ভোটের হাওয়া: সিরাজগঞ্জ-১

নাসিমের দুর্গে ম্লান অন্য প্রার্থীরা

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮      

আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ

আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীবেষ্টিত কাজীপুর উপজেলা। কাজীপুরের ১২টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে এ সংসদীয় আসন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল এ আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর স্মৃতিবিজড়িত কাজীপুরকে 'দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ'ও বলা হয়ে থাকে।

স্বাধীনতার পর সবক'টি সংসদ নির্বাচনেই এম মনসুর আলী পরিবারের সদস্যরা নির্বাচিত হন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী নিহত হওয়ার পর তারই সুযোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম ধীরে ধীরে এখানকার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য। আগামী সংসদ নির্বাচনেও মোহাম্মদ নাসিম ছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রার্থী নেই বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখানে কোন্দলও নেই। মোহাম্মদ নাসিমকে ঘিরেই আবর্তিত এখানকার আওয়ামী রাজনীতি।


শহীদ এম মনসুর আলী পরিবারের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে এখানে শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। প্রতিবারই বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। এবারও মোহাম্মদ নাসিমের দুর্গ টলানোর মতো কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেনি বিএনপি। বৈচিত্র্য আনতে প্রস্তুত বলে  বিএনপির মনোনায়ন প্রত্যাশীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও সরকারবিরোধী আন্দোলন বা কর্মকাণ্ড নেই এখানে।


শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে বিজয়ী হন। প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রীও হন। '৭০-এর নির্বাচনেও তিনি প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন পান। দ্রুতই তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতায় পরিণত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকার উন্নয়নে ভূমিকার কারণে এখনও এখানকার মানুষের কাছে স্মরণীয়-বরণীয়।

সে সময় তিনি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য চাকরি, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ায় সবার অন্তরে ঠাঁই করে নেন। মৃত্যুর পর তার মেজো ছেলে মোহাম্মদ নাসিমকে এ অঞ্চলের মানুষ তার বাবার আসনে বসিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জ-১ ও সিরাজগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জ-১ আসনটি ছেড়ে দিলে তার বড় ভাই ড. মোহাম্মদ সেলিম উপনির্বাচনে বিজয়ী হন। এরপর ২০০১ ও ২০১৪ সালে মোহাম্মদ নাসিম এ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে মোহাম্মদ নাসিম মামলাবিষয়ক জটিলতায় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় ছেলে তানভীর শাকিল জয় নির্বাচিত হন। 


মোহাম্মদ নাসিম ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কাজীপুরকে নতুনভাবে সাজানোর ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের উন্নয়নের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ লাঘবে নদীভাঙন রোধে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। যমুনা নদীর তীরবর্তী প্রত্যন্ত ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে এখন লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। পাকা সড়ক, বৈদ্যুতিক লাইন, সৌরবিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজের স্থায়ী ভবনসহ চরাঞ্চলবাসীর জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। 


মোহাম্মদ নাসিম প্রতি সপ্তাহেই এলাকায় আসেন। খরা, বন্যা, নদীভাঙন ও প্রচণ্ড শীতেও তিনি কাজীপুর এসে দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে কার্পণ্য করেন না। নেতাকর্মীদের বরাবরই উদ্দীপ্ত রাখেন তিনি। তৃণমূলে এমন গভীর যোগাযোগ তাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে সরকারের উন্নয়নের প্রচার ও এলাকায় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বের কারণে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দল বরাবরই এখানে কোণঠাসা। 


এদিকে আওয়ামী লীগের দুর্গ ভাঙতে এ আসনে বিএনপি মাঠ সাজাতে এবারও হিমশিম খাচ্ছে। এ আসনে বিএনপির রাজনীতি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জাতীয় ও আঞ্চলিক আন্দোলনের প্রভাব এখানে পড়ে না। উপজেলা বিএনপির প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতির কারণে এখানে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল। তবে জেলা বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার পর এ অঞ্চলে বিএনপির নেতাকর্মীরা ভেতরে ভেতরে কিছুটা উজ্জীবিত। নতুন কর্মী সংগ্রহ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে স্থানীয়ভাবে দল সক্রিয় হচ্ছে বলে দাবি মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সহসভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার রানার। অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর ধারণা, আসনটির দখল পেতে প্রার্থী নির্বাচনে বৈচিত্র্য আনতে হবে, যা সাধারণ ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে।

এরই ধারাবাহিকতায় বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপাকে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে। কনকচাঁপার জন্ম এই উপজেলায় হওয়ায় এ গুঞ্জন এখন ডালপালা মেলছে। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এ আসনে কনকচাঁপার নাম শোনা গেলেও তাকে কখনোই এলাকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। এ ছাড়াও এক সময়ের উদ্যমী ছাত্রনেতা ও বর্তমান জেলা বিএনপির সহসভাপতি অধ্যাপক মো. রহমতুল্লাহ আয়ুব এ আসনে দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তিনি জানান, তার জন্মস্থান কাজীপুর হওয়ায় এলাকায় তার পরিচিতি রয়েছে। এ ছাড়াও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মকবুল হোসেন চৌধুরীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছে। সদর উপজেলার যে চারটি ইউনিয়ন কাজীপুর আসনে অন্তর্ভুক্ত তার বাড়ি ওই অঞ্চলেই। তার মতে, ভোটার আধিক্য এই চার ইউনিয়নে তার রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। এ ছাড়া কাজীপুরেও তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির পুরনো কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন সেলিম রেজা। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কাজে তিনি সক্রিয় না থাকলেও আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় তিনিও রয়েছেন। যদিও নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে ঢাকায় অবস্থান ও দলীয় কাজে অংশগ্রহণ না করায় তাকে নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। 


মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি থেকে আবদুল মোমিন সমাজবাদী মনোনয়ন চাইবেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রত্যাহার করে নেন। মহাজোটের শরিক জাসদের সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই তালুকদারের বাড়ি এ আসনের বাগবাটি ইউনিয়নে। আগামী নির্বাচনে মহাজোটের হয়ে এ আসনে জাসদ তাদের প্রার্থী চাইবে বলে শোনা যাচ্ছে। এ কারণে আবদুল হাই তালুকদার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে চলেছেন। 

বিষয় : ভোটের হাওয়া

পরবর্তী খবর পড়ুন : চোখ জুড়িয়ে যায়

আরও পড়ুন

 বিকল্প অনেক ফরমেশন হাতে আছে: তিতে

বিকল্প অনেক ফরমেশন হাতে আছে: তিতে

জার্মানির কাছে ৭-১ গোল বিধ্বস্ত হওয়া দলটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন ...

জনগণকে সেবা করতে পারলেই খুশি : আইনমন্ত্রী

জনগণকে সেবা করতে পারলেই খুশি : আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তিনি জনগণের সেবক এবং জনগণের সেবা ...

মাংস ব্যবসায়ীদের এত কারসাজি!

মাংস ব্যবসায়ীদের এত কারসাজি!

মাংসের দোকানিদের কারসাজির যেন শেষ নেই। কেউ পানিতে চুবিয়ে মাংসের ...

অমীমাংসিত ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা জাতি জানতে চায়: মির্জা ফখরুল

অমীমাংসিত ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা জাতি জানতে চায়: মির্জা ফখরুল

ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ...

নির্বাচনের আগে সংসদ ভাঙার দাবি বি. চৌধুরীর

নির্বাচনের আগে সংসদ ভাঙার দাবি বি. চৌধুরীর

যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী একাদশ ...

আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাসে ফিরতে হবে: মাচেরানো

আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাসে ফিরতে হবে: মাচেরানো

বছর চারের ধরে দারুণ ফুটবলের প্রদর্শনী দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ: কামরুল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ: কামরুল

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ।এই দুষ্টগ্রহকে বাংলাদেশের ...

কবিরাজির নামে নারীদের ধর্ষণ করতেন তারা!

কবিরাজির নামে নারীদের ধর্ষণ করতেন তারা!

কবিরাজি চিকিৎসার নামে নারীদের ধর্ষণ, ধর্ষণের ভিডিওচিত্র ধারণ ও সেই ...