ভোটের হাওয়া : পাবনা-১

আওয়ামী লীগে চতুর্মুখী লড়াই বিএনপিতে প্রার্থী সংকট

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮     আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮      

এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি- এ তিন শাসনামলে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনে যে দল জিতেছে, সেই দলই সরকার গঠন করেছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ, মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। এ জন্য আগামী নির্বাচনেও এ আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এখান থেকে বারবার নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি ছিল কলঙ্কেরও। এ দুঃখ যেমন সাঁথিয়া-বেড়াবাসীর, পুরো পাবনাবাসীরও। যুদ্ধাপরাধ মামলায় মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও সেই কলঙ্ক মুছে গেছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

আগামী নির্বাচনে বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লড়াইয়ে সামনের সারিতে। এ ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সাঁথিয়া উপজেলার তিনবারের চেয়ারম্যান ও দলের সাবেক উপজেলা সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন, সাঁথিয়া পৌরসভার মেয়র মিরাজুল ইসলাম প্রামাণিক, দলের সাঁথিয়া উপজেলার সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার, বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী কল্যাণ পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ওবায়দুল হক এবং সাঁথিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মোজাম্মেল হক মাস্টারের ছেলে মোশারোফ হোসেন স্কাই।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের এই দীর্ঘ তালিকাতেই বোঝা যায়, এ আসনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল যথেষ্ট প্রকট। দলের জেলা সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের বিরোধ কোনো গোপন ব্যাপার নয়। সাঁথিয়া উপজেলার সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার ও সাধারণ সম্পাদক তপন হায়দার সানের সঙ্গেও বনিবনা নেই টুকুর। তার ওপর করমজা চতুরহাট এলাকা সাঁথিয়া উপজেলা থেকে কেটে পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত করায় অনেকেই বর্তমান এমপির ওপর নাখোশ।

সন্তানদের অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার মাধ্যমে শতকোটি টাকা অর্জনের অভিযোগে শামসুল হক টুকুর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। টুকুর ছোট ভাই বেড়া পৌরসভার মেয়র আবদুল বাতেনের দাপট এবং সব কাজে হস্তক্ষেপ করায় দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও নাখোশ।

অভিযোগ প্রসঙ্গে শামসুল হক টুকু বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া দলের সংস্কারবাদী গ্রুপ সব সময়ই তার বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে। ওই গ্রুপ অপপ্রচার চালিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তিনি বলেন, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় তিনি যে উন্নয়নকাজ করেছেন, তা অভূতপূর্ব। এ কারণে মানুষ তাকেই ভোট দেবে। তা ছাড়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি কঠোর হাতে বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন মোকাবেলা করে এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখেছিলেন। এসব কারণে মানুষ তাকেই বেছে নেবে।

এদিকে দলীয়ভাবে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সমর্থকরাও অনেকটা নিষ্ফ্ক্রিয়। অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, সারাজীবন নৌকার মাঝি হয়ে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকেছেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সঙ্গেই থাকতে চান।

নিজাম উদ্দিন বলেন, সাঁথিয়া এলাকার মানুষ সব সময়ই বঞ্চিত। এখনও এই জনপদে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। প্রত্যাশিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন।

মিরাজুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, তিনি সফলভাবে কয়েক দফায় পৌর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। আরও বড় পরিসরে জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য এমপি পদে দলের মনোনয়ন চাইবেন।

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার বলেন, ঐতিহ্যবাহী করমজাহাট এলাকা বেড়া পৌরসভায় নেওয়ায় সাঁথিয়া বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তা ছাড়া সাঁথিয়া থেকে আওয়ামী লীগের কেউ মনোনয়ন পাননি বলে তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

ওবায়দুল হক জানান, নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন।

মোশারোফ হোসেন স্কাই বলেন, তার বাবা মোজাম্মেল হক মাস্টার সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। বড় ভাই তপন হায়দার সান সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

এ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকলেও দলের নেতাকর্মীরা মামলায় জড়িয়ে থাকায় প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। তার পরও দলটির সাবেক আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর এলাকা হওয়ায় জামায়াতকে আসনটি বিএনপি ছাড় দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন প্রার্থী হতে পারেন। আবার মতিউর রহমান নিজামীর পরিবারের কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এমনটা হলে বেড়া উপজেলা জামায়াতের আমির ডা. আবদুল বাসেত খান দলের প্রার্থী হতে পারেন। তিনি বলেন, দলের মনোনয়নের বিষয়টি তার জানার কথা নয়। এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করাও দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী। কেননা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিকেই দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়ে থাকে।

এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শফিকুল ইসলাম, তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ইউনুস আলী, কর্মজীবী দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি ও ধোপাদহ ইউপি চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দীন এবং বেগম খাইরুন্নাহার মিরু।

বিএনপির কয়েক নেতাকর্মী জানান, আগামী নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার পুরোভাগে রয়েছেন সাংবাদিক নেতা এম এ আজিজ। তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। অন্য কেউ প্রার্থী হলে নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়বেন।

বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, জোটগত নির্বাচনের কারণে বিএনপি এ আসনে জামায়াতকে ছাড় দিয়েছিল। আগামী নির্বাচনে এই সম্ভাবনা আর নেই।

ইউনুস আলী বলেন, দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও জোটগত নির্বাচনের কারণে দলীয় মনোনয়ন পাননি। তিনি এলাকার মানুষের এবং দুঃসময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। নিশ্চয়ই দল তাকে মূল্যায়ন করবে।

সালাহ উদ্দীন জানান, তিনি দলের দুঃসময়েও দুই দফায় ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেলে তিনি বিজয়ী হবেন বলে আশা করছেন।

বেগম খাইরুন্নাহার মিরু বলেন, পারিবারিকভাবেই তিনি বিএনপির সমর্থক। তা ছাড়া পুরো জেলার মধ্যে তিনিই একমাত্র নারী মনোনয়নপ্রার্থী। তিনি বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন।

তবে এ আসনে বিএনপির যোগ্য প্রার্থীর সংকট রয়েছে। রয়েছে দলীয় কোন্দলও। সাঁথিয়া উপজেলা সভাপতি মাহবুব মোরশেদ জ্যোতি ও সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান শামসু দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

মাহবুব মোরশেদ জ্যোতি অবশ্য দলীয় কোন্দলের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের ওপর ভর করতে হয় বলেই বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন পেলে সব সমস্যা মিটে যাবে।

শামসুর রহমান শামসু বলেন, একটি কুচক্রী মহল সব সময়ই দলে সংকট তৈরি করে রাখে। দলের কয়েকজন নেতাও তাদের সমর্থন দেন। এ কারণে দলে কোন্দল থেকেই যায়।

জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শাহজাহান সরদার ও জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওমর আলী খান মান্নাফ। শাহজাহান সরদার জানান, গত নির্বাচনে তিনি পার্টির প্রার্থী ছিলেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন। ওমর আলী খান মান্নাফ বলেন, তিনি পার্টির হাইকমান্ডের নির্দেশ পেয়েই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়েছেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির নজরুল ইসলাম জানান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য তাকে দলীয়ভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ আসনে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের আহমেদ রফিক, ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ১৯৭৯ সালে বিএনপির মির্জা আবদুল আউয়াল, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ, ২০০১ সালে আবারও মতিউর রহমান নিজামী, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু নির্বাচিত হয়েছেন।

বিষয় : ভোটের হাওয়া

পরবর্তী খবর পড়ুন : 'সুন্দরী'রা ভালো নেই

আরও পড়ুন

জনগণকে সেবা করতে পারলেই খুশি : আইনমন্ত্রী

জনগণকে সেবা করতে পারলেই খুশি : আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তিনি জনগণের সেবক এবং জনগণের সেবা ...

মাংস ব্যবসায়ীদের এত কারসাজি!

মাংস ব্যবসায়ীদের এত কারসাজি!

মাংসের দোকানিদের কারসাজির যেন শেষ নেই। কেউ পানিতে চুবিয়ে মাংসের ...

অমীমাংসিত ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা জাতি জানতে চায়: মির্জা ফখরুল

অমীমাংসিত ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা জাতি জানতে চায়: মির্জা ফখরুল

ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ...

নির্বাচনের আগে সংসদ ভাঙার দাবি বি. চৌধুরীর

নির্বাচনের আগে সংসদ ভাঙার দাবি বি. চৌধুরীর

যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী একাদশ ...

আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাসে ফিরতে হবে: মাচেরানো

আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাসে ফিরতে হবে: মাচেরানো

বছর চারের ধরে দারুণ ফুটবলের প্রদর্শনী দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ: কামরুল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ: কামরুল

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দুষ্টগ্রহ।এই দুষ্টগ্রহকে বাংলাদেশের ...

কবিরাজির নামে নারীদের ধর্ষণ করতেন তারা!

কবিরাজির নামে নারীদের ধর্ষণ করতেন তারা!

কবিরাজি চিকিৎসার নামে নারীদের ধর্ষণ, ধর্ষণের ভিডিওচিত্র ধারণ ও সেই ...

 নাদিয়ার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে

নাদিয়ার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে

চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে! শুনতে অবাক লাগলেও সত্য। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ...