িত দুই 'ভাই'

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে বোমা হামলা নিয়ে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের পর ...

এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে, তারপরও ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রতিদিনই এগিয়ে ...

চলন্তিকা হাতিয়ে নিয়েছে একশ' কোটি টাকা

চলন্তিকা হাতিয়ে নিয়েছে একশ' কোটি টাকা

খুলনার রূপসা উপজেলার ডোবা মায়েরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ...

মঙ্গলের 'জোছনা'

মঙ্গলের 'জোছনা'

জোছনার সৌন্দর্য নিয়ে যুগে যুগে কত যে কবি-সাহিত্যিক সাহিত্যকর্ম রচনা ...

জার্মানিকে বিদায় বলে দিলেন ওজিল

জার্মানিকে বিদায় বলে দিলেন ওজিল

ধকলটা আর নিতে পারলেন না ওজিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ ...

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর আবারও হামলা

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর আবারও হামলা

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-মামলা এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক নিপীড়নের ...